উত্তরাধিকার (২য় পর্ব)

0
1360

উত্তরাধিকার (২য় পর্ব)
লেখাঃ-মোর্শেদা রুবি
*************************
বোরকাটা সযত্নে গেটের পেছনে একটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলো নাযিয়াত।ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে পড়তে চাইছে।কিন্তু এখনো বিশ্রাম নেবার সময় হয়নি ওর।
মাগরিবের নামাজের পরপরই আরো দুটো মেয়ে পড়তে আসবে।ওরা দুই বোন!একজন ক্লাস এইটে অপরজন ক্লাস নাইনে পড়ে!ওদের পড়ানো শেষ হলে আজকের মতো ছুটি।আবার আগামীকাল সকাল থেকে শুরু হবে!
মাদ্রাসার সময়টুকু বাদে প্রতিদিন গুণে গুণে চারটা টিউশনি করতে হয় নাযিয়াতকে।
একটা সময় যখন ওর বাবা বেঁচে ছিলো তখন নাযিয়াতকে পরিবার নিয়ে এতো ভাবতে হয়নি।
স্কুল পেরিয়ে তখন কলেজে উঠেছিল সে।এখনকার মতো পূর্ণ হিজাব নিকাব না করলেও সবসময় শালীনভাবে চলাফেরা করতেই পছন্দ করতো সে!
কোনোদিনই সে ওড়নাকে মাফলার ষ্টাইলে গলায় ফেলে রাখেনি।সবসময় তার সদ্ব্যবহার করেছে।আড়াই গজের ওড়নাকে দুপাশে সেফটিপিন দিয়ে আটকে কিছুটা পেঁচিয়ে অর্ধেক শরীর ঢেকে পড়তো সে!তারপরেও কিছু কৌতুহলী দৃষ্টির ছোবল থেকে নিজেকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়তো!বয়স বাড়ার সাথে সাথে আশেপাশের মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে যেতে দেখেছে নাযিয়াত।পর্দা আর শালীনতার পার্থক্য বুঝতে খুব বেশী বেগ পেতে হয়নি নাযিয়াতকে!
শালীনতা আর পর্দার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন।কারন একটা হাফহাতা জামা একটা স্লিভলেস জামার চেয়ে শালীন!আবার স্লিভলেস জামা একটা বিকিনির চেয়ে শালীন।কারো কাছে হাঁটু পর্যন্ত পোষাক হাঁটুর উপরের জামার চেয়ে শালীন!শালীনতা জিনিসটা সবসময়ই তুলনামূলক ভাবে বিচার্য এবং এটা ব্যক্তিভেদে সবসময়ই বিভিন্ন!দেশকালের বিচারে শালীনতার সংজ্ঞাও বদলে যায়!আমেরিকায় যেটা শালীন বাংলাদেশে সেটা অশালীন!
কিন্তু পর্দা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
এটি একটি ফরয ইবাদত।
এটি শুধু পোষাকের সাথে সম্পর্কিত নয়,এর আরো আনুষঙ্গিক শর্ত আছে!
কেবল কব্জি আর মুখমন্ডল বাদে সমস্ত শরীর ঢেকে রাখার নামই পর্দা নয়!
পোষাক যথেষ্ট ঢিলেঢালা হওয়া,রঙচঙে চাকচিক্যবিহীন হওয়া এর অন্যতম শর্ত।পাশাপাশি অকারনে গায়ের মাহরামের সামনে না যাওয়া,তাদের সাথে মিষ্টি স্বরে কথা না বলা,আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে তাদের সামনে চলাফেরা না করা,কন্ঠের মিষ্টতা পরপুরুষ পর্যন্ত না পৌঁছানো….পর্দ
ার অনেকগুলো শর্তের মধ্যে অন্যতম।পর্দার বিধান সারাবিশ্বে সকল দেশের সকল ভিন্ন গোষ্ঠির মানুষের জন্য একই।
একজন বাঙালী মুসলিমের জন্য পর্দার যে নিয়ম একজন আমেরিকান মুসলিমের জন্য ঐ একই নিয়ম।
এগুলো নাযিয়াত জানতো না।
কলেজে পড়ার সময় এক ইমাম সাহেবের মেয়ের সাথে ওর খুব বন্ধুত্ব হয়েছিলো!মেয়েটি পূর্ণ পর্দা করে কলেজে আসতো,ওর আপাদমস্তক কারো আচ্ছাদান দেখে কলেজের মেয়েরা ওকে বলতো ‘কাকতাড়ুয়া’!ও একথায় একদম গা করতো না!কোনোরকমে চোখ টুকু বের করে ক্লাসে বসতো।কলেজ শেষ হবার দিন নাযিয়াত ওকে অনুরোধ করেছিলো ওর পুরো মুখটা দেখাতে।
ও অনুরোধ রেখেছিলো তবে পর্দার আরেকটি শর্ত বেধে দিয়ে বলেছিলো কারো কাছে যেন ওর চেহারার বর্ণনা না করে!নাযিয়াত ওর কথা রেখেছিলো,কাউকে বলেনি যে ও ছিলো দম বন্ধ করা সুন্দরী!
কলেজে পড়াবস্থাতেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়!তারপর আর যোগাযোগ হয়নি ওর সাথে!
নাযিয়াত ওর সংষ্পর্ষে থেকেই পর্দা করা শিখেছে।দ্বীন সম্পর্কে জেনেছে।ও’ই নাযিয়াতকে বলেছে যে কুরআন বিশুদ্ধভাবে না পড়লে তার অর্থ বদলে যায় এবং নামাজও শুদ্ধ হয়না।ওরই পরামর্শ ছিলো নাযিয়াত যেন একটা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে কুরআন পড়াটা বিশুদ্ধভাবে শিখে নেয়।
সে বছরই নাযিয়াত একটা মাদ্রাসায় ঢুকে কুরআন পড়া শিখতে শুরু করেছিলো!
মাত্র এক বছরের মধ্যেই নাযিয়াত বিশুদ্ধ কুরআন পাঠে দারুন পারদর্শীতা অর্জন করে ফেললো।পাশাপাশি মাদ্রাসার নুরানী সোহবতে বদলে গিয়েছিলো ওর জীবনধারা!
কলেজের পাশাপাশি মাদ্রাসাতে ছোট বাচ্চাদের পড়া শেখানোর দায়িত্বটা তখনই স্বেচ্ছায় নিয়ে নেয় ও!
এদিকে পাশ করে বেরুবার পরপরই ওর বাবা আচমকা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে কলেজের খরচ জোটানো দুরূহ হয়ে পড়েছিলো ওর জন্য!
উপরন্তু সংসারের খরচ, ছোটবোনদের পড়াশোনা ওকে দিশেহারা করে ফেলছিলো প্রায়!তখন মাদ্রাসাতে পড়ার সময়ই জেনেছিলো যে, আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের পছন্দ করেন,তিনি সর্বদা ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছেন।
তখন থেকেই নাযিয়াত ধৈর্য্যকে নিজের বর্ম বানিয়ে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নামলো!
নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে অর্ধেক বেলা মাদ্রাসা আর বাকীবেলা চারটা টিউশনি জুটিয়ে নিয়েছিলো সে!এতেই আল্লাহ বরকত দিয়েছেন।আর সেই বরকতের জোরে মসৃন গতিতে চলছে ওদের সংসার নামক ঠেলাগাড়ীটা!

★★
মাগরিবের নামাজ পড়ে উঠতেই সবচে ছোট বোন রেশমা ওকে এককাপ ধোঁয়া ওঠা চা ধরিয়ে দিয়ে বললো-“বড়াপু,চা টা খেয়ে নাও,তোমার সাথে জরুরী কথা আছে!”
-“চা খেতে খেতেই শুনি, কি তোর জরুরী কথা!”
রেশমা ওর জামার কোনা খুঁটছে।
নাযিয়াত বুঝলো, সে কিছু চাইতে এসেছে।নাযিয়াত ওর চায়ের কাপটা রেখে ওর হাত ধরে বললো-
-“তোর কিছু লাগবে তাইনা?কিন্তু বলতে দ্বিধা হচ্ছে!”
রেশমা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললো-
-“না বললেও কিভাবে বুঝে ফেললে বড়াপু?”
নাযিয়াত সামান্য হাসলো-“এবার বল্,কি চাই?”
রেশমা মৃদুস্বরে তার ব্যাগের কখা জানালো যেটা ছিঁড়ে গেছে!নাযিয়াত চায়ে চুমুক দিয়ে বললো-“কই নিয়ে আয় দেখি সেটা!”
কথার মাঝেই নাযিয়াতের ইমিডিয়েট ছোটো বোন নাদিয়া এলো!ও নিজেও ছোটখাট দুটো টিউশনি করে নিজের খরচ চালায়!ও এসেই ওর সমস্যা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো!নাযিয়াত ধৈর্য্য ধরে ওর কথাটাও শুনলো!
ওর কথাটা শেষ হতে না হতেই মা এসে বসলেন ওর পাশে-“হ্যাঁরে,তোর সাথে একটা জরুরী কথা ছিলো,তুই ফী হবি কখন?”
-“পুরোপুরি ফ্রি হতে গেলে রাত বারোটা বাজবে মা, তারচে এখনি বলে ফেলো!”
-“তোর ছোট খালামনি এসেছিলো আজ।তার কথায় যা বুঝলাম,সে নাদিয়ার সাথে তার ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।”
নাযিয়াত নিরবে কথাটা শুনে বললো-“উনি কি পরিস্কার করে বলেছেন কথাটা?”
-“না,ঠিক,সরাসরি বলেননি তবে আমার মনে হলো!”
-“বিয়েশাদীর ব্যপারে কথাবার্তা খোলাখুলি হলে ভালো পরে মনকষাকষি হয়না!আচ্ছা,প্রয়োজনে খালামনির সাথে আমি নিজেই কথা বলে নেবো,যদি সত্যিই উনি চান যে নাদিয়া তার ছেলের বৌ হবে তাহলে আমাদের রাজী না হবার কোনো কারন নেই মা!বরং এটাতো আল্লাহর রহমত!”
-“সব বুঝলাম কিন্তু বিয়ের খরচ জোটাবি কোত্থেকে?ন্যুনতম ঘর সাজিয়ে দিতে গেলে….”!
-“মা..!আমি আগে খালামনির সাথে কথা বলে নেই!উনি তো আমাদের সবই জানেন!তারপর যা হয় দেখা যাবে,তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ!”
-“আমি আরেকটা কথা ভাবছি!”
-“বলো!”ক্লান্ত চোখে তাকালো নাযিয়াত।ওর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে!
-“তুই আমার বড় মেয়ে,তোকে রেখে মেজটাকে বিয়ে দিতে দাঁড়ালে লোকে কি বলবে?তাছাড়া তোর কি হবে?”
নাযিয়াত হেসে ফেলল-“লোকে তো কত কথাই বলে মা,সমস্যার সময়ই কেবল তাদের কাউকে পাশে পাওয়া যায়না।আমাদের ধর্মে বড়র আগে ছোটকে দেয়া যাবেনা এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই!আমার ভাগ্যে যা আছে তা’ই হবে!আমাকে নিয়ে ভাবতে গেলে তোমার বাকী চার মেয়েকে সিরিয়াল ধরে বসে থাকতে হবে মা!এখন এসব ভাবনা ছাড়ো!তুমি বিশ্রাম নাও গে!”
-“ঘরে কিন্তু একদম বাজার নেই!”
নাযিয়াত একটু থমকে গেলো!ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো-“রাতটা কোনোরকম চালাও,কাল সকালে দেখি কি পাওয়া যায়!এতো রাতে আবার বোরকা গায়ে দিতে ইচ্ছে করছেনা মা!ঘরে ডিম আছে না?ঐটা দিয়ে চালিয়ে নাও!”
পেছন থেকে সেজো বোন নাঈমা বলে উঠলো-“আমাদের বাসার সামনেই সব্জির ভ্যান বসেছে বড়াপু!আমি মাথায় কাপড় দিয়ে যেয়ে নিয়ে আসি?”
নাযিয়াত জ্বলে উঠলো-“নিয়ে আসি মানে?তোর ঠ্যাঙ আমি ভেঙ্গে ফেলবো!”(মায়ের দিকে তাকিয়ে)ও বুঝি ফটাফট রাস্তায় বেরোয়?তুমি কিছু বলো না?”
মা আমতা আমতা করতে লাগলো!মুলতঃ নাযিয়াতের ভয়েই তারা একটু আধটু রেষ্ট্রিকশন মানতে চেষ্টা করে,নইলে সুযোগ পেলেই নিয়মের বেড়া ডিঙ্গোতে চায়!নাযিয়াত বরাবরের মতোই পর্দার আদেশ সম্পর্কে ওদের নসীহত করলো!ওরা চুপচাপ শুনলো।ওদের চারবোনের একটাই বড় গুণ আর তা হলো ওরা কখনোই নাযিয়াতের সাথে তর্ক করেনা!কিন্তু নাযিয়াতের চোখের আড়াল হলেই ওরা যে যার মতো স্বাধীন হয়ে যায়।
পিতার অনুপস্থিতিতে একটি পরিবার লাগামবিহীন ঘোড়া আর পালবিহীন নৌকার মতোই!নাযিয়াত সাধ্যমতো সেই হাল ধরার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে কই!

প্রিয়ন্তী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হিজাবটা মাথায় চাপালো!যে কোনো মুহূর্তে নাযিয়াত এসে পড়বে।
পেছন থেকে রাফিজের ব্যস্ত কন্ঠে তটস্থ হলো সে-“কোথায় যাচ্ছো?”
-“পড়তে বসবো!নাযিয়াত আপু আসবে এখন!”
-“আমার নীল ফাইলটা গতরাতে এখানে রেখেছিলাম।এখন পাচ্ছিনা!কোথায় দেখেছো?”
-“না,তো….!”বলে প্রিয়ন্তী ফের হিজাব বাঁধতে লাগলো!রাফিজ বাঁজখাই স্বরে ধমক লাগালো-“না তো’.. বলে যে দায় সারছো,খুঁজে বের করতে পারোনা?খালি আছো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।একটা জিনিস যদি গুছাতে দেখি!গতরাতেই এখানে ফাইলটা রেখেছি আর এখন গায়েব হয়ে গেলো?”
প্রিয়ন্তী মুখ ভার করে সোফার নিচে উঁকি দিয়ে বললো-“এখানে নেই!”
রাফিজ রাগে ফেটে পড়লো-“ওখানে যে নেই ওটাতো আমিই প্রথমে বললাম।তোমার কোমড় কি বাঁকা হতে চায়না?খুঁজে দেখতে পারোনা?নাকি সারাদিন খালি সেজেগুজে পুতুল হয়েই থাকতে পারো?অকম্মার ঢেঁকি কোথাকার!যাও,সরো এখান থেকে!যত্তসব আহ্লাদী মার্কা ঢং..!”
প্রিয়ন্তী মুখ কালো করে চলে এলো সেখান থেকে।রাফিজ নিজেই সোফার ফোমগুলো তুলে,তোষকের নিচে,খাটের নিচে দেখতে লাগলো।কোথাও নেই!রাতারাতি একটা ফাইল হাওয়া হয়ে যেতে পারেনা!গেলো কোথায়? খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফাইল।
আজকের মিটিং এ এটার উপরই আলোচনা চলবে!রাফিজ প্রচন্ড বিরক্ত বোধ করছে। প্রিয়ন্তীর ওপর রাগটা ক্রমাগত বাড়ছে।খাওয়া,ঘুমানো আর সাজগোজ করা ছাড়াও যে দুনিয়াতে আরো কাজ আছে সেটা যেন এই মেয়ে জানেইনা!মা যে কোত্থেকে একটা পুতুল যোগাড় করে ওর ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছে আল্লাহই জানেন!
পুতুলটা খালি পটের বিবি সেজে ঘুরে,কোনো উপকারেই আসেনা!মনটাই তেতো হয়ে গেলো ওর!হতাশ হয়ে বসে সিগারেট ধরালো! সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়েই আলমারীর ডালা খুললো শার্ট বের করবার জন্য আর তখনই একগাদা কাপড় হুড়মুড় করে রাফিজের গায়ের উপর দিয়ে মাটিতে পড়লো!সবশেষে পড়লো রাফিজের নীল ফাইলটা।
রাফিজের মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেলো!গলা চড়িয়ে ডাক দিলো-“প্রিয়ন্তী….!”
প্রায় সাথে সাথেই বেলা চৌধুরী ঘরে ঢুকলেন-“কি রে, সাত সকালে এতো চ্যাঁচাচ্ছিস কেন?প্রিয়ন্তীর এ্যারাবিক টিচার এসছে,ও পড়তে বসেছে।কি বলবি আমাকে বল!”
-“এই দেখো তোমার পুতুল বৌমার কাজ।গতরাতে তাকে কাপড়গুলো গুছিয়ে রাখতে বলেছিলাম,সময়মতো কেনো কিছুই হাতে কাছে পাইনা।সে সব কাপড় দুহাতে ধরে এটার ভেতর ঠেলে ঢুকিয়ে রেখেছে।একটাও ভাঁজ করা নেই,কি অবস্থা দেখো !এতো বছর ধরে সংসার করছে অথচ এখনো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘোরে।সে কাপড়ের সাথে আমার ফাইলটাকে শুদ্ধ পোটলা বানিয়ে আলমারীতে ঢুকিয়েছে,অথচ সে নিজেই জানেনা।সেই তখন থেকেই এই ফাইলটা খুঁজছি।তার কোনো খবর নেই!এভাবে কতদিন,মা?কিছু শেখাতে পারোনা ওকে?”
-“আরে বাবা!বড়লোকের মেয়ে কাজকর্ম করে তো আর অভ্যেস নেই!তাছাড়া আদরে আদরে বড় হয়েছে।আমি ময়নাকে বলে দেবো, ও সব গুছিয়ে দেবে!”
-“নিজেদের ব্যক্তিগত জিনিসও কি ময়না গুছিয়ে দেবে?এসব বলে তুমিই ওকে মাথায় তুলেছো!ওকেই শেখাও না কেন?সংসার তো আর ময়না করবে না ও’ই করবে…তো ওকেই এসব বিষয়ে যত্নবান হতে বলো!যত্তসব !”
রাফিজ গজরাতে গজরাতে কাপড়ের পাহাড় টপকে বাইরে চলে গেলো!বেলা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাপড়গুলোর দিকে তাকালেন।প্রিয়ন্তীটা আসলেই বড় উদাসীন।স্বামীর প্রয়োজন অপ্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখা যে ওর কর্তব্য, এই জিনিসটাই ওকে বোঝানো যায়না!

★ ★
প্রিয়ন্তীকে পড়াতে নাযিয়াতের বেশ পরিশ্রম হয় কারন মেয়েটার মধ্যে পরিশ্রম করার মানসিকতা একেবারেই নেই!সে সব কিছু সহজে আয়ত্ত্ব করতে চায়।ওকে একটা শব্দ কয়েকবার পড়তে বললেই সে বিরক্ত হয়ে যায়।নাযিয়াতের মাথা ভোঁ ভোঁ করে ওকে পড়াতে বসলে।তারপরেও হাল ছাড়েনা।গত দুটো মাস ধরে ওকে কায়দাই পড়িয়ে যাচ্ছে, আর কোনো অগ্রগতি হচ্ছেনা!
নাযিয়াত চলে আসতে নিলে বেলা চৌধুরীর ডাকে থেমে গেলো!
-“তোমার মোবাইল নম্বরটা দেয়া যাবে?”
-“জ্বী..?”অবাক হয়ে তাকালো নাযিয়াত!
-“তোমার সাথে আমার পার্সোনাল কিছু কথা আছে!”
-“জ্বী,বলুন!”
-“উঁহুঁ…এখন নয়।পরে। সেকারনেই তোমার মোবাইল নম্বর চাচ্ছি যেন যে কোনো সময় তোমার সাথে কন্ট্যাক্ট করতে পারি!”
নাযিয়াত কিছুটা ভেবে নম্বর বললো!বেলা চটপটে হাতে তা সেভ করে নিলেন।নাযিয়াত সালাম দিয়ে চলে গেলো!
বেলা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন,নাহ্,ব্যপারটাকে এভাবে ফেলে রাখার কোনো মানে হয়না!যা করার তাকেই করতে হবে।তাহলে অযথা দেরী কেন!
তিনি প্রিয়ন্তীর মা’কে ফোন দিলেন।এবং তারপর পরই গাড়ী বের করতে বললেন!
*
আধাঘন্টার মধ্যেই তিনি প্রিয়ন্তীর মায়ের মুখোমুখি হলেন।প্রিয়ন্তীর মা শাজিয়া হামিদ একটু অবাক হয়েই তাকালেন!
বেলা চৌধুরী এতো জরুরী ভিত্তিতে একেবারে বাড়ী বয়ে কি বলতে এসেছেন!
তারপরেও তিনি স্বাভাবিক সুরে বলার চেষ্টা করলেন-“আপা, একেবারে হঠাৎ, এসময়ে?বিশেষ কিছু দরকার নাকি?”
বেলা স্বগোতক্তি করলেন-“বিশেষ তো বটেই!আপনার সাথে কথা বলা দরকার তারপর বাকী কাজ।গেটটা একটু লাগিয়ে দিন”!
শাজিয়ার বিস্ময়ের মাত্রা বাড়লো!তিনি উঠে গিয়ে দরজা চাপিয়ে এসে বসলেন-“জ্বী,বলুন।প্রিয়ন্তী ঠিক আছে তো!জামাই…?”
-“আপাত দৃষ্টিতে ওরা ঠিকই আছে ,তবে কতদিন ঠিক থাকবে সেটাই প্রশ্ন!”
-“কেন,এমন কেন বলছেন?”
-“দেখুন,একটা সংসারের ভিত্তি হলো স্বামী স্ত্রী’র পারষ্পরিক ভালোবাসা বিশ্বাস।আমি প্রিয়ন্তীর কোনো বদনাম গাইতে আসিনি।সে যেমন আছে সেটাকেই ভাগ্য বলে মেনে নিতে আমার অসুবিধে নেই !
সে আগাগোড়াই সংসারের প্রতি উদাসীন কিন্তু এখন যে সমস্যাটা প্রকট হয় দেখা দিয়েছে সেটা হলো আমার বংশ তাকে দিয়ে রক্ষা হচ্ছেনা!সেটা হলেও নাহয় তার অন্যান্য দোষ মাটিচাপা পড়ে যেতো,কিন্তু….!”
-“কি বলতে চান সেটা পরিস্কার করে বলুন!”শাজিয়া থমথমে মুখে বললেন!বেলা আর ভণিতা না করে সরাসরি বললেন-“আমি আমার রাফিজকে আবার বিয়ে করাতে চাই!”
শাজিয়া বোকার মতো তাকিয়ে রইলেন-“,মানে?”
-“মানে যা শুনেছেন সেটাই!এর আবার মানে কি?আমার উত্তরাধিকার দরকার,ব্যস্!”
শাজিয়া সোজা হয়ে বসলেন-“আপনি কি আমার মেয়েকে ডিভোর্সের কথা বলতে এসেছেন?”
-“এই তো বেশী বুঝে ফেললেন!আপনার মেয়েকে তো বলেও বোঝানো যায়না,আর আপনাকে না বলতেই সব বুঝে ফেলেন!”
-“তাহলে?আমার মেয়ের সতীন আনবেন যে বললেন ?”
-“জ্বী,আর সেটা আপনার মেয়ের ভালোর জন্যই!যা বলি ভালো করে শুনুন,তারপর মতামত দেবেন!”
শাজিয়া তাকিয়ে রইলেন।বেলা যথাসম্ভব গুছিয়ে তার পরিকল্পনা বললেন।
শাজিয়ার মুখ পর্যায়ক্রমে গম্ভীর হয়ে উঠলো-
-“এভাবে জেনেশুনে আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করা কি ঠিক হবে?”
-“নষ্ট হবে কেন?এর বিনিময়ে তার সমস্ত দায়ভার যে আমি নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি তার কি?এজন্যেই তো গরীব ঘরের মেয়ে বেছে নিচ্ছি।এমনিতে তো এদের ভালো বিয়েই হতোনা,সেখানে বিয়ে হবে,সংসার পাবে,স্বামী টাকায় বাপের বাড়ীর জঞ্জাল সাফ করবে!মন্দ কি?”
-“কিন্তু তার সন্তানটাকে রেখে তাকে যে পরে ঘরছাড়া করবেন,এতে পাপ হবেনা?”
-“আরে,এতো ভাবলে দুনিয়া চলবেনা।তাহলে ঠিক আছে,আমি ঐ গরীব মেয়েটাকে রেখে দেবো আপনি আপনার মেয়েকে নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন,কেমন…. রাজি তো?”
শাজিয়া থমকে গেলেন।
বেলা সবজান্তার হাসি হেসে বললেন-“শোনেন,ওসব তত্ত্ববাক্য যে আমি জানি না,এমন না।কিন্তু এসব আপ্তবাক্যে আমার পোষাবে না,আমার একজন উত্তরাধিকারী চাই,ব্যস ! তার জন্য যা যা করা দরকার তা আমি করতে প্রস্তুত।নাযিয়া
তকে ঠকাবো না,ওর চারটে বোনকে পার করার দায়িত্ব নিচ্ছি,বাড়ীটা ওর মা’র নামে কিনে দিচ্ছি,ক্যাশ পাঁচলাখ টাকা দিচ্ছি আর কি চাই?”
-“নাযিয়াতটা কে?”
-“আপনার মেয়ের আরবী টিচার!”
-“ওকে বলেছেন,এসব কথা?”
-“আরে পাগল নাকি?ওকে সবই বলবো! কেবল নাতি হবার পর যে ওকে আমার আর লাগবেনা একথাটা বাদ দিয়ে।এটা বললে রাজী হবে নাকি?আরে উন্নত বিশ্বে পেট ভাড়া দেয়া হয়,কিন্তু এটা মুসলিম কান্ট্রি এখানে ওসব চলবেনা!তাছাড়া ওদের বৈধ অবৈধ নেই!আমি পাকাপোক্তভাবে আমার একজন ওয়ারিশ চাই!নইলে তো দত্তকই নিতাম! কিন্তু সে তো আর আমার রক্ত হবেনা! তাই রাফিজকে বিয়ে করানো ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই!আপনাকে জানালাম যেন আপনি আবার অন্য কিছু ভেবে না বসেন।বেয়াই সাহেবকে একথা বোঝানোর দায়িত্ব আপনার। আমি জনে জনে এতো বোঝাবুঝিতে নেই।সামনে আমাকে আরো কঠিন কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে তাই আপনাকে জানালাম।বেয়াই সাহেব রাজী না হলেও আমাকে ভিন্ন পথ দেখতে হবে তাই ওনাকে ভালোভাবেই বোঝাবেন।আমি এখন তাহলে উঠি!”
-“সে কি চা….ঠান্ডা…!”
-“নো,থ্যাংকস।আমাকে এখন এক জায়গায় যেতে হবে!”

★ ★
আজ শুক্রবার।আজ নাযিয়াতের বাইরে কোনো কাজ নেই!দিনটাকে সে বড় উপোভোগ করে সে!সারা সপ্তাহের জমানো কাপড় কাচা,ইস্ত্রি করা,ঘরদোর পরিস্কার করা,ভালো মন্দ রান্না করে মা আর ছোটবোনদের নিয়ে খাওয়া দাওয়া করেই কাটিয়ে দেয়!
আজও সমস্ত কাজ সেরে দুপুরের খাওয়া সেরে বিছানায় গা টা এলিয়েছে মাত্র।
অমনি ডোর বেল বাজলো!
নাযিয়াত অলস সুরে নাঈমাকে বললো-“দ্যাখতো এসময় কে এলো?”
মিনিট দুয়েক পরে বেলা চৌধুরীকে ওর রুমে প্রবেশ করতে দেখে নাযিয়াতের মুখের ভাষা হারিয়ে গেলো যেন।অপ্রস্তুত হয়ে অভ্যেসবশত সালাম দিয়ে বেতের সোফাটা ইঙ্গিত করলো সে!
বেলা অত্যন্ত অমায়িক হাসি হেসে বললেন-“বাহ্,তোমাকে দেখে তো আজ আরো দশ বছর কম মনে হচ্ছে!সবসময় তো তোমায় বোরকায় দেখি,বেশ ম্যাচিওরড মনে হয়!আজ তোমাকে এমন ঘরোয়া পরিবেশে একদম পিচ্চি পিচ্চি লাগছে।তোমার আসল বয়সটা আসলে কত বলো তো?”
নাযিয়াত আমতা আমতা করে বলল-“বয়স লুকোনো আমার স্বভাব নয়।আমার এখন সাতাশ চলছে!”
-“কিন্তু দেখতে তোমাকে বাইশ কি তেইশ লাছে,বিশ্বাস করো!”
-“আ…আপনি হঠাত এখানে?”প্রসঙ্গ বদলাতে চাইল নাযিয়াত।বেলা শান্ত হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে পাশে বসালেন!
-“তোমার কাছে কিছু চাইতে এসেছি,প্লিজ মামনি,আমাকে ফিরিয়ে দিওনা,সোনা মা!”
-“ক্কি..কি চাইছেন বুঝলাম না।আমার এমন কি আছে যা আমি আপনাকে দিতে পারি…?”
-“আগে বলো তুমি আমাকে ফেরাবে না?তোমার দোহাই লাগে।তোমার আম্মা কোথায় ওনাকে ডাকো,ওনার সামনেই কথাগুলো বলতে চাই আমি!”
বিভ্রান্ত নাঈসা মা’কে ডেকে দিলো।
নাযিয়াত নিঃশ্বাস বন্ধ করে ওনার কথাগুলো শুনতে লাগলো!মহিলা ওর মায়ের হাত ধরে অনুনয়ের সুরে ওকে চাইছেন তাঁর নিজের ছেলের জন্য!
ও ভুল শুনছে না তো?”
….
চলবে…..

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে