ওয়াদা ২৯

0
2818

ওয়াদা২৯
শুভদের গ্রামের বাড়ি আর তন্নিদের গ্রামের বাড়ি একি এলাকায়। শুভর সাথে তন্নির ২ বছরের রিলেশন ছিলো। কিন্তু শুভ তন্নির সাথে শুধুমাত্র টাইমপাস করতো। পরে শফিউর রহমানের কথায় গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে। তন্নি আপনাকে শুভর ব্যাপারে অনেক কিছু বলে কিন্তু আপনি সেদিন তন্নিকে বিশ্বাস করেন নি। শুভ আপনাকে যা বুঝিয়েছিলো আপনি সেটাই বিশ্বাস করেছিলেন। যার জন্য আপনার আর তন্নির মধ্য দূরত্ব বেড়ে যায় এবং তন্নি কাউকে কিছু না বলে চলে যায়। শুভ ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর আস্তে আস্তে অস্ত্র পাচারকারী গ্যাং এর দলে যুক্ত হয়ে পরে। গত ৮/৯ মাস ধরে আমরা এই অস্ত্র পাচারকারী গ্যাংকে ধরার চেষ্টা করছি। মেঘ আমার স্কুল লাইফের বন্ধু ও বাইরে চলে যাওয়ার পর থেকে ওর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ ছিলো না। ও দেশে আসার পরও আমার সাথে ওর কোনো যোগাযোগ হয় নি। কিন্তু প্রায় ৪/৫ মাস আগে আমি একদিন সকালে একটা জরুরি কাজে কারাগারে যাচ্ছিলাম আর তখনই আমার মেঘের সাথে দেখা হয়। অনেক দিন পর পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা তাই ওকে বলেছিলাম আমার সাথে কারাগারে যেতে আমার কাজটা শেষ হলে দুজনে কোথাও বসে গল্প করবো। মেঘও সেদিন ফ্রি ছিলো তাই আমার সাথে গিয়েছিলো। আর কাকতালীয় ভাবে শুভও সেদিন ওর বাবার সাথে দেখা করতে কারাগারে যায়। আর মেঘ শুভকে দেখে ফেলে। শুভকে কারাগারে দেখে মেঘ আমার কাছে জানতে চায় যে ও কেন এখানে এসেছে। আমি এই চাকরিতে জয়েন করেছি এক দেড় বছর হবে। আর এই কেসটা তারও অনেক আগের তাই আমি এই কেসটার ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। কিন্তু মেঘ আমাকে বলে ওই ছেলেটার ব্যাপারে পুরো ইনফরমেশন ওকে দিতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তাই আমি খোজ খবর নিয়ে জানতে পারি শুভ ওর বাবার সাথে দেখা করতে আসে আর ওর বাবা ব্যাংক থেকে টাকা চুরির দায়ে শাস্তি ভোগ করছেন। মেঘ খুব উতলা হয়ে শুভ আর ওর বাবার ব্যাপারে আরো খোজ খবর নিতে বলে। আমি ওর কথা মতো খোজ নিয়ে জানতে পারি শুভর বাবাকে যিনি জেলে পাঠিয়েছিলেন তিনি আর কেউ না আপনার বাবা। মেঘ যখন এটা জানতে পারে যে আপনার বাবা যাকে পুলিশে দিয়েছিলেন শুভ তারই ছেলে তখন মেঘের শুভর উপর সন্দেহ হয়। মেঘ তখন শুভর উপর চব্বিশ ঘন্টা নজর রাখার জন্য দুজন গোয়েন্দা ঠিক করে যাতে মেঘ বুঝতে পারে শুভ ছেলেটা আসলে কেমন। আমি মেঘের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে ও শুভর ব্যাপারে এতো খোজ খবর কেন নিচ্ছে কিন্তু মেঘ সেদিন আমায় কিছু বলেনি। তার মাত্র কয়েকদিন পরই আমরা অস্ত্র পাচারকারী গ্যাং এর একজনকে ধরে ফেলি এবং তার কাছ থেকেই পাচারকারীর সব সদস্যদের ব্যাপারে জানতে পারি। আমি যখন জানতে পারি শুভও এই দলের সাথে যুক্ত তখনই মেঘকে সবটা জানায়। আমাদের হাতে তেমন জোরালো প্রমাণ না থাকায় আমরা শুভকে গ্রেপ্তার করতে পারি নি। তারপর মেঘ আমায় আপনার আর শুভর ব্যপারে সবকিছু বলে। আপনার আর শুভর একটা সম্পর্ক আছে। আমাদের সন্দেহ হয় শুভ আপনায় ভালোবাসে না ও আপনার কোন ক্ষতি করার জন্যই আপনার এতো কাছে এসেছে। আপনি মেঘের ছোট বেলার বন্ধু তাই মেঘ কোনো ভাবেই আপনার কোন ক্ষতি মানতে পারবে না বলে আপনাদের ভার্সিটিতে টিচার হয়ে যায়। যাতে আপনার আর শুভ দুজনের উপরই নজর রাখতে পারে আর আপনায় রক্ষা করতে পারে। মেঘ সহ আরো দুজন পুলিশ সবসময় আপনার আশেপাশে থাকতো আপনায় রক্ষা করার জন্য। এটা মেঘই আমাদের করতে বলেছিল। মেঘ শুভর পেছনে যে দুজন গোয়েন্দা লাগিয়েছিলো তারা আস্তে আস্তে শুভর ব্যাপারে সব প্রমাণ জোগার করে। আর তন্নির বিয়ের দিন সকালে মেঘ আমায় ফোনে জানায় যে শুভর বিরুদ্ধে সব প্রমাণ জোগার করা হয়ে গেছে। শুভ তন্নির বিয়েতে এসেছে। আমরা ওই দিনই শুভকে গ্রেপ্তার করতে আসতে চাইছিলাম কিন্তু মেঘ ওর বোনের বিয়েতে কোনো ঝামেলা হোক সেটা চাইছিলো না। তাই আমরা ঠিক করি বিয়ের পরের দিনই আমরা শুভকে গ্রেপ্তার করবো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত মেঘ আমার সাথে যখন ফোনে কথা বলছিলো তখন শুভ সবকিছু শুনে ফেলে। সবটা শোনার পর ও আপনার কাছে যায় আর আপনাকে বলে ওর সাথে পালিয়ে যেতে। ও আপনায় ভালোবাসার দোহায় দিয়ে ইমশোনালি ব্লাকমেইল করে কারণ ও জানতো আপনি ওকে খুব বেশি ভালোবাসেন। আর ওর বিশ্বাস ছিলো আপনি ওর সাথে পালাবেন। আর ও আপনায় নিয়ে অনেক দুরে কোথাও পালিয়ে যাবে। কিন্তু শুভর কপাল খারাপ ছিলো তাই শুভ যখন আপনাকে পালানোর কথা বলে তখন মেঘও সব কিছু শুনে ফেলে। মেঘ বুঝতে পারে শুভ ওর প্লানের ব্যপারে সব জেনে গেছে। তখন ও আপনার আর ওর পরিবারের সবাইকে সব কিছু জানায়। তখন সবাই মিলে ঠিক করে ওইদিনই আপনায় নিয়ে বাড়িতে ফিরবে আর আপনার সাথে মেঘের বিয়ে দেবে। যাতে আপনি শুভর সাথে পালাতে না পারেন। আর তাছাড়া আপনার বাবা আপনার বিয়ে মেঘের সাথেই দিতে চেয়েছিলেন। আপনাকে শুভর হাত থেকে বাচানোর জন্য মেঘকে এই বিয়েটা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। তাই ওইদিন রাতে আপনাদের বিয়েটা হয়। আমাদের প্লান ছিলো রাতে যখন শুভ তন্নিদের বাড়ির সামনে আপনার জন্য অপেক্ষা করবে তখন আমরা শুভকে ধরবো। কিন্তু আমরা চেষ্টা করেও শুভকে সেদিন রাতে ধরতে পারি নি। শুভ পালিয়ে যায়।শুভকে অনেক খুজি কিন্তু এতোদিন ধরে ও নিখোজ ছিলো। কিন্তু আমরা একটা ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম যে শুভর বাবা যেদিন ছাড়া পাবে শুভ সেদিন ওর বাবার সাথে নিশ্চয় দেখা করবে। তাই আমরা আগে থেকে প্রস্তুত ছিলাম। গতকালই শুভর বাবার শাস্তি শেষ হয়েছে এবং উনি ছাড়া পেয়েছেন। আর আমাদের ধারনা অনুযায়ী শুভ ওর বাবার সাথে দেখা করতে এসেছিলো আর তখনই আমরা শুভকে গ্রেপ্তার করি। আর গতকাল রাতে শুভর কাছ থেকে আমরা সব কিছু শুনি। প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও পরে একটু মিষ্টি মুখ করাতে সব কিছু বলে দিয়েছে। আর আমরা সেটা প্রমাণ হিসাবে ভিডিও করে রেখেছি। আমি মেঘকে বলেছিলাম আপনাকে শুভর ব্যাপারে সব সত্যি বলে দিতে কিন্তু মেঘ আমায় তন্নির সাথে হওয়া ঘটনাটা বলে আর এটাও বলে যে আপনি শুভকে অন্ধের মত বিশ্বাস করেন। আমরা যদি আপনাকে সবকিছু বলি আপনি মেঘকেও তন্নির মত ভুল বুঝবেন। ভাববেন মেঘ তন্নির হয়ে আপনার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। তাই মেঘ চেয়েছিলো সমস্ত প্রমাণ জোগার করে আপনায় বলবে। আর সেজন্যই আজ আপনায় সব কিছু বলা হলো। কারণ আমাদের কাছে শুভর বিরুদ্ধে সব রকম প্রমাণ আছে।(পুলিশ অফিসার সিফাত)
-নাশু সেদিন আমি শুভর ব্যাপারে তোকে একটাও মিথ্য কথা বলেছিলাম না। সেদিন আমি তোকে শুভর কথা গুলো বলেছিলাম শুভকে পাওয়ার জন্য না কারণ ওর মতো একজন মানুষকে আমি কখনই আমার জীবনে চাইতাম না। আমিতো তোকে ওর মিথ্যা ছলনা থেকে বাচাতে চেয়েছিলাম। আমি কখনো চাইনি তুইও আমার মতো শুভর ছলনার স্বীকার হ। শুধু সেই চেষ্টা টুকুই করেছিলাম সেদিন।(তন্নি)
-নাশু আমিতো তোর মা। কোনো মা কি তার সন্তানের খারাপ চাইতে পারে তুই বল? মেঘের সাথে বিয়েটা দেওয়ায় তুই আমায়, আমাদের সবাইকে ভুল বুঝে দুরে সরিয়ে দিয়েছিলি। আমার কষ্ট হয়েছিলো যে তুই আমায় ভুল বুজলি। কিন্তু তোর ভালোর জন্য তোর কাছে সেদিন আমায় খারাপ হতে হয়েছিলো। কখনো কখনো ভালো কিছু করার জন্য একটু খারাপও হতে হয়। সব কিছু জেনেও চুপ করে থাকতে হয়েছিলো। সেদিন যদি আমি তোকে জোর না করতাম তাহলে আজ তোর জীবনটা নষ্ট হয়ে যেতো। আর মেঘ? ও তোর জন্য যেটা করেছে সেটা নতুন করে আবার নাইবা বললাম।(মা)
আমি এতক্ষণ ধরে পাথরের মুর্তির মতো বসে থেকে কথাগুলো শুনছিলাম। আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি কোনো দুর্স্বপ্ন দেখছি ঘুম ভেঙ্গে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার শুভ এতটা নীচ কি করে হতে পারে? এতোদিন ধরে ওযে বলে এসেছে আমায় ভালোবাসে সেটা মিথ্যে ছিলো? আমায় নিয়ে ওর যে স্বপ্নের কথা বলতো সেগুলো মিথ্যে ছিলো? আমায় যে ওয়াদা করেছিলো সেটা মিথ্যে ছিলো? এইসব কিছু শুধুমাত্র ওর অভিনয় ছিলো? আমি বসা থেকে উঠে শুভর সামনে গিয়ে দাড়ালাম।
-ওরা যা কিছু বলছে সেইসব কিছু কি সত্যি?
-(চুপ করে আছে)
-কি হলো ওরা কি সত্যি বলছে?
-(চুপ)
-সত্যিটা কি তুমি আমায় বলবে?
(চুপ)
-আমি তোমার কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করছি।
-(চুপ)
-দেখ আমি জানি আমার পরিবারের লোক যা কিছু বলছে সেইসব সত্যি। কিন্তু তবুও আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চায়।
-(চুপ)
-ওরা যা কিছু বলছে সেটা কি সত্যি শুভ।(আমি খুবই শান্ত গলায় কথা বলছি)
-আমি আমার বাবাকে ওয়াদা করেছিলাম তার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ আমি নিবো। তোমার বাবার জন্য আমার বাবাকে এতোদিন ধরে জেলে থাকতে হয়েছে। আমার মাকে প্রতিদিন আমি চোখের পানি ফেলতে দেখেছি। আমার বাবা বেচে থাকতেও এতোগুলো দিন ধরে আমাদের পাশে ছিলো না। বাবাকে আমি আমার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আর বাবাকে যে কষ্ট দিয়েছে তাকে আমি কিভাবে ছেড়ে দিতাম। কিন্তু তোমার বাবা মারা যাওয়াতে বাধ্য হয়ে তোমায় টার্গেট করতে হয়। তোমার বাবা যেহেতু মারা গিয়েছিলেন তাই আমি ভেবেছিলাম তোমার সাথে প্রেমের অভিনয় করে তোমায় বিয়ে করবো। আর তারপর তিলে তিলে তোমায় কষ্ট দিয়ে প্রতিশোধ নিবো। তোমার জীবনটাকে নরক করে দিয়ে আমার বাবার মনকে শান্তি দিবো। আর তাই এতো কিছু করেছি। আর এর জন্য আমার এতটুকুও আফসোস নেই। আমি যা করেছি একদমি ঠিক করেছি। বাবাকে দেওয়া ওয়াদা পালন করেছি।(শুভ)
শুভর কথা শুনে ওকে কিছু না বলেই ওখান থেকে মায়ের কাছে এসে মা কে বললাম।
-মা আমি বাড়ি যাবো। খুব ক্লান্ত লাগছে। (বলেই ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম)
বাইরে এসে গাড়িতে বসলাম। একটু পর সবাই এলো শুধুমাত্র মেঘ ছাড়া। ও পরে আসবে। আমরা সবাই বাড়ি ফিরে এলাম। আমি আমার মায়ের সাথে আমাদের ফ্লাটে এলাম। কাকিমা আমায় ওনাদের ওখানে যেতে বলেছিলেন কিন্তু আমি যায়নি। কারণ এবাড়িতে যে আমার অনেক কাজ পরে আছে। আমি সোজা আমার রুমে আসলাম। এসেই শুভর দেওয়া সব উপহার, ওর সব ছবি, ওর সাথে সম্পর্কিত সব জিনিস যেগুলো আমায় ওর কথা মনে করিয়ে দিতে পারে সব কিছু এক জায়গায় করলাম। তারপর বেলকুনি তে দাড়িয়ে সব কিছু পুড়িয়ে ফেললাম। আজ থেকে শুভ নামের চ্যাপ্টার টা আমার জীবন থেকে ক্লোজড। তারপর রুমে এসে রুমের দরজা লাগিয়ে দিলাম। দরজা দেওয়ার সাথে সাথেই মা আর নিশাত দরজা ধাক্কাতে শুরু করলো। কিন্তু আমি এখন কারোর কথা শুনতে চাই না। ড্রয়ার থেকে একটা ব্লেড বের করে বিনাছার উপর বসলাম। ব্লেডটা হাতে নিয়ে কাদতে লাগলাম আর বলতে লাগলাম।
-আমায় ক্ষমা করো মা। পারলে আমায় ক্ষমা করো। আমি আর বাচতে চাইনা। আমি যে হেরে গেছি মা। বাবা তুমিও আমায় ক্ষমা করো তোমার মেয়ে যে হেরে গেছে। মেঘ তুমি আমার জন্য যা কিছু করেছ তার প্রতিদানে তোমায় দেওয়ার মতো আমার কাছে কিচ্ছু নেই। শুধু এই দোয়াই করতে পারি ভালো থেকো। বলেই বাম হাতের শিরায় একটান দিলাম। সাথে সাথে গরম তেল যেমন টগবগ টগবগ করে ফোটে তেমন ভাবে রক্ত বেরতো লাগলো। আমার চোখদিয়ে অনিবরত পানি পরছে। আমি হাতের দিকে তাকিয়ে রক্ত পরা দেখছি। চারিপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথাটা পুরা ভার হয়ে গেছে। আমি বিছানায় পরে গেলাম।
চলবে,,,

#মেহজাবিন_নাশরাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here