এক_পশলা_বৃষ্টি_আর_সে পর্ব_২০

0
1985

এক_পশলা_বৃষ্টি_আর_সে পর্ব_২০
লেখনিতে: চৈত্র রায়

৩৮
,
,
,
পরদিন সকালে বাবা নিজে গিয়ে আম্মুকে নিয়ে এলেন সাথে করে…. সারাদিন সবাই মিলে কাটিয়ে বিকেলের পর আম্মু আর ওনার সাথে রউনা দিলাম…… এতোগুলো দিন কাটিয়ে যাবার সময় মনে হচ্ছে দ্বিতীয় বিদায় আমার…….. মায়ের অফিস থেকে ফেরার আর অপেক্ষা করা হবে না….. বাবার জন্য চা করা হবে না….. ভেতরে তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে যেনো……. যম ঠাকুর আর সেখানে বেশি সময় দাড়ালেন না…. আম্মুকে আর আমাকে সিএনজি তে বসিয়ে দিয়েই নিজে গিয়ে বাবার সাথে কথা বলে তারপর গাড়িতে ওঠে এলেন…..বাড়ি ফিরে কেমন যেনো স্যাতস্যাতে লাগছে সবকিছু….. যেনো কোন কিছুতেই প্রাণ নেই…. ওনি একেবারে বইপত্র নিয়ে পড়ার ঘরে চলে এলেন……আমি কিছুক্ষণ সেখানে দাড়ানোর পরই আম্মু পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন….. এই ঊনিশ দিনের মধ্যে এমন একটা দিন ও নাই যে মানুষ টা আমাকে দেখতে কলেজ যায় নি….
,
,
,
——— টুকি আমি কিন্তু বাবুকে অনেক বকেছি জানিস!!! ওকে জন্মের পর ও এভাবে বকি নি কখনো…. যখন যখন তোর কথা মনে পড়তো তখন তখন বকেছি….. এই কয় দিনে একেবারে মায়া লাগিয়ে দিয়েছিস রে টুকি….. আর এমন করিস না মা….. আমি খুব কষ্ট পেয়েছি জানিস…. ঠিক মতো খেতে পারতাম না…. তাই তো এটা সেটা তোর জন্য নিয়ে কলেজে ছুটে যেতাম…… আমি চোখ বুঝি তারপর তোদের যা ইচ্ছা করিস…..
,
,
,
আম্মুকে আমি জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম কতোক্ষণ….. সব মায়েদের গায়েই একটা প্রশান্তিকর গন্ধ আছে….. মায়ের কথাটা বেশ মনে পড়ছে…… রুমে এসে একেবারে সব পরিপাটি পেলাম…..সেদিনের গোসলের পর ভেজা কাপড় গুলো সুন্দ করে সোফায় ভাজ করে রাখা……..গামছাটা চেয়ারের উপর….. দেরি না করে কাপড় চেঞ্জ করে বেরিয়ে এলাম ফ্রেশ হয়ে…… ওনি তখন রুমে ঢুকে শার্টের বোতাম খুলতে ব্যাস্ত…… চেঞ্জ করা কাপড় গুলো সোফায় মেলে রেখে…. ডায়নিং চলে এলাম পানি খেতে….. ওমনি চেচিয়ে ডাকা শুরু…..
,
,
,
——— তুলিইইইই…. একগ্লাস পানি নিয়ে আসোতো….
,
,
কেন যেনো মনে হচ্ছে বহুযুগ পর নিজের নামটা এভাবে শুনছি….. পানি নিয়ে রুমে গিয়ে দেখি বাথরুমে ঢুকে পড়েছে…..বিছানা টা বড্ড টানছিলো…. পানিটা টেবিলে রেখেই বিছানায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছি……. ঘুম ভেঙে গেলো মুখের উপর গরম নিশ্বাস আর পানির ফোটায়….. চোখ মেলে দেখি…. ওনি একেবারে আমার মুখের উপর ঝুকে আছে…..চুল মুখ থেকে পানি চুইয়ে মুখের উপর পড়ছে….. আমি পানির ফোটা গুলা মুখ থেকে মুছে সোজা হয়ে বসতেই ওনি আমার আঁচল টেনে নিয়ে গামছারমতন করে মুছে যাচ্ছেন…. …তারপর আমাকে দিয়ে নতুন করে পানি আনিয়ে খেলেন……
,
,
,
রাতে আর নতুন করে কিছু রান্না করতে হয় নি….. মা আসার সময় সব কিছু বাক্স বন্ধি করে সাথে দিয়ে দিয়েছেন…… রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে রুমে এসে একেবারে আমি শুয়ে পড়লাম….. দরজা লাগানোর ধৈর্য্যটাও যেনো আমার মধ্যে অবশিষ্ট নেই….. এক ঘুমে রাত ভোর করে সজাগ হতেই দেখলাম….. যম ঠাকুরের দু পায়ের মাঝে আমার দুই পা…. সারা বিছানায় শাড়ি ছড়িয়ে আছে শুধু আমার গায়েই নেই….. অনেকদিন পর শাড়ি পড়ার দরুন যা হয় আরকি….. এদিকে নড়েচড়ে উঠতে ও পারছি না…. কাধের শাড়ি সব ওনার পিঠের নিচে….. ঘুমের মধ্যে ওনাকে এমন আষ্ট্রেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে ঘুমিয়েছি ভাবতেই লজ্জা পাচ্ছে খুব….. আমার নড়াচড়া দেখে ওনার ঘুম ভেঙে গেলো….. চোখ না খুলেই কপালে হাত দিয়ে কি যেন চেক করছে…. তারপর চোখ মেলে আমার দিকে ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে…..
,
,
,
——— গুড মর্নিং….. লেডি….. তোমার জন্য রাতে একটু ও ঘুমাতে পারি নাই…. পা ব্যাথা ব্যাথা করে সারা রাত পা টিপিয়েছো….৷ এদিকে হালকা জ্বর ও ছিলো….. নিশ্চয়ই এসে ভর সন্ধ্যায় গোছল করেছিলে….
,
,
,
ওনার কথা শুনে অনেকটা অবাক হয়ে ও হলাম না…. কারণ সন্ধ্যে থেকেই হাত পা ব্যাথায় কাহিল ছিলাম….. ইশ লোকটা শেষে কিনা পা টিপলো সারারাত….. ওনি ওনার পিঠের নিচে থেকে কাপড়ের আঁচল টা টেনে সরিয়ে ফের শুতে শুতে বললেন…….
,
,
,
——— আস্তে ধীরে উঠে কাপড় গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও…. আমি আরও কিছুক্ষণ ঘুমাবো….
,
,
,
ওনার এই সাধারণ কথাটায় অসাধারণ লজ্জা পেলাম….. আমার এই উদ্ভব ঘুম টা যে কবে যাবে আল্লাহ মালুম…. ঝটপট ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলাম রুম থেকে….. ওনিও বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে একেবারে অফিসে যাবার জন্য রেডি হয়ে বেড়িয়ে গেলেন আগের সেই রোজকার রুটিনে…..
,
,
,
৩৯
,
,
,
দুটো প্রাইভেট থেকে একটা যম ঠাকুর অফ করিয়ে দিলেন ফিরতে রাত হয়ে যায় বলে…. তারউপর এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে…..৷ আম্মু রোজ আমাকে সাথে করে প্রাইভেট পড়াতে নিয়ে যায়…… ব্যাপার টাতে আমি আর আম্মু দুজনেই বেশ মজা পাই….. আমার ছোট বেলা থেকেই খুব ইচ্ছে ছিলো সবকিছুতেই মাকে পাবো…. কিন্তু তেমন তো খুব একটা হয়ে উঠেনি বললেই চলে….. এদিকে আম্মুর ও বিয়ের পর বড় আপু আর ভাইয়ারা কলেজ পড়ুয়া….. ওনি যখন হয় তখন আম্মু একেবারে পাক্কা গৃহিণী তাছাড়া ও বাড়িতে বৌদের বাইরে বের হবার চল ছিলো না খুব একটা…… ওনার বাবা মানে আমার শ্বশুরমশাই তার সর্বকনিষ্ঠ পুত্রের জন্য লোক ঠিক করে দিয়েছিলেন তখন স্কুলে নিয়ে আসার জন্য….. তাই আম্মুর ইচ্ছেটাও তখন অপূর্ণ রয়ে গেছে……. ফেরার সময় তো আমরা ইচ্ছে করেই হেটে ফিরতাম…. গল্প করতে করতে…. আচার… আইস্ক্রিম…. লজেন্স এটা সেটা খেতে খেতে….. আম্মু আসলেই খুব মজার মানুষ….. রাস্থায় কোন কিছু দেখলেই বলবে…..টুকি যাবার সময় কিনে খাবো মনে রাখিসতো…. বা কখনো দোকানিকে জিজ্ঞেস করতেন অমুক সময় পর্যন্ত ওনি থাকবে কিনা…… প্রাইভেটের সব স্টুডেন্ট দের মুখে মুখে আম্মুর প্রশংসা আর আমার সৌভাগ্যের আলোচনা….. আসলেই আমি সৌভাগ্যক্রমেই এমন একটা মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম……..
,
,
,
আম্মুকে সাথে করে নিয়ে ইচ্ছে পূরণ হলেও বেশ ঝামেলায় পড়তে হয় বলা চলে….. ওনি প্রাইভেটের লাস্ট বেঞ্চে নয়তো কখনো স্যারের চেয়ারের পাশে বা কখনো বারান্দায় দাড়িয়ে সব খেয়াল করেন….. আমি ঠিকঠাক পড়া দিচ্ছি কিনা?? ফাকি বাজি করছি নাতো সব….. তারপর বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে একগ্লাস দুধ হাতে ধরিয়ে সামনে বসে পড়তেন….. যতক্ষণে শেষ না করবো ততক্ষনে একপা ও নড়বে না…..যম ঠাকুরের নতুন অফিস থেকে ফিরতে সাতটা আটটা বেজে যায় বলে…. ঘন্টা খানেক বিরতি দিয়েই আমাকে পড়ার ঘরে টেনেটুনে নিয়ে বসাবে….. কখনো পাশের চেয়ারে বসে থাকবে নয়তো কখনো তজবি হাতে পায়চারি করবে…. আর যেদিন কোনক্রমে পড়া এদিক ওদিক হয় তাহলে তো হয়েছেই….. সারা রাস্তা হুমকি ধামকি দিতে দিতে আনবে…… ওনার দেওয়া হুমকির মধ্যে বেস্ট হুমকি হচ্ছে.———
,
,
,
——— ফিরোক আজ বাবু….. তারপর একে একে সব বলবো আমি তোর সারাদিনের রুটিন….. দেখে নিস
,
,
,
ব্যাস ওটুকুতেই আমি কাদোকাদো হয়ে ওনার পেছনে ঘুরঘুর করতাম সারা সন্ধ্যে…… এর মধ্যে ঢাকা সহ সারাদেশে শুরু হলো টানা বর্ষন….. এই বৃষ্টি ভিজে রাতভর জ্বরে ভোগে ওনি অফিস থেকে তিনিদিনের ছুটি পেলেন…….. জ্বরে ভোগা ওনার এই জীর্ণ শীর্ণ চেহারা দেখে বেশ বুঝতে পারলাম ওনার প্রতি আমার ভালোবাসার গভীরতা টা…… ওনাকে যতবার দেখেছি ততবারই কেদে বুক ভাসিয়ে মনে মনে বলেছি
,
,
,
——— ভালোবাসিতো….
এই যে দেখেন বুকের বা পাশটায় কেমন ব্যাথা হচ্ছে……
,
,
,
,
,
চলবে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে