হৃদমাঝারে পর্ব-১১+১২

0
1048

#হৃদমাঝারে
#নাঈমা_জান্নাত
পর্ব-১১+১২

গৌধূলী বিকেল। চারদিকে সূর্যের আলোর প্রকোপ কমেই এসেছে। অস্তিয়মান সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে শুভ্রতা। কারণ,এই সময়টা তার কাছে একটু বেশীই সুন্দর। কিন্ত আজ সেদিকে তাকিয়েও ভালো লাগছে না। তার ভালো লাগা যে মেঘেতে আটকে গেছে। বারংবার একটা মুহুর্তের কথা মনে পড়ছে।
দুপুরবেলা মেঘ আসবে না ভেবে শুভ্রতা বারান্দায় বসে পড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলো। খালি পেটে কি আর পড়া হয়! শুভ্রতা তাও মনযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মাঝেই চিরচেনা গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে উঠে। শুভ্রতা রুমে উঁকি দেয়। সে’কি ভূল দেখছে? উঁহু মেঘই তো! কিন্ত কয়টা বাজে এই টাইমে কি করে এলো! লাঞ্চটাইম তো শেষ! নিশ্চয়ই ভূত! কিন্ত ঢাকা শহরের এই ইট পাথরের দেয়ালেও ভূত আসতে পারে?
‘আমার দিকে ওভাবে তাকানো কিছু হয় নি। আমার হাতে আধঘণ্টা টাইম আছে। জলদি ওঠ। আর খালি পেটে পড়তে বসার মানে কি? তুমি জানো না খালি পেটে পড়তে বসলে ক্ষিধের জন্য পড়ায় মন বসে না। আর ক্ষিধে পেলে যদি না খাও পাকস্থালী পেটের মধ্যে চুষে নেয়। যার জন্য আলসার হয়!’ একদমে মেঘ কথাগুলো বলে শেষ করলো। শুভ্রতা অদ্ভুত চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ভাষ্যমতে এই লোকটা কর্পোরেট ওর্য়াল্ডে না ডুকে লেকচারার হতে পারতো।
‘কি হলো কানে কথা যাচ্ছে না?’ মেঘের ধমকে শুভ্রতা হুড়মুড়িয়ে রুমে ডুকে যায়। ইতিমধ্যে মেঘ একপ্লেট বিরিয়ানি নিয়ে এসেছে। শুভ্রতাকে আসতে দেখে বলে,,’খাটে বস!’ শুভ্রতা ভদ্র মেয়ের মতো চুপচাপ বসে পড়ে। মেঘও সামনে বসে এক লোকমা বিরিয়ানি শুভ্রতার মুখের সামনে ধরে। শুভ্রতা তা দেখে গোল গোল চোখে মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ তা দেখে চোখের ইশারায় খেতে বলে। শুভ্রতা হা করে মুখে নেয়। মেঘের আঙ্গুল শুভ্রতার ঠোঁটে লাগতেই শুভ্রতা খানিক চমকালো। মেঘ আরেক লোকমা দিতে গেলে শুভ্রতা বাধা দিয়ে বলে,,’আপনি খাবেন না? খেয়ে এসেছেন?’
মেঘ শুভ্রতার মুখে আরেক লোকমা দিয়ে বলে,,’আগে তুমি খাও। আমি পরে খাচ্ছি!’ শুভ্রতা তা শুনে তড়িঘড়ি করে বলে,,’না আপনিও খান। একসাথেই খাই!’ মেঘ তা শুনে দেরী করে না নিজেও খাওয়া শুরে করে,শুভ্রতাকেও খাইয়ে দেয়। শুভ্রতা খাওয়ার মাঝেই মেঘের দিকে তাকিয়ে রয়। গায়ের সাথে সাদা শার্টটা ঘামে কেমন লেপ্টে আছে। চোখে মুখে পানি দিয়েছে কিন্ত মুছে নি,যার জন্য পানি গুলো কেমন চিকচিক করছে। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। শুভ্রতার ইচ্ছে করছে আলতো’ভাবে ছুঁইয়ে দিতে,কিন্ত মেঘ যদি কিছু মনে করে। থাক অন্য কোনো সময়। নিজের মনকে নিজেই বুঝিয়ে নিলো। খাওয়া শেষ শুভ্রতার মুখ মুছিয়ে উঠে দাঁড়াল মেঘ। শুভ্রতাও পেছন পেছন উঠে দাঁড়াল। হয়তো ভাবছে মেঘ যদি বিরিয়ানির ব্যাপারে কিছু বলে। কিন্ত সেগুড়ে বালি!
‘আমি আসছি এখন। সাবধানে থেকো তুমি। আর তুমি যখন মেসেজ দিয়েছিলে তখন মিটিং এ ছিলাম। আমার কাছে এক্সট্রা চাবি ছিলো যার জন্য নিজেই রুমে ডুকে গেছি। ওকে আল্লাহ হাফেজ!’ কথাগুলো বলে মেঘ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। শুভ্রতাও মেঘের পেছন পেছন যায়। দরজা পর্যন্ত এলে মেঘ পেছন ফিরে শুভ্রতার কাছে যায়। অতঃপর শুভ্রতার কপালে নিজের ওষ্ঠদ্বয় ছুঁইয়ে বলে,,’বিরিয়ানিটা খুব ভালো ছিলো।’ মেঘের কথায় শুভ্রতার ওষ্ঠদ্বয়ে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। মাগরিবের আযানে শুভ্রতার ভাবনার ছেদ ঘটে।
_______________
সারারুমে শুভ্রতা পায়চারী করছে আর নখ কামড়াচ্ছে। অতি টেনশনে শুভ্রতা এটাই করে। খাটে বসে একবার ল্যাপটপ আবার শুভ্রতার দিকে তাকাচ্ছে মেঘ। শুভ্রতার নখ খাওয়ার বিষয়টা নিয়ে বেজায় বিরক্ত সে। মেয়েটা কি জানে না এটা শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর! মেঘ আর চুপ করে থাকতে না পেরে বলে,,’শুভ্র! কি করছো তুমি? নখ কামড়াচ্ছো কেনো? তুমি জানো না নখে কতো ময়লা,জীবাণু থাকে। এতে তোমার পেটে সমস্যা হতে পারে!’
‘উফফ থামুন তো আপনি। টেনশানে আমার মাথা কাজ করছে না। আপনি আছেন আপনার জ্ঞান নিয়ে। আপনি দেখুন রেজাল্ট আউট হয়েছে কিনা। না জানি ফেইল করি কিনা। আল্লাহ। ইয়া মাবুদ সাহায্য করো। ফেইল যেনো না করি!’
আজ শুভ্রতার এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিব। এর মাঝে কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। শুভ্রতা আর মেঘের সম্পর্ক আগের মতো থাকলেও নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া অনেকটা হয়ে গেছে। খানিকটা সহজও হয়েছে।
‘এই নাও তুমি রুহির সাথে কথা বলো। ফোনের ব্যালেন্স শেষ করো তাও প্লিজ নখ কামড়িও না!’ শুভ্রতা মেঘের হাত থেকে ফোন নিয়ে রুহিকে কল দেয়। ওপাশ থেকে রুহির কন্ঠ ভেসে আছে,,’কিরে শুভ্রা রেজাল্ট কি?’
‘আরে রাখ তোর রেজাল্ট। এখনও পাই নাই। আমার কি মনে হয় আমি না ফেইল করছি,তাই রেজাল্ট পাচ্ছি না। এই রুহিপু কি হবে রে?’

‘আরে রাখ তোর ঢং। প্রতি এক্সামে তুই এমন করিস। পরে তো রেজাল্ট ভালো হয়। তুই হলি আমগো বংশের ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট!’ রুহির কথার মাঝেই মেঘ বলে,,’রেজাল্ট আউট হয়েছে!’ শুভ্রতা ছুটে গিয়ে মেঘের পাশে বসে। মেঘের টি-শার্টের অংশ টেনে টেনে বলে,,’তাড়াতাড়ি দেখুন না। আমার টেনশান হচ্ছে। পরে যদি হার্ট-অ্যাটাকে মরে যাই,তাহলে আপনি বিধব হবেন!’
মেঘ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে বলে,,’বিধব কি?’
‘বিধবার মেইল ভার্সন জানি না, তাই বিধব দিয়ে কাজ চালিয়ে দিচ্ছি। আপনি এসব বাদ দিয়ে রেজাল্ট দেখেন!’
মেঘ ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে রোল,রেজিস্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে রেজাল্ট দেখে। তারপর শুভ্রতার দিকে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে দেয়। শুভ্রতা ভয় পেয়ে মেঘের দিকে তাকায়। তারপর নিজে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে A+ এসেছে। শুভ্রতা খুশি মনে মেঘের দিকে তাকায় কিন্ত মেঘ চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে শুভ্রতার দিকে। ‘আপনি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? রেজল্ট তো ভালোই হইছে!’
শুভ্রতার কথায় মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,’সেটা আমিও দেখছি। কিন্ত এতোক্ষণ আমার মাথা খেলে কেনো তুমি? তোমার পরীক্ষা ভালো হয়েছিলো তুমি জানতা না? শুধু শুধু সুস্থ মানুষকে পাগল করা ছাড়া তোমার কাজ নেই না?’ মেঘের ধমকে শুভ্রতা ন্যাকা কেঁদে বলে,,
‘আমার টেনশন হয়েছিলো সেই জন্যই তো। আপনি এমন করছেন কেনো? আর আমার রেজাল্ট ভালো হয়েছে কোথায় বাহবা দিবেন তা না বকা-বকি করছেন!’
শুভ্রতার কথায় মেঘ খাট থেকে নেমে কিচেনের দিকে যায়। ফিরে আসে এক প্লেট মিষ্টি নিয়ে। শুভ্রতা তা দেখে বলে,,’মিষ্টি কেনো আনলেন? আর কখন আনলেন?’
সেটা তোমার জানার দরকার নেই। তুমি এখন এগুলো খাবা। দেন পড়তে বসবা। এখন মাত্র এগারোটা বাজে। আজ সকাল থেকে পড়ো নেই। আজ যেহেতু শুক্রবার তাই বারোটায় উঠে যাবা। তারপর গোসল করতে যাবা। এখন আর আমায় ডিস্টার্ব করবা না। আমার অফিসের কাজ আছে!’ কথাগুলো বলে মেঘ প্লেটটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে শুভ্রতাকে টপকে আরেকপাশে ল্যাপটপ নিয়ে বসে যায়। শুভ্রতা তা দেখে ভেংচি কেটে মনে মনে বলে,,’কোথায় বউ ভালো রেজাল্ট করেছে,একটু ভালো ভালো কথা বলবে তা না। আজকেও পড়তে বসো। উফফ আল্লাহ রে এই কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম।’ নিজে নিজে মেঘকে বকে মিষ্টি খেতে লাগলো।
__________________
প্রায় অনেকগুলো মাস পরে নিজের চেনা পরিচিত মুখ দেখে চমকে উঠে শুভ্রতা। কোচিং শেষে পাশের মার্কেটে গিয়েছিলো শুভ্রতা। মেঘের জন্য একটা গিফট কিনবে। গিফট বলতে ঘড়ি কিনার জন্য। সেখানেই নিজের চির চেনা পরিচিত মুখের দেখা ফেলো। এই তার দেড়’মাসের নামের স্বামী আর দু’বছরের প্রেমিক! শুভ্রতা মেঘের ঘড়ি কেনা রেখে তাড়াতাড়ি করে মার্কেট থেকে বাসায় চলে এলো। বাসায় এসে কোনোমতে ব্যাগটা ফেলে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইলো। নিজেকে শান্ত করার তীব্র প্রচেষ্টা চালালো। তবে কি আবারও তার সুখে কালো ছায়া পড়তে চলেছে? মেঘের সাথে বেড়ে উঠা সুন্দর সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে? শুভ্রতা আর কিছুই ভাবতে পারলো না। নিজের চুল খামছে ফুঁপিয়ে উঠে।

#চলবে?

#হৃদমাঝারে
#নাঈমা_জান্নাত
(১২)

আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ছড়াছড়ি! যেকোনো সময় আকাশের বুক ছিঁড়ে বৃষ্টি নামবে। বলতে বলতেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়ে গেছে। বারান্দায় অগোছালো ভাবে বসে আছে শুভ্রতা। রান্না বান্না কিছু করে নি। নিজেও কিছু খায় নি। একমনে নিজের জীবনের হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। অতীতের পাতা উল্টিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই ফেলো না। বাতাসের ঝাপটার সাথে সাথে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে শুভ্রতাকে। কিন্ত সেদিকে মেয়েটার কোনো ধ্যানই নেই। সে অন্য ভাবনায় মত্ত। এলোমেলো ভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। কলিংবেলের আওয়াজও তার ধ্যান ভাঙ্গাতে সক্ষম হয় নি। বারংবার বেল বেজে যাচ্ছে। কিন্ত সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
‘শুভ্র! শুভ্র! কই তুমি?’ রুমে ডুকতে ডুকতে শুভ্রতাকে চিল্লিয়ে ডাকছে মেঘ। এদিক ওদিক খুঁজেও মেয়েটাকে না পেয়ে বারান্দায় উঁকি দেয়। বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বলে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছে। শুভ্রতাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মেঘ। অতঃপর শান্ত কন্ঠে শুভ্রতাকে ডাক দেয়।
‘এখানে এভাবে বসে আছো যে? কতোবার বেল বাজালাম ডাকলাম,শুনলে না যে? আর এভাবে বসে আছো কেনো? ভিজে যাচ্ছো তো। ওঠো!’
মেঘের এতো কথায় শুভ্রতার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে একমনে সামনে তাকিয়ে আছে। মেঘ হাটু গেড়ে শুভ্রতার পাশে বসে। তারপর শুভ্রতার কাঁধে স্পর্শ করে বলে,,’কি হয়েছে শুভ্র?’
মেঘের কথায় শুভ্রতা মেঘের দিকে তাকালো। চোখ দু’টো টকটকে লাল হয়ে আছে। বৃষ্টির জন্য কিনা ঠিক বুঝলো না মেঘ। কিন্ত কিছু একটা যে হয়েছে সেটা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে মেঘ।
‘কি হয়েছে শুভ্র?’ মেঘ বেশ নরম গলায় প্রশ্ন করে।

‘আপনি আমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারেন নি তাই না? অন্য সবার মতো আপনিও আমায় ছেড়ে চলে যাবেন তাই না? সবার মতো আপনিও আমাকে খারাপ মেয়ে মনে করেন তাই না?’ আকস্মিক শুভ্রতার প্রশ্নে হকচকিয়ে যায় মেঘ।
‘কি বলছো কি শুভ্র? তোমার মাথা ঠিক আছে?’

‘আপনি সত্যি আমাকে মেনে নিতে পারেন নি তাই না?’

‘শুভ্র আর ইউ গোন মেড? কি বলছো তুমি? কি হয়েছে? দেখি ওঠ এখান থেকে তোমার মাথা ঠিক নেই। উঠো না!’ শুভ্রতাকে উঠানোর চেষ্টা করে মেঘ বলে। মেঘ শুভ্রতাকে একপ্রকার টেনেই উঠিয়ে নেয়। শুভ্রতা মেঘের চোখের দিকে এক’দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। মেঘ শুভ্রতার দু’গালে হাত দিয়ে বলে,,’শুভ্র! কি হয়েছে তোমার? আমাকে খুলে বলো! না বললে আমি বুঝবো কি করে?’
‘আপনি আমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মানেন তো?’ শুভ্রতার কথায় মেঘ শুভ্রতাকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বলে,,’তোমার কোনো সন্দেহ আছে?’
‘তবে আমাকে নিজের স্ত্রীর স্বীকৃতি দিন। আমাদের সম্পর্কটা আর পাঁচ’টা স্বামী স্ত্রীর মতো করুন!’ শুভ্রতার কথায় মেঘের হাত আলগা হয়ে আসে। শুভ্রতা তা দেখে মাথা উঁচু করে মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে,,’কি হলো?’
মেঘ দু’টো ঢোক গিলে বলে,,’শুভ্র তুমি নিজের মধ্যে নেই। চলো ভেতরে চলো। ফ্রেশ হবে। খেয়েছো কিছু?’
‘আপনি একদম কথা ঘুরানোর চেষ্টা করবেন না। আমি বুঝে গেছি আপনি আমায় স্ত্রী হিসেবে মানেন না বলেই স্বীকৃতি দিতে চাইছেন না!’
শুভ্রতার কথায় মেঘ কি বলবে বুঝতে পারছে না। কিন্ত আপাদত শুভ্রতাকে শান্ত করা প্রয়োজন। তাই মেঘ শুভ্রতার দু’গালে হাত দিয়ে বলে,,’সব হবে শুভ্র! কিন্ত এখন বাইরে থেকে এসেছি ফ্রেশ হবো তো। তুমিও চেঞ্জ করো নি। ভিজে গেছো তো। চলো আমরা আগে ভেতরে যাই। তারপর না হয়!’
মেঘের কথার বিপরীতে শুভ্রতা আর কিছুই বললো না। চুপচাপ রুমে চলে গেলো। মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেও ভেতরে গেলো।

সময়ের সাথে সাথে বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলেছে। তার সাথে দু’জন মানব মানবীর সম্পর্কটা আরো একধাপ বেড়ে চলেছে। দু’জনে আবদ্ধ হতে চলেছে নতুন সম্পর্কে,এক নতুন অনুভূতিতে।
শুভ্রতার ব্যবহারে মেঘ আজ ভীষণই অদ্ভুত। আজ যেনো সে এক নতুন শুভ্রতাকে আবিষ্কার করছে। শুভ্রতাকে তখন বুঝিয়ে রুমে পাঠালেও শান্ত করতে পারে নি মেঘ। কিন্ত শুভ্রতার অদ্ভুত আচরণেরও কোনো সমাধানে পাওয়া যায় নি।
_________________
সূর্যের তীর্যক রশ্মি নিজের চোখে মুখে পড়তেই ঘুম ভেঙ্গে যায় শুভ্রতার। কারো উষ্ণ ছোঁয়ায় ঘুমটা ভারী হয়ে আসছে। কিন্ত চোখে আলো পড়ায় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। ফিটফিট করে চোখ খুলে খানিকক্ষণ ঝীম ধরে রইলো। কালকের সকল ঘটনা মস্তিষ্কে একবার সাজিয়ে নিলো। তারপর মেঘের মুখের দিকে তাকালো। শুভ্রতাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে আছে। শুভ্রতা মেঘের মুখে হাত বুলিয়ে বলে,,’আই এম সরি মেঘ। কাল যদি আপনাকে জোর না করতাম তাহলে যে আমার ভয় কাটতো না। আমি চাই না আরো একবার বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ভোগ করতে। আমি চাই না আপনাকে হারাতে। কালকের পর হয়তো আপনার আমাকে ছেঁচড়া মনে হয়েছে,কিন্ত কি করবো বলুন। ভেবেছি যদি আপনি আমাকে স্ত্রী অধিকার দিন তবে আমাকে আর ছেড়ে যাবেন না। আমি আর হারাতে পারবো না। বিশ্বাস করুন হারাতে হারাতে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি! কাল ওই মানুষটাকে দেখার পর আবারও আমার বুক কেঁপে উঠেছে। যদি আপনি আমায় অবিশ্বাস করে দূরে ঠেলে দিন আমি তা সহ্য করতে পারবো না!’ নিজে নিজে বিড়বিড় করে কথাগুলো বলছে শুভ্রতা। কাল সে খুব ভয় পেয়ে গেছিলো।

‘তোমাকে যদি ছেড়ে যাওয়ার হতো তবে তোমায় বিয়ে করতাম না। তুমি তো আমাকে সবই বলেছিলে যদি ছেড়ে যাওয়া হতো সেদিনই চলে যেতাম! আমি ভাবি নি এতো দিনে আমার প্রতি তোমার এইরকম একটা বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। আমি হয়তো ব্যর্থ!’ আকস্মিক মেঘের গলায় হকচকিয়ে যায় শুভ্রতা। সে তো কথাগুলো আনমনেই বলে ফেলেছে। ভেবেছিলো মেঘ ঘুমিয়ে আছে। কিন্ত মেঘ যে এভাবে জেগে শুনে ফেলবে তা ভাবতে পারে নি। শুভ্রতা মেঘের দিকে তাকালো। মেঘও শুভ্রতার দিকেই তাকিয়ে ছিলো বলে চোখাচোখি হয়ে গেলো। শুভ্রতা ভাবলো মেঘের কাছে লুকাবে না।
তাই নিজে বলে,,’আসলে কাল আমি ওকে দেখেছিলাম। ভয় পেয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম আপনি আমায় ভূল বুঝবেন,বিশ্বাস করতে চাইবেন না।’
‘তা এখন আপনার ভূল ভেঙ্গেছে ম্যাডাম?’ মেঘ বেশ রসাত্মক স্বরে কথাটা বলে। এতোক্ষণ লজ্জা না লাগলেও শুভ্রতার এখন বেশ লজ্জা লাগছে। মাথা নুইয়ে বলে,,’ফ্রেশ হবো ছাড়ুন!’
‘এতোক্ষণ তো বেশ ভালোই ছিলে এখন এতো তাড়া!’ মেঘের হেয়ালি কথায় শুভ্রতা এবার জোর করে মেঘের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
_____________________
শুনো যেটা দিবে একেবারে শিওর হয়ে দেবে। আন্দাজে মার্ক করবা না। কারণ এখানে ভূল মার্ক করলেও নাম্বার কাটা যায়। যতোটা পারো দিবা। প্রয়োজনে সব দিবা না কিন্ত আন্দাজে কোনো কাজ করবা না। ওকে?’ গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে শুভ্রতাকে এক নাগাড়ে উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে মেঘ। আজ শুভ্রতা এডমিশন টেস্ট।
সকাল থেকেই সে বেশ নার্ভাস। মেঘ শুভ্রতার নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য বিভিন্ন কথা বলছে। মেঘের এবার ঘড়ির দিকে তাকালো। সময় হয়ে আসছে। শুভ্রতাকে সব বুঝিয়ে হলে পাঠিয়ে দিলো। শুভ্রতার জন্য সে বাইরে অপেক্ষা করবে। আজ অফিস থেকে অনেক কষ্টে ছুটি মেনেজ করেছে। তাও হাফ ডে। শুভ্রতার এক্সাম শেষ হলে আবার অফিস যাবে। শুভ্রতা বিদায় নিয়ে হল রুমের দিকে গেলো। বুকটা বেশ কাঁপছে। এতোদিনের তৈরি করা স্বপ্নের শেষ সীড়িটা আজ অতিক্রম করবে। যদি তা অতিক্রম করতে পারে তবে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না। ‘আমি নিশ্চয়ই পারবো। পারতে আমাকে হবেই। মেঘের জন্য,আমার জন্য!’ নিজের মনে কথাগুলো বলে চলে যায় শুভ্রতা।

#চলবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে