অভিমান হাজারো পর্বঃ১২

0
704

অভিমান হাজারো পর্বঃ১২
আফসানা মিমি

—“কি এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
—“তো কি চোখ বন্ধ করে রাখবো?”
—“এভাবে তাকাবা না। আমার অস্বস্তি হয়।”
—“সেটা আপনার সমস্যা, আমার না।”
—“এতো সাহস কই থেকে পাচ্ছো মেয়ে? ভুলে গেছো কি বলেছিলে আমাকে! আমি কিন্তু ভুলিনি।”
—“আপনি কি করবেন না করবেন তাতে আমার কি! হয় মনে রাখেন নয় ভুলে যান। এজ য়্যুর খায়েশ।”
—“এতো ঘাড় ত্যাড়া মেয়ে আমি আমার লাইফে দেখিনি।”
—“দেখেননি তো এখন দেখে নেন। জানি তো আপনি নিজে ঘোমটা মেলে আমাকে দেখবেন না। তাই তো আপনার সামনে ঘোমটা মেলে বসে আছি আপনি দেখবেন বলে। দেখে বলেন তো কেমন লাগছে?”
—“জঘন্য লাগছে।”
—“আপনার চোখের দৃষ্টি আমি পড়তে পারি। দেখেছিলাম তো কেমন হা করে তাকিয়ে আমাকে গিলছিলেন। জঘন্য লাগলেই যদি এভাবে দেখেন তাহলে সুন্দর লাগলে কিভাবে দেখতেন ভাবছি।”
—“গিলছিলাম মানে? ছিঃ কথার কি শ্রী! মুখের ভাষা ঠিক করো মেয়ে।”
—“আমি এমনই। এমন দেখেই বিয়ে করেছেন আমাকে। চেঞ্জ হবার কোন ওয়ে নেই।”

অয়ন আর কিছু না বলে ব্যালকনিতে চলে গেল। কি চটাংচটাং কথা বলছে মুখের ওপর! একেই বলে চুরি চুরি তার ওপর আবার সিনা চুরি। একে তো অন্যায় করেছে তার ওপর আবার মুখে মুখে তর্ক! কি বেয়াদব মেয়েরে বাবা! একে নিয়ে সংসার করবে কি করে! ভেবেছিল শিক্ষা নেবে এই মেয়ের। কিন্তু হচ্ছে তো তার উল্টোটা। কই সে আফরার ক্লাস নিবে! না! উল্টো আফরাই তার ক্লাস নিচ্ছে। বিয়ের প্রথমদিনেই এমন তাহলে বাকি দিন কি করবে! ভাবতেই ঘাম বের হয়ে যাচ্ছে অয়নের।

আফরা বুঝতে পারছিল অয়ন তার ওপর রেগে আছে। রাগটা যাতে আরো বেড়ে না যায় তাই একটু সাহস দেখিয়েই ফেললো। নয়তো পেয়ে বসবে তাকে। আঙুলের ইশারায় তাকে নাচাবে। যা সে মানতে পারবে না। নমনীয় হয়ে থাকলে অয়নের সাথে সহজ হতে পারবে না। উল্টো তাকে ইগনোর করবে। যা সে চাচ্ছে না। সে চাচ্ছে তাদের সম্পর্কটা আর দশটা সম্পর্কের মতোই চালিয়ে নিতে। বিয়ে তো জীবনে একবারই হয় তাই না! তাই অয়ন যেমনই হোক ওর সাথেই বাকি জীবন সংসার করে যাবে। ভাগ্যে থাকলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাথে থাকতে পারবে। আর কপাল খারাপ হলে তো কোন কথা-ই নেই। তাই অয়নকে দিবে না তার সাথে রোবটিক আচার আচরণ করতে। যাতে গম্ভীর হয়ে না থেকে স্বাভাবিক থাকে সেই চেষ্টাই করতে হবে।

—“কি হলো ভাইয়া? এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ঘুমাবেন না?”

হঠাৎ আফরার কথা শুনে ঈষৎ চমকে উঠলো অয়ন। সাথে অবাকও হলো কিছুটা। আফরা তাকে ‘ভাইয়া’ ডাকছে! সে ভুল শুনছে না তো! কনফার্ম হওয়ার জন্য পিছনে ঘুরে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো

—“এই মেয়ে কি বললে তুমি?”
—“বলছিলাম যে ঘুমাবেন না?”
—“না না তার আগে কি যেন বলেছো!”
—“ওহ আবারো শুনতে চাচ্ছেন ‘ভাইয়া’ ডাকটা? আমি তো জানতাম না আপনার কাছে এতো ভালো লাগবে এই ‘ভাইয়া’ ডাক।”
—“জাস্ট শাট আপ! স্বামী আমি তোমার। আজকে তিন কবুল পড়ে, রেজিস্ট্রি খাতায় সিগনেচার করে বিয়ে করেছি তোমাকে। তোমার মুখে ‘ভাইয়া’ ডাক শুনার জন্য বিয়ে করেছি?”

আফরা আঙুল উঁচিয়ে বললো
—“য়্যু শাট আপ! আপনি তিন কবুল পড়ে, রেজিস্ট্রি খাতায় সাইন করে আমাকে বিয়ে করেছেন। আর আমি তো বানের জলে ভেসে এসেছি। আমি তো তিন কবুল না পড়ে, সাইন না করেই আপনার বাসায় সুরসুর করে চলে এসেছি একা একা তাই না?”

অয়ন বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো আফরার এমন কথায়। কোনমতে বললো
—“আমি কি তা একবারও বলেছি?”
—“বলেননি কিন্তু আপনার কথার মাঝে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যেন আমি একা একাই চলে এসেছি বিয়ে না করে।”
—“এতো বেশি বুঝো কেন মেয়ে?”
—“এই যে এই যে আবারো! আমার কি নাম নেই? এই মেয়ে এই মেয়ে সম্বোধন কথা বলছেন কেন? ভাইয়া ডাকলে কেমন লাগে আপনার?”
—“অসহ্য! কিসের সাথে নিয়ে কি মিলাচ্ছো! মেয়ে বলে ডেকে কথা বলতে সমস্যা কোথায়?”
—“আপনার সমস্যা না থাকতে পারে কিন্তু আমার আছে। আপনি আমাকে ‘বউ’ ডেকে ডেকে কথা বলবেন। নয়তো আমি আপনাকে সবার সামনে ‘ভাইয়া’ ডাকবো।”

অয়ন ফের বিস্মিত হলো। এ মেয়ে তো দেখি সেই চিজ! অথচ উপর থেকে বুঝা-ই যায় না ভিতরে ভিতরে এতো তেজ। দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানে না। এখন তো দেখি পুরো মাছটা কাঁচাই গিলে খেতে পারবে।
—“তুমি পাগল হয়েছো? সবার সামনে আমি তোমাকে বউ ডাকবো! অসম্ভব!” অয়ন বললো কিছুটা তেজের সহিত। সাথে হালকা বিরক্তি মিশিয়ে।

—“সকল অসম্ভবকে সম্ভব করবেন এখন থেকে।”
—“জীবনেও না। মরে গেলেও না।”
—“সেটা কালকেই দেখা যাবে। আপাতত ঘুমাতে আসেন এখন। বহুত প্যানপ্যানানি করেছেন। এখন একটু শান্তিতে ঘুমাতে দেন।”
—“আমি কি তোমাকে ধরে রেখেছি? ঘুমাও না গিয়ে, যাও না!”
—“ওমা আমি কি আপনাকে ছাড়া ঘুমাবো নাকি?”
—“লজ্জা নাই তোমার? সেদিন এমন একটা কথা বলে আমাকে ধর্ষকদের কাতারে ফেলে এখন এমন লজ্জাহীন কথাবার্তা বলছো! কিছুটা হলেও তো লজ্জা থাকা উচিৎ। তোমার লজ্জা কি সব ধুয়ে খেয়ে ফেলছো?”
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


আফরার হঠাৎ করেই কেমন কান্না পেয়ে গেল অয়নের কথায়। সে কি খারাপ কিছু করছিল! দুজনের ভালোর কথা ভেবেই তো এমনটা করছিল। কারণ তাদের দুজনের সাথে তাদের দুই পরিবারও জড়িত আছে। আফরা আচমকা এক কাণ্ড করে বসলো। অয়নের কাছে গিয়ে টলমল চোখে তার চোখের গভীরে কিছুকাল তাকিয়ে থেকে এক হাত গলায় পেঁচিয়ে আরেক হাত দিয়ে চুল আঁকড়ে ধরে অয়নের অধরোষ্ঠে গভীরতম একটা চুম্বন প্রদান করে চলে আসতে নিল। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে অয়নের দিকে তাকিয়ে বললো
—“আপনার কাছে আমি লজ্জাহীনা উপাধী নিয়েই থাকতে চাই আমৃত্যুকাল। এতে আমার কিছু যায় আসে না। এতোদিন লজ্জা শরম ধুয়ে খাইনি কিন্তু আজ থেকে তার সূচনা করলাম। এখন থেকে ঠিক এভাবেই প্রতিনিয়ত লজ্জা শরম সব ধুয়ে ধুয়ে খাব।” বলেই আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে থেকে গটগট করে রুমের ভিতর চলে গেল।

অয়ন পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো অনড়ভাবে। আফরার শেষ কথাগুলো তার কর্ণগোচর হলো বলে মনে হয় না। সে আটকে আছে একটু আগের আফরার করা কাণ্ডে। সে ভাবতেও পারেনি আফরা এমন একটা কাজ করে বসবে।

কালকের ঝুট ঝামেলায় আর সবাইকে বলার সুযোগ পায়নি যে অদিতি কন্সিভ করেছে। আজকের নাস্তা শেষে বলার পর পরিবারের সকল সদস্যদের মুখে খুশির আমেজ ফুটে উঠেছে। আদিল গিয়ে পাঁচ কেজি মিষ্টান্ন আনলো সবাইকে মিষ্টিমুখ করানোর জন্য। সে আজ অনেক খুশি। বিয়ের চার বছরের মাথায় এই খুশির খবরটা শুনে অদিতিকে নিয়ে পুরো বাড়ি চক্কর দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সবার সামনে তা একপ্রকার অসম্ভব।

অতশী মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি খেতে পারে না। মিষ্টির মধ্যে সে কালোজাম পছন্দ করে কিছুটা। সাদাটা একেবারেই খেতে পারে না। স্পন্দন ওর সামনে এসে একটা সাদা মিষ্টি মুখে তুলে ধরলো। অতশী একবার তাকিয়ে মাথা নেড়ে সেখান থেকে অন্যদিকে চলে গেল। কিভাবে অতশীর সাথে স্বাভাবিক হবে সেই উপায় মাথায় আসছে না তার। হঠাৎ করেই একটু দূরে খেয়াল করে অতশী শ্বাশুড়ীর হাত থেকে একটু কালোজাম চামচ দিয়ে কেটে মুখে নিয়েছে। কেন জানি এতে স্পন্দন একটু কষ্টই পেল ওর হাত থেকে মিষ্টি না খাওয়ায়।

আরমান সাহেব বাজারে গেছেন। আদিল গেছে শ্বশুরবাড়িতে খুশির খবরটা জানাতে। লাবণ্য বাসায় নেই। ইয়াসমিন বেগম, হুসনে আরা খাতুন, অদিতি আর স্পন্দন বসে আছে ড্রয়িংরুমের সোফায়। অতশী গিয়ে সবার জন্য চা করে আনলো। সাথে হালকা স্ন্যাকস। এসেই অতশী আর অদিতি কি নিয়ে যেন ফিসফিস করে কি যেন বলাবলি করছে। স্পন্দন বসে মোবাইল চাপছে। ইয়াসমিন বেগম আর হুসনে আরা খাতুন তাদের বাড়ির ব্যাপারে কথা বলছে।

হুসনে আরা খাতুন চা খেতে খেতে একবার অদিতির দিকে তাকিয়ে তারপর অতশীর দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
—“বড় বউ তো বিয়ার চাইর বছর পরে বাচ্চা নিতাসে। তা তুমি খুশির খবর কবে শুনাইবা ছুডু বউ?”

স্পন্দন চা’য়ে চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ মামীর এমন কথা শুনে খুব বাজেভাবে বিষম খেলো। কাশতে কাশতে তার শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। অতশী চকিতে একবার মামী শ্বাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে পরে স্পন্দনের দিকে তাকালো। দেখলো স্পন্দনের চোখ লাল হয়ে গেছে কাশতে কাশতে। ইয়াসমিন বেগম উঠে গিয়ে মাথায় এবং পিঠে হালকা চাপড় মেরে বললেন
—“কিরে এমনভাবে বিষম খেলি কেন?”

উনারও বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল ভাবী সরাসরি এসব কথা তুলায়। এটা ওদের দুইজনের ব্যাপার। বড়দের এতে নাক না গলানোই উচিৎ।

স্পন্দন কিছুটা স্থির হয়ে এলে মামী আবারো জিজ্ঞাসা করলেন
—“কি হইলো ছুডু বউ কথা কও না ক্যা? নাকি বাচ্চাকাচ্চা নেওনের ইচ্ছা নাই! কি যুগ আইলো রে! আইজকালকার মাইয়াগুলান খালি ড্যাঙড্যাঙিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেই জানে। সংসারি করবার জানে না। সংসারে এদের মনই নাই। ক্যামনে ফেসেন(ফ্যাশন) করতে পারবো অইডাই জানে। লাগে জানি পেটের থিকা-ই এগুলা শিখা আইসে।”

অতশীর ভিতরে কান্নারা আস্তে আস্তে দলা পাকাচ্ছে। কখন না জানি বাইরে বেরিয়ে যায়! তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাই যেখানে স্বাভাবিক না সেখানে বাচ্চা নেওয়ার কথা আসছে কেন? কে না চায় মা হতে! মাতৃত্বের স্বাধ কোন মেয়েটা ভোগ করতে না চায়! এর চেয়ে সুখকর অনুভূতি কি অন্যকোথাও পাওয়া যায়! যায় না তো।

স্পন্দন একবার অতশীর দিকে তাকিয়ে দেখে মাথা নিচু করে বসে আছে বিষণ্ণ মুখে। আর যাই হোক অতশী কষ্ট পায় এমন কাজ সে করবে না। না কারো দ্বারা অতশীকে কষ্ট পেতে দিবে। চা টা শেষ করে মামীর দিকে ঘুরে তারপর শীতল কণ্ঠে বললো
—“আমাদের বিয়ে হয়েছে একমাসও হয়নি। আপনি কিসের ভিত্তিতে ওকে এখনই বেবি নেওয়ার কথা বলছেন? আমরা কখন বেবি নিব না নিব তা কি আপনার কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করে ফ্যামিলি প্ল্যানিং করবো?”

স্পন্দনের এমন কথাতে অতশী লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। ইয়াসমিন বেগমের মাঝে অস্বস্তিরা দানা বাঁধছে। কেমন যেন হাসফাঁস লাগছে। উনার ভাবীর মুখে কোন লাগাম নেই। কোথায় কি বলতে হবে সেই বোধটা বোধহয় আল্লাহ্ উনাকে দেননি। নয়তো সন্তানসম কাউকে এভাবে সরাসরি এসব বলতে পারে! হুসনে আরা খাতুন স্পন্দনের থেকে এমন উত্তর আশা করেননি। তিনি ভেবেছিলেন স্পন্দন গোবেচারা টাইপের ছেলে। কিন্তু এমন চটাংচটাং করে যে পাল্টা উত্তর দিয়ে দিবে সেটা উনি ভাবতেও পারেননি। বিস্ময়ে হা হয়ে রইলো কয়েকটা মুহূর্ত। অতঃপর নিজেকে সামলে আবারো বললেন

—“তোর ভালার লাগিই তো কইলাম। এহনকার দিনে মাইয়ারা বিয়ার পরে বাচ্চা নিতেই চায় না সহজে। পরে বয়স বাইড়া গেলে অনেকের বাচ্চা হয় না। এর লাগিই কইতাছিলাম যত তাড়াতাড়ি বাচ্চা নেওয়া যায়। আরে বংশে প্রদীপ জ্বালানোর মতো কেউ না থাকলে ভিটামাটি মরুভূমির মতো হইয়া যায়।”

—“ওকে কি আপনি বাচ্চা তৈরির মেশিন পাইছেন যে আপনি বলার সাথে সাথেই বাচ্চা জন্ম দিবে! আমাদের বাচ্চার দরকার নাই। ওর যদি কখনো বাচ্চা না-ও হয় আমার কোন সমস্যা নাই তাতে। কারণ ওকে আমি বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য বিয়ে করিনি। আমি নিজে ভালো থাকার জন্য বিয়ে করেছি ওকে। আমার ভালো থাকার কারণ ও, আমার সুখের কারণ ও, আমার মুখের হাসির কারণ ও, আমার সকল দুঃখের সঙ্গী ও। সো ওর বাচ্চা না হলেও কোন সমস্যা নাই আমার। আমার শুধু ওকে চাই। আর এতে করে কে কি ভাবলো আই ডোন্ট কেয়ার। পরোয়া করি না কাউকে। লোকের ভাবায় আমার কিছু যাবে আসবে না। আর বংশে প্রদীপ কে জ্বালাবে তা বলছিলেন তো! ভাইয়ার বেবি আসছে না! সেই হবে আমাদের বংশের প্রদীপ। কথা কি ক্লিয়ার! বুঝাতে পারছি আমি সবাইকে?”

হুসনে আরা খাতুন যেন দমবার পাত্রী নন। আবারো বললেন
—“আরে ভাইয়ের পুলা মাইয়াই এক আরে নিজের পুলা মাইয়াই আরেক। ওরটা কি তর হইবো?”
—“এতোই দরকার পড়লে বাচ্চা দত্তক নিব। এ ব্যাপারে আর একটা কথাও শুনতে চাচ্ছি না আমি। অতশী চলো।

অতশীর হাত ধরে টেনে রুমে নিয়ে যাওয়ার সময় স্পন্দন শুনতে পেল তার মামী আবারো বলছেন
—“এসব ছোটলোকের মাইয়া বড় ঘরে পা ফেলার পরই যেন দেমাগ বাইড়া যায়। জামাইরে হাতের মইধ্যে নিয়া নেয় বিয়ার কয়েকদিনের মাথায়ই। যেই মা জন্ম দেয় সেই মা’রেই চিনে না। কই না কই থেকে একটারে ধইরা বিয়া কইরা আনছে! ঐ মাইয়ার লাগি আমারে কতগুলান কথা কইয়া গেল। আমিও দেইখ্যা নিমু এ মাইয়া এ সংসারে কতদিন টিক্কা থাকবার পারে।”

বেশ ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বলে শেষ করলেন হুসনে আরা খাতুন। উনার ইচ্ছা ছিল উনার ছোট মেয়েকে স্পন্দনের সাথে বিয়ে দিবে। এমন সুদর্শন আর টাকাওয়ালা ছেলে কি আর আজকাল পাওয়া যায়! হাতের নাগালে স্পন্দন ছিল বিধায় এতোদিন নিশ্চিন্তে ছিলেন উনি। কিন্তু কয়েকদিন আগেই শুনে বিয়ের মণ্ডপ থেকে নাকি এক মেয়েকে জোর করে বিয়ে করে নিয়ে আসে। এতেই উনার বাড়া ভাতে ছাই পড়েছে যেন। এতোদিন পর এ বাড়িতে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল এ ছোটলোকের মেয়েটাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে স্পন্দনের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দেওয়া। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি পড়ায় আত্মসম্মানে লেগেছে উনার।

শেষ কথাটা শুনে স্পন্দন সিঁড়ির প্রথম ধাপে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঘুরে দাঁড়িয়ে হুসনে আরা খাতুনের উদ্দেশ্যে বললো

—“তার আগে আপনার নিজে থাকার ব্যবস্থা করুন। ভাববেন না এখনও সম্মান দিয়ে কথা বলছি বলে পরেও এমন সম্মান দিয়ে কথা বলবো। মেহমান হয়ে বেড়াতে এসেছেন। বেড়ান, খান, ঘুরেন, ফিরেন কিন্তু আমাদের পরিবারের কারো ব্যাপারে নাক গলাবেন না। আমি কাকে নিয়ে সংসার করবো না করবো সেটা নিশ্চয়ই আপনার কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করে করবো না! আর মা তোমার ভাইয়ের একমাত্র বউকে বলে দিও আমাদের কারো ব্যাপারে যেন নাক না গলায়। আমার পরিবারের সদস্যদের ওপর বাইরের মানুষের মাতব্বরি আমি বরদাশত করবো না। বলে দিও যেন উনি যেন উনার মতোই থাকেন। আর আমাদেরকে আমাদের মতো করে থাকতে দেয়। আর এখানে উনার থাকতে সমস্যা হলে উনি চলে যেতে পারেন। কেউ হাতে পায়ে ধরে আটকে রাখবে না উনাকে।” বলেই স্পন্দন অতশীর হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। আর এদিকে হুসনে আরা খাতুন ক্রোধের অনলে জ্বলতে লাগলেন। অন্যদিকে অদিতি তাদের চোখের আড়ালে মুচকি হাসছে। বিচার হয়েছে একদম এই খাটাশ মহিলার। মুখের ওপর উচিৎ জবাব দিয়েছে স্পন্দন। যার কারণে মুখে তালা পড়ে গেছে একেবারে।

চলবে……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here