ওয়াদা ৩০

0
3613

ওয়াদা৩০
যখন চোখ খুললাম দেখলাম আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি। আমার পাশে মা আর নিশাত বসে আছে। আমায় চোখ খুলতে দেখে মা নিশাতকে সবাইকে বলতে বললো আর ডাক্তারকে ডাকতে বললো।
-কেমন লাগছে এখন?(মা)
-ভালো।
-তুই কেন এমন একটা কাজ করতে গেলি? একবারও আমাদের কথা ভাবলি না।(মা কাদতে কাদতে বললো)
-আপা এখন এইসব কথা থাক না। সবে মেয়েটার জ্ঞান ফিরিছে। ওর উপর দিয়ে কত বড় একটা ঝড় গেলো বলুন তো।(মা মানে অনু কাকিমা)
-ঠিক বলেছো। এইসব নিয়ে পরেও কথা বলা যাবে।(আংকেল)
-এখন কেমন আছিস মা।(অনু কাকিমা)
-ভালো।(বলে উঠতে গিয়ে পরে গেলাম)
-আস্তে কি করছিস কি?(মা)
-একটু ওয়াশরুমে যাবো।(আমি)
শরীরটা খুব দুর্বল আর হাতেও খুব ব্যাথা। ঠিক মতো দাড়াতেও পারছি না। তাই মা আমায় ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেলো। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে দেখি ডাক্তার এসেছে। মা আমার পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিলো। ডাক্তার আমায় দেখে বললো
-ভয়ের কিছু নেই এখন আর। দু’দিন অজ্ঞান থাকায় অনেক দুর্বল হয়ে পরেছে। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া আর কিছু দিন বিশ্রাম নিলে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। আর আমি যে ঔষধ লিখে দিয়েছি সেগুলো এক সপ্তাহ চলবে। এক সপ্তাহ পর এসে ওনাকে একবার দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। ঔষধ চেন্জ করতে হতে পারে। আর উনি যেন মানসিক ভাবে উত্তেজিত না হয় সেদিকটা খেয়াল রাখবেন। আপনারা চাইলে আজকে সন্ধ্যায় ওনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন।(বলে ডাক্তার চলে গেলো)
-আল্লাহর কাছে লক্ষ লক্ষ শুকরিয়া যে ভয়ের কিছু নেই। এই দু’দিন যা টেনশনে ছিলাম।(অনু কাকিমা)
-হুম ঠিক বলেছো। আচ্ছা আমি তন্নিকে একটা কল করি। বেচারি খুব টেনশনে আছে।(আংকেল)
-হুম যাও।(অনু কাকিমা)
আংকেল বাইরে চলে গেলেন তন্নিকে কল করার জন্য। কিন্তু আমি খুজছি মেঘকে। সবাই এসেছে আমায় দেখতে কিন্তু ও তো এলো না। আমার জ্ঞান ফিরেছে সেটা কি ও জানে না? হয়তো জানে না। তাই আসে নি। কিছুক্ষণ পর আংকেল কিছু প্যাকেট নিয়ে ভেতরে আসলো।
-অনু?(আংকেল)
-হুম।
-এই প্যাকেটে সবার জন্য খারাব আছে। এই দু’দিন কারোরি ঠিক মতো খাওয়া হয় নি। একটা কাজ করো নাশুকে খাইয়ে দিয়ে তোমরাও কিছু খেয়ে নাও।(আংকেল)
-আচ্ছা ঠিক আছে।(অনু কাকিমা)
-নিশাত?(আংকেল)
-জ্বী আংকেল?
-চল মা তুই আর হোটেল থেকে খেয়ে আসি।(আংকেল)
-চলো।
আংকেল আর নিশাত চলে গেলো। মা আমায় খাইয়ে দিলো। তারপর মা আর কাকিমা একসাথে খেয়ে নিলো। অনু কাকিমা মা কে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিলো ফ্রেশ হওয়ার জন্য। মা ফ্রেশ হয়ে আসলে তারপর কাকিমা বাড়িতে যাবে। কাকিমা আমার পাশে বসে আছে। আর মা চলে গেছে। কিন্তু আমি শুধু মেঘের কথা ভাবছি। আমার জ্ঞান ফিরেছে সকালে আর এখন দুপুর হতে চললো অথচ মেঘ এখনো একবারো এলো না। একটু পর একজন নার্স এসে ঘুমের ইন্জেকশন দিয়ে গেলো। তারপর আমি ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুম ভাঙ্গলো সন্ধ্যার সময়। মা, কাকিমা, নিশাত সবাই আছে। আংকেল বাইরে রিসিপশনে কথা বলছে। আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। একটু পর আমরা বেরিয়ে পরলাম কিন্তু মেঘ এখনো এলো না। ভেবেছিলাম হয়তো সন্ধ্যায় নিতে আসবে কিন্তু এলো না। কেন এলো না ও? বন্ধুত্বের কর্তব্য পালন করা শেষ হয়ে গেছে তাই? ওতো শুধুমাত্র শুভর হাত থেকে আমায় বাচাতে চেয়েছিলো। আর ও ওর কাজে সফলও হয়েছে। ওর কাজতো শেষ হয়ে গেছে। তাই হয়তো আসে নি। এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ির পৌছে গেলাম। কাকিমা আর মা দু’জন মিলে আমায় ধরে আস্তে আস্তে উপরে নিয়ে আসলো। মা আমায় তার কাছে রাখতে চাইছইলো কিন্তু অনু কাকিমা মাকে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে আমি এখন তার বাড়ির বউ, তার মেয়ে তাই আমায় ওনার সাথেই থাকতে হবে। অনু কাকিমা আমাশ রুমে দিয়ে চলে গেলো আর যাওয়ার আগে বলে গেলো কোন কিছুর দরকার পরলে যেন তাকে ডাকি। অনু কাকিমা চলে যাওয়ার পর একা একা বসে আছি ভালো লাগছে না। অনেক রাত হয়ে গেছে কাকিমা আমায় খাইয়ে দিয়ে শুতে চলে গেছে। আর আমাকেও ঘুমিয়ে পরতে বলেছে। কিন্তু আমার চোখে ঘুম আসছে না। এতো রাত হয়ে গেছে মেঘ এখনো বাড়ি ফেরিনি। সারাদিনে একবারও আমার সামনে আসেনি কেন? এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি জানিনা। সকালে অনেক দেরিতে ঘুম ভাঙ্গলো। আমি উঠে আস্তে আস্তে রাথরুমের দিকে যেতে লাগলাম। অনেক দুর্বল এখনো। হাটতে পারছি না। যখন আমি পরে যেতে লাগলাম তখনি কোথা যেন মেঘ এসে আমায় ধরলো। কাল থেকে লাটসাহেবটাকে একবারও দেখিনি। চোখ মুখের কি অবস্থা হয়েছে। মনে হচ্ছে কত কাল ঠিকমত ঘুমায় নি।
-যখন দেখছো ঠিক মতো দাড়াতে পারছো না তখন একা একা না উঠে কাউকে ডাক দিতে পারতে। এগুলোও কি শিখিয়ে দিতে হবে নাকি?(মেঘ ধমক দিয়ে)
-আমি খুব অসুস্থ আপনি আজও আমায় বকবেন?(কথাটা বলার পর মেঘ আমার দিকে কেমন করে তাকালো)
তারপর আমায় ধরে ওয়াশরুম পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললো।
-আমি এখানেই আছি। হয়ে গেলো আমাকে ডাক দিও। পাকামি করে একা একা বেরনোর কোনো দরকার নেই।(মেঘ)
-ঠিক আছে।(বলে দরজা বন্ধ করে দিলাম)
হাত মুখ ধুয়ে একটু পর দরজা খুলে ওকে ডাকলাম।
-শুনছেন?(আমি ডাকার সাথে সাথে ও চলে এলো)
-হুম। চলো।
-বলছি কিছু মনে না করলে একটা কথা বলবো?
-হুম।
-আলমারি থেকে আমার কাপড় বের করে দিবেন প্লিজ। আসলে তিনদিন তো গোসল করা হয়নি তাই।
-দিচ্ছি।(বলে আলমারি থেকে জামা বের করে আমার হাতে দিয়ে বিছানার উপর বসলো।) আমিও আবার দরজা বন্ধ করে গোসল করে নিলাম। গোসল শেষে দরজা খুলে আবার ওকে ডাক দিলাম। ও আমায় ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলো।
-আর একটা কাজ করে দিবেন?
-কি?
-ঝুমাকে একটু ডেকে দিবেন?
-কেন?
-একটু দরকার আছে।
-কি দরকার আমায় বলো আমি করে দিচ্ছি।
-না না। আপনি পারবেন না। আপনি ঝুমাকে ডেকে দিন।
-কি এমন কাজ শুনি যে আমি পারবো না?
-আমিতো বলছি আপনি পারবেন না। এটা আপনার কাজ নয়।
-মেঘ পারে না এমন কোন কাজই নেই ওকে? সো তুমি বলো আমি করে দিচ্ছি।
-আসলে আমার হাতেতো খুব ব্যাথা। হাত ঠিকমতো নাড়াতেও পারছি না।
-জানি। কাজটা কি সেটা বলো।
-আমার জামা কাপড় ধুয়ে শুকাতে দিতে হবে। আমি একহাত দিয়ে ধুতে পারছি না।
-কিহ্?(একটু রাগি ভাবে)
-আমি আগেই বলেছিলাম আপনি পারবেন না। এটা আপনার কাজ নয়। তাই ঝুমাকে ডেকে দিতে বললাম।
-তোমায় কে বলেছে আমি জামা কাপড় ধুতে পারি না। আমার নিজের জামা কাপড় আমি নিজেই ধুয়ে দি ওকে?
-হ্যা। তাই বলেতো আর আমার কাপড় ধুতে পারবেন না তাই না। যান ঝুমাকে ডেকে দিন।
তারপর ও বাইরে গেলো ঝুমাকে ডাকতে। একটু পর আবার রুমে এলো।
-ঝুমা বাড়িতে নেই। একটু আগে বাজারে গেছে। আসতে অনেক দেরি হবে। আর মা রান্না করছে।
-ও। কিন্তু এতো সময় ধরে জামা ভিজেয়ে রাখলে তো,,,,,,
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই মেঘ ওয়াশরুমে চলে গেলো। একটু পর বাইরে বেরোলো হাতে আমার জামা কাপড় নিয়ে। তখনই তন্নি এলো।
-নাশু কেমন আছিস এখন?(তন্নি)
-আগের থেকে অনেকটা ভালো।
-কি ব্যাপার ব্রো বিয়ে হতে না হতেই বউ এর চাকর হয়ে গেলে,,,?(তন্নি)
-বাজে বকিস না ওকে। ওর হাতে ব্যাথা ও ধুতে পারছিলো না আর ঝুমাও বাড়িতে নেই তাই বাধ্য হয়ে,,,,,,(মেঘ)
-কেন খালামণিতো বাড়িতে আছে ওনাকে না বলে তুই গেলি কেন?(তন্নি)
-মা ব্যস্ত ছিলো তাই আমি,,,,,
-বুঝি বুঝি তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না। তুমি যে বউ পাগলা হবা সেটা আমি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম।(তন্নি)
-কি বললি আমি বউ পাগলা? দাড়া তোর হচ্ছে।
এই বলে মেঘ তন্নিকে ধরতে এলো। আর তন্নি সারা ঘর দৌড়াতে লাগলো। আর তার পিছু পিছু মেঘ। আমি ওদের এমন কান্ড দেখছি আর হাসছি। তন্নি দৌড়াতে দৌড়াতে বাইরে চলে গেলো পিছু পিছু মেঘও গেলো। আর আমি ওখানেই বসে বসে হাসছি। হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করলো। শুভ যদি আমার সাথে এমনটা না করতো তাহলে আমার জীবনটা আজ হয়তো অন্য রকম হতো। এইসব ভাবছিলাম আর কাদছিলাম।
-কার জন্য কাদছিস যার কাছে তোর জীবনের কোনো মূল্য নেই?(তন্নি)
আমি ওকে দেখে তাড়াতাড়ি কান্না থামিয়ে চোখ মুছে নিলাম।
-তুই যার জন্য এখানে বসে চোখের পানি ফেলছিস তার কাছে তোর এই চোখের পানির কোনো মূল্য নেই।(তন্নি)
-তুই যা ভাবছিস তেমন কিছুই না। আমি কাদছি না। চোখে কিছু একটা পরেছে হয়তো তাই,,,,
-এটা কমন ডাইলোগ। নতুন কিছু থাকলে সেটা দে।
-(চুপ)
-নাশু কেন কাদছিস তুই? কেন তুই ওই বদমাইশ লোকের জন্য নিজের চোখের পানি ফেলছিস? এইভাবে চোখের পানি নষ্ট করিস না। চোখের পানির অনেক মূল্য রে। আর এতো মূল্যবান জিনিস ওই লোকটার জন্য নষ্ট করছিস তুই? ও এর যোগ্যই নয়।(তন্নি)
এবার আমি তন্নি জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলাম।
-নাশু প্লিজ এইভাবে কাদিস না।
-তন্নি আমার সাথেই কেন এমনটা হয় বলতো। আমাকেই কেন সবার ওয়াদার স্বীকার হতে হয়। সবাই কেন আমাকে নিয়েই ওয়াদা করে। আমিই কেন বলতে পারিস। বাবা আংকেল কে ওয়াদা করেছিলো তাই সেই ওয়াদা পালন করতে গিয়ে বাধ্য হয়ে আমায় মেঘকে বিয়ে করতে হলো। শুভ ওর বাবাকে ওয়াদা করেছিলো বাবার উপর প্রতিশোধ নেবে তাই ও ওর ওয়াদা রাখতে আমার জীবন নষ্ট করতে এসেছিলো। আমার মন, ভালোবাসা, বিশ্বাস সব কিছু নিয়ে খেললো শুধু মাত্র ওর ওয়াদা পালন করবে বলে। সবাই সবাইকে দেওয়া ওয়াদা পালন করছে কিন্তু আমায় করা ওয়াদা গুলো কেউতো পালন করছে না। সেগুলোর কি কোনো মূল্য নেই। মেঘ ছোট বেলায় আমায় ওয়াদা করেছিলো ও আমায় কখনো একা হতে দিবে না কিন্তু ও ওর ওয়াদা ভঙ্গ করে বিদেশ চলে গিয়েছিলো। বাবা আমায় ওয়াদা করেছিলো সব সময় আমার পাশে থাকবে কিন্তু বাবাও তার ওয়াদা রাখলো না। আর শুভ ওতো এতই সৎ ব্যক্তি যে নিজের বাবাকে দেওয়া ওয়াদা পালন করার জন্য কারোর জীবন নষ্ট করতে দুবার ভাবে না। বলতে পারিস কেন আমাকে দেওয়া ওয়াদা কেউ রাখে না। কেন সবাই আমাকে মিথ্যে ওয়াদা করে। আমিই কেন সবার মিথ্যে ওয়াদার স্বীকার হই। আজ সবার ওয়াদার জন্য আমার বেচে থাকাটাই দায় হয়ে পরেছে।(ওকে জড়িয়ে ধরে কাদতে কাদতে কথাগুলো বললাম)
-নাশু তাকা আমার দিকে। একটা কথা সব সময় মনে রাখবি আল্লাহ ভালো মানুষদের সব সময় পরীক্ষা নেয়। আল্লাহ তোর ধৈর্য্যর পরীক্ষা নিচ্ছেন। তুই যদি এইভাবে ভেঙ্গে পরিস তাহলে বাকি সবার কি হবে বলতো। তুই একজনের ভালোবাসা পাসনি বলে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলি কিন্তু একবারও ভাবলি না কতগুলো মানুষ তোকে আকড়ে ধরে বেচে আছে। তোর মা যে তোকে জন্ম দিয়েছে তার ভালোবাসা কি ওই শুভর ভালোবাসার থেকে কম হয়ে গেছে? এই দু দিনের শুভ তোর কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে যে তুই তার জন্য নিজের জীবন দিতে যাচ্ছিলি। আর যারা তোকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই তোর কাছে?
চলবে,,,

#মেহজাবিন_নাশরাহ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে