উত্তরাধিকার (৪র্থ পর্ব)

0
1161

উত্তরাধিকার (৪র্থ পর্ব)
লেখাঃ-মোর্শেদা রুবি
************************
ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না!মেয়েটা কি ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি!
খানিক অপেক্ষা করে রাফিজ উঠে পড়লো!মনে মনে ভাবছে, পানি খাবার ছল করে ঘরে গিয়ে দেখা যেতে পারে!এভাবে একা বসে থাকতে বিরক্ত লাগছে!
ঘরের ভেতর ঢোকার মুহুর্তে দরোজার কাছে মৃদু সংঘর্ষ হয়ে গেলো!নাযিয়াত বারান্দার দিকেই আসছিলো!রাফিজও ঘরে ঢুকছিলো! সেই মুহূর্তেই ধাক্কা!
রাফিজ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সরে আসলো!
নাযিয়াত মৃদু স্বরে বললো-“দুঃখিত।খেয়াল করিনি!”
-“কি ব্যপার?”রাফিজের কন্ঠটা একটু কঠিন শোনালো!
-“ঘরে মাথাব্যথার কোনো ঔষধ আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে এসছিলাম!”
রাফিজ লক্ষ্য করলো মেয়েটি এরই মধ্যে পোষাক বদলে ঘরোয়া হয়ে গেছে।ও মেয়েটির পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে ড্রয়ার হাতড়ে একটা ছোট্ট কৌটা নাযিয়াতের হাতে দিলো।
নাযিয়াত মৃদু স্বরে বললো-“যাজাকাল্লাহ!”
রাফিজ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বিছানার একপাশে গিয়ে বসলো!হাত বাড়িয়ে একটা বই টেনে নিলো!
নাযিয়াত মাথায় ঔষধ মেখে রাফিজের দিকে তাকালো-“অনুমতি দিলে আমি শুয়ে পড়ি?”
রাফিজ অবাক হয়ে বললো-“তুমি শোবে এতে আমার অনুমতি লাগবে কেন?”
নাযিয়াত মুচকি হাসলো-“আমি যদি এখন কোনো নফল নামাজও পড়তাম তবু আপনার অনুমতি লাগতো কারন নফল নামাজ রোজা করতে স্বামীর অনুমতি নিতে হয়”!
রাফিজ বেশ অবাক হলো।সে মুসলিম হলেও ইসলাম সম্পর্কে তার জানাশোনা খুব কম।পাঁচওয়াক্ত নামাজ আর ত্রিশ দিনের রোজার বাইরে সে খুব কমই জানে!তাই আগ্রহ নিয়ে বললো-“তাই নাকি?এমন কেন?”
নাযিয়াত বিছানায় পা তুলে নামাজের ভঙ্গিতে বসলো-“কারন,স্ত্রী যদি নফল নামাজ রোজায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে তাহলে স্বামীর ডাকে সে যখন তখন সাড়া দিতে পারবেনা!যেহেতু নফলের পরিসর অবারিত আর ব্যক্তিভেদে স্বামীর চাহিদাও ভিন্ন!তাই শরীয়তের এই হুকুম।স্বামীর নিজের জন্য যে কোনো সময় তার স্ত্রীকে প্রয়োজন হতে পারে!তখন সে স্ত্রীকে তার ব্যক্তিগত আমলের জন্য কাছে পাবেনা।এটা মহান আল্লাহ চান না,কারন স্ত্রী হচ্ছে স্বামীর জন্য শস্যক্ষেত্র সেখানে স্বামী অবাধে বিচরণ করতে পারবে!আর স্বামীর ষড়ঋপুর হেফাজত করবে তার স্ত্রী!নিজস্ব স্ত্রী ছাড়া বাকীদের দিকে তাই স্বামী তাকাবেনা,লোভ করবেনা!সেই স্ত্রী যদি ব্যক্তিগত আমলে ব্যস্ত থাকে তাহলে সেটা স্বামীর জন্য কষ্টকর হয়ে পড়বে! সে তখন নিজের প্রয়োজন মেটাতে বাইরের দিকে আগ্রহী হবে!এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়বে!এই যেমন এখনকার দিনে হচ্ছে!
মহান আল্লাহ প্রত্যেক স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য মনোরঞ্জনের বস্তু করে দিয়েছেন।স্ত্রী হলো স্বামীর বেগাম!বেগাম মানে হলো যার কাছে গেলে মনের সব গাম(কষ্ট)দুর হয়ে যাবে!তাই নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক এমন নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন।
তবে,ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে এ নিয়ম খাটবেনা তখন আল্লাহর আদেশ আগে,স্বামীর আদেশ পরে!”
-“হমম…খুব,সুন্দর নিয়ম!আচ্ছা,এতে কি স্বামীকে স্ত্রী’র উপর খবরদারী করার প্রাধান্য দেয়া হয়ে গেলো না?সব স্বামী তো এক না!কোনো স্বামী যদি স্ত্রী’র প্রতি এই অধিকারের অপপ্রয়োগ করে তাহলে স্ত্রী কি করবে?”
-“প্রথমতঃ স্ত্রীকে স্বামীর নেতুত্ব মেনে নিতে হবে!স্বামী হলেন গৃহকর্তা!যে নেতৃত্ব দেয় তার উচিত তার দলের সকল সদস্যের সুখ সুবিধার দিকে লক্ষ্য রাখা।আবার দলের বাকী সদস্যদের উচিত নেতার আদেশ সর্বান্তকরনে মান্য করা।তাহলেই একটি দল সুন্দরভাবে পরিচালিত হবে।সংসারও তেমনি একটি দল যা পুরুষের নেতৃত্বে চলবে আর পুরুষটির দুর্বলতা হলো তার বেগম যার কাছে গিয়ে সে রিচার্জড হয়!এভাবেই সংসার চলে!এতো সুন্দর সিষ্টেম আপনি আর কোথাও পাবেন না!স্বামী স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক।বাকী থাকলো স্বামীর অনাচারের বিষয়টা, সেটা স্ত্রীর দিক থেকেও হতে পারে!তবে যেহেতু স্বামী পুরুষ,সমস্যা তার দিক থেকেই বেশী আসে!সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে,শেষ বিচারের দিনে স্বামীকে ঐ অন্যায় কাজের জন্য কঠিন জবাবদিহী করতে হবে!আমাদের দেশে ইসলামের বিধিবিধান সবটা না জানার কারনে স্বামীরা স্ত্রীদের উপর একচেটিয়া রাজত্ব করে যাচ্ছে!কিন্তু ব্যপারটা আসলে অন্যরকম।কেয়ামতের মাঠে স্বামীর চরিত্রের সনদ দেবে তার স্ত্রী!কোনো স্ত্রী যদি স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল তুলে তো ঐ স্বামীর জান্নাত পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে তা সে যত বড় পরহেজগার ব্যক্তিই হোক না কেন! আমাদের রাসুল সাঃ বলেছেন–
-“তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে ভালো!আসলে ইসলাম নারীকে যতটা সম্মানের দরোজা দিয়েছে অন্য কেউ ততটা দেয়নি!”
-“হমম,সবসময় তো স্বামীর অধিকারের গল্প শুনি!স্ত্রী’র অধিকারের গল্প তো কাউকে করতে শুনিনা!”
রাফিজ স্বগোতক্তির সুরে বললো।বলতে গিয়ে লক্ষ্য করলো যে,নাযিয়াতের সাথে এভাবে গল্প করতে ওর বেশ ভালো লাগছে!
নাযিয়াতকে বলতে শুনল-“স্ত্রী’র আরো অনেক অধিকার আছে সময় করে একদিন শোনাবো আপনাকে!”
বলেই নাযিয়াত হেসে ফেললো আর হঠাৎই রাফিজের মনে হলো নাযিয়াতের হাসিটা বড় মিষ্টি!
মেয়েটা প্রিয়ন্তীর মতো পুতুল সুন্দরী নয় তবে তার চেহারায় একটা টান আছে যেটা অন্যকে আকর্ষণ করে।একেই বোধহয় বলে মায়া!রাফিজ চোখ সরিয়ে নিলো!
আরেকটা প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলেছিলো সে কিন্তু তাকিয়ে দেখলো নাযিয়াত বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।মিহি নাক ডাকার শব্দ আসছে ওর দিক থেকে।রাফিজ বই খোলা রেখেই ওর দিকে তাকিয়ে রইলো!

সকালে ঘুম ভাঙ্গার পরই রাফিজ দেখলো ঘরে কেউ নেই! উঠে বসতেই পায়ের কাছে চপ্পল জোড়া ঠেকলো!প্রতিদিন চপ্পল জোড়া খুঁজতে খাটের নিচে উঁকি মারতে হয় আজ যেন মনে হলো কেউ জায়গামতো সাজিয়ে রেখেছে।
ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখলো নাযিয়াত ওর জন্য নাস্তা সাজিয়ে অপেক্ষা করছে!
রাফিজ অবাক হয়ে বললো-“নাস্তা এখানে কেন?”
-“জ্বী,আন্ট…মানে আম্মাই ঘরে দিতে বললেন!আপনি দেরী করে উঠেন বলে ডাকিনি!নিন্,খেয়ে নিন!
রাফিজ কথা না বাড়িয়ে চেয়ার টেনে বসলো!
নাযিয়াত পানি ঢেলে সামনে রেখে বললো-“চায়ে চিনি ক’চামচ দেবো?”
-“চায়ে চিনি খাইনা!”
-“তাই?আমি ও খাইনা !বাহ্,আপনার সাথে আমার মিলে গেলো দেখছি!”
রাফিজ কোনো উত্তর করলোনা।নিরবে নাস্তা শেষ করলো!
অমনি ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাজির!রাফিজ হাত বাড়িয়ে সেটা নিতেই নাযিয়াত ট্রে নিয়ে বেরিয়ে গেলো!
রাফিজের কাছে পুরো ব্যপারটা স্বপ্ন মনে হতে লাগলো!বউ সামনে দাঁড়িয়ে যত্ন করে নাস্তা খাওয়াবে এটা ওর চিরদেখা স্বপ্ন ছিলো যা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিলো!প্রিয়ন্তীকে যখন বলতো,তুমি একটু বসো না আমার সামনে, খেতে খেতে গল্প করি।প্রিয়ন্তী নানান বাহানা দেখিয়ে সটকে পড়তো।পরে দেখা যেতো সে কোনো না কোনো ম্যাগাজিনে মুখ ডুবিয়ে রেখেছে।
একদিন রাফিজ রাগ করলে সে সমান তেজে উত্তর দিয়েছিলো,স্যরি,তোমার সঙ্গে এসব লুতুপুতু প্রেম খেলা আমাকে দিয়ে হবেনা,খাওয়া সামনে আছে নিয়ে খাও,যা লাগবে ময়নাকে বলো।আমি পারবোনা তোমার অত ফাইফরমাশ খাটতে!”
রাফিজ আহত স্বরে বলেছিলো-“এটাকে ফাই-ফরমাশ খাটা বলছো কেন!আমি কি তোমাকে আমার সামনে চাইতে পারিনা?”
-“অবশ্যই পারো,তবে কারনে অকারনে এসব আলগা পিরীত আমার ভালো লাগেনা!খুব বিরক্ত লাগে!এতো চাহিদা কেন তোমার?”
এমন কথার পর আর কথার উত্তর দিতে রাফিজের রুচি হয়নি।’এতো চাহিদা কেন’ কথাটা ওর পৌরষে লেগেছিলো!
তারপর থেকে সে নিজেই নিজের কাজগুলো করে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো।
প্রিয়ন্তীকে আর যখন তখন ডাকতো না,হঠাৎ করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতো না,আচমকা বিশেষ কিছু চাইতো না….ফলে ওদের সম্পর্কটা একটা যান্ত্রিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে।
আজ অনে..ক দিন পর রাফিজের মনে হলো ও একজন পুরুষ যার চাওয়াপাওয়ার বেলাভূমি তার স্ত্রী আর সেটা হতে পারে নাযিয়াত।
চায়ের কাপ রাখার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলো নাযিয়াত হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।রাফিজ আনমনেই ওর দিকে তাকালো,নাযিয়াত নিজের তর্জনী থুতনীতে ঠেকিয়ে কিছু একটা ইঙ্গিত করলো!রাফিজ প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুঝলো নাযিয়াত ওর মুখে কিছু লেগে থাকার কথা মিন করছে।রাফিজ নিজের হাতটা থুতনীতে বুলালো!নাযিয়াত তর্জনী তুলে রেখেছে আর দেখাচ্ছে, শেষে নিজেই ওড়নার প্রান্ত দিয়ে ওর থুতনীটা মুছে দিয়ে আর দাড়ালো না,সম্ভবত ঝোঁকের বশে কাজটা করে লজ্জা পেয়েছে।
রাফিজ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো!
বড় অসময়ে এসে স্বপ্নেরা সব হানা দিচ্ছে !

বেলা চৌধুরীর সামনে ঔষধ আর পানির গ্লাসটা রেখে নাযিয়াত বসলো!বেলা ফোনে কথা বলছিলেন।কথার ধরনে ও বুঝতে পারলো বেলা প্রিয়ন্তীর সাথে কথা বলছে।নাযিয়াত ইশারা করলো, ও কথা বলবে।বেলা দ্বিরুক্তি না করে নাযিয়াতকে ফোনটা ধরিয়ে দিলেন।নাযিয়াত হেসে হেসে এমন ভাবে কথা বলতে লাগলো যেন কত পুরোনো বন্ধুত্ব ওদের!বেলা একটু অবাকই হলেন নাযিয়াতের প্রাণশক্তি দেখে।তারপর ঔষধ টা খেয়ে নিলেন।সবসময় ময়নাকে দিয়েই চেয়ে নেন ঔষধটা।গত ক’দিন ধরে নাযিয়াত সামনে এনে দিচ্ছে।মেয়েটার মধ্যে সাংসারিক গুণ আছে!মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন বেলা।

রাফিজ নিয়মিতই অফিস করছে!বিয়ে উপলক্ষে কোনো ছুটিই সে নেয়নি!বরং ঘণিষ্ট দু একজন ছাড়া অফিসের অনেকে জানেই না যে,ও বিয়ে করেছে!
তবে জীবনটা যেন আচমকা বদলে গেছে ওর!
অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতো লুঙ্গি খুঁজে হয়রান হতে হয়না।
সকালে অফিসে যাবার সময় আবার অফিস থেকে ফেরার পর প্রয়োজনীয় প্রতিটা জিনিস হাতের কাছে সাজানো থাকে!
এসবের বাইরেও যে স্ত্রী’র কিছু বাড়তি যত্ন থাকে তা রাফিজ এতোদিন জানতো না!
নাযিয়াত আজকাল নিজের পছন্দের রঙটাও পরিয়ে দেয় ওকে।এইতো আজ সকালেই জলপাই রঙা একটা টিশার্ট বিছানার ওপর বের করে রেখেছে।
রাফিজ হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকালে নাযিয়াত মিনতিমাখা কন্ঠে বললো-“আম্মা মার্কেটে গিয়েছিলো,ওনাকে কালারটা বলে দিয়েছিলাম!মনে হলো আপনাকে ভালো লাগবে!এটা একটু পরেননা আজ!”
রাফিজ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না,কেবল নির্বিকার চিত্তে টিশার্টটা গায়ে দিয়ে অফিস চলে গেলো!অফিসে কাজ করতে গিয়ে মনে হলো,প্রিয়ন্তীর সাথে থাকতে থাকতে প্রিয়ন্তীর নির্লিপ্ততা ওর ওপরও ভর করেছে।নতুবা সকালে এই সুন্দর শার্টটার জন্য একটা থ্যাংকস কি নাযিয়াতের পাওনা ছিলো না?
কি ভেবে ফেরার পথে এক তোড়া রজনী গন্ধা কিনলো!তারপর সেটা ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে রাখলো।আসলে মায়ের হাতে এমন নগ্নভাবে প্রকাশিত হতে চায়না ও!তাছাড়া এটা কোনো প্রেমপূর্ণ আবেগ না কেবল থ্যাংকসের একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র,রাফিজ নিজেকে বোঝালো!

বিকেলে স্ন্যাক্সের ফাঁকে রজনীগন্ধার তোড়াটা ক্যাজুয়ালী নাযিয়াতের হাতে তুলে দিয়ে চায়ে চুমুক দিলো রাফিজ।একমনে পেপার দেখতে লাগলো যেন এটা কোনো ব্যপারই না!দৃষ্টি পেপারে থাকলেও নাযিয়াতের মুখের ছড়িয়ে পড়া হাসি চিনতে একটুও ভুল হলোনা রাফিজের।
প্রতিদিনই ওর মনে আশঙ্কা দানা বাঁধে এই ভেবে যে,আজ থেকে বুঝি সব আগের মতো নিরব নিস্পৃহ হয়ে যাবে।নাযিয়াত বোধহয় নব বিবাহিতার আবেগ কাটিয়ে যান্ত্রিক হয়ে উঠবে।কিন্তু না,প্রতিদিনই বরং নাযিয়াত একটু একটু করে নিজেকে নিত্য নতুন রূপে প্রকাশ করে যাচ্ছে!
সাপ্তাহিক ছুটির দিন একটু দেরী করে ওঠার অভ্যাস রাফিজের।
নাযিয়াত এগারোটা থেকে ঠেলতে লাগলো গোসলের জন্য!আজ জুম’আ বার।তাড়াতাড়ি গোসল করে নামাজে যান।জুমআ’র দিন গোসল করতে হয়!যারা জুমআ’র নামাজ ছাড়ে তারা অভিশপ্ত!জুম’আ না পড়লে সে ব্যক্তি মুনাফিক!জুম’আ একটি বিশেষ দিন।এই দিনে দু’আ কবুল হয়!এই দিনে একটি বিশেষ মুহূর্ত আছে যখন দু’আ কবুল হয়।
এসব বলে বলে রাফিজকে অস্থির করে তুললো!বিবাহিত জীবনের পাঁচ বছরের মধ্যে আজই প্রথম রাফিজ শুভ্র সফেদ পাজামা পাঞ্জাবী পড়ে নামাজের একঘন্টা আগে মসজিদে চলে গেছে।
যাবার আগে নাযিয়াত হাঁটু গেড়ে বসে ওর পাজামা তুলে দিয়েছে টাখনুর ওপর!
রাফিজ একটু তাড়াতাড়িই মসজিদে চলে গেছে!
এটিও রাফিজ করেছে এক দীর্ঘ হাদিস শুনে!হাদীসটি শোনার পর ও আর থাকতে পারেনি–
-“আবু হুরায়রা রাঃ এর বর্ণনা-‘রাসুল সাঃ বলেছেন-“যখন জুম’আর দিন আসে,ফেরেস্তাগণ মসজিদের দরোজায় এসে দাঁড়ায় এবং যার পূর্বে যে আসে তা লিখতে থাকেন!যে ব্যক্তি খুব সকালে আসে তার উদাহরণ হচ্ছে,যে মক্কায় কুরবানী করার জন্য উট পাঠায়!তারপরে যে আসে তার উদাহরণ,যে একটি গরু পাঠায়!তারপরের আগমনকারী একটি দুম্বা,তারপরের আগমনকারী একটি মুরগী,তারপরের আগমনকারী যেমন একটি ডিম পাঠালো!যখন ইমাম খুতবার জন্য বের হন,ফেরেস্তাগণ তাদের কাগজ ভাঁজ করে লন এবং খুতবা শুনতে আরম্ভ করেন!”(হাদিসটি বুখারী ও মুসলিম শরীফ এর)!
{note:আশাকরি,এই সহীহ হাদীসটি শোনার পর আর কোনো ভাইজান জুম’আ মিস করবেন না এবং নামাজে দেরী করে যাবেন না!দেখুন টাকা দিয়ে উট কিনে কুরবানীর সামর্থ্য সবার থাকেনা অথচ প্রতি শুক্রবার এই সুযোগটি হেলায় হারাচ্ছেন!বিষয়ট
ি গভীরভাবে ভেবে দেখার বিনীত অনুরোধ রইল}

জুম’আ থেকে ফিরে দেখলো নাযিয়াত নিজেও সুন্দর একটি পোষাক পড়ে সামান্য সেজেছে।রাফিজ প্রশ্ন না করে পারলোনা,’জুম’আর দিনে কি মেয়েদের সাজতে হয় নাকি?”
নাযিয়াত লজ্জায় বেগুনী হয়ে বলেছে-‘না..না,এটা তো আমাদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন।তাছাড়া জামাটা নতুন না!এটা আমার বিয়ের আগের বানানো!আপনি বললে নাহয় বদলে ফেলি?”
-“আরে না,আমি তো শুধু জানতে চাইলাম।আচ্ছা,তুমি যে সকালে বললে আজকের দিনে দু’আ কবুল হয়!সেই কবুলের সময়টা কখন, জানো?”
নাযিয়াত মৃদু স্বরে বলল -“দুটো বর্ণনা আছে,একটি হলো ইমামের বসা থেকে নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত আরেক বর্ণনা আসর থেকে সুর্যাস্তের আগের সময়টার মধ্যে খুঁজতে বলা হয়েছে।তবে জুমার দিনে যে দু’আ কবুল হবে এটি সহীহ সনদে বর্ণিত আছে।”
-“যাক্,তাহলে সারাদিনই চাইতে থাকবো…!”
বলে নাযিয়াতের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালে নাযিয়াত চোখ নামিয়ে ফেললো!ওর লজ্জা দেখে রাফিজ মুচকি হাসল।

রাতে ঘুমুবার আয়োজন করছিলো নাযিয়াত।রাফিজ বললো-“একটু বারান্দায় আসবে?”বলার সময় মনে হলো প্রিয়ন্তী হলে উত্তর দিতো….’কিইই?পারবোনা এখন!”
কিন্তু নাযিয়াত যে এটা বলবেনা,এই ক’ দিনে জেনে ফেলেছে রাফিজ।সত্যিই নাযিয়াত হাতের কাজ রেখে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো!রাফিজ চেয়ার দেখিয়ে বললো-“বসো!”
নাযিয়াত বসলে রাফিজ নিজেও ওর পাশে বসলো!তারপর দীর্ঘক্ষণ দুজনেই চুপ।
কিছুক্ষণ পরে রাফিজ বললো-“তুমি আসার পর আমার জীবনটা বদলে গেছে,নাযিয়াত! জীবনে যে এতো আনন্দ আছে আগে জানতাম না।আসলে আমি একটু সেকেলে ধরনের।বঊ যত্ন করবে,খোঁজখবর রাখবে,আদর করে কথা বলবে এগুলো আমার আকৈশোর লালিত স্বপ্ন।প্রিয়ন্তীকে বিয়ের পর…..”!
-“একটু থামুন…,প্লিজ!”নাযিয়াত ওকে থামিয়ে দিলো!রাফিজ তাকালে নাযিয়াত বললো-
-“প্রিয়ন্তীর নামে কোনো দোষ বলবেন না যেন,তাহলে সেটা গীবত হয়ে যাবে!”
-“সেটা যদি দোষের হয় তবুও?”রাফিজ অবাক হলো!নাযিয়াত মাথা নাড়লো!
-“একবার রাসুল সাঃ সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,তোমরা কি জানো,গীবত কি?তাঁরা উত্তর দিলেন,আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই অধিক জানেন!তিনি বললেন-‘গীবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে।জিজ্ঞেস করা হলো-“আমি যা বলছি যদি তার মাঝে ঐ দোষ বিদ্যমান থাকে তখন আপনার মতামত কি?রাসুল সাঃ বললেন-‘তুমি যা বলো যদি তার মাঝে তা থাকে তবে তুমি তার গীবত করলে আর যদি তার মাঝে ঐ দোষ না থাকে তবে তুমি তার নামে মিথ্যা অপবাদ রটালে!(মুসলিম)
রাফিজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো-“তাহলে ওর কথা থাক্ কারন যা’ই বলবো,তা হয়তো গীবতই হয়ে যাবে!”
নাযিয়াত নিরবে বসে রইলো!
রাফিজ ওর দিকে তাকিয়ে মুদু স্বরে বললো-“তোমার কথা বলো,আমার মতো পূর্ব বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করে তোমার স্বপ্ন হোঁচট খেয়েছে নিশ্চয়ই!”
নাযিয়াত বাতাসের শব্দে হাসলো-“কেন,এমন হবার তো কোনো কারন নেই,বিয়ে হয়ে গেলে কি কেউ ভালোবাসার অযোগ্য হয়ে যায়?আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটা বড় বিদঘুটে!ছেলেরা/মেয়েরা একশটা বফ আর গফ রাখলে দোষ হয়না কারন তখনো তাদের কাছে সে অবিবাহিত আর পূত পবিত্রই রয়ে যায় অথচ একজন বিবাহিত পূরুষ কিংবা তালাকপ্রাপ্তা মহিলার গায়ে কেবল বিয়ের সিল পড়ে যাবার কারনে তারা অচ্ছ্যুৎ হয়ে যায়।তাদের বিয়ে করা যাবেনা!পুরো ব্যপারটার মধ্যে একটা শয়তানী প্ররোচনা কাজ করছে!মুলতঃ নারী পুরুষের সম্পর্কের চুড়ান্ত ও পবিত্র পরিণতি হলে বিয়ে!এটাকে মন্দভাবে দেখার কোনো উপায় নেই!আসলে আমার চাওয়াটা অন্যখানে!”
রাফিজ কৌতুহল নিয়ে তাকালো-“কি সেটা…?”
-“আমার খুব ইচ্ছা আমার স্বামী নামাজী হবে,তাকওয়া অবলম্বন করবে,দাঁড়ী রাখবে,ইসলামের হুকুম আহকামগুলো মেনে চলবে,আমাকে সেভাবে চলতে উৎসাহিত করবে,দুজনে মিলে একটি সাহাবীওয়ালা ঘর রচনা করবো যে ঘরের যাত্রা হবে জান্নাতের পথে….এইতো! যেদিন থেকে দ্বীন আর দুনিয়ার পার্থক্য বুঝতে শিখেছি সেদিন থেকে এমনটিই চেয়ে এসেছি!”
-“পেয়েছো?”রাফিজের স্বরে কৌতুক না কি ঠিক বোঝা গেলোনা!নাযিয়াত স্থির কন্ঠে বললো!
-“পাইনি…এমনটাও তো বলতে পারছিনা!কার কখন হেদায়েত হয়ে যায় কে বলতে পারে!”
-“হমম…গত একটা সপ্তাহ ধরে তোমার মুখে সাহাবীদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা শুনতে শুনতে নিজেকে তাদের একজন ভাবতে মন চাওয়া শুরু হয়েছে!”
-“সত্যিই…?”নাযিয়াতের কন্ঠে উচ্ছাস!
রাফিজ হাসল!বললো-“প্রথম দিন কি বলেছিলে মনে পড়ে?”
-“কি বলেছিলাম?”
-“স্বামীর কাছে স্ত্রী’র অধিকার সম্পর্কে পরে বলবে বলেছিলে!সেটা কিন্তু এখনো বলোনি!”
-“ওহ্…..! এমনিতে তো অনেক অধিকার রয়েছে!”
-“সেসব কি তুমি আমার কাছে আশা করো না?”
-“জ্বী,তা তো করিই!”
-“আমিও চাই,আমার অধিকার খর্ব না করে তোমাকে তোমার হক দিয়ে দিতে!”
নাযিয়াত মুখ নিচু করে রাখলো!কোনো জবাব দিলোনা!বাইরে বাতাসের বেগ বাড়ছে!নাযিয়াতের মনে হলো ও সেই ঠান্ডা বাতাসে একটু একটু কাঁপছে! রাফিজ হঠাৎ ঝুঁকে ওর বেতের চেয়ারটা ধরে টান দিয়ে একেবারে নিজের কাছে নিয়ে এলো!
নাযিয়াত একটু চমকে উঠলো।রাফিজ ওর হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো!
-“আমার দিকে তাকাও…!”
নাযিয়াত একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে ফেললো!রাফিজ তাকিয়ে আছে।বাইরে বাতাসের বেগ ক্রমাগত বাড়ছে।সেই ঝড়ের দাপট ওদের ভেতরটাকে একেবারে ভেঙ্গেচুরে দিতে চাইছে যেন!
…..
চলবে…..

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে