#মন_গোপনের_কথা
#পর্ব_১২
লেখনীতে, পুষ্পিতা প্রিমা
ছুটি থাকায় রিকের অফিস ছিল না আজ। রিপ ও তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। টেবিলে দুপুরের খাবার সাজাচ্ছে নীরা আর মুনা। রিক বলল
‘ মুনা মাহিকে ডাক দাও ?
মুনা পানির গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে বলল
‘ ও মাত্রই ফিরেছে। গোসল নিচ্ছে বোধহয়।
‘ তাহলে আর কিছুক্ষণ বসি। সব নিয়ে এসো। তোমরা ও বসে যাও।
মুনা আবার রান্নাঘরে চলে গেল। নীরা দু তিন বার ডাক দিল মাহিদকে। মিনিট কয়েক পরে মাহিদ এল। আজ আব্বা আছে বাসায়। দেরী করে যাওয়া চলবে না। তাড়াহুড়ো করে এসে অপ্রস্তুত হাসলো রিকের সাথে। রিক তার পাশের চেয়ার টেনে দিল। বলল
‘ আসেন খান সাহেব।
মাহিদ টি শার্ট টানতে টানতে এসে চেয়ারে বসলো। নীরা তরকারির বাটি টেবিলে রেখে মাহিদের দিকে তাকালো। বলল
‘ মাথা ভালো করে মুছিসনি কেন?
রিপ চোখ তুলে তাকালো। মাহিদ সাথে সাথে মাথায় হাত দিল। আলাভোলা চোখে একবার মা আরেকবার আব্বার দিকে তাকালো। আমতাআমতা করতে করতে বলল
‘ মুছে,,ছি তো।
নীরা তোয়ালে নিয়ে আসলো। মাথা মুছে দিতে দিতে বলল
‘ চুলগুলো ভালো করে মুছলে কি হয়? এই এক কথা তোকে কত বার বলতে হবে মাহি?
মাহিদ চুপ করে থাকলো। মাথা মুছায় চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। কপালে পড়ে থাকলো। রিক কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিতে দিতে বলল
‘ মাহিদ খান নজরুল সাজার সিদ্ধান্তটা কি এবার পাক্কা?
মাহিদ ভড়কে গেল৷ রিপের দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকালো। রিক হেসে ফেলল। বলল
‘ রিপ তোর ছেলে নজরুল হওয়ার সাধনা
করছে চুল না কেটে। দাঁড়ি ও কাটিস না । রবীন্দ্রনাথ হয়ে যাহ বাপজান।
মাহিদ চোখ দিয়ে ইশারা করলো রিককে চুপ থাকতে। রিক হেসে উঠলো। মুনা আর নীরা এসে বসলো। মুনা মাহিদের প্লেটে খাবার দিতে দিতে বলল
‘ সকালে ছিকুসোনা ফোন করে তোকে খুঁজছিল। তোর ফোন নাকি বন্ধ? তোকে পেলে নাকি কামড়ে দেবে। বেশি দুক্কু পেয়েছে তুই যাসনি তাই।
মাহিদ বলল
‘ ছিকু শালার আর কাজ নাই। শালারে হাতের কাছে পাইলে এমন মার দি,,,,,
রিপের দিকে চোখ পড়তেই ঢোক গিলল মাহিদ। কথা আর বেরোলো না। মুনা, নীরা আর রিক ঠোঁট টিপে চাপা হাসছে বাপ ছেলের কান্ড দেখে। মাথা একেবারে নামিয়ে নিল মাহিদ। চুপচাপ ভাত নাড়তে লাগলো। রিপ বলল
‘ তারপর? শালাকে হাতের কাছে পেলে কি করা হবে?
মাহিদ মাথা আরও নামিয়ে নিল। রিক উচ্চস্বরে হেসে পিঠ চাপড়ালো মাহিদের। রিপকে বলল
‘ আচ্ছা থাক বাদ দে।
রিপ বলল,
‘ না। ছিকু কোনদিক দিয়ে ওর শালা হয় আমার সেটা জানতে ইচ্ছে করছে।
মুনা বলল
‘ বাদ দে না। তোরা বাপ ছেলে কেউ কারো থেকে কম না।
রিপ আর কথা বললো না। মাহিদের খাওয়া দেখলো চুপচাপ। ভাতের প্লেটের একপাশে পেয়াঁজ,ধনেপাতা আর সরঞ্জাম জমিয়ে রাখে ছেলেটা।
রিপকে তাকাতে দেখে নীরা মাহিদের পাত থেকে সেসব সরিয়ে বলল
‘ এসব খেলে কি হয়? এগুলো তো আর বিষ না। এমন ছেলে আমি আর দেখিনি।
রিক বলল
‘ যেমন বাপ তেমন ছেলে।
রিপ চুপচাপ খেতে লাগলো। নীরা মুখ মোচড়ে বলল
‘ যতসব বাজে অভ্যাস।
রিপ আঁড়চোখে তাকালো নীরার দিকে। খাওয়া দাওয়া শেষের দিকে। রিপ কিছুক্ষণ পর বলল
‘ পিহুর সাথে কি নিয়ে ঝগড়া হলো ? ও কাঁদছিল। দেখলাম। মেরেছিস।
মাহিদ রিপের দিকে সরাসরি অবাক চোখে তাকালো। রিপ ও চোখ তুললো। নীরা মুনা রিক খাওয়া থামালো। রিক বলল
‘ তুই দেখেছিস?
‘ হ্যা। বল কেন মেরেছিস?
আবার ও মাহিদের দিকে তাকালো রিপ।
মাহিদ মাথা নামিয়ে ফেলল। নীরা বলল
‘ আবার ও?
রিপ বলল
‘ মাথা নামাবি না।
মাহিদ মাথা তুললো। রিপের দিকে তাকালো না। প্লেটে চোখ রেখে ভাত নড়াচড়া করতে করতে বলল
‘ মারিনি আব্বা।
‘ তাহলে এমনি এমনি কাঁদছিল? ও বাচ্চা মেয়ে?
মুনা বলল
‘ তোদের এত ঝগড়া কি নিয়ে হয় আমি তো সেটাই বুঝিনা। আর মাহি তুই কি দিনদিন ছোট হচ্ছিস? ওর বিয়ে হয়ে গেলে আর ঝগড়া করার জন্য পাবি? নিজের বোন থাকলে তো সেটাকে মারতে মারতে মেরে ফেলতি বোধহয়।
‘ ও আমার নিজের কেউ নয়।
চট করে কথাটা বলে ফেলে আবার আফসোস করলো মাহিদ। রিপ বলল
‘ তাই নাকি?
নীরা মাহিদের দিকে লাল চোখ করে চেয়ে থাকলো। ইচ্ছে করলো ঠাস করে একটা দিতে। কি বলে ফেলল দেখলি?
রিক বলল
‘ নিজের কেউ নয়’ এই কথা কিভাবে বলতে পারলি মাহি? এভাবে কেউ বলে? ইশু এসব শুনলে কষ্ট পাবে। আমরা কখনো ওকে বুঝতেও দেয়নি ও আমাদের নিজের বোন নয়। এভাবে আর কখনো বলিস না। এরকম বলতে নেই।
মাহিদ চুপ করে থাকলো। রিপ বলল
‘ আমি এখনো জানলাম না কেন ওকে মেরেছিস? তোর নিজের কেউ নয় হলে তুই ওর গায়ে হাত তোলার অধিকার পাস কই?
‘ আমি মারিনি।
‘ তো কেন কাঁদছিল পিহু?
গলার আওয়াজ খানিকটা উঁচু হলো রিপের।
মাহিদ উত্তর দিল না। কারো কান্নার খোঁজ সে রাখতে চায় না। তার খবর ক’জন রাখে?
মুনা বলল
‘ তাহলে কি বকেছিস? কিভাবে বকেছিস যে কাঁদলো? অনেক সময় হাতের মার থেকে মুখের কথা বিষাক্ত হয় মাহি। এভাবে কাউকে আঘাত করাটা ঠিক নয় । তুই ওর অনেক বড়। ওর সাথে এসব করাটা কি ঠিক? তোকে না ও ভাই ডাকে।
রিপ আর কোনো কথা না বলে টেবিল ছাড়লো রাগের মাথায়। হনহনিয়ে চলে গেল। মাহিদ বসে থাকলো চুপচাপ। রিক ও টেবিল ছাড়লো। যাওয়ার সময় মাহিদের মাথায় হাত বুলালো। বলল
‘ দুজনের যখন এত ঝগড়া হয়। কথা না বললেই তো হয়। কথা অফ রাখ কিছুদিন।
মাহিদ শক্ত হয়ে বসে রইলো। সবাই চলে যেতেই নীরা এসে মাহিদের কান টেনে ধরলো। বলল
‘ তোকে আর কতবার বলতে হবে? তোর বয়স কত হয়ছে খেয়াল আছে? ওই বাচ্চা মেয়েটার সাথে সবসময় ঝগড়া করতে থাকিস কেন? হ্যা।
মাহিদ কথা বললো না। নীরা কান ছেড়ে দিল ঠেলে। আওয়াজ করে বাসনকোসন গোছাতে গোছাতে বলল
‘ যা ইচ্ছা তাই কর। আমি আর কিছু বলব না। আমি পিহুকে ফোন করে বলব তোরে যাতে ভাই ও না ডাকে। তুই ভাই ডাক শোনার যোগ্যই নস। দাঁড়া।
মাহিদ হাত ধুয়ে চলে গেল ঘরে।
সন্ধ্যার দিকে পিহুর ফোনে কল দিল নীরা। পিহু ফোন ছিকুকে ধরিয়ে দিল। ছিকু ফোন কানে দিয়ে বলল
‘ বেরিচতারের বুউ ফুন দিচে কেন?
নীরা হেসে বলল
‘ ওরিম্মা বাবুসোনা তুমি! কেমন আছ ভাইজান? পিহু কোথায়?
‘ পিহু নাই কেন?
‘ কোথায় গেছে পিহু?
‘ পিহু চলি গিছে।
‘ পিহুকে ফোন দাও। আমি কথা বলব।
ছিকু পিহুর কাছে ফোন নিয়ে গেল। বলল
‘ বেরিচতারের বুউ পিহুর সাথে কথা বলবে কেন?
পিহু ফোন নিল। নীরাকে সালাম দিতেই নীরা সালাম নিয়ে বলল
‘ কেমন আছ আম্মা?
‘ ভালো আছি মামি । তোমরা সবাই কেমন আছ?
‘ সবাই ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে মাহিকে নিয়ে।
পিহু চুপ করে থাকলো। কিছুক্ষণ পর বলল
‘ হ্যা বলো।
‘ মাহির সাথে আজ তোমার ঝগড়া হয়ছে?
পিহু খানিকটা অবাক হলো। প্রতিক্রিয়া বুঝতে দিল না নীরাকে। শান্ত গলায় বলল
‘ না।
‘ আমাকে মিথ্যে বলছ? তোমার ছোট মামা দেখেছিল কোর্ট থেকে ফেরার সময়।
পিহু এবার চুপসে গেল। বলল
‘ কই ঝগড়া হয়নি। মাহিদ ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিও। মাহিদ ভাই ভালো বলতে পারবে।
‘ ও কিছু বলছেনা তাই তোমার কাছে ফোন দিয়েছি আমি। কি হয়েছে তোমাদের? আমাকে খুলে বলো। সিরিয়াস কিছু?
‘ না মামি। সিরিয়াস কিছু কি হবে? এমনিই টুকটাক কথা কাটাকাটি হয়েছে। এসব ব্যাপার নিয়ে আর ঘাটাঘাটি না করলে ভালো হয়। শুধু শুধু জলঘোলা হবে।
নীরা আচ্ছা বলে ফোন রেখে দিল। কিছু তো একটা হয়েছে এদের।
তারপর একটা লম্বা সময় পেরিয়ে গেল। প্রায় মাস দু’মাসের মতো। পিহুর পরীক্ষা অতি সন্নিকটে। তাই সে ব্যস্ত পড়াশোনায়। মেডিক্যাল যাওয়া আসা আর পড়ার টেবিলেই কেটে যাচ্ছে সময়। এসবের মাঝে মাহিদের সাথে তার ভুলক্রমে ও দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। পিহু পড়তে চায়নি।
ছিকুর জন্য টিচার রাখা হয়েছে বাসায়। তার বয়স তিনের শেষের দিকে। পাকা পাকা সব কথা বলতে জানে। পড়তে জানবেনা এটা হয়? তাই তার জন্য টিচার রাখা হলো। টিচারকে নাস্তানাবুদ বানিয়ে ফেলল সে। কেন কেন শুনতে শুনতে মহাবিরক্ত হয়ে পড়লো টিচার। শেষমেশ পরীকে জানালো এই বাচ্চাকে সারাক্ষণ আদর করলেও ক্লান্তি লাগবে না। কিন্তু প্রশ্নগুলো মারাত্মক। এই মারাত্মক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেনা বিধায় বাচ্চাটাকে আর পড়ানো হলো না। টিচার চলে গিয়েছে তাই ছিকু মহাখুশি। পিহুর কাছে দৌড়ে এল। কোমর দুলিয়ে নেচে নেচে বলল
‘ পিহু চিটার পালিয়েছে কেন? ছিকুকে ভয় পেয়েছে কেন?
পিহু কপাল চাপড়ে বলল
‘ আবার চিটার? কি চিটার? টিচার হবে টিচার।
‘ কেন টিচার হবে কেন? চিটার হবেনা কেন?
পরী এসে বেডঝাড়ু দিয়ে পেছন থেকে একটা মারলো। ছিকু পিঠ চেপে ধরে রেগে তাকালো পরীর দিকে। পরী বলল
‘ বেয়াদব ছেলে পড়তে বসলে নানান তালবাহানা তার । এমনিতে দুনিয়ার সব কথা জানে। যেগুলো আমরা জানিনা সেগুলো ও জানে। শুধু পড়তে জানেনা।
পড়াচোর,ফাঁকিবাজ। বাপ ও মনে হয় ছোটবেলায় এমন ছিল।
ছিকু রেগে তাকিয়ে থাকলো। মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে ছটিয়ে বসলো। বসে ধুপধাপ কপাল ঠেকাতে লাগলো মেঝেতে। পিহু চেয়ার ছেড়ে দৌড়ে গেল। কোলে তুলে নিয়ে বলল
‘ কি হচ্ছে আব্বা? এরকম কেউ করে? ব্যাথা পাচ্ছেন তো।
ছিকু তখন চিল্লিয়ে কাঁদছে। কেন পরী তাকে মারলো? কেন মারলো?
পিহু বলল
‘ ওকে আমি পড়াবো। আমার পরীক্ষাটা শেষ হোক। আমি রোজ দু ঘন্টা করে আমার কলিজাকে পড়াবো। ও এখনো ছোট তাই এমন করছে।
পরী বলল
‘ তুমি পড়াবে? টিচার এ বি পড়তে বললে ও প্রশ্ন করে। এটা এ কেন? এটা বি কেন? অ তে অজগর বলতে বললে বলে, অজগর ওখানে কেন? ছিকু ধরতে পারেনা কেন? আ তে আম বলতে বলো ছিকু আম খেতে পারেনা কেন? আম খেতে মন চায় কেন? এরকম করলো ওকে কে পড়াবে?
পিহু ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। বলল
‘ আচ্ছা আচ্ছা বললাম তো আমি পড়াবো। কলিজা আপনি পিহুর কাছে পড়বেন?
ছিকু কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিল।
‘ কুলিজা ডাকো কেন?
পিহু হতাশ হলো। ছিকুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল
‘ কেন কেন বলা বন্ধ না করলে সবাই ছিকুকে রেখে চলে যাব। অনেকদূরে চলে যাব। ছিকু তখন একা হয়ে যাবে।
‘ পিহু মিছিমিছি বলে কেন?
পরী বলল
‘ দেখেছ? ভয় ও পায় না এই ছেলে। আমি কি করব একে নিয়ে?
পিহু শান্ত গলায় বলল
‘ ও এখনো ছোট দিদিয়া। তুমি যাও এখন। আমি ওর কান্না থামাই আগে। যাও।
ছিকু মাথা তুললো। রেগে বলল
‘ পরী যায় না কেন? এখুনো দাঁড়ায় আচে কেন?
পিহু খিক করে হেসে ফেলল। পরী হনহনিয়ে চলে গেল। আজ হাতের কাছে পেলে আর দুটো দেবে গাল দুটোতে। কেন কেন বের করে দেবে। অসভ্য ছেলে।
________________
রাত সাড়ে বারোটা। কলিং বেজে উঠলো। রিপ সোফায় বসেছিল ল্যাপটপ কোলে নিয়ে। কম সাউন্ডে টিভি চলছে। নিউজ চলছে। রিমোট চেপে টিভি বন্ধ করলো সে। ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো।
দরজা খুলতেই মায়ের বদলে আব্বাকে দেখে ভড়কে গেল মাহিদ। হাতে ক্রিকেট ব্যাড, পিঠে স্ট্যাম্প আর ক্রিকেট সরজ্ঞামের ব্যাগ। ক্লান্ত চোখ দুটোতে খুঁজছে ঘুম। পড়নের ঢিলেঢালা টি শার্ট ঘামে পিঠে লেগে গিয়েছে। রিপ সোফায় বসতে বসতে মাহিদ ততক্ষণে ঘরে বাড়িতে পা রেখেছে। মাকে না দেখে কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেল। ব্যাগ আর ব্যাট রেখে রিপের কাছ থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল
‘ মা কোথায় আব্বা?
রিপ চোখ তুলে তাকালো।
‘ জ্বর এসেছে। ঔষধ খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। তোর খোঁজ নেওয়ার দরকার নেই।
কথাটায় রাগ, অভিমান মেশানো ছিল বুঝতে পারলো মাহিদ। মাথা নিচু করে দ্রুত সরে পড়লো সে। চলে গেল নীরার কাছে। কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে সে। মাহিদ তার মাথার কাছে বসলো। মাথার চুলে হাত রেখে ডাকল
‘ মেরিমা আ’ম সরি।
নীরা তখন বেঘোরে ঘুম। মাহিদ কপালে হাত দিয়ে দেখলো জ্বরের মাত্রা কমে এসেছে। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ালো সে।
চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নীরা ডাক দিল পেছন থেকে। মাহিদ ফিরে তাকাতেই নীরা চোখ কচলালো বাচ্চাদের মতো। মাহিদ হাসলো। নীরার পাশে গিয়ে বসলো। নীরা ভার ভার গলায় বলল
‘ আমার বর আর আপা ছাড়া তো কপালে জ্বরপট্টি দেওয়ার মতো একটা মেয়ে নাই। কই ভাবছি একটা বউ নিয়ে আসবো তাড়াতাড়ি। তুই ভাইবা পরীক্ষায় ফেল মেরে বসে আছিস? আবার ক্রিকেট চ্যাম্পিয়ন হচ্ছিস?
মাহিদ চুপ করে থাকলো। নীরা তার পিঠে চড় বসালো। বলল
‘ ভাইবা পরীক্ষা খারাপ হলো কেমনে? তর্ক করেছিস না ওই মাস্টারগুলোর সাথে?
মাহিদ চুপ করে থাকলো।
‘ যা হ চলে যাহ আমার সামনে থেকে। তোরে আমার দরকার নেই ফাজিল ছেলে। ছেলের বউ দেখা লাগতো না আমার। এভাবে জ্বরের ঘোরে একদিন মরে থাকবো কাঁথার নিচে। যাহ।
মাহিদ থমথমে মুখে তাকালো। বলল
‘ মা পরের মেয়ে তোমার সেবা করবে? মাথা খারাপ তোমার? আব্বা আর বড়মার মতো একটা পরের মেয়ে তোমার দেখাশোনা করবে কখনো ?
‘ করবে। কেন করবে না? পিহু হলে করতো না? পিহু হবে কি করে? পিহুর তো বিয়ে ঠিক আছে। পিহুর মতো ডাক্তারণী আসলে তো করবে। আমার পিহুর মতো একটা ছেলে বউ চাই। তুই আইনা দিবি। যেভাবে পারোস সেভাবে।
মাহিদ বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। নীরা তার দিকে তাকালো। বলল
‘ এভাবে কি দেখিস? আমি ভুল কি বললাম? ছেলের বউ চাওয়ার ইচ্ছে জাগা ভুল?
‘ আমি পারব না মা। বিয়ে করার ইচ্ছে নেই আমার। এখন তো একদমই না।
‘ কি বললি?
নীরার চোখে জল চলে এসেছে।
‘ ব্যারিস্টার কখনো আমার ছোটবড় কোনো আবদার ফিরিয়ে দেয়নি। তুই দিলি। ভালো। তোর কাছে আর কিছু চাইবো না আমি। তুই তোর মতো থাক। আমি আমার মতো থাকি। যাহ। মা টা ডাকার দরকার নেই আমাকে। আমি কারো মা নই।
মাহিদ থমকে থমকে রুমের বের হতে গিয়ে রিপের মুখোমুখি হলো। মাহিদ চোখ নিচে নামিয়ে নিল। রিপ গলা পরিষ্কার করলো। একটু থেমে বলল
‘ ভুল আর দোষত্রুটি থেকেই শিক্ষা নেওয়া উচিত। তা না হলো আফসোস জিনিসটা পিছু কভু ছাড়বে না। তাই সময় থাকতেই সাধন হোক। আমার সন্তান তুই, তাই একটা উপদেশ দিই তোকে । তুই ঠিক ততটুকু পাবি যতটুকু তুই অন্যজনকে দিতে পারবি। হ্যা সেটা যদি হয় কষ্ট কিংবা আনন্দ। দুটোতেই সেম। ওই যে বিছানায় যাকে দেখছিস। সেটা তোর মা হয়। মা!
মা মানে বুঝিস? জানি বুঝিস। বুঝলে ও আমার মতো এখনো বুঝিস নি। আজকে আমার সবকিছু আছে। কিন্তু মা টা নেই। এখন চাইলে ও মায়ের আবদার পূরণ করতে পারিনা। কিন্তু তোর মা আছে। তোর কাছে আবদার করতে পারে। পূরণ নাই বা করলি এতে দোষ নেই। মানুষ যা চায় তা পায় না। পেতেই হবে এমনটা ও না। তবে না পাওয়া জিনিসটার অভাব গুছিয়ে দেওয়ার জন্য কিছু না কিছু একটা থাকে। সেটা খুঁজে নিতে হয়। তুই এবার খুঁজে নে তোর মায়ের আবদার পূরণ করার বিকল্প পদ্ধতি। তোর মা পিহুর মতো কাউকে চেয়েছে তুই বিকল্প হিসেবে না হয় পিহুকেই এনে দিলি!
মাহিদের চোখ তখন স্থির। চাপা হাসলো রিপ। মাহিদের কাঁধে হাত রেখে বলল
‘ উদাহরণ দিলাম। পিহু উদাহরণ মাত্র।
মাহিদ টালমাটাল পায়ে নিজের ঘরের দিকে গেল।
____________
পরীক্ষা বিকেলে পড়েছে পিহুর। পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই সন্ধ্যা নেমে পড়েছে। নিশিতার সাথে প্রশ্নপত্র নিয়ে কথা বলতে বলতে ঝুপ করে সূর্যি ডুব দিল। এমন সময় রিকশা পাওয়া মেলা ভার। নিশিতা উল্টোপথে যাবে। সে রিকশায় উঠে বলল
‘ বাড়ি ফিরে কল দিস।
পিহু মাথা দুলালো। ফোন না আনায় বাড়িতে ফোন দিতে পারলো না। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। একটি রিকশা আপনাআপনি এসে থামলো পিহুর সামনে। বলল
‘ ম্যাডাম যাইবেন?
পিহু মাথা নাড়লো। রিকশার হুডের নিচে একটা মানুষ থাকায় অস্বস্তি হলো। বলল
‘ হুড তুলে দিলে বসতে পারি।
‘ আইচ্ছা।
পিহু উঠে বসতেই রিকশার হুড তুলে দিল চালক। তারপর রিকশা এগিয়ে চললো। কিছুদূর যেতেই পিহুর অস্বস্তি দ্বিগুন বাড়লো। কারণ পাশে বসা মানুষটির ছোট্ট করে ফেলা নিঃশ্বাসের সাথে, গায়ে মাখা পারফিউমের গন্ধের সাথে সে পরিচিত। তবে আজকাল এই গন্ধ অসহ্য ঠেকে। যন্ত্রণার কারণ হয়। পিহু রিকশাকে থামতে বললো। রিকশা থেমে ও গেল। পুরো ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে আবছা অন্ধকারে হাঁটা ধরলো পিহু। অন্যদিন ছায়াহীন রাস্তায় হাঁটলে গা ছমছম করলে আজ একটি ছায়ার সাথে হাঁটলে ও ভয় করছেনা তার। ভেতরে যেন অদ্ভুত জেদ হচ্ছে। আর ও কিছুদূর এগিয়ে গেলে ও ছায়াটি তার পিছু ছাড়লো না। পিহু এবার থামলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরলো। বলল
‘ কি সমস্যা? দূর সম্পর্কের আত্নীয়র পেছন পেছন এত হাঁটাহাঁটি কিসের?
মাহিদ এদিকওদিক তাকালো। পর্যবেক্ষণ করলো আশপাশের কোনোকেউ তাকিয়ে আছে কিনা । পিহু আবার হাঁটা ধরলো। মাহিদ তার হাতটা ধরে আটকালো। বলল
‘ একটু থাম।
পিহু হাতটা ছাড়িয়ে নিল খুব সন্তর্পণে। কোনো কথা বললো না। শুধু শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
মাহিদ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। পিহু বলল
‘ আমার হাতে সময় কম।
মাহিদ উশখুশ করলো। খানিক পরেই বলল
‘ মা আর আব্বা বলেছে তোর মতো কাউকে খুঁজে নিতে। আমি পাচ্ছি না। আমাকে একটু হেল্প কর। তোর মতো মেয়ের দেখা পেলে বলিস। তুই হলে ও সমস্যা নেই। আমার জন্য নয়, মায়ের জন্য। মা খুব ছোটোমানুষি করে। মায়ের আবদার। আমি ফেলতে পারছিনা।
পিহু সরু চোখে তাকিয়ে বলল
‘ কি?
পিহুকে দাঁড় করিয়ে রেখে হনহনিয়ে হেঁটে অন্ধকারে হাওয়া হয়ে গেল মাহিদ।
চলবে,,,,
#মন_গোপনের_কথা
#পর্ব_১৩
লেখনীতে, পুষ্পিতা প্রিমা
পিহু রাস্তা ধরতেই দেখলো আফিকে। আফি টর্চলাইট মারলো পিহুর মুখে৷ স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে রাস্তার ওপাশ থেকে ডাকলো
‘তোমারে খুঁজতে খুঁজতে আমি পাগল হইয়্যা যাইতাছি। আর তুমি আমারে দেইখা ও চুপ কইরা আছো ক্যান আম্মাজান ?
পিহু হেসে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। আফি আসলো। পিহুকে বলল
‘ রিকশা পাওনাই তো কাউরে ফোন দিবানা? তোমার মা বাপ জেঠি আমারে এক জায়গা শান্তিতে খাঁড়াইতে দিতাছে না।
‘ রিকশা পেয়েছিলাম। নেমে যেতে হলো। তাই ভাবলাম বাকি পথ হেঁটেই যায়।
‘ রিকশা থেইকা নামলা ক্যান? মাইয়্যা মানুষ একা একা যাইতা কই?
‘ একা ছিলাম না বড়পাপা। মাহিদ ভাই ও ছিল। কি কতগুলো উল্টাপাল্টা বলে আমাকে একা রেখে চলে গেল ।
‘ ব্যারিস্টারের বাচ্চা কামডা কি ঠিক করলো?
‘ একদম না।
‘ তুমি খাঁড়াও। তার ব্যারিস্টার বাপেরে আমি যদি আইজ যদি বিচার না দিই আমি চৌধুরীর ব্যাটা না।
পিহু হেসে ফেলল৷ বলল
‘ থাক বাদ দাও।
‘ বাদ টাদ দেওয়া যাইবো না বাপ।
‘ তুমি ও বাপ বাপ শুরু করেছ?
দুজনের কথার মাঝখানে আদির ফোন এল আফির ফোনে। আফি ফোন তোলার সাথে সাথে বলল
‘ তোমার ছেড়িরে পাইনাই ডাক্তার সাহেব। নিজে আইসা খুইজ্যা লও। নিজের মাইয়্যার খোঁজ নিজে রাখতে পারোনা। আবার বাপ দাবি করো। সেয়ানা দেখাও আমার লগে?
আদি উদ্বিগ্ন গলায় বলল
‘ মেডিক্যালের আশপাশে কিংবা রাস্তায় দেখো দাভাই। কোথায় যাবে পিহু? তুমি মজা করছ এসময়?
আফি হাসলো। হাসলো পিহু ও। আদি দুজনের হাসির আওয়াজ শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বলল
‘ আমার সাথে মশকরা হচ্ছে?
পিহু ফোন নিয়ে বলল
‘ পাপা আমরা অলরেডি বাড়ির রাস্তা ধরেছি। আর কিছুক্ষণ। ডোন্ট ওয়ারি।
‘ এত দেরী হলো কিভাবে পিহু?
পিহু বিড়বিড়িয়ে বলল
‘ এক বান্দরের পাল্লায় পড়ে।
‘ বুঝলাম না।
‘ দেরী হতেই পারে পাপা। রিকশা পাচ্ছিলাম না। আমরা এখনি পৌঁছে যাচ্ছি। রাখো৷
‘ ওকে৷ চলে এসো।
________
পরদিন পিহুর পরীক্ষা আছে। ফরেন্সিক মেডিসিন। বাড়ি ফিরে মাত্রই ফ্রেশ হয়ে নাশতা খেয়েছে। ইশা এসে তেলের বোতল হাতে নিয়ে পিহুর কাছে আসলো। তেল হাতে নিয়ে বলল
‘ এখন একটু ঘুমাও। পরে উঠে পড়া শুরু করবে!
পিহু না না করে উঠলো। ইশা বলল
‘ কি হলো?
‘ তেল দেব না আম্মা। আমার বিরক্ত লাগে। সরো সরো। উফফ।
ইশা কথা শুনলো না। তেলে চুবিয়ে দিল পিহুর চুল। বলল
‘ পেট যেমন খাবার খুঁজে। মাথার চুল ও তেল খুঁজে। তোমার দিদিয়াকে ও এখব জোর করে দিয়ে আসলাম। বাজে অভ্যাস দুজনের।
ছিকু এল দৌড়ে দৌড়ে। হাতে ফুটবল। দৌড়ে এসে ইশার পা আঁকড়ে ধরলো। বলল
‘ ইশুবুনু পরী ছিকুকে মারে কেন? ফুটবল নিয়ে ফেলে কেন? পরী এমুন পুঁচা কেন?
ইশা বোতল রাখলো। ছিকুকে কোলে তুলে বলল
‘ মারবেই তো। এখন কি ফুটবল খেলার সময়? এখন পড়ার সময় ভাই।
‘ কেন? পড়ার সময় কেন? ছিকুর পড়তে মন চায় না কেন?
কথাগুলো বলতে বলতে ছিকুর চোখে জল এল। পরী এসে দাঁড়ালো দরজার কাছে। হাতে বেডঝাড়ু। ছিকুকে দেখিয়ে বলল
‘ আজ পিঠ লাল করে ফেলব৷ কেমন অসভ্য ছেলে দেখেছ আম্মা? বইটা ছিঁড়ে কাগজগুলি গ্লাসের পানিতে চুবিয়ে দিয়েছে। তারপর গ্লাসটা আমাকে দিয়ে বলল, পরী শব্বত বানিয়েছি কেন?
ইশা আর পিহু একসাথে হেসে উঠলো৷ সাথে ছিকু ও খিকখিক করে হাসা শুরু করলো।
ইশা তার গাল চেপে ধরে বলল
‘ আহা এভাবে হাসতে নেই। পরী রেগে গেছে তো।
ছিকু ইশার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল
‘ কেন? পরী রেগে গিছে কেন? পরী এত পুচা কেন? পরীকে কেউ মারেনা কেন? রেহান বকেনা কেন?
পরী তেড়ে আসলো। পিহু ছিকুকে কোলে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে লুকিয়ে ফেলল। বলল
‘ নাই নাই ছিকু নাই।
পরী বলল
‘ ওকে আমাকে দাও পিহু। দাও বলছি।
পিহু বলল
‘ এমন করোনা দিদিয়া। এখনো বাচ্চা তো।
ছিকু পিহুর বুকে মুখ গুঁজে রাখা অবস্থায় বলল
‘ পরী বাচ্চাকে মারে কেন? বাচ্চাকে আদর করে না কেন?
পরী বলল
‘ আদর? আসেন আদর করি। আসেন। বেয়াদব ছেলে। আমি জানিনা কি হবে একে নিয়ে।
রাইনা এসে পিহুর কোল থেকে কোলে নিল ছিকুকে। পিঠে হাত বুলিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল
‘ তুই একদিনে সব শিখিস নি। আমার ভাই ও একদিনে সব শিখতে পারবে না। যখন শেখার সময় হবে তখন শিখবে। একদম বকাঝকা করবি না আমার ভাইকে।
ছিকু যেতে যেতে রাইনাকে বলল
‘ পরী বিদ্দব কেন? ছিকুকে বিদ্দব বলে কেন?
রাইনা হাসলো মিটমিট করে।
ইশা পরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
‘ ওকে আদর করে করে পড়াতে হবে মা। রাগারাগি করলে তো একদমই পড়বে না।
‘ আদর করেই তো পড়াচ্ছিলাম আম্মা। ছড়া পড়াচ্ছিলাম। এত ডাকি তবু কথা কয় না কেন বউ। ও সেটা পড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বুউ কথা কয় না কেন? নজ্জা পায় কেন?
ইশা আর পিহু হেসে ফেলল আবার। পরীরও হাসি পাচ্ছে রাগ ও লাগছে। তার চেহারায় দুরকম প্রতিক্রিয়া। পিহু টেবিলে মাথা ফেলে বলল
‘ দিদিয়া ওর কথা মনে পড়লে আমি পরীক্ষার হলে হেসে ফেলি। আমার কিউট আব্বা।
ইশা বলল
‘ এত পাকাপাকা কথা বলে। শিখিয়ে দিতে হয়না কাউকে।
পরী বলল
‘ পন্ডিতগিরি বের করব আমি। একবার হাতের কাছে পাই।
ইশা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল
‘ আচ্ছা নীরুর ফোনে একটা কল দেওয়া দরকার ছিল । ওর জ্বরটা কমেছে কিনা কে জানে?
পিহু বলল
‘ ফোন দিয়ে জেনে নাও।
ইশা পিহুর ফোন থেকেই ফোন দিল। নীরা তখন সোফায় হেলান দিয়ে বসেছে। জ্বর ছাড়ায় শরীর দুর্বল লাগছে।
মাহিদ ফোনে গেমস খেলছে নীরার কোলে মাথা রেখে শুয়ে। পিহুর ফোন থেকে ফোন আসায় নীরা লাফ মেরে ফোন তুললো। কানে দিতেই ইশা বলল
‘ তোর জ্বর সেড়েছে? এখন কেমন আছিস? বাড়ির সবাই কেমন আছে?
‘ জ্বর কমেছে। এখন ভালো লাগছে। সবাই ভালো আছে। তোরা কেমন আছিস?
‘ সবাই ভালো আছি।
মাহিদ ফোন কেড়ে নিল। ইশাকে বলল
‘ বাপের বইন। হুনো হাতের মোবাইলটা হাত থেকে এখনি ধপাস কইরা ফালাইয়া দাও। দুই টাকার মোবাইল। কথাগুলো ফসফস করতাছে। কার মোবাইল এইডা? এই ফইন্নি মার্কা মোবাইল কার?
পিহু ফোনের পাশ থেকে তেজ গলায় বলল
‘ আম্মা দু টাকার মানুষের কাছে সবকিছু দু টাকারই মনে হয়। যত্তসব।
মাহিদ আর ও কিছু বলতে যাচ্ছিল। নীরা ফোন কেটে মাহিদের কান টেনে দিয়ে বলল
‘ বেয়াদব ছেলে। ওকে রাগাচ্ছিস কেন? ওকে রাগালে ওর মতো মেয়ে কোথায় পাবি তুই? আমার ওর মতো ছেলেবউ চাই। চাই মানে চাই।
মাহিদ লাফ দিয়ে উঠে বসলো। বলল
‘ তো? আমি তো বলছি একটা মাইয়্যা খুঁজে দিতে। শালী কোনো ফিডব্যাক দেয়নাই আমারে।
‘ কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য! বলেও ফেলছিস? মাহিরে তুই তো বিরাট কাম করছস বাপ।
মাহিদ গর্ব করে বলল
‘ মাহিদ খান সবই পারে মেরি,,মাআআ।
_____________
রাত এগারোটার দিকে পিহুর ফোনে নীরার ফোন থেকে কল এল। পিহুর সাথে টুকটাক কথা কথা বলতে একসময় নীরা বলল
‘ ভাইবা পরীক্ষায় ফেল মারা গাঁধার জন্য মেয়ে দেখতাছি তোমার মতো। তুমি কি কাউরে পাইছো আম্মাজান?.
পিহু চট করে উত্তর দিল।
‘ ইয়েস। জাস্ট ওয়েট এ মিনিট মামি।
নীরা অপেক্ষা করলো। রিপ টেবিলে বসা। হাতে কলম। কালি চলছে স্বাক্ষরের পর স্বাক্ষরে। নীরা অপেক্ষা করতে করতে রিপকে বলল
‘ ব্যারিস্টার পিহু মেয়ে খুঁজে পায়ছে?
রিপ কলম থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নীরার দিকে তাকালো। বলল
‘ কোন মেয়ে?
‘ অপেক্ষা করতে বলছে পিহু।
কিছুক্ষণের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে একটি মেয়ের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ভেসে উঠলো। নীরা ভালো করে ছবিটা পরখ করে বলল
‘ ব্যারিস্টার তাড়াতাড়ি আসেন।
‘ আসছি।
‘ এখন আসেন। আসেন। আসেন না। ধুরর।
রিপ টেবিল গুছালো। কলমের ঝুঁড়িতে কলম রাখলো। এসে বসলো নীরার পাশে। নীরা তার বুকের উপর এসে পড়লো। ফোনের স্ক্রিন দেখিয়ে বলল
‘ পছন্দ হয়ছে?
‘ পিহু দিয়েছে?
‘ হুম।
‘ এই মেয়ে পিহুর মতো?
‘ পিহুই তো বললো।
‘ ঠিক আছে। তোমার ছেলেকে দেখাও।
‘ তাকে দেখানোর দরকার নেই। এই মেয়ের খোঁজ খবর নেন। সোজা তুলে নিয়ে আসবো। আমার ছেলেবউ চাই মানে চাই।
‘ যে সংসার করবে তার পছন্দ অপছন্দ জানা দরকার নীরা।
‘ আপনার ছেলে কাউকেই পছন্দ করবে না। কিন্তু আমার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করবে বলেছে। এটাই অনেক।
‘ যদি এই মেয়ে পিহুর মতো না হয়?
‘ পিহু মিথ্যে বলবে? যদি মিথ্যে বলে তাহলে পিহুকেই তুলে নিয়ে আসবো। পিহু মাহির বউ ? ব্যাপারটা কেমন না! ধুর আমি কিসব ভাবি? এরা তো একে অপরের শত্রুর মতো। সারাক্ষণ ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকে এদের মধ্যে। ছিঃ ছিঃ কিসব ভাবি আমি।
রিপ দু হাত মেলে নীরাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করলো। নীরার মাথার উপর থুঁতনি ঠেকিয়ে মনে মনে বলল,
‘ এরাই দিনশেষে একে অপরকে বেশি ভালো রাখে নীরা।
নীরা মুখ তুলে বলল
‘ দম্পতি হতে হবে আমাদের মতো। নাহ?
রিপ মাথা নেড়ে বলল
‘ হু। এবার চুপচাপ ঘুমাও।
নীরা ঘুমিয়ে পড়লো। কি শান্তি আজ! ছেলে বউ এইবার ঘরে আসিবে।
চলবে।