অদৃশ্য বাসর পর্ব ১

0
646

অদৃশ্য বাসর পর্ব ১

আবু জিয়াদ

একটু আগেই নানী শাশুড়ী রুমে দিয়ে গেছেন। বিষয়টি বেশ লজ্জার। রাত বাড়ার সাথে সাথে এক এক করে আত্মীয় স্বজন সবাই চলে গেলে মায়াবিনী একা হয়ে পড়ে। শাশুড়ীর ঘরের খাটের কিনারায় বসে অনেক কিছু ভাবছিলো মায়াবিনী আর নিজে নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠছিল। অবশেষে এমন অবস্থা থেকে নানী শাশুড়ীই উদ্ধার করলেন। শাশুড়ীর রুম থেকে মায়াবিনীকে নিয়ে আসলেন যে রুমে তাদের বাসর হবে সেই রুমে।

: ভারি কাপড় ছেড়ে সুতি শাড়ি পড়ে শুইবি। নানী বললেন। আর কোনো সমস্যা হলে পাশের রুমেই আছি , ডাক দিবি। মাস্টার যে কই গেলো এখনও আসছে না। দেখি কল দিয়ে। তুই অপেক্ষা কর।

নানী একাই বলে গেলেন। মায়াবিনীর মুখে রাজ্যের লাজ। কোন কথা বের হচ্ছে না।

লোকটা একটু বেশিই পাগল। দিনের বেলায় বিয়ে বাড়ির ভিড়ের মাঝেও বারবার চেষ্টা করেছে মায়াবিনীর কাছে আসার। ছুতু খুঁজেছে। সবার চোখ এড়াতে পারলেও মায়াবিনী আর নানীর চোখ এড়াতে পারেনি। নানী বারবার ধমক দিয়েছেন। আর বলেছেন “রাতে খড়ম খুঁজতে আসবি। এখন না। তোর বউ কেউ নিয়ে যাচ্ছে না। পাগল কোথাকার !

এরপরও লোকটি একবার সুযোগ পেয়ে মায়াবিনীকে পাশের রুমে টেনে নিয়ে গেছে। মায়াবিনীর সে কি লাজ ! মুখ নিচু করে রেখেছে। তবু দুই হাতে মুখ উঁচু করে ধরে কপালে একটি ,, নাহ লোকটি আসলেও বেশরম।

বাসর ঘরের খাটের একপাশে মায়াবিনী বসে বসে ভাবছে , লোকটা কি অসভ্য !বিয়ে বাড়ির এতো ব্যস্ততার মাঝে কেউ এমন করে ? এখনও মায়াবিনীর গালে লোকটার হাতের পরশ আর কপালে আদ্র-উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছে। অথচ এপর্যন্ত সে কয়েক বার ওয়াশ রুমে যেয়ে ধুয়ে মুছে এসেছে তারপরেও স্মৃতির পরশ যেনো কপালে রয়েই গেছে।

লোকটা এখনও আসছে না কেন ? রাত বাড়ছে। সুন্দর করে সাজানো বাসর ঘর মায়াবিনীকে কেবল মুগ্ধই করে চলেছে। তাজা ফুলের সুবাস , খাটের সাইড টেবিলে সাজিয়ে রাখা দুধ ,মধু , ফল-ফলাদি আর মিষ্টি সহ কত কি ! সব যেনো স্বপ্ন। এতদিন মনের আয়নায় অতিসঙ্গোপনে সে যে স্বপ্ন দেখে এসেছে আজ যেনো সব এক সাথে ধরা দিচ্ছে। এভাবে ধরা দেয়া মোটেও ঠিক না। তাহলে স্বপ্নের স্বাদ আস্বাদন করার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। রেখে যায় কেবল সুখ স্মৃতির বেদনা মধুর আফসোস।

রাত বেড়ে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে। মায়াবিনীর কাছে এখন আর কিছু ভালো লাগছেনা। এক গাঁদা ভারি অলংকারে আপাদমস্তক মোড়ানো।
শাড়িও বেশ অস্বস্তিকর। অনেক মোটা আর বাহারী কাজে বেশ ভারি ।গায়ে রাখাই দায়। তাহলে কি সে এসব খুলে সাজ ছেড়ে হাল্কা শাড়ি পড়ে স্বাভাবিক হয়ে যাবে ? বেচারা কি ভাববে ? সে খুব শৌখিন আর রুচিশীল মানুষ। নিজ চোখে দেখে তৃপ্ত হয়ে নিজ হাতে খুলে দিলেই তো বেশ হয়। আচ্ছা এখনও সে কেনো আসছে না ? সন্ধার দিকেই মায়াবিনী কার কাছে যেনো শুনেছে সে বাইক নিয়ে ময়মনসিংহ শহরে গিয়েছে। নতুন বইক। মায়াবিনীর বাবা শখ করে বিয়ের উপহার হিসাবে আজই পাঠিয়েছেন। চালক হিসাবে বেচারা নতুন। ভাবতে ভাবতে এখন মায়াবিনীর কিছুটা ভয়ও করছে।

খুঁট করে দরজা খোলার শব্দে মায়াবিনী নড়ে চড়ে বসলো। বেচারার হাতে রেপিংযে মোড়ানো কিছু একটা। পুরা দস্তুর দুলহা সেজে রুমে প্রবেশ করেছে সে। গায়ে শেরওয়ানি , মাথায় পাগড়ী , পায়ে নাগড়া ,কি অসাধারণ !

কিন্তু এভাবে সেজে কি কেউ এতো রাতে বাসর ঘরে প্রবেশ করে ? কি অদ্ভুত পাগল একটা !

মায়াবিনী লজ্জায় তাকাতে পারছে না। যে লোকটাকে সে এতোদিন বুকের অলিন্দে লালন করে এসেছে , দূর থেকে লুকিয়ে দেখে দুধের স্বাদ গুলে মিটিয়েছে তাকে কাছে পেয়েও তার দিকে আজ তাকাতে পারছে না কেনো ? বেশি ভালোবাসলে বুজি এমনই হয় ? তার মানে ভালবাসা সব সময় লজ্জার আবরণে ঢাকা থাকে ?

লোকটা ঘরে প্রবেশ করেই পাগলামী শুরু করে দেয় । কি অসভ্য ! কোনো কথা নাই বার্তা নাই সরাসরি সেই দুপুর বেলার মত দুহাতে মুখ উঁচু করে ধরে কপালে ঠোঁটের স্পর্শ।

কিন্তু এবারের স্পর্শ মায়াবিনীর কাছে কেমন জানি লাগছে। সন্দেহজনক। অনুভূতিটা ঠিক দুপুরের মত না। হাতে ধুলা বালি মাখানো, ভেজা । মনে হচ্ছে কাঁদায় চুবানো। ঠোঁটও ময়লাযুক্ত আর বরফ শীতল। মায়াবিনী হঠাৎ করে মাথা তুলে ভালোবাসার মানুষটার দিকে তাকালো। কিন্তু কি আশ্চর্য ! লোকটার মাথায় বাঁধা পাগড়ী রক্তে রঞ্জিত। টপটপ করে রক্ত ঝরছে। চোখ দুটি থেতলানো। আঘাতে মুখের আবস্থা কি বিচ্ছিরি। উপরের পাটির দাঁত ভেঙ্গে নাক সহ উপড়ে গেছে। ভয়ে ভয়ঙ্কর শব্দে চিৎকার করে উঠে মায়াবিনী। এরপরে আর তার কিছু মনে নেই। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

আবু জিয়াদ

১ম পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here