অভিশপ্তরাত(২য়পর্ব)

0
2613

অভিশপ্তরাত(২য়পর্ব)

Umme Nipa

উপমার হাস্যজ্জ্বল মুখ দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটাকে সে কতকাল চিনে।

উপমা পানি দিতে পারো আমায়?কথাটা শিহাব কাপা গলায় ই বললো।

পানির কথা বলতে না বলতেই মেয়েটি ঘরের ভিতর চলে গেল।আমি ভয়ে শিউরে উঠছি।কি করা উচিৎ আমার,কিভাবে পদক্ষেপ নিব কিছুই বুঝছিনা

উপমা গামছা নিয়ে শিহাবের মাথা মুছে দিচ্ছে আর বলছে ওকে দেখে চমকে গেলে কেন?ও আমার স্কুল বান্ধুবী।ক্লাস ৯অবধি একত্রে পড়েছি। তারপর বাবা ট্রান্সফার হয়ে চলে এল আর দেখা হয়নি ওর সাথে।আজ কতকাল বাদে ওকে দেখলাম।মেয়েটা খুব অসহায় জানো।বর বাসা থেকে নাকি নামিয়ে দিয়েছে।প্লিস তুমি কিছু বলোনা।ও কয়েকদিন থাক আমাদের সাথে।আমিও একা থাকি,বান্ধুবীর সাথে সময় টা বেশ কেটে যাবে।

শিহাব: নাম কি তোমার বান্ধবীর?

এরই মাঝে মেয়েটি পানির গ্লাস আমার দিকে এগিয়ে বললো,মায়া…মায়া আমার নাম

শিহাবের হাত কাঁপছে , পানি ঢক ঢক করে পান করলো শিহাব।আর মনে মনে ভাবছে,নাহ কাল ই আমার জানতে হবে এই মেয়ের আসল পরিচয়।মিনু হয়ত ঠিক দেখেছিল।না না কি ভাবছি?কি করে সম্ভব?

উপমা এরই মাঝে উঠে বললো,শিহাব কি হয়েছে আজ?চুপচাপ হয়ে গেলে কেন?ফ্রেশ হয়ে নেও,খাবো… খুব ক্ষুধা লেগেছে আমার।আর মায়া ও খায়নি।

মিনুর কোলে নবাগতা ফুটফুটে বাচ্চা।বাচ্চার মায়ের জ্ঞান ফিরে নি এখনো। বাচ্চাটা মিনু কোলে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।কত শত বাচ্চাকে সে স্পর্শ করে কোন সম্পর্ক ছাড়া।তারপর না বাচ্চারা তাকে মনে রাখে না সে বাচ্চাকে।বার বার তার সেই মৃত অদেখা বাচ্চার চেহারা কল্পনা করতে গিয়ে এমন ই এক বাচ্চার চেহারা ভেসে আসতেছে।

এরই মাঝে সেবিকা নাজমা মিনুকে ডাক দিলেন।

হুম আপা বলেন,

মিনু পুলিশ এসেছে।

কেন?

ওই যে লাশ টা? আজ যে টা আসছিল বাচ্চা ছিল পেটে তার লাশ নিতে।

এমা ময়নাতদন্ত হবেনা?

না রে।পুলিশ নাকি তার মৃত্যুর কারণ জানতে পেরেছে।এখন লাশ নিয়ে দাফন করা হবে।

মিনু দৌড়ে মর্গের ঘরে গেল।পুলিশ আর ডাক্তার ভীড় করে আছে দরজা।অচেনা মেয়েটিকে নিয়ে মিনুর বেশ আগ্রহ।

ভীড় সরিয়ে মিনু ভিতরে গেল।বডিটা ওভাবেই পরে আছে।দুজন বয় বডিটাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মিনু ধ্যান দিয়ে তাকিয়ে আছে।বডির সাথে সাথে মিনুও যাচ্ছে। এম্বুলেন্স এ তোলা হল বডি।বডির সাথে যিনি আছেন,হয়তো তার আপনজন কেউ।খুব অস্বাভাবিক ভাবে তার মুখে বিদ্রুপের হাসি।গাড়িতে ওঠার সময় পুলিশের পকেটে টাকা গুঁজে দিল।মিনুর বুঝতে বাকি নেই কিছু ভুল আছে এখানে।

গাড়ি ছেড়ে দিল।এরই মাঝে ভিতর থাকে একটা হার কাচ এর গায়ে বার বার ধাক্কা দিচ্ছে আর যেন বলছে,মিনু আমার বাচ্চাকে দুনিয়ায় আনতে দেও, মিনু পেটে খুব ব্যথা।আমার বাচ্চাটা মরে যাবে।

গাড়িটা তীব্র গতীতে চলে গেল।মিনুর কানে ওই একই সূর বাজতে থাকলো।এক আক্ষেপভরা সূর।যে সূর এক নিমিষেই বুক কে দুমড়ে মুছরে দিতে পারে।

উপমাকে অনেকদিন পর খুশি দেখছে শিহাব। শিহাবের মাথায় চিন্তার ভাঁজ।উপমাকে একা রাখা কি উচিৎ হবে?মায়া মোটেও সুবিধার কেউ না।

উপমা শিহাবের বুকের উপর মাথা রেখে মলীন গলায় বললো,শিহাব তুমি কি মায়াকে দেখে খুশি নও?

শিহাব তার কথার উত্তর না দিয়েই প্রশ্ন করলো,উপমা তোমার বান্ধবী কি করে তোমার ঠিকানা জানলো?বেপারটা রহস্যজনক না?

উপমা হেসে শিহাবের চোখের চশমা সরিয়ে বিছানার পাশে রেখে বললো,
ডাক্তারি রেখে গোয়েন্দাগিরী করতে পারতে!

শিহাব কঠিন স্বরে ধমক দিয়ে বললো,হেয়ালি রাখো।

উপমা: আমি বাজারে গিয়েছিলাম,তখন আমি দেখি ও রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। আমায় দেখে চিনে নিল।আমার একটু অসুবিধা হলেও পরিচয় দিতে আমি চিনে নিয়েছি।তুমি জানো ও বেশ ভালো ছাত্রী ছিল।আমি ধারে কাছেও ছিলাম না।অনাহারের সংসারে মেধাবী মেয়েটার আজ এই হাল।আমি চাই ওর একটু উপকার করতে।

শিহাব: মৃত মানুষ কে কবর দেয়া ছাড়া আর কি উপকার করা যায়?

উপমা: তুমি আবার হাস্যকর কথা বলছো।ঘুমাও তো।

এরই মাঝে দরজার ওপাশে বিকৃত ছায়া দেখে শিহাবের চোখ ওদিকে চলে যায়

ওখানে কিছু একটা আছে উপমা।দেখতে দেও আমায় এই বলে উঠতে নিলেই উপমা শিহাবের হাত শক্ত করে ধরে বলে,এত আগ্রহ নিয়ে এসব না খুঁজে একবার আমার বাচ্চা না আসার কারণ টা তো খুঁজতে পারতে ডাক্তার মশাই?

উপমার মলীন মুখ টা দেখে শিহাবের খুব মায়া হল।সে জানে উপমা কখনই মা হতে পারবেনা।কারণ টা উপমা নিজেই।কিন্তু শিহাব কখনই তা সাহস করে বলতে পারেনা।উপমার জন্য তার ভালোবাসার চেয়েও যে খুব মায়া কাজ করে…
উপমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই মেয়েটা চট করে ঘুমিয়ে যায়। শিহাব সেই টেকনিক জানে।বিয়ের ন বছরে জানা টা পসিবল।প্রেম করেই তাদের বিয়ে।বিয়ের আগেও ৪বছরের পরিচয় তাদের।এক মানুষ কে চিনতে কি যুগ লাগে!

উপমা ঘুমিয়ে গেছে।ঘুমন্ত মেয়ের মুখে ইদানীং আক্ষেপ এর ছাঁপ ভেসে উঠে। যা শিহাব বেশ বুঝতে পারে ইদানীং। উপমার দিকে তাকিয়ে টপ টপ করে পানি ফেলছে শিহাব।মেয়েটার সব কিছু থেকেও কেন যেন কিছুই নেই।তার উপর মায়া নামের যে বন্ধু তার একাকীত্বর সাথী হবে বলে ভাবছে সে আসলেই কি ওর জন্য উপকারী! তাড়িয়ে দিলেও কি ওকে ছেরে যাবে!আমার কি করা উচিৎ?আমি কি জেনে বুঝে তোমায় বিপদে ফেলে দিচ্ছি?আমার কারনেই কি মায়া ক্ষিপ্ত!আমার কাছেই কেন ওই লাশ এলো! এখন কেন আমার বাসাতেই!এর উত্তর জানতে হবেই

বাইরে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হল আবার।জানালার পর্দা পত পত করে উড়ছে।হুট খুব কাছ থেকেই ভেসে আসছে সেই পরিচিত কন্ঠ, আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা….

চলবে…

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে