উত্তরাধিকার (৯ম পর্ব)

0
1003

উত্তরাধিকার (৯ম পর্ব)
লেখাঃ-মোর্শেদা রুবি
***********************
বেলা পাঁচ কেজি মিষ্টি কিনে আনালেন ড্রাইভারকে দিয়ে! মিষ্টি নিয়ে রওনা দিলেন বেয়াই বাড়ী!প্রিয়ন্তীদের বাড়ী!
প্রিয়ন্তীর মা বাবা তাঁকে দেখে দুজনেই অবাক।
বেলা প্রিয়ন্তীর মা’কে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন-“সুখবর নিন্,আপনি নানু হতে যাচ্ছেন!আজ সকালেই প্রিয়ন্তী মামনি সুসংবাদটা জানালো।খবর পেয়ে আর দেরী করিনি সোজা চলে এলাম দেখা করতে।
প্রিয়ন্তীর মা’র হাসি মুখটাতে হঠাৎ কালো কালির পোচ পড়লো যেন।বুকটা ধ্বক করে উঠলো!
তিনি কেবল ভাবলেন,বেলা চৌধুরী নাতি হবার আনন্দে সব গুলিয়ে ফেলেছেন,নাকি!
প্রিয়ন্তী এখনি কিভাবে মা হবার সুসংবাদ শোনাতে পারে?
তার প্রিয়ন্তীর সাথে কথা হওয়া দরকার!
বেলা চৌধুরীকে তিনি কিছু বললেন না!
প্রিয়ন্তীর বাবা একটু বাইরে গেলে বেলা খুশিতে হাত নাড়িয়ে বললেন-“আমি তো ভাবতেই পারিনি যে প্রিয়ন্তী আমাকে এতো বড় একটা গুডনিউজ দেবে।আপনাকে বলেছিলাম না,আমার নাতিনাতনী আসলে আমি তৎক্ষনাৎ ঘরের জঞ্জাল দুর করবো!তাই করেছি,নাযিয়াতকে মায়ের বাড়ী পাঠিয়েছি।রাফিজকে ঠান্ডা করা ওয়ান টু’র ব্যপার।
প্রিয়ন্তী এবার রাজত্ব করবে।
নিন্,সবই তো আমাদের মনমতো হয়ে গেলো!আপনি এবার খুশি তো?
বেলা হা হা করে হেসে উঠলেন।
-“কি ভেবেছিলাম আর কি হলো!ভেবেছিলাম,নাযিয়াতের বাচ্চা হবে আর নাযিয়াতকে সরিয়ে বাচ্চাটা রেখে দেবো,এখন তো সেসব কিছুই করতে হলোনা।সব একদম
সুন্দরভাবে সেটেল হয়ে গেলো!
আসলে সবই ভাগ্য,বুঝলেন,নইলে নাযিয়াতকে বিয়ে করানোর কি দরকার ছিলো!
অযথা কাবাবের মাঝে একটা হাড্ডি,আমি তো সাথে সাথেই ওকে ওর বাড়ী পাঠিয়েছি।কারন আমার ছেলেকে তো যেন যাদু করে রেখেছে,বুঝলেন।এখন তাকে সাইড করেছি এরপর এমন চাল চালবো যে আর দেখতে হবেনা!ছেলে দুদিন মুখ কালো করে থাকবে তারপর বউ বাচ্চা পেয়ে আবার সবই ভুলে যাবে।এ জীবনে তো আর এসব কম দেখলাম না!”
শুনে শাজিয়া ফাঁকা হাসি হাসলেন।
এক ঘন্টা বেলার ভ্যাজর ভ্যাজর সহ্য করে গেলেন। বেলা বিদায় নেয়া মাত্র তিনি প্রথমে শায়লাকে ফোন দিলেন।তার কুফরী কাজ করেছে,নাযিয়াত আজ ঘরছাড়া অথচ তিনি তো খুশি হতে পারছেন না।
কি হতে যাচ্ছে তার মেয়ের জীবনে কে জানে!
ফোন ধরলো শায়লার ছোট মেয়ে।সে জানালো শায়লা খুব অসুস্থ,হাসপাতাল
ে ভর্তি!
শাজিয়া ভাবছেন,কি করবেন,প্রিয়ন্তী কে আনিয়ে লুকিয়ে এবরশন করিয়ে দেবেন, নাকি বেলা যেমনটা ভাবছে সেই ভাবনার পালে হাওয়া দেবেন!
দ্বিতীয়টিই নিরাপদ।
এবরশনে ঝুঁকি বেশী।কিন্তু এটা কি ঠিক হবে,একজনের সন্তানকে আরেকজনের নামে চালিয়ে দেয়া?
শাজিয়া অনেক দিন থেকেই ধর্মকর্ম থেকে বহুদুরে।বরং না করতে করতে ধর্মটা তার কাছে বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান হয়েই রয়ে গিয়েছে!
তিনি নামাজ রোজার তেমন পাবন্দী করেন না।রোজার দিনগুলোতেও অসুস্থতা আর ঔষধ খাবার দোহাই দিয়ে রোজাগুলো তরক করে ফেলেন।তিনি জানেন,আল্লাহতা’লা বলে একজন আছেন যিনি সমস্ত সৃষ্টিকূলের স্রষ্টা,প্রতিপালক! কিন্তু সেই জানাটা কেবল জানা পর্যন্তই রয়ে গেছে।মান্যতার কোনো কার্যকলাপ তার কাজের মধ্যে ফুটে ওঠেনি!
তবু আজ কেন যেন তার মনটাতে একটা ভয় দানা বাঁধছে।কেবলি মনে হচ্ছে একটা পাপ ঢাকতে গিয়ে আরেকটা পাপে জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।এভাবে পাপের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ছেন তিনি!এসব সময়ে ইবলিশ খুব সক্রিয় ভূমিকা পালন করে!সে বান্দাকে অভয় দেবার চেষ্টা করে।শাজিয়ারও তেমন হলো।তিনি হেরে গেলেন শয়তানি প্ররোচনার কাছে।
পরক্ষণেই মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিলেন তিনি…আরে দুর!আজকাল আবার এতসব কেউ দেখেনাকি?
বাচ্চা যারই হোক, মা তো প্রিয়ন্তীই!
শেষ পর্যন্ত ইবলিশ শয়তানেরই জয় হলো।
শাজিয়া নিজের মনে জন্ম নেয়া সংকোচটুকু নিঃসংকোচে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মেয়েকে ফোন দিলেন!


গাড়ী মসৃন গতিতে এগিয়ে চলছে।
বেলার মাথায় নানান ভাবনার ভীড়!ভাবনাগুলো যেন একে অন্যের গায়ে হুটোপুটি খাচ্ছে!
মোবাইল খুলে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার সাঈদ সিকান্দারকে ফোন করলেন তিনি ।
সাঈদ সাহেব তখন প্রতি সপ্তাহের মতো আজো চিটাগং ব্রাঞ্চে যাবার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন।
ম্যাডামের ফোন পেয়ে দ্রুত রিসিভ করে সালাম দিলেন!বেলা রাশভারী কন্ঠে বললেন-
-“সাঈদ সাহেব?”
-“জ্বী,জ্বী ম্যাডাম,বলছি!”
-“কেমন চলছে সব?”
-“জ্বী,খুব ভালো ম্যাডাম!রাফিজ স্যার তো চমৎকার সবদিক সামলে নিচ্ছেন!”
-“হমম…এ সপ্তাহের ব্রাঞ্চ ট্যুরে কে যাচ্ছে?”
-“বরাবরের মতো আমিই তো যাচ্ছি ম্যাম।রাফিজ স্যার তো গত কয়েক মাস ধরে….!”
-“এবার ‘ও’ যাবে!” সাইদ সিকান্দারের কথা ফিতা কাটার মতো একপোচে কেটে দিয়ে বললেন বেলা চৌধুরী!
-“জ্বী,ম্যাডাম?”সাঈদ সাহেব দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন!
-“কি বলেছি,শোনেন নি?বাংলা বোঝেন না?বলেছি এ সপ্তাহের ট্যুরে রাফিজ যাবে।”
-“ক্..কিন্তু ম্যাম যাবার দিন তো আজকেই! রাত এগারোটার ট্রেন!আমার তো টিকিটও কাটা হয়ে গেছে।”
-“ফেলে দিন! আর ফোন করে আর্জেন্টলি সন্ধ্যার ফ্লাইট বুক করুন রাফিজের জন্য!কি বলেছি,বুঝেছেন?”
-“জ্বী,ম্যাম।স্যারকে সন্ধ্যের ফ্লাইটে চিটাগং পাঠাতে হবে!আর্জেন্টলি!এনি হাউ!”
-“গুড…!এবার ধরতে পেরেছেন।আপনি ঐদিকটা ম্যানেজ করুন আই’ল ম্যানিজ রাফিজ!ক্লিয়ার?”
-“ইয়েস ম্যাম!”
ফোন কেটে সাথে সাথেই ছেলেকে ফোন দিলেন বেলা!


নাযিয়াতদের বাড়ীর সামনে গাড়ী থামিয়ে গাড়ী থেকে নেমে নাযিয়াতদের বাড়ীর গেট নক করলেন!বেলা নাকে এমনভাবে রুমাল চেপে ধরেছেন যেন কোনো ডাষ্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
ব্যপারটা ইচ্ছাকৃত তাচ্ছিল্য যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে নাযিয়াতকে তার ক্লাস স্মরন করিয়ে দেয়া!
গেট খুললো নাদিয়া!
বেলাকে দেখেই চমকে উঠলো সে।
সালাম দিয়ে ভেতর ঘরে নিয়ে এলো!
বেতের সোফাটা দেখিয়ে বসতে বললে বেলা সেদিকে তাকালো।
সোফাটা জায়গায় জায়গায় বেত খুলে গেছে।পিঠে বেতের খোঁচা লাগা এড়াতে নাযিয়াতের মা মোটা কাপড়ের কভার দিয়ে সেটাকে আড়াল করেছেন!
বেলা দাম্ভিক ভঙ্গিতে একটা সোফায় বসতেই সেটা মট্ করে উঠলো!বসে নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন-“তোমার বড়বোন কই?ডাকো তাকে!”
বলতে বলতেই নাযিয়াত পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে সালাম দিলো বেলাকে।
বেলা সালামের জবাব না দিয়ে কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন-
-“তোমাকে একটা খবর জানাতে এলাম।আমার রাফিজ বাবা হতে চলেছে।প্রিয়ন্তী মা!এবার দয়া করে তুমি তাদের জীবন থেকে সরে দাঁড়াও!তোমার কারনে ওদের দুজনের মাঝখানে আজ এতবড়ো দেয়াল।আমার রাফিজ তো আগে এমন ছিলোনা!সে তোমার পাল্লায় পড়ে যতসব উদ্ভট আচরণ শুরু করেছে।”
বেলার আকস্মিক আক্রমনে নাযিয়াত দিশেহারা বোধ করলো!সে কিছু বলতে যাবার আগেই বেলা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো-
-“সে দাঁড়ী রেখেছে,প্যান্ট গুটিয়ে রাখে, মসজিদ ছাড়া নামাজ পড়বেনা,বৃহঃবার রোজা রাখবে…এসব ধর্মীয় গোড়ামী (নাউযুবিল্লাহ) তুমিই ওকে শিখিয়েছো, তাই না?”
নাযিয়াত বাকরুদ্ধ হয়ে বেলার কথাগুলো শুনে যাচ্ছিলো কেবল!এবার মৃদুস্বরে বললো-
“এসব কি বলছেন,আম্মা?ধর্মীয় গোঁড়ামী?”
-“তা নয় তো কি?ও কি বুড়ো হয়ে গেছে যে এখনি ধর্মকর্ম নিয়ে পড়ে থাকবে?তুমি বোরকা পড়ে বুড়ি সেজে থাকো ভালো কথা,আমার ছেলেকে কেন টানছো?ওর এখন হেসে খেলে কাটানোর সময়!”
-“মৃত্যু কি বয়স দেখে আসে আম্মা?”
-“তারমানে তুমি চাও,আমার ছেলে তাড়াতাড়ি মরে যাক্ আর তুমি ওর সম্পত্তির উপর রাজত্ব করো!তাই না?”
-“ইন্নালিল্লাহ্…..আমি এমনটা কখন বললাম মা!আপনি…..!”
-“হয়েছে, আমাকে আর পট্টি লাগাতে এসোনা।যে জন্য এসেছি সেটাই বলি,কাল বিকেল পাঁচটার দিকে আমি ল’ইয়ার নিয়ে আসবো।তুমি পেপারস সাইন করে দেবে!ব্যস্,তোমার কাজ শেষ!”
নাযিয়াত ক্লান্ত স্বরে বললো-“কিসের পেপারস?”
বেলা ঠান্ডা স্বরে বললেন-“তোমাদের ডিভোর্সের!”
-“আম্মা…?”প্রায় কঁকিয়ে উঠলো নাযিয়াত।
বেলা ধমকে উঠলেন-“চুপ করো,লোভী মেয়ে কোথাকার!ভেবেছিলে,আমার ছেলেকে হাত করে আমাকে সাইড করে দেবে?তোমার সেই আশার গুড়ে বালি।প্রিয়ন্তী আজ মা হতে চলেছে।সত্যের জয় সবসময়ই হয়!তোমার চালাকি আমি বুঝি।ভালোমানুষির রূপ ধরে তো রাফিজকে ভুলিয়েছো।প্রিয়ন্তী সেরকম পরিবারের মেয়ে বলে এখনো চুপ আছে।নইলে ওর স্ট্যাটাসের সামনে তুমি যে কি তা তো ওর বাড়ী গিয়েই বুঝেছো!”
নাযিয়াত হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলটা ধরলো।ওর মাথা আবার ঘুরাচ্ছে,বমি বমি লাগছে।নাদিয়া দ্রুত এসে ওকে ধরলো।
বেলা উঠে বেরিয়ে যাবার আগ মুহূর্তে বললো-“কাল পাঁচটায়! মনে থাকে যেন!আর রাফিজকে ফোন করে এসব জানাবার তালে যদি থাকো তবে এসব ধান্ধা বাদ দাও।সে এখন দেশে নেই!সে তোমার ছল বুঝতে পেরেছে।সে তোমাকে ঘৃণা করে!”
বলে বেলা বেরিয়ে গেলেন।
নাযিয়াত নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।নাদিয়া ওকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে ফেললো।
বেলা আসার কথা শুনে নাযিয়াতের মা নাস্তা নিয়ে আসছিলেন।ঘরে ঢুকে দু মেয়েকে কাঁদতে দেখে তিনি থমকে গেলেন-
-“বেয়াইন সাহেবা চলে গেছেন?”
নাদিয়া মাথা নাড়লে নাযিয়াতের আম্মু অবাক হয়ে বললেন-“আমার সাথে দেখা ও করলেন না?তাঁকে মিষ্টিমুখ করাবো বলেই দেরী হচ্ছিলো!মিষ্টি আনিয়েছি ভালো পেষ্ট্রি শপ থেকে।উনাকে বলেছিস তো নাযিয়াতের কথাটা?”
নাদিয়া রেগে বললো-“সে বলার কোনো সুযোগ রাখলে তো?যা তা বলে গেছে অভদ্র মহিলাটা।”
নাযিয়াত চোখ মুছে কাতর স্বরে বললো–
-“মা,আমাকে বাঁচাও,মা!আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না…মা!পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি,আমি ওর বউ হয়েই থাকতে চাই!নিজ হাতে আমি ঐ পেপারে সাইন করতে পারবোনা।আমাকে তোমরা এখান থেকে নিয়ে চলো! যেখানে বেলা চৌধুরী আমাকে খুঁজে পাবেনা।কাল উনি আসার আগেই আমি এখান থেকে সরে যেতে চাই! ”
নাদিয়া হঠাৎ বললো-“তুমি ভেবোনা আপি,সারাজীবন তুমি আমাদের জন্য অনেক করেছো, আজ আমাদের পালা!তুমি যেভাবে চেয়েছো সেভাবেই হবে।তবে তুমি একা না,আমরা সবাই যাবো!নইলে বেলা চৌধুরীকে বিশ্বাস নেই।সে আমাদের মাধ্যমে হলেও ছেলের কাছ থেকে ডিভোর্স নিয়ে এসে ঠিক তোমাকে পাঠিয়ে দেবে!তখন তো ডিভোর্স ঠেকানো যাবেনা।আমরা যদি বাসা ছেড়ে দেই তাহলে তো আর সে তোমাকে খুঁজে পাবেনা!ডিভোর্স পাঠাবে কাকে?আমি ‘ও’কে বলছি,ও সব ব্যবস্থা করে দেবে!”
নাদিয়া আত্মবিশ্বাসের সুরে বললো!বিয়ের পর থেকেই ওর ধারনা হয়েছে পৃথিবীতে একমাত্র সৎ যোগ্য করিৎকর্মা সাহসী ভালো মানুষ হলো যদি কেউ থাকে তবে সেটা ওর স্বামী রিফাত!
সুযোগ পেলেই স্বামীর গীত গাইতে শুরু করে ও!
নাযিয়াতের মা বললো-“কিন্তু সবাই হুট করে যাবো কোথায়? তাছাড়া ওটা বেলা চৌধুরীর একার কথা।জামাই নিশ্চয়ই মানবে না!সে ডিভোর্স না দিলেই তো আর ডিভোর্স হবেনা!”
-“তোমার জামাই কে বিশ্বাস নাই! তোমার জামাই যে ঢিলা কোম্পানীর মানুষ, ওনার মা ওকে ধমক দিলে সে ঠিকই সুড়সুড় করে সই করে দেবে!আবাল একটা..!”
-“নাদিয়া তুই থামবি?তুই আমার সামনে ওকে এসব বলে আমাকে কষ্ট দিচ্ছিস।ও ওর মা’কে অসম্ভব মানে এটা কি ওর অন্যায়?ওর মা,নিজের অহংবোধে ভুগেন,এতে ওর দোষ কোথায়?”
-“হম,জানি তো।রাফিজ ভাইয়ের কোনো দোষই তোমার কাছে দোষ না।যাক্,এসব কথা
বলে লাভ নেই!আমি রিফাতকে ফোন দিচ্ছি।দরকার হলে গ্রামে নানুবাড়ী চলে যাবো!”
*
নাযিয়াত নিঃশব্দে কাঁদছে।নাদিয়া ওর কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে বললো-
-“এতো ভালোবাসো তুমি রাফিজ ভাইকে।সেও যদি তোমাকে তেমনই ভালোবাসে।তাহলে তোমাকে সে পাতাল ফুঁড়ে হলেও ঠিকই খুঁজে বের করবে।ভালোবাসার পরীক্ষায় এবার তাকে পাশ করতে দাও!এটা নিয়ে এতো ভেবোনা।তুমিই না সবসময় বলো….আল্লাহ যা করেন,ভালোর জন্যেই করেন!আজ তোমার সাথে যা হচ্ছে তাতে নিশ্চয়ই তোমার জন্যে কল্যান রয়েছে!এটা মানো তো!”
নাযিয়াত মৃদু হাঁপাতে লাগলো।
মাথা ওপর নিচ করে বললো-“কথাগুলো বলার জন্য তোকে ধন্যবাদ!”

প্রান্তিক দোকান থেকে বেরিয়ে আসছিলো!তখনি পেছন থেকে বোরকা পড়া একটি মেয়ে ডাকলো তাকে-“ভাইয়া….একটু শুনুন!”
প্রান্তিক ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো দুটো বোরকা পড়া মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
সে সংকোচ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো!
-“জ্বী,আমাকে বলছেন?”
-“জ্বী,ভাইয়া! ও আপনার সাথে একটু কথা বলার অনুমতি চায়!”
প্রান্তিকের হাতে সদ্যকেনা পাঞ্জাবীর প্যাকেট।সে এলিফ্যান্ট রোডে এসেছিলো একটা কাজে।সেখান থেকে ফেরার পথে এই পাঞ্জাবীটা কিনেছে!
খানিক ইতস্তত করে দ্বিতীয় মেয়েটির দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকালো-“জ্বী,বলুন!”
মেয়েটি আপাদমস্তক বোরকা নিকাবে আবৃতা।
তার চেহারা দেখা যাচ্ছেনা।
সে মৃদু স্বরে বললো-“আসসালামুআলাইকুম!”
-“ওয়ালাইকুমুসসালাম!”
-“আপনি পরিচয় দিলে আমাকে হয়তো চিনবেন!আমি জান্নাত!”
-“আপনি জান্নাত মানে?”
-“ইয়ে আমি জান্নাতুল মাওয়া! আপনি গতমাসের এক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় এসেছিলেন আমাকে দেখতে!”
প্রান্তিকের কুঁচকানো ভুরু সমান হয়ে গেলো-
-“ওহ্,আচ্ছা!তা কি ব্যপার বলুন!”
-“আপনি আমাকে দেখে যাবার পর মানা করে দিয়েছিলেন,তাই না?”
প্রান্তিক খানিকটা অস্বস্তিতে পড়লো-
–“ইয়ে,মানে…আসলে আম্মা……!”
-“আমি জানি আপনি কেন মানা করেছেন,কারন আমার পরিবার পীর মানে,ওরশ করে,সিরনী করে এসব আপনি মানেন না, তাই না?”
প্রান্তিক তাকালো-“এসব কি মানা উচিত,আপনিই বলুন?অবশ্য আপনারা তো সবাই……!”
-“না,সবাই না!এখানেই আপনার ভুল।আমি নিজে ওসব মানিনা কিন্তু আমার পরিবারের কাউকে আমি এসব বোঝাতে পারছিনা।তাই খুব করে চেয়েছিলাম,আল্লা
হ এমন একজনকে আমায় মিলিয়ে দিন যে এগুলোর বিপক্ষে!”
প্রান্তিক লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললো-
-“এখন আমি কি করতে পারি,বলুন?”
-“দেখুন,আমি তো আর আপনাকে বলতে পারিনা যে আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই কিন্তু একটা বাস্তব সত্য বলি,যেদিন আপনার পক্ষ থেকে না শুনলাম সেদিনই আমি আল্লাহর কাছে দু’আ করেছি যে,আপনার সাথে যেন দেখা হয় আমার।কারন আপনার ফোন নম্বর নেই,আপনার বাসাও চিনিনা।যোগাযোগের কোনো পথ নেই!কিন্তু মন থেকে আপনাকে ভুলতে পারছিলাম না।তাই আল্লাহকে বললাম,ছেলেটি যদি আমার জন্য কল্যানকর হয় তাহলে ওর সাথে যে কোনভাবে দেখা সাক্ষাতের একটা ব্যবস্থা করে দাও নতুবা ওর কথা আমাকে ভুলিয়ে দাও!তারপর একটা মাস গেছে আপনার সাথে কোন যোগাযোগ হয়নি,আপনার আশা যখন ছেড়ে দিচ্ছিলাম তখনই আপনার দেখা পেয়ে গেলাম।ও আমার বান্ধবী,ওর সাথেই এখানে এসেছি একটা কাজে।হঠাত আপনাকে ঐ দোকান থেকে বেরুতে দেখে ওকে বললাম।সাহাবীদের সময় তো যে কেউ যে কাউকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারতো,কারন তখন বিয়েটা সহজ ছিলো,জেনা ছিলো অসম্ভব কঠিন আর সাড়ে চৌদ্দশত বছর পরে আজ জেনাটা খুবই সহজ! ইচ্ছে হলেই কেউ কাউকে প্রথম দেখায় বলতে পারে-‘আপনার ফোন নাম্বারটা কি দেয়া যাবে?আপনার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চাই! আপনাকে আমার ভালো লেগেছে চলুন না এককাপ কফি হয়ে যাক্…ইত্যাদী কিন্তু হাজার চাইলেও কেউ বলতে পারেনা,’প্লিজ,আপনি আমাকে বিয়ে করবেন,আপনার ধার্মিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে!”
প্রান্তিক অবাক হয়ে মেয়েটির কথা শুনছিলো!
কোনো মেয়ে যে এভাবে এতো গুছিয়ে এসব কথা বলতে পারে তা ওর জানা ছিলোনা!মেয়েটি তার বান্ধবীর দিকে একবার তাকিয়ে তারপর প্রান্তিকের দিকে তাকালো-“চলি!আস্সালামুআলাইকুম!”
প্রান্তিকের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে দিয়ে মেয়েটি দৃঢ়পদে হেঁটে চলে গেলো।প্রান্তিক বোবা সেজে দাঁড়িয়ে রইলো।তারপর ডান হাতটা পকেটে পুরে ফুটপাত ধরে এগোতে লাগলো।ওর।
হাঁটার ধরন বলে দিচ্ছে ও খুব চিন্তিত!


রাফিজ ক্রমাগত ফোন করেই যাচ্ছে কিন্তু নাযিয়াতের নাম্বারটা বারবার আনরিচেবল আসছে!
রাফিজের খুব অস্থির লাগছে।নাযিয়াত হঠাৎ ওকে না বলে বাড়ী চলে গেলো কেন?আর গেলোইবা, ফোন যাচ্ছেনা কেন?
তিন দিন পর সে আজ ঢাকায় ফিরেছে!
এসে শুনলো নাযিয়াত বাড়ী ফেরেনি! শুধু তাই না,নাযিয়াত নাকি রাগ করে চলে গেছে।রাফিজের মনে একটা চিন্তা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে,নাযিয়াতের সাথে প্রিয়ন্তীর কিছু হলো?নাকি ওর মা’র?আসলে কি ঘটেছে তার এই ক’দিনের অনুপস্থিতিতে?একেবারে হঠাৎ ব্রাঞ্চ ট্যুরের প্রোগ্রামটা এসে যাওয়ায় ওকে চিটাগং যেতে হয়েছে কারন ওদের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার সাইদ সাহেব হঠাৎ নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছে যার ফলে ওকেই যেতে হয়েছিলো মায়ের আদেশে।
রাফিজ এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে কাপড় না বদলেই মোবাইলে নিয়ে অনবরত কল করেই যাচ্ছে।
এমন সময় বেলা ওকে দেখে বললেন-“কি রে রাফি, তুই এখনো কাপড় ছাড়িসনি,ফ্রেশ হোসনি?আজ রাতে আমরা তিনজন বাইরে ডিনার খেতে যাবো!
ইটস এ্যান অনার টু প্রিয়ন্তী!আমি তোদের দুজনকে নিয়ে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সবচে বড় আনন্দটাকে সেলিব্রেট করবো আজ।তোর ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম।আজ রাতে যাবো,ঠিকআছে?”
রাফিজ চরম বিরক্তি নিয়ে মোবাইল টিপতে টিপতে বললো-“এমন কি খুশির খবর পেয়ে গেলে যে ডিনার দিতে হচ্ছে প্রিয়ন্তীর অনারে?”
-“আমরা পার্ক টাউনে যাবো!ওটা প্রিয়ন্তীর পছন্দের রেষ্টুরেন্ট!সে আমাকে উত্তরাধিকার দেবার সুসংবাদ দিতে পারে আর আমি ওর অনারে একটা মিনি পার্টি থ্রো করতে পারবোনা?”
রাফিজের মোবাইল ধরা হাত স্থির হয়ে গেলো!
প্রিয়ন্তী উত্তরাধিকার দেবার খবর দিয়েছে মানে?
রাফিজ বেলার দিকে তাকিয়ে স্থির কন্ঠে বললো-“একথার মানে?”
-“মানে এখনো বুঝিসনি?উফ্,রাফি তুই এখনো বোকাই রয়ে গেলি!আরে বাবা,তুই বাবা হতে যাচ্ছিস রে বাপ!আর আমি দাদুমনি!প্রিয়ন্
তী কনসিভ করেছে !”
রাফিজের কপালে পরপর তিনটা ভাঁজ পড়লো-“কিইই?”
বেলা দু কাঁধ ঝাকিয়ে বললেন-“তোর এতো অবাক হবার কারন কি?এটা কি অসম্ভব কিছু?”
-“প্রিয়ন্তী কোথায়?”মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে রাফিজ বললো!বেলা কিছু বলার আগেই রাফিজ সোজা প্রিয়ন্তীর রুমে ঢুকল।প্রিয়ন্তী শুয়ে শুয়ে ম্যাগাজিন দেখছিলো।
রাফিজ গিয়ে সরাসরি বললো-“এসব কি শুনছি প্রিয়ন্তী?”
প্রিয়ন্তী ম্যাগাজিন সরিয়ে উঠে বসলো,কোনো উত্তর দিলোনা।
রাফিজ চড়া গলায় বলে উঠলো-“যেখানে তোমার সাথে গত ছয়মাসে আমার সাথে কোনো দাম্পত্য সম্পর্ক নেই সেখানে তুমি সন্তানসম্ভবা কিভাবে?আনসার মি!আই ওয়ান্ট টু নো ইট।বলো,চুপ করে আছো কেন?
বেলা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন!
প্রিয়ন্তী মুখ নিচু করে বসে রইলো!
…….
চলবে…….

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে