নষ্ট গলি পর্ব-৩৭

0
2500

নষ্ট গলি পর্ব-৩৭

লেখা-মিম

দীর্ঘ পয়ত্রিশ মিনিট যাবৎ গলা ফাটিয়ে চেচাচ্ছে ইমন। বারবার একটা কথাই বলছে,

– যা চাও সব দিবো। আমাকে এখান থেকে বের করো।

মাঝে দুইবার এসে ইমনের হাল দেখে গেছে স্বপন। এই ডোজে অবস্থা নাজেহাল হয়েছে নাকি আরও ডোজ বাড়াতে হবে সেটাই দেখে গেলো। হাল দেখে যা বুঝা গেলো যেকোনো মূহুর্তে জ্ঞান হারাবে৷ একটা মানুষ ইঁদুরকে এতটা ভয় পায় ইমনকে না দেখলে বোধহয় স্বপন কখনো টেরই পেতো না৷ ইমনের হাল দেখে মনে হচ্ছে ভিডিও ক্লিপের কথা জিজ্ঞেস করলে এখনই বলে দিবে। তবুও একটাবার সোহানের অনুমতি নেয়াটা জরুরী মনে করছে স্বপন। এখনই ভিডিওর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে কি না জানার জন্য ফোন করলো সোহানকে।

সমুদ্রের পাড়ে মায়ার হাত ধরে খালি পায়ে হাঁটছে সোহান। বাচ্চাদের মতো কিছুক্ষন পরপরই সমুদ্রের দিকে দৌঁড়ে যাচ্ছে মায়া। পানিতে নেমে লাফালাফি করে আবার দৌঁড়ে এসে সোহানের হাত ধরে হাঁটছে। শরীরের অর্ধেক ভিজে গেছে মায়ার। অন্য কোনো সময় হলে এভাবে ভিজা কাপড়ে সোহান কখনোই ঘুরতে দিতো না ওকে। কিন্তু আজ বাঁধ সাধছে না। ওকে ওর মতো করে উপভোগ করতে দিচ্ছে।

পকেটে থাকা ফোনটা বাজছে সোহানের। ফোন বের করে দেখলো স্বপন কল করেছে।

– হ্যাঁ স্বপন, খবর কি?
– ভাই, ইঁদুরকে একটা মানুষ এত ভয় পায়?
– সে পায়।
– বলছে তো যা চাই দিয়ে দিবে। ভিডিওর কথা জিজ্ঞেস করবো?
– এখনই না। আরো ভয় দেখাও৷ ভয়ের জন্য যাতে মাথা থেকে অন্য সব কিছু বেরিয়ে যায়। তাহলেই ভিডিও কোথায় কোথায় আছে স্বীকার করবে। আর নয়তো এক দুই কপি নিজের কাছে রেখে বাকিগুলোর কথা বলবে।
– আচ্ছা ভাই।
– স্টোর রুমের উল্টোদিকে যে রুমটা আছে সেটাতে ঢুকো। বড় একটা স্যুটকেস দেখতে পাবে। ওটার ভিতর অনেক কিছু আছে৷ চাইলে সেখান থেকে কিছু কাজে লাগাতে পারো।
– জ্বি ভাই।

পানিতে নেমে লাফাচ্ছে মায়া। সোহানের কথা কিছুই শুনেনি সে৷ ইমনের ব্যাপারে আরেকটু জানতে পারলে ভালো ছিলো। মায়াকে এই মূহূর্ত্বে জিজ্ঞেস করাটা কি উচিত হবে? ইমনের কথা জিজ্ঞেস করলেই তো মনটা খারাপ করে ফেলবে। না জিজ্ঞেস করলেও হচ্ছে না। দুইদিনের বেশি এখানে ইমনকে আটকে রাখা যাবে না। যা করার দুদিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। মায়া এসে সোহানের হাত জড়িয়ে ধরে হাঁটতে লাগলো। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মায়াকে জিজ্ঞেস করেই ফেললো সোহান।

– মায়া…..
– হুউউম…
– মন খুব ভালো?
– অন্নেএএএক।
– একটা কথা জানার ছিলো।
– জিজ্ঞেস করে ফেলুন।
– ইমন আর কি ভয় পায়?

সোহানের প্রশ্নে থমকে দাঁড়ালো মায়া। মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেলো মূহুর্তে। সোহানের দিকে বেশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

– এই মানুষটাকে স্মরণ করা কি খুব জরুরী?
– হ্যাঁ জরুরী। তাই তো জিজ্ঞেস করছি।
– আপনি কি আমার সাথে ভালো সময় কাটাতে এসেছেন নাকি আমার অতীত নিয়ে টানাটানি করতে এসেছেন?
– এটা কেমন প্রশ্ন মায়া? কখনো দেখেছো প্রয়োজন ছাড়া তোমার অতীত নিয়ে ঘাটাতে?
– ঘাটাননি। তবে এই মূহুর্তে কেনো? অন্য কোনো সময়ও তো জানতে চাইতে পারতেন?

সোহানের হাতটা ছেড়ে নিজের মতো হেঁটে চলছে মায়া। পিছন পিছন আসছে সোহান। মায়া রাগ করেছে। মায়াকে ইমনের ব্যাপারে কিছু জানাতে চাচ্ছে না সোহান। পুরো ব্যাপারটা মায়ার কাছ থেকে চেপে যাবে। কয়েক মিনিট এভাবেই হেঁটে চলছিলো ওরা দুজন। কিছুক্ষণ পর মায়া এসে মুখ গোমড়া করে সোহানের হাত জড়িয়ে ধরলো।

– ঐ লোকটা উপর থেকে নিচে তাকাতে ভয় পায়। লোকটার নাকি মাথা ঘুরে। বমি হয়।
– তুমি জানো কিভাবে?
– একবার এক হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলো। নয়তলায় একটা রুম বুক করেছিলো। রুমে যেয়ে দেখি একপাশের জানালার পর্দা খোলা। আমাকে বললো জলদি পর্দাগুলো আটকে দিতে। আমি যখন পর্দা আটকাচ্ছিলাম তখন আমাকে বলেছিলো উনি নাকি খুব বেশি উপর থেকে নিচে তাকাতে পারে না। বুক ধরফর করে। দম বন্ধ হয়ে আসে। মাথা ঘুরায়। বমি হয়।
– রাগ হয়েছো খুব?
– হ্যাঁ।
– আসো আদর করে দেই।
– লাগবে না।
– সত্যি লাগবে না?

খিলখিল করে হেসে উঠলো মায়া। সোহানের হাত ছেড়ে ফের দৌঁড়ে চলে গেলো সমুদ্রের পানিতে পা ভেজাতে।

রতনের রুমে ফ্লোরে পড়ে থাকা স্যুটকেসটা খুললো স্বপন। অনেক কিছুই আছে এটাতে। স্ক্রু ড্রাইভার, ড্রিল মেশিন আরো অনেক কিছু। কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে ড্রিল মেশিনটা হাতে নিলো। এটা নিয়ে এখন ইমনের রুমে যাবে সে। এখানে সঙ্গে করে আরো পাঁচজনকে এনেছে স্বপন। বাসার ড্রইংরুমে তারা টিভি দেখছে। সেখান থেকে বাশার কে ডেকে নিয়ে এসে স্টোর রুমে গেলো। দরজা খুলে ইমনের মুখোমুখি দাঁড়ালো স্বপন আর বাশার। ইঁদুরগুলো তখনও ছুটাছুটি করছে। বাশারের হাতে একটা মোটা লাঠি। এটা দিয়ে ইঁদুরগুলোকে রুম থেকে সরাচ্ছে সে।

প্রচন্ড রকমে হাঁপাচ্ছে ইমন। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেনো শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ।

– ভাই, একগ্লাস পানি হবে?
– বাশার, এই শালারে ফুটা করমু কই? বুকে নাকি মাথায়?
– ফুটা করবেন মানে? এই,,,,, এই আপনারা ড্রিল মেশিন কেনো এনেছেন?
-তোরে ফুঁটা কইরা ঝাঁঝরা বানামু।
– ভাই মুখটা ভালো কইরা ডিজাইন কইরেন। যাতে লাশ কেও চিনতে না পারে।

বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করেছে ইমন।

– ভাই, আমি কি করেছি ভাই?
– তুই ভিডিও করছোস।
– আমি কিচ্ছু করিনি ভাই। আমাকে যেতে দিন।
– দিমু তো। তোরে আগে ছিদ্র করি। এরপর।
– বিশ্বাস করেন ভাই। আমি কিচ্ছু করিনি। আমাকে এভাবে মারবেন না প্লিজ।
– মায়ার ভিডিও করোস নাই?

কান্না থামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো ইমন। মায়া,,,,,, হ্যাঁ মায়ার ভিডিও ক্লিপ আছে ওর কাছে। তার মানে এরা মায়ার লোক। না না, মায়া না। বোধহয় মায়ার হাজবেন্ডের লোক। তার বউয়ের পিছু নেয়ার অপরাধে লোক পাঠিয়েছে ওকে খুন করার জন্য।

– ভাই, ভিডিও ক্লিপ আমি দিয়ে দিবো। আমাকে ছেড়ে দিন।
– তোরে দিয়া ভরসা নাই। নিজের কাছে এক দুই কপি রাইখা বাকি কপি আমারে দিবি। এরপর আবার ঐ ভিডিও নিয়া তামশা করবি৷ দুইদিন পরপর বায়োস্কোপ দেখার টাইম নাই। এরচেয়ে ভালো তোরেই শেষ কইরা দেই। ঐ বাশার মেশিন চালু কর। আগে কপালের মাঝখান বরাবর দিবি।

প্রচন্ড শব্দ করতে থাকা ড্রিল মেশিনটা ইমনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইমনের মনে হচ্ছে যেনো এই মেশিন কপালে ঠেকার আগেই ওর দম আটকে মরে যাবে। চিৎকার করে বলছে আমি সব ক্লিপ দিয়ে দিবো৷ আমাকে মেরো না। ড্রিল মেশিনের আওয়াজে সেই চিৎকারের আওয়াজ চাপা পড়ে যাচ্ছে।

– শালার পোলা, করছোস কি?

ড্রিল মেশিন বন্ধ করে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে ইমনকে প্রশ্ন করলো বাশার।

– কি রে? সমস্যা কি?
– ভাই, শালায় মুতছে।
ফ্লোরে তাকালো স্বপন। গলা ফাটিয়ে হো হো করে হাসছে সে৷

– কি রে ব্যাটা? কি করলি তুই? মরনরে এতো ভয় পাস। আকাম করার সময় হুঁশ থাকে না?
– ধুর,,,,, এইডা কিছু হইলো? এগুলা পরিষ্কার করবো কে এখন?
– ঐ টুনু,,,,,,, টুনুউউ,,,,

স্বপনের আওয়াজ পেয়ে ড্রইংরুম থেকে ছুটে এলো টুনু।

– কি ভাই?
– রান্নাঘরে গিয়া দেখতো ত্যানা ট্যানা কিছু আছে কিনা?
– খাঁড়ান। দেখি।

চেয়ারে মাথা ফেলে চোখ বন্ধ করে রেখেছে ইমন। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। স্বপন আর বাশারের হাসি কোনোভাবেই থামছে না৷ পাগলের মতো হেসেই যাচ্ছে ওরা। রান্নাঘর থেকে ফ্লোর মুছার কাপড় নিয়ে এলো টুনু। কাপড় হাতে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,

– কি করুম এটা দিয়া?
– ফ্লোরটা মোছ।
– পানি ফালাইলো কে?
– পানি না ব্যাটা। শরবত।
– লেবুর শরবত?
– নাহ, লবনের।।

ফ্লোর মোছার জন্য নিচে বসতেই মৃদু বাজে গন্ধ নাকে এসে ঠেকলো টুনুর। ফ্লোরে পড়ে থাকা পানির দিকে নাক খানিকটা এগিয়ে নিলো ভালোভাবে বুঝার জন্য গন্ধটা কিসের। সাথে সাথেই মাথা ঝাড়া দিয়ে সেখান থেকে সরে এলো টুনু।

– ঐ মিয়া, এটাতো মুত। আমারে শরবত কইলেন ক্যা?

(চলবে)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে