একটুখানি সুখ পর্ব-০৭

0
484

#একটুখানি_সুখ
#আনিশা_সাবিহা
পর্ব ৭

–“লাইক সিরিয়াসলি? টেল মি ওয়ান থিং! তোমায় কে এই কথাটা বলেছে? আই মিন তাকে একটু যাচাই করে দেখতাম আদোও তার চোখ ঠিক আছে কিনা। তুমি আর হট?”

বলেই আবারও উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল স্বচ্ছ। তার হাসি যেন থামছেই না। চকচকে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। স্বচ্ছের হাসির ঝংকারটাও সুন্দর বেশ। তবে এই হাসিতে যে মোহকে ইনসাল্ট করা হচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছে মোহ। রাগে আগের চেয়ে বেশি দরদর করে ঘামছে সে। ঘামে আর মৃদু বাতাসে গালের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে মোহের চুল। রোদ সরাসরি এসে পড়ছে তার চোখেমুখে। রোদের তাপ ও রাগ দুটো মিলিয়ে মুখে উঠে উঠেছে গাঢ় লাল আভা। গাল দুটো বেশি লাল হয়েছে তার। তা দেখে হাসি থামায় স্বচ্ছ। এক মূহুর্তের জন্য তার মনে হয় এ যেন কোনো ভয়াবহ সুন্দরী ঝাঁসির রানি দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তৎক্ষনাৎ ঠোঁট কামড়ে চোখ সরিয়ে ফেলল সে। আবার মুখে সেই হাসি ফুটিয়ে বলল,

“তোমার মাঝে হটনেসের কোন গুন আছে? একটা পাগলই বলতে পারে তোমায় এসব কথা। তুমি সত্যিই হট হতে চাইলে তোমায় আমি কিছু ছবি পাঠিয়ে দেব। সেসব ছবি দেখে নিজেকে তেমন বানাতে চাইলে বানাতে পারো।”

“আপনি চুপ করবেন স্বচ্ছ ভাই? আপনার মুখে কিছু আঁটকায় না জানি। বার বার ওই শব্দটা ইউজ করার মানে কি? অন্তত আমি আপনার কাজিন সেই হিসেবে এসব বলা বন্ধ করতেই পারেন।”

বিরক্ত আর কিছুটা লজ্জা নিয়ে বলে মোহ। তবুও ভাবান্তর নেই স্বচ্ছের। সে আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে বলল,
“এটা কোথায় লিখা আছে কাজিনকে এসব বলা যাবে না? আর কাজিন কি? তুমি কি ভাবো তোমার মতো একটা মেয়েকে স্বচ্ছ কাজিন মানবে? হাহ, ইন ইউর ড্রিম। তুমিই তো নিজেকে হট বলে পরিচয় দিলে আমি কি দিয়েছি? আমি তো জাস্ট তোমায় সাজেস্ট করলাম কি করে…”

“আমি কেন আপনার সঙ্গে কথা বলছি বলুন তো? আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার সঙ্গে কথা বলা আর না বলা একই। আপনি তো নিজে কনসিডার করবেন না। সো প্লিজ স্টপ। আমিও আপনাকে কাজিন মানতে মরে-টরে যাচ্ছি না।”

অতিষ্ঠ হয়ে বলে মোহ। তার চোখমুখের অঙ্গিভঙ্গি বলে দিচ্ছে স্বচ্ছের এমন কথাবার্তার ওপর কতটা বিরক্ত সে। তবুও স্বচ্ছ একেবারে নির্বিকার। যেন মোহের কোনো কথায় তার কান অবধি পৌঁছায়নি। মোহের এমন চেহারা দেখে বেশ মজা লুটছে মনে মনে স্বচ্ছ। হাসতে গিয়েও গম্ভীরতা বজায় রাখছে সে। মোহ আবারও তেতে বলে ওঠে,
“আর তাছাড়া আমি তো বুঝতেই পারছি না আপনি এই ভার্সিটির সামনে করছেন টা কি? নিশ্চয় নতুন করে ভর্তি হতে আসেননি? কেন এসেছেন?”

স্বচ্ছ তুড়ি বাজিয়ে বলেন,
“দিস ইজ নট অনলি ইউর ভার্সিটি। আমার আট নম্বর গার্লফ্রেন্ড ফারিহা আছে এখানে। তার সঙ্গে মিট করতে এসেছি। এনি কুয়েশ্চন?”

মোহ আর কিছু বলে না। গটগট করে হেঁটে চলে আসে জুহির কাছে। ভার্সিটির দরজার সামনে দাঁড়িয়েই স্বচ্ছ আর মোহকে খেয়াল করছিল জুহি। মোহ আসতে না আসতেই জুহি লাফিয়ে বলে ওঠে,
“এই মোহ, ওই ছেলেটা কে রে? তোর বয়ফ্রেন্ড? কিন্তু তোর বয়ফ্রেন্ড তো অন্যজন ছিল চাশমিশ ওয়ালা। কবে বয়ফ্রেন্ড পাল্টালি?”

প্রথমেই স্বচ্ছের কথাবার্তায় মেজাজ বিগড়ে ছিল মোহের। জুহির কথা শুনে দাঁত চেপে তাকালো সে।
“আমার মাথা এতোটাও খারাপ না যে উনার মতো একটা ডিজগাস্টিং লোককে আমি বয়ফ্রেন্ড বানাব। আমার সো কলড কাজিন উনি।”

“সিরিয়াসলি? সিঙ্গেল? বল না সিঙ্গেল? একটু লাইন করিয়ে দে না রে।”

“হ্যাঁ একেবারে সিঙ্গেল। আট নম্বর গার্লফ্রেন্ডের সাথে মিট করতে এসেছে। নয় নম্বর গার্লফ্রেন্ড হবি? তাহলে যা। তোর জন্য একদম পারফেক্ট।”
মুখ ভেঙিয়ে বলল মোহ। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভোঁতা হয়ে যায় জুহির। সেখান থেকেও সরে আসে মোহ। নিজের মাথা আর খারাপ করতে চায় না সে।

হেঁটে কিছুটা দূর এগিয়ে আসতে আসতেই আচমকা তার সিক্সথ সেন্স বলে ওঠে তার পিছু পিছু কেউ হেঁটে যাচ্ছে। কেউ তাকে লক্ষ্য করছে। এমনটা ভার্সিটিতে আসতেও হয়েছিল তার। যদিও সে গাড়িতে এসেছিল। তবুও মনে হয়েছিল একটা সাদা রঙের গাড়ি তার গাড়িতে ফলো করছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কোথাও উধাও হয়ে যায় গাড়িটা। লুকিং গ্লাসে গাড়ির দেখা আর মেলে না।

এখন আবারও একই অনুভূতি পেয়ে কিছুটা আতঙ্কিত হলো সে। ধীরে ধীরে পিছু ফিরেও তেমন সন্দেহজনক কাউকে নজরে পড়ল না তার। স্বচ্ছকেও আশেপাশে দেখা গেল না। সামনে ফিরে হাঁটার গতি বাড়িয়ে ড্রাইভারকে কল লাগায় মোহ। ড্রাইভার জানায় তার আসতে একটু লেট হবে। তা শুনে সেখানেই দাঁড়ায় মোহ। আশেপাশে এতো মানুষজন থাকতেও তার মনে হচ্ছে কেউ হিংস্র ভঙ্গিতে তাকে দেখছে। কথায় বলে মেয়েদের সিক্সথ সেন্স বেশি কাজ করে। একটু জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল মোহ। নিজেকে শান্ত রাখতে বড় বড় শ্বাস ফেলেও বিশেষ লাভ হলো না। হাতের রুমাল চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল সে।

মিনিট পাঁচেক পরই আকস্মিকভাবে তার সামনে একটা বাইক এসে থামে। হঠাৎ এমন ঘটনা ঘটে যাওয়া হুড়মুড়িয়ে পেছনে সরে যায় মোহ। বিতৃষ্ণা নিয়ে বাইকের মালিকের দিকে তাকাতেই স্তব্ধ হয় সে। স্বচ্ছ হেলমেট খুলে মোহের দিকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে।

“কি সমস্যা আপনার জানতে পারি স্বচ্ছ ভাই? কেন অকারণে আমার পেছনে লাগছেন?”

মোহ কথাগুলো অতিরিক্ত রাগের সঙ্গে বলতে গিয়েও পারল না। কারণ স্বচ্ছকে দেখে কেন যেন একটু হলেও স্বস্তি পেয়েছে সে। জড়োসড়ো ভাবটা কেটে গেছে তার মনে। স্বচ্ছ কথা পাল্টে বেশ দ্রুততার সঙ্গে বলল,
“বাইকে উঠে পড়ো রাইট নাউ।”

স্বচ্ছের এই কথায় ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয় মোহের। সে হতভম্ব হয়ে বলে,
“মানে?”

“মানে বোঝো না? নাকি কানে শুনতে পাও না? আমি এখনই বাইকে উঠে বসতে বলেছি। সময় নেই তাড়াতাড়ি ওঠো। তর্কাতর্কি করতে চাই না মোহ।”

“আমি কেন আপনার বাইকে উঠতে যাব? এটা আপনি ভাবলেন কি করে? বলা নেই কওয়া নেই বাইকে উঠতে বলবেন আর উঠে যাব?”

“লাস্টবার বলছি বাইকে উঠে পড়ো। নয়ত অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে আমায়।”

এবার মোহ রাগে রীতিমতো তার শরীর কাঁপছে মৃদু। স্বচ্ছের এমন উদ্ভট ব্যবহার তাকে বিভ্রান্ত করে ফেলছে। মোহও রীতিমতো জেদ নিয়েই বলল,
“আমি যাব না আপনার সাথে। কি প্রবলেম আপনার? আগে তো আমার সামনেও আসতেন না। তাহলে কি হলোটা এই কয়দিনে? আমি যাব না। কিছুক্ষণ পর আমার গাড়ি আসবে আমি তাতে করেই যাব।”

স্বচ্ছ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে মোহের দিকে। চোয়াল শক্ত করে বাইক থেকে নেমে মোহের হাত ধরে টান দিতেই সে স্বচ্ছের দিকে চলে আসে। মোহ সরতে চাইলে তাকে কোলে করে তুলে বাইকে বসিয়ে দেয় স্বচ্ছ। ঘটনা এতো দ্রুত ঘটে যাওয়ায় কিছু করার সুযোগটুকুও পায় না মোহ। মেয়েটার হাত শক্ত করে ধরে শাসিয়ে বলে,

“নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। আই থিংক তুমি পাগলের চেয়েও অধম নও। আর একবার যদি বাইক থেকে নামার চেষ্টা করেছো তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। আমি ভেতর থেকে এতোটাও মিষ্টি মানুষ নয়। আমার তিক্ত রূপ দেখাতে বাধ্য করবে না। কালকের কথা মনে আছে? ওইযে নিজের রুমে ঢুকে পাগলের প্রলাপ বকছিলে? ভিডিওটা এখনো আমার কাছে আছে। ভিডিওটা সবার ফোনে যাক এমন কিছু নিশ্চয় চাও না? কিপ ইউর মাউথ শাট।”

এক মূহুর্ত দাঁড়ায় না স্বচ্ছ। সামনে বাইকে উঠে যত দ্রুত সম্ভব ততটা দ্রুত বাইক স্টার্ট দেয় সে। ফুল স্পিডে বাইক চালানোতে স্বচ্ছের কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও পারছে না মোহ। সে স্বচ্ছের কোনোরূপ আচরণ বুঝতে পারছে না। লোকটা নিজ মনে বাইক দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে। মোহ এবার না পেরে আমতা আমতা করে বলে,
“বাইক একটু স্লো স্পিডেও তো চালানো যায়। আমার এতো তাড়াহুড়ো নেই।”

স্বচ্ছ গাম্ভীর্যের সাথে জবাব দেয়,
“সো হোয়াট? তোমার কমপ্লিমেন্ট শুনতে চেয়েছি? না তো! আমার অনেক তাড়া আছে। অফিস থেকে এসেছি। আমায় আবার যেতে হবে।”

“তাহলে চলে গেলেই পারতেন। কেন আমায় বাইকে এভাবে তুলে দরদ দেখাতে গেলেন?”

“ওইযে আমি একটু দরদী মানুষ তাই।”

রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ল মোহ। কিছু বললও না। এবার স্বচ্ছ নিজ থেকে বলল,
“কি কাঁধে হাত রাখতে সাহস পাচ্ছো না? কাঁধে হাত রাখতে পারো। তোমার হাত এতোটাও আকর্ষণীয় না যে খেয়ে ফেলার ইচ্ছে হবে।”

স্বচ্ছের এমন খাপছাড়া কথায় আবারও ক্রুদ্ধ হয়ে গেল মোহ। এমন মানুষ হয় কেন? অন্যকে লজ্জা দেওয়ার জন্য? এবার শোধ তুলতে স্বচ্ছের কাঁধে খামচে ধরে নখ বসিয়ে দিতেই বেসামাল হয়ে পড়ে স্বচ্ছ। গলা খাকিয়ে জোরে জোরে বলে ওঠে,
“হোয়াট দ্যা…! এমন করছো কেন?”

“আপনিই তো বললেন কাঁধে হাত রাখতে।”

“তাই বলে এভাবে? মনে তো হচ্ছে রক্ত বের টের হয়ে গেছে। এখন তুমি আমার কত বড় ক্ষতি করে দিলে ধারণা আছে? যেভাবে নখ বসিয়েছো নিশ্চয় দাগ হয়ে গিয়েছে। এটা আমার ভবিষ্যৎ বউ দেখলে কি হবে বুঝতে পারছো?”

বেশ আতঙ্কের ভাব ধরে প্রশ্ন করে স্বচ্ছ। মোহ মানে না বুঝে জিজ্ঞেস করে,
“কি হবে?”

“আমার বউ আমায় ডিভোর্স দিয়ে দেবে নিশ্চিত। কাঁধে এমন দাগ কেন হয় জানো তো? ইটস কলড লাভ বাইট।”

এবার হতবিহ্বল হলো মোহ। রাগে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদার মতো অবস্থা হলো তার। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে স্বচ্ছকে বলে,
“আপনি কি চুপ করবেন?”

স্বচ্ছ চুপ করে মৃদু হাসে। জোরালো বাতাসে চোখমুখ বন্ধ হয়ে আসছে মোহের। ছোট ছোট চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে সে। সামনের মানুষটাকে মাঝে মাঝে ভেংচি কাটা থেকে শুরু করে মনে মনে তাকে গালি দিয়ে উদ্ধার করে ফেলল মোহ।

রাস্তার দিকে চোখ পাকিয়ে সে বলল,
“শুনুন আমি বাড়ির দিকে যাব না এখন।”

“তো কোথাও যেতে চাও?”

“পুলিশ স্টেশনে যাব।”

তা শুনে হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষে স্বচ্ছ। পিছু ফিরে বলে,
“কেন? পুলিশ স্টেশন কেন?”

“গতকাল রাতে কেউ আমাকে ওইযে ওসব বলেছিল। আর আমার সঙ্গে অসভ্যতাও করেছিল। তাই ওই লোকটাকে খুঁজে বের করতে চাই আমি।”

চোখ বড় বড় করে তাকায় স্বচ্ছ। যেন এখুনি চোখজোড়া কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। মূহুর্তেই কাশি উঠে যায় তার। বিষম খেয়ে একনাগাড়ে কাশতে শুরু করে সে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here