খেলাঘর/পর্ব-৩৮

খেলাঘর/পর্ব-৩৮
লেখা- সুলতানা ইতি

মিথিলা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো এমন কেনো হচ্ছে আমার সাথে কোন দিক থেকে কোন ভালো খবর পাই না, কি যে হয়েছে
মিথিলা আস্তে আস্তে উঠে জিমির রুমে গেলো
জিমি মিথিলা কে দেখেই হাউ মাউ করে কান্না শুরু করলো

মিথিলা কিছুক্ষন চুপ করে বোন কে জড়িয়ে ধরে রাখলো
– আপু শান্ত হও আর কি হয়েছে আমায় বল

জিমি- আমি আর ওর সংসারে ফিরে যাবো না, তোর কাছে আমায় রাখবি না

মিথিলা- কি হয়েছে পুরো টা বল আমায়

জিমি বলতে শুরু করলো, ওর মাথায় এখন বিদেশে যাওয়ার ভূত ছেপেছে, আমাকে বলতেছে আমার বাবার বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে দিতে
আমি বললাম বাবা নেই মা নেই মিথিলা কতো কষ্ট কররে আয়ান আর নির্ঝর কে পড়া শুনা করাচ্ছে,আমি ওদের বড় বোন হয়ে কোন সাহায্য করতে পারছি না আমি কোন মুখে গিয়ে টাকা চাইবো,
এই কথা বলাতে ও আমার গায়ে হাত তুলে আর বলে বাবার বাড়ি টা বিক্রি করে হলেও টাকা নিতে, আমি জানি তোর এই বাড়ি টা ছাড়া আর কোন সম্বল নেই,এখন তুই বল বাড়ি টা কি করে বিক্রি করি

মিথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে জিমির দিকে বুঝার চেষ্টা করছে আপু বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে দুলাভাইকে সাপোর্ট দিচ্ছে কি না,ওরা বাড়ি বিক্রির কথা ভাবলো কি করে? মিথিলা শান্ত কন্ঠে বল্লো
– তুই কি চাস

জিমি- তুই যা বলবি

মিথিলা চোখ বন্ধ করে বসে আছে ভাবছে আপু একজন হলে অবলীলায় থাকতে পারে কিন্তু স্বামির বাড়ি ছেড়ে একে একে সবাই বাবার বাড়ি এসে পড়লে লোকে কি বলবে এই সব প্রভাব আয়ান আর নির্ঝরিণীর জীবনে পড়বে, আর আপু কে আনলে মেহের নিগার মা হারা হয়ে যাবে, মেহের নিগার কে সহ আনলে অনেক ঝামেলা একটা মেয়ে কে পিতৃ পরিচয় ছাড়া বড় করা অনেক কঠিন কি করা যায় এখন

মিথিলা আয়ান নির্ঝরিণী কে ডাকলো
ওরা এসে মিথিলার সামনে বসলো

মিথিলা- তোরা তো সব শুনেছিস, কি করা যায় বলতো

আয়ান- বাড়িটা বন্ধক রেখে দুলা ভাইকে টাকা দিয়ে দে

মিথিলা- তা না হয় দিলাম,কিনতু পরে বাড়ির বন্ধক ছাড়াবি কি করে,

আয়ান- হয়ে যাবে কোন ব্যাবস্থা

আয়ানের কথা মিথিলার পছন্দ হয়নি
মিথিলা নির্ঝরিণী কে বলো
তোর কি ইচ্ছে নির্ঝর

নির্ঝরী সাথে সাথে কঠোর কন্ঠে বল্লো
– ঐ বেটা কে অনেক ছাড় দেয়া হয়েছে আরর না একটা টাকা ও দেয়া যাবে না ঐ লোক টাকে ঐ সালা সোহাগ কি আমাদের ব্যাংক পেয়েছে নাকি বাবার রাখা শেষ স্মৃতি বন্ধক রাখবো? নো য়ে

মিথিলা- তুই কি করতে চাস তা হলে

নির্ঝরিণী – আপু লোক টা কে একটা ধোলাই দিতে হবে, কেউ কখনো ওকে কিছু বলেনি তো তাই মাথায় ছেপে বসেছে

মিথিলা- ওকে ধোলাই দিতে যা যা লাগবে তা আমাদের নেই

নির্ঝরিণী – নেই মানে,আমি ফোন করে লোক টা কে আচ্ছা করে ঝেড়ে দিবো,দেখ তার পর কি হয়

জিমি- না এমন করিস না পরে যদি ও আর ও রেগে যায়

নির্ঝরিণী – তুই চুপ থাক আপু,এই সব পুরুষ দের টাইট দিয়ে রাখতে হয়,তুই সেটা কখনো ও করিস নি তো তাই লোক টা অনেক বেড়ে গেছে,

মিথিলা নির্ঝরিণীর কথা শুনে মনে মনে আশ্বস্ত হলো,
– তা হলে ফোন টা করেই ফেল নির্ঝর

নির্ঝরিণী ফোন করলো সোহাগ পাটওয়ারির কাছে মেহের নিগারের বাবা জিমির হাজবেন্ড

কল হচ্ছে, হচ্ছে কয়েক বার কল দেয়ার পর রিসিভ হলো
নির্ঝরিণী – ঐ ঘুমাচ্ছিলেন নাকি,শান্তির ঘুম দিচ্ছেন বউ বাচ্ছাকে বাবার বাড় পাঠিয়ে

সোহাগ- কে বলছেন

নির্ঝরিণী – ঐ বেটা আমাকে ছিনিস না এখন, আপনাকে তো দুলাভাই বলতে ঘেন্না লাগে ছিঃ

সোহাগ – ও নির্ঝরিণী, এতো রেগে আছিস কেনো

নির্ঝরিণী – আপনি জানেন না আমাদের অবস্থা, তা হলে আপনি কেনো আপু কে আমাদের বাড়ি পাঠিয়েছেন টাকার জন্য

সোহাগ- আসলে আমার টাকার খুব দরকার মেয়ে একটা আছে দেশে থেকে কিছু তো করতে পারছি না, তাই

নির্ঝরিণী -ঐ মিয়া টাকা কি জমা করে গেছেন নাকি আমাদের বাড়িতে,নাকি এখানে টাকার গাছ আছে, বিয়ে করেছেন যৌতুক নিয়ে,তার পর ও অনেক বার টাকা দেয়া হয়েছে আপনাকে,সেগুলা কি করেছেন আগে হিসেব দিন, তার পর আপনাকে টাকা দেয়া যায় কি না ভাববো

সোহাগ রেগে গিয়ে বল্লো
এই মেয়ে মুখ সামলিয়ে কথা বলো,বড়দের সাথে কি ভাবে কথা বলতে হয় জানিস না,ওহ জানবি কি করে মা বাবা নেই তো শিক্ষা দেয়ার জন্য,মেঝো টা একটা বেয়াদব তোদের কে বেয়াদব ই বানাইছে

নির্ঝরিণী – এই ছ্যারা মুখ সামলে কথা বল,আমাদের ভালো শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব তো আপনাদের উপরে ও আছে,তা হলে আপনারা কি একবার খোজ নিয়েছেন আমাদের? নেন নি তো, উলটো যখন তখন টাকার জন্য,পাঠান অসুস্থ শ্বাশুরির গলা থেকে হার খুলে বিক্রি করতে বিবেকে বাধেনি, আবার বলছেন বেয়াদব হয়েছি আপনার মতো লোকদের শিক্ষা দেয়ার জন্য আমাদের মতো বেয়াদব দের জন্ম নেয়া দরকার, কই যাকে আপনি বেয়াদব বলেছেন আমার মেঝো বোন সে তো আপনার সাথে এভাবে কথা বলতে রাজি হয়নি, বরং টাকা টা দিতে ছেয়ে ছিলো,কিন্তু আমি দিতে দিই নি,আর দিবো না, এর শেষ আমি দেখে ছাড়বো

সোহাগ- এই মেয়ে কি করবি তুই

নির্ঝরিণী – কি করবো,সোজা বাসা থেকে বের তিন কিলোমিটার দূরে একটা পুলিশ স্টেশন আছে সেখানে যাবো আপনার নামে এফ আই আর লিখবো নারী নির্যাতন মামলা করবো, চৌদ্দ শিকের মধ্যে পছিয়ে মারবো আপনাকে,এবার বুঝেছেন কি করতে পারি আমি

সোহাগ- এতো বড় বড় কথা ছাড়ছিস,বাস্তবে কিছুই পারবি না,টাকা আছে তোদের ফকিরের মুখে বড় কথা

নির্ঝরিণী – ওকে চ্যালেঞ্জ রইলো,সময় তিন ঘন্টা,এর মধ্যে চৌদ্দ শিকের মাঝে যদি সাক্ষাত না হয় আমাদের তা হলে আপনি যা ছাইছেন তা ই দেয়া হবে আপনাকে,মনে রাখবেন শরির শেষ রক্ত বৃন্দু দিয়ে হলে আমি জিতবো,আর হা জানেন ই তো আমরা ফকির তা হলে ফকিরের থেকে টাকা চাইতে লজ্জা করে না,আপনি তো আমাদের থেকে ও বড় ফকির

এবার সোহাগ একটু শান্ত গলায় বল্লো
– স্বামি স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হয় তাই বলে কয়জন স্বামির ঘর ছেড়ে চলে যায়

নির্ঝরিণী – আপনি আমার আপুকে টর্চার করেছেন, তাই আপু আসতে বাধ্য হয়েছে

সোহাগ- আমি তোমার আপু কে বাবার বাড়ি যেতে বলিনি রাগের মাথায় পুরুষ রা কতো কথাই বলে সেগুলা সব ধরতে নেই

নির্ঝরিণী – ওকে ফাইন ধরলাম না,আপু কে পাঠাচ্ছি যদি আপু আবার ফিরত আসে তা হলে আমি যাবো ফেরত আপনার বাড়ি আপুকে বলবো আপনাকে খুন করতে,আর দায়ভার নিবো নিজের ঘাড়ে

এবার নির্ঝরিণীর কাছে থেকে মিথিলা ফোন কেড়ে নিয়ে বল্লো
– ভাইয়া আপনি ওর কথায় কিছু মনে করবেন না,আসলে একটা কথা ঠান্ডা মাথায় ভাবা উচিত আপনার একটা মেয়ে আছে
আপনাদের এখন যদি দুজনের পথ আলাদা হয়ে যায় মেয়েটার কি হবে তা হলে

সোহাগ – ঠিক বলেছিস তুই,আসলে মাথা গরম হয়ে গেছিলো তাই,পাঠিয়ে দে তোর আপু কে
আমি রাখছি,

মিথিলা- না থাক আপু কে পাঠাবো না আপনি আসুন,অনেক দিন শ্বশুর বাড়ি আসেন নি,এসে বেড়িয়ে যান আপুকে নিয়ে যান

সোহাগ- না আমি আসবো না জিমি কে পাঠিয়ে দাও

মিথিলা- আসেন না ভাইয়া আমাদের তো বড় ভাই নেই মুরুব্বী বলতে কেউ নেই,আপনি তো সব আসলে খুশি হবো

সোহাগ- ঠিক আছে আসছি

মিথিলা কল অফ করে দিলো একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো

তার পর জিমির দিকে তাকিয়ে বল্লো আপি তোকে একটা কথা বলি হুম
স্বামি স্ত্রীর মাঝে অনেক কিছু ই হয় সব কথা বাবার বাড়ির লোকদের জানাতে নেই কিছু কথা নিজের মাঝে রেখে মানিয়ে নিতে হয়

জিমি- তা হলে তুই স্বামির সংসার ছেড়ে বাবার বাড়িতে কেনো

বোনের কথা শুনে মিথিলা চুপ হয়ে গেলো কি বলবে বোন তো আর জানে না আমি কিসের মধ্যে ছিলাম,যার স্বামি তাকে সহ্য করতে পারে না তার কিছু করার থাকে না

মিথিলা চুপ থাকতে দেখে নির্ঝরিণী বল্লো
জিমিপু মেঝো আপু সাথে নিজেকে মিলিওনা সবার জীবনের গতি এক ভাবে চলে না আপু শ্বশুর বাড়ি থেকে এসে কারো উপরে বোঝা হয়নি বরং আমরা তার উপরে বোঝা হয়েছি

মিথিলা- থাক নির্ঝর এভাবে বলিস না,,
জিমি আর কিছু বল্লো না

সেদিন সোহাগ এসে দু দিন থেকে বউ বাচ্ছা কে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলো

আজ নির্ঝরিণী খুব তাড়াহুড়ো তে আছে আয়াপের সাথে একটা শো আছে তার,মিথিলা কে কলেজের কথা বলে বেরিয়ে গেলো

শো শেষে আয়াপ বল্লো
– নির্ঝু চলো তোমায় আজ একটা জায়গায় নিয়ে যাবো

নির্ঝরিণী – কোথায় যাবো,জায়গা টার নাম বলা যায় না

আয়াপ- তুমি আমায় বিশ্বাস করছো না তাই তো

নির্ঝরিণী – ব্যাপার টা সে রকম না,আমি একটা মেয়ে মানুষ আমার সে জায়গা যাওয়া সেইফ হবে কি না সেটা দেখতে হবে

আয়াপ- আমি কি তোমাকে উলটা পালটা কোন জায়গায় নিতে পারি

নির্ঝরিণী আয়াপের কথার সাথে না ফেরে বল্লো
– ঠিক আছে চলুন

আয়াপ একটা হোটেলের সামনে গাড়ি থামালো

নির্ঝরিণী – হোটেলে কেনো

আয়াপ- এখন তো এসেই গেছি চলো যেতে যেতে বলি
নির্ঝরিণী গাড়ি থেকে নেমে হাটা ধরলো
আয়াপ নির্ঝরিণীর পাশে পাশে হাটছে
– এখানে একটা রুম বুক করেছি

নির্ঝরিণী হাটা থামিয়ে বল্লো রুম কেনো
আয়াপ- আমরা তো বিয়ে করবো ই তার আগে একটু….

আয়াপের কথা শেষ করতে পারলো নির্ঝরিণী ঠাসস করে আয়াপের গালে থাপ্পড় দেয়
– এই ছিলো তোর মনে ছিঃ আপু ঠিক ই বলতো তোর মতো লোক ভালো হয়না বড় লোকের বখে যাওয়া ছেলে,আমি আপুর কথা বিশ্বাস করিনি এখন দেখছি…

আয়াপ মিথিলার কথার মাঝে বল্লো
– নির্ঝু তুমি আমায় ভুল বুঝছো আমার কথা টা তো আগে শুনো

নির্ঝরিণী – কিচ্ছু শুনতে চাই না আমি ভাগ্যিস আগেই তোকে ছিনতে ফেরেছি,
নির্ঝরিণী আর এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে দৌড়ে রাস্তা এসে একটা টেক্সি ডেকে উঠে পড়ে,
আয়াপ থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেষ পর্যন্ত নির্ঝরিণী আমায় ভুল বুঝলো

সারা পথে নির্ঝরিণী কান্না করেছে,বাসায় এসে দেখে কেউ নেই আয়ান কলেজে আপু অফিসে একা বাসা পেয়ে নির্ঝরিণী চিৎকার করে কাদতে লাগলো,ছেলেরা এমন কেনো,কেনো তাদের বিশ্বাস করে ঠকতে হয়

চলবে
ভুল ক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন

Comments are closed.