আমার ভিনদেশী ছাত্র

0
480

হঠাৎ করে ইমেইলে একদিন রিকোয়েস্ট পেলাম জেএফপিপি স্কলারশীপ পাওয়া ছাত্রদের মেন্টর হতে। ভাবলাম আচ্ছা কি তামাশা দেখি। নিজের সব ডিটেইলস পাঠিয়ে দিলাম। তা প্রায় বছর দুয়েক আগের ঘটনা। সপ্তাহ পেরোতে ফিরতি ইমেইল এলো আমার জন্য ছাত্র বরাদ্দ হয়েছে। ও এডিলেড ইউনিতে মেডিসিন প্রথম বর্ষের ছাত্র।

প্রথম বর্ষের ছাত্র জিপির কাছে কি শিখবে বা আমিই কি শেখাবো তাই নিয়ে একটু দোনোমনা ছিল। আর তাই ওর প্রথম বর্ষ ফাইনাল শেষে ও যখন দু সপ্তাহের জন্য আসে আমি তেমন কিছু তাকে বলতামনা। শুধু এক্সামিনেশন রিলেটেড কিছু হলে তাকে দেখাতাম। আমার ধারনা যে আমাদের প্রথম বর্ষেই আটকে ছিল। এনাটমী, ফিজিওলজীর আইটেমের দৌরাত্ম আর ভিসেরা, ক্যাডাভার নিয়ে নাড়াচাড়া। অবাক হলাম ওর কথা শুনে। আমি এসব শিখতে আসিনি, আমি এসেছি তুমি কিভাবে রোগীদের সাথে কথা বলো, কিভাবে এপ্রোচ করো সেসব শিখতে। সাথে তুমি যদি ওসব শেখাও সেটা আমার বাড়তি পাওনা। তারপর থেকে শুধু একেকটা রোগী গেলে পরে ওর কাছে জানতে চাইতাম, কোন প্রশ্ন আছে? আমাকে অবাক করে দিয়ে ও এপ্লাইড এনাটমীর নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো। আর ওকে আমি ফিরতি প্রশ্ন করলে সেটারও কোন না কোন উত্তর সে দিতে পারতো। আমি শুধু মেলাতাম নিজের প্রথম বর্ষের সাথে। কি দারুন যত্ন করে বিডি চৌরাশিয়ার এপ্লাইড এনাটমী অংশটাই না আমরা এড়িয়ে যেতাম।

দু সপ্তাহ শেষে ও যখন বিদায় নেয় তখন বললাম, কিছু শিখতে পেরেছো? ও হেসে বলে, অনেক কিছু। দেখা হবে সামনের বছর।

– সামনের বছর দেখা হবে মানে? আর আমি সামনের বছর এখানে থাকবো কি না তারই তো কোন নিশ্চয়তা নেই।

ও ভীষণ অবাক হয়ে বলে, তোমাকে তো আগামী পাঁচ বছরের জন্য আমার মেন্টর করা হয়েছে। আমি সামনের বছর আবারও দু সপ্তাহের জন্য আসবো। আমার এমবিবিএস শেষ না হওয়াতক আমি প্রতি বছর তোমার কাছে ট্রেনিংয়ে আসবো। এবার তুমি অস্ট্রেলিয়ার যে প্রান্তেই যাও আমি তোমাকে ফলো করবো।

– ওকে, দেখা হবে সামনের বছর। ভালোভাবে পড়াশোনা করে আমার ইজ্জত রেখো।

কোনদিক দিয়ে বছর পেরিয়ে আবারও ওর আসার সময় হয়ে গেলো। এ বছরও এসেছিল দু সপ্তাহের জন্য। এ বছরে তার টার্গেট ছিল শুধুই মেডিকেশন সম্পর্কে জানা। আমি অবাক হয়ে দেখি নিত্যদিনের আমাদের দ্বারা ব্যবহৃত সব ঔষধের নাম ও ব্যবহার সে কম বেশী জানে। যদিও জানেনা তাদের কাজ করার কৌশল। আবারও অবাক হই মেকানিজম অব একশন শেখার জন্য কতোটা সময় আমরা ফার্মাকোলজীতে ব্যয় করেছি। পড়েছো মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে, এই মন্ত্রে বিশ্বাসী আমি তাকে জোর করে কিছু কিছু মেকানিজম অব একশন শিখিয়ে ছেড়েছি যদিও।
আজ যাবার আগে এক প্যাকেট চকোলেট বাড়িয়ে দিয়ে বলে, থ্যাংকিউ ডক ফর অল ইউর সাপোর্ট। আই উইল সি ইউ নেক্সট ইয়ার।
কাঁধে হাত দিয়ে বলি, অল দ্য বেস্ট। আর মনে মনে বলি, এতো কিছু শিখিয়ে দিলাম, বছর জুড়ে আমার ইজ্জত রাখিস বাছা।

#ডা_জান্নাতুল_ফেরদৌস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here