Friday, June 5, 2026







প্রত্যাশা পর্ব-০১

#গল্প
প্রত্যাশা
#পর্ব_১
-শাতিল রাফিয়া

শাশুড়িমা যখন খুব আশা নিয়ে প্রশ্ন করলেন- পারবে না মা আমার ছেলেটাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে?
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললাম- না।

শাশুড়িমা চমকে উঠলেন! মনে হয় এই ধরনের কোন উত্তর তিনি আশা করেননি।

– তুমি একটু চেষ্টা করলেই…
তার কথার মাঝ পথেই আমি বললাম- মা আপনি মনে হয় সিনেমার খুব ভক্ত। তাই এগুলো বলছেন। কিন্তু এটা আমার বাস্তব জীবন। আর বাস্তবে এইসব হয় না।

শাশুড়িমা চুপ করে রইলেন।

– আমার মাকে জানিয়েছিলেন এসব?
মাথা নেড়ে শাশুড়িমা বললেন- না। উনি টাকা ধার নিয়েছেন। ফেরত দিয়ে দেবেন।
আমি চোখ কুঁচকে বললাম- এত টাকা ফেরত দেবেন কীভাবে?
– উনি বলেছেন সময় নিয়ে ফেরত দিয়ে দেবেন। কিন্তু আমি তোমার মাকে বলেছি, তোমাকেও বলছি তোমাদের টাকা ফেরত দিতে হবে না। তুমি প্লিজ আমার ছেলেটাকে বিপথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো। এইটুকু করবে না আমার জন্য?
আমি বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- যেটা আপনারা এতদিন ধরে পারেননি, আপনি মা, আপনার কথাই যেখানে শোনেনি, সেখানে আমি কীভাবে পারব বলুন?
– পারবে। তুমি ওকে তোমার রূপ, যৌবন দিয়ে আটকে রাখতে পারবে না বাসায়? এটা একটা কথা বললে?

এতক্ষণ শাশুড়ির কথা শুনে বিরক্ত হচ্ছিল, রাগ হচ্ছিল। এবার রীতিমত ঘৃণা হল! ছি! কী নীচ চিন্তাভাবনা! চেহারাই কি সব? আমাকে লাস্যময়ী সেজে তার ছেলেকে আটকে রাখতে হবে! ছি ছি!
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মনের মিল। একজন মানুষের মনের ভেতরে ঢোকা, তাকে ভালবাসা। এরপর বাকি সব।

আমি আমার গলার উত্তাপ পুরোটা প্রকাশ করে বললাম- আমার পক্ষে এত নিচে নামা সম্ভব নয়। আর আপনার ছেলে এরকম খারাপ চরিত্রের হলে বিয়ে করতে রাজি হল কেন?
– আমরা রাজি করিয়েছি।
– আপনি যেভাবে বিয়ে করাতে রাজি করিয়েছেন, সেভাবেই খারাপ পথ থেকে সরিয়ে আনতে পারতেন।
– আসলে আমরা ছবি দেখানোর জন্য রাজি করিয়েছিলাম। আর তোমার ছবি দেখে ও বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেছি মা! এরপর ভাবলাম বিয়ে করালে বউ এসে যদি সঠিক পথে আনতে পারে!
– ছি! কী বাজে চিন্তাধারা আপনাদের! এজন্যই তো আমার মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা মেয়েকে ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। যার বাবার জোর নেই!
– ব্যাপারটা এরকম নয়।
– একদমই এরকম। আর আপনি যদি ভেবে থাকেন, আমি আপনার কাতর গলা শুনে, এই কাঁদোকাঁদো চেহারা দেখে গলে যাব তবে ভুল ভাবছেন। আমার জীবন কোন মুভি নয়, আপনি সেই মুভির ডিরেক্টরও নন। আর আমিও কোন নায়িকা নই। আমি আগামীকাল বাসায় চলে যাব।

শাশুড়িমার চোখে তীব্র অসন্তুষ্টি দেখতে পেলাম। নতুন বউয়ের মুখ থেকে এরকম কটকট করে কথা বলাটা উনি মনে হয় মেনে নিতে পারছেন না।

আমার কথা শুনে থেমে থেমে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার বাবার চিকিৎসার তাহলে কী হবে? কয়কাল ধরে টাকা যোগাড় করবে? কার থেকে ধার নেবে?

এই প্রথমবার আমার মুখ থেকে কোন কথা বের হল না।

শাশুড়িমা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- ভেবে দেখ প্রত্যাশা।

আমি তার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম! উনি আমার দৃষ্টি উপেক্ষা করে বেরিয়ে গেলেন।
***

একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। আমরা দুইবোন। আমি বড়, প্রত্যাশা। আর আমার ছোটবোন প্রমি। আমার বাবার লেখাপড়ার খুবই ইচ্ছা এবং আগ্রহ ছিল। কিন্তু বাবার কম বয়সে দাদা মারা যাওয়ায় এবং সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় দায়িত্ব এসে পড়েছিল বাবার কাঁধে। পরিবারের সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাবা বেশি একটা পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি।
তবে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নিজের সন্তানদের পড়াবেন। তাদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন যাতে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে, চাকরি করতে পারে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠলেও পড়ালেখাটা আমাদেরকে ঠিকভাবেই করতে হয়েছে। বাবা দরকার লাগলে নিজে দুইদিন না খেয়ে থেকেছেন, কিন্তু আমাদের টিউশনের ব্যাপারে, বইখাতা কেনার ব্যাপারে কখনো কার্পণ্য করেননি। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।

বড় হওয়ার সাথে সাথে আমরা দুইবোনই বেশ সুন্দরী, রূপবতী হয়ে উঠেছিলাম। মা সবসময় বলতেন ‘কানের পাশে কাজল দিয়ে একটা দাগ দিয়ে রাখবি।’

প্রথম দিকে নিজের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও ধীরে ধীরে একটু বিরক্ত লাগতে থাকে। প্রথম প্রথম যখন উড়ো চিঠি আসতো, সৌন্দর্যের বর্ণনা লেখা থাকত, তখন স্বভাবতই বয়সের কারণে ভালো লাগতো। বড় হতে হতে এত চিঠি আসতে থাকে যে বিরক্ত হয়ে গেলাম। আর সব চিঠির বিষয়বস্তু শুধুমাত্র রূপের মাধুর্য্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বড় হওয়ার পর দৈহিক এবং শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা লেখা নোংরা চিঠিপত্র আসতে থাকে।
পাড়ার বখাটেরা বিরক্ত করে, ফোন দিয়ে আউল ফাউল কথা বলে।

খুব সুন্দরী ছিলাম বলে অনেক আগে থেকেই আমাদের বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। মা অনেকগুলোতেই বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার এক কথা।
“পড়াশোনা শেষ করে, চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত কোন বিয়ে নয়।”

আমি এবার মাত্র অনার্স শেষ করেছি। মাস্টার্সের জন্য আমি এবং বাবা দুইজন মিলেই টাকা জমাচ্ছি। আমি দুইটা টিউশনি করি।
প্রমি এবার ইন্টার দিয়েছে। সে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছে।

মা এবার আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রচন্ড চাপ দিচ্ছেন। বাবার কথার কোন নড়চড় হবে না। আর আমারও এখন বিয়ে করার কোন ইচ্ছে নেই।

মা রেগে উঠে বলেন- দিও না বিয়ে। দুই মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে থাক। আরে কেন বোঝ না বয়স হয়ে গেলে আর ভাল প্রস্তাব আসে না। কত ছেলেরা বিরক্ত করছে, আজেবাজে কথা বলছে। একটা অঘটন ঘটে গেলে এই পড়ালেখা, চাকরি সব মাথায় উঠবে বুঝলে?
বাবা মুচকি হেসে বলেন- দুর্ঘটনার ভয়ে কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? কিচ্ছু হবে না। আমার মেয়েরা চাকরি করে একটা ভালো জায়গায় বাসা নেবে বুঝেছ?

মা না বুঝে আরও চেঁচামেচি শুরু করেন।

এভাবে চলছিল, কিন্তু একদিন হঠাৎই বাবা অসুস্থ হয়ে গেলেন।
বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হল। পরীক্ষা নীরিক্ষার পরে জানতে পারলাম বাবার লাংস ক্যান্সার হয়েছে। দ্বিতীয় স্টেজে আছে। ডাক্তার তাড়াতাড়ি কেমোথেরাপি শুরু করতে বললেন। এরপর একটা সার্জারী করতে হবে।

আগেই বলেছি আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। মাস্টার্সের জন্য একটু জমানো টাকা ছিল। সেটা প্রথম দফায় সব টেস্ট করতে, ডাক্তার দেখাতে, এসব করতে করতেই শেষ! আমরা মহা বিপদে পড়লাম। যেখানেই চাকরির চেষ্টা করছি, মাস্টার্স খুঁজছে। অথবা এক্সপেরিয়েন্স চাইছে। আমরা থাকিও ভাড়া বাসায়। আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পেতেও তেমন লাভ হল না। আমি যেখানে টিউশন করি, তাদের কাছে এডভান্স চেয়েছিলাম। কিন্তু তারাও কোন সাহায্য করতে পারলেন না।

এমন সময় আমাদের বাড়িওয়ালা আমার জন্য আরেকটা টিউশনির সন্ধান নিয়ে এলেন। বাড়িওয়ালা আংকেলের স্ত্রীর বান্ধবীর পরিচিত কেউ। বাচ্চাটা ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। তার মা-বাবা নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ত। সে থাকে তার নানা-নানুর সঙ্গে।
আমি শুনেই নিষেধ করে দিচ্ছিলাম কারণ এই এক-দুই হাজার টাকার চাকরিতে আমার কিচ্ছু হবে না। কিন্তু বাড়িওয়ালা বললেন উনারা বাংলাদেশের নামকরা বড়লোক পরিবার। পনেরো হাজার টাকা দেবে মাসে। বাচ্চাটা খুবই দুষ্টু, নানুর কথা শুনতে চায় না। তার কাছে পড়তে চায় না। তাই হোম টিউটর রাখা হচ্ছে। পনেরো হাজার টাকাও এখন আমার কাছে ঠুনকো। কিন্তু তবুও এবার রাজি হলাম। অন্তত বাবার ওষুধটা তো কিনতে পারব। আর যেহেতু অনেক বড়লোক পরিবার, আমি এডভান্স চাইলে নিশ্চয়ই দেবেন।

বাসা বদলে আরো কমদামী ছোট বাসায় উঠলাম। এই এলাকাটা আরো খারাপ। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কিছু কমবয়সী ছোকরা যেন ‘গিলে ফেলবে’ এই নজরে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কিছুই করার নেই।

আমার টিউশনির প্রথমদিন এল। যাকে পড়াব তার নাম ‘স্নেহ’।

স্নেহ আসলেই দুষ্টু একটি ছেলে। কোন কথা একবারে শুনতে চায় না। অনেক কষ্টে তাকে কখনো বুঝিয়ে, কখনো বকে, কখনো বা আদর করে পড়াতে হয়। স্নেহকে অন্য বাচ্চাদের চেয়ে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। একদিন তাকে পড়াতে পড়াতে রাত হয়ে গেল। এর মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। সেদিন স্নেহের নানু নিজে গাড়ি দিয়ে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে আমার কষ্ট ফলপ্রসূ হল। স্নেহ পরীক্ষায় আগের বারের চেয়ে অনেক উন্নতি করল। স্নেহের মা-বাবা, নানা-নানু সবাই আমার ওপর খুব খুশি হল।

ভাবলাম এবার উনাদের কাছে কিছু টাকা অ্যাডভান্স চাইব। উনারা নিশ্চয়ই দেবেন।

কিন্তু তার আগেই একদিন বাসায় গিয়ে শুনি স্নেহের নানু স্নেহের মামার সাথে আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। আমি এই তিনমাস ধরে স্নেহকে পড়াচ্ছি, কিন্তু তার কোন মামাকে দেখিনি। পরে জানতে পেরেছি তার মামা সকালে বেরিয়ে যায় আর রাতে ফেরে। তাই কোনদিন দেখা হয়নি।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কোথায় উনারা আর কোথায় আমি? কোথায় রাজপুত্র আর কোথায় ঘুঁটে কুড়ুনি?

মা শুনে প্রথমেই একবাক্যে ‘না’ করে দিয়েছিলেন। মা বলেছিলেন ‘আমাদের আর আপনাদের স্ট্যান্ডার্ড একেবারেই মেলে না! আর আমাদের সেই অবস্থা নেই যে এত খরচা করে মেয়ে বিয়ে দেব!’

এরপর কী হয়েছিল বা স্নেহের নানু কী করে মাকে রাজি করিয়েছিলেন জানি না।

কিন্তু একদিন মা আমার হাত ধরে বললেন- বিয়েতে রাজি হয়ে যা। তোর এখানে বিয়ে হলে, প্রমিরও সুবিধা হবে। এই এলাকাটা অনেক খারাপ। বখাটেরা কীভাবে বিরক্ত করে, দেখতেই পাচ্ছিস। আমি সবসময় ভয়ে থাকি না জানি কোন অঘটন ঘটে যায়। এমনিই তোর বাবাকে নিয়ে চিন্তায় আছি। ওখানে বিয়ে হলে তুই ভাল থাকবি, ওরা একটা চাকরিতেও ঢুকিয়ে দিতে পারবে। সেই টাকা দিয়ে তোর বাবার চিকিৎসা করাতে পারব। তোর বাবার চিকিৎসার কথাটা ভাব অন্তত।

আর কিছু না হলেও বাবার চিকিৎসার কথা ভেবে রাজি হয়েছিলাম। সত্যিই তো ওরা আমাকে একটা চাকরিতে ঢুকিয়ে দিতে পারবে।
অবশ্য খুব বেশি ভাবার অবকাশ আমাকে দেওয়া হয়নি। কারণ আমার মতামত না নিয়েই মা পরের সপ্তাহে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলেন।

বাবা বিয়েতে একেবারেই রাজি ছিলেন না।

বাবা বলেছিলেন- যতদিন হায়াত আছে আমি বাঁচব। চিকিৎসা করালেই আমার হায়াত বাড়বে না।

বাবাকে মা ঠান্ডা করেছিলেন এই বলে যে ওরা বিয়ের পরেও আমাকে পড়াবে, চাকরি করতে দেবে। আর এত বড় বাড়ির বউ হওয়ার ভাগ্য সবার হয় না। আরও কি কি যেন বলেছিলেন।

একদিন প্রচন্ড অনাড়ম্বরভাবে আমার সাথে স্নেহের মামার বিয়ে হয়ে গেল। তার মামার নাম ইরফান। বিয়েতে ওরা যে শাড়ি দিয়েছিল সেই শাড়ি আর ওরা যে গয়না দিয়েছিল সেটা পরেছি। সাজার মধ্যে প্রমি ঠোঁটে একটু লাল লিপস্টিক ঘঁষে দিল।

ইরফানকে আমি কোনদিন চোখে দেখিনি। দেখার ইচ্ছেও হয়নি সত্যি। এই বিয়েটা একেবারেই অনিচ্ছায় বাবার চিকিৎসার জন্য করেছি।

বিয়ের সময়ও ইরফানকে দেখলাম না। বিয়ের পর গাড়িতে আমার সাথে আমার শাশুড়িমা আর ননাশ বসেছিলেন। ইরফান কোথায় কিছুই জানি না।

বাসায় পৌঁছানোর পরে ইরিনা আপু (আমার ননাশ) আমাকে একটা রুমে ঢুকিয়ে দেয়। এতদিন স্নেহকে আমি তাদের বিশাল হলঘরের মত ডাইনিং রুমে পড়িয়েছি। আজ প্রথম আমি দোতলায় আসলাম। আর রুমে ঢুকলাম। রুমে ঢুকে আমি খুবই অবাক হলাম! একজন নায়কের ছবি বড় করে দেওয়ালে টানানো। নায়কটা কে আমি সেটা চিনতে পারছি না। আজকাল অনেক নতুন নতুন ইয়াং নায়ক-নায়িকার আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু এত বড় একজন মানুষ কেন একটা নায়কের ছবি নিজের ঘরে টাঙিয়ে রাখবে? লোকটা পাগল-টাগল নয় তো?

মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি ঘুমে ঢুলছিলাম। এই বিয়ে নিয়ে আমার মনে কোন আশা, ইচ্ছা, আগ্রহ, উত্তেজনা, আনন্দ কিচ্ছুই ছিল না। বাবার জন্য বিয়েটা করতে হবে বলে করেছিলাম।

এমন সময় দরজা খোলার শব্দে আমি ধড়মড় করে জেগে উঠি। আমার শাশুড়ি এসেছেন।

উনি আমার পাশে বসে হেসে বললেন- তুমি ঘুমিয়ে পড়। আসলে ইরফান ফ্রেন্ডদের সাথে বাইরে গেছে। আগামীকাল ফিরবে।

উনার কথা শুনে আমার ঘুম হাওয়া হয়ে গেল! বিয়ের রাতে নববধূকে রেখে কেউ যে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যেতে পারে এই তাজ্জব ঘটনা আমার নিজের সাথে না ঘটলে আমি কখনোই বিশ্বাস করতাম না!

শাশুড়িমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- তোমাকে ক’টা কথা বলি প্রত্যাশা! কঠিন কিছু সত্য। আসলে ইরফানের কিছু বাজে আর খারাপ অভ্যাস আছে। রাত-বিরেতে পার্টি করা, ড্রিংক করা, এভাবে রাতে বাসায় না ফেরা, ঘুরতে চলে যাওয়া…

আমার বিস্ফারিত নয়ন দেখে উনি থেমে গেলেন। আমি ভাবছি এই কথাগুলো মানুষ অবলীলায় কী করে বলে ফেলতে পারে?

শাশুড়িমা তাড়াতাড়ি বললেন- না! ও আসলেই এরকম ছিল না। সামারা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে ওর রিলেশন ছিল। খুবই দহরম-মহরম। মেয়েটা ওকে চিট করেছিল। তারপর থেকে ও এরকম বখে গেছে। আর কাউকে বিশ্বাস করে না। মেয়েদের ওপর প্রচন্ড অনীহা! কাউকে মান্য করে না।
এরপর আশা নিয়ে প্রশ্ন করলেন- পারবে না মা আমার ছেলেটাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে?
***

শাশুড়িমা চলে গেলে আমি মাকে ফোন দিলাম।

দাঁতে দাঁত চেপে বললাম- তুমি কি করে আমাকে এখানে বিয়ে দিতে পারলে?

এরপর আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। নিজেকে প্রচন্ড ক্ষুদ্র তুচ্ছ মনে হতে লাগল।

মা ধৈর্য ধরে সব শুনলেন।

এরপর বললেন- আমি সত্যি জানতাম না ইরফান এরকম। জানলে বিয়েটা কখনোই হতে দিতাম না। তোর বাবা মরে গেলেও না। তোর শাশুড়ি নিজে থেকেই আমাকে লোনের কথা বলেছিলেন। আমি চাইনি। উনি নিজেই আমাকে লোন দিয়েছেন। আমি নিষেধও করেছিলাম। আমি বলেছিলাম আমাদের স্ট্যান্ডার্ড মেলে না। আমাদের সোসাইটি এত হাই না। আমাদের এত টাকাপয়সা নেই।
– কি বলেছিলেন উনি?
– বলেছিলেন আমাদের তো অনেক আছে। আমরা আর টাকা দিয়ে কী করব? কিন্তু আপনার মেয়েটা যে কত লক্ষী সেটা তো নিজের চোখে দেখেছি। এই লক্ষী মেয়েটাকে কী করে হাতছাড়া করব, বলুন?
আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম- আমি এবার কী করব?
মা বললেন- বিয়েটা ছেলেখেলা নয়। জীবনটাও নয়। এই বিয়ে করলাম, আর এই ছেড়ে দিলাম ব্যাপারটা এরকমও নয়। তোর শাশুড়ির কাছ থেকে যে লোন নিয়েছি তার মধ্যে কিছু টাকা অলরেডি খরচ হয়ে গেছে। আগামীকাল তোর বাবার প্রথম কেমোথেরাপি। সেটার টাকাটাও যোগাড় হয়েছে তোর শাশুড়ির কাছ থেকে নেওয়া লোন থেকেই। আমি বলি কি তুই উনাদের বলে একটা চাকরিতে ঢোক, এরপর টাকা আয় করে উনাদের লোনটা শোধ করে দে। স্নেহের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু তোর আগের টিউশন তো আছেই। আর এর মাঝে চেষ্টা কর তোর আর ইরফানের সম্পর্ক সহজ করার। ও… ও যদি নিজেকে শুধরে নিতে পারে!আর তোর শাশুড়ির কথাই তো শেষ কথা নয়। তুই ইরফানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা কর। এরপরেও যদি একসাথে থাকতে না পারিস, তুই ডিভোর্স দিয়ে চলে আসিস। আমি নিষেধ করব না। কিন্তু চেষ্টা না করেই এভাবে হাল ছেড়ে দিস না মা। আর এখন তোর ডিভোর্স হয়ে গেলে কি পরিমাণ বদনাম রটবে সেটা তুই নিজেও জানিস! আর.. আর এখন তোর বাবার কথাটা ভাব। প্রমির কথাটা ভাব।
তোর বাবা সুস্থ থাকলে আমি কখনোই তোকে ওখানে থাকতে বলতাম না।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সারারাত নির্ঘুম কাটল। সকালে বাসায় যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিচে নামলাম। আমি গিয়ে বাবাকে হসপিটালে নিয়ে যাব। নিচে ডাইনিং টেবিলে আমার শশুড়-শাশুড়ি বসে ছিলেন। তাদের সালাম দিলাম। তাদের সাথে একসাথে নাস্তা করলাম।
ইরিনা আপু, দুলাভাই আর স্নেহ এখনো ওঠেইনি। আর ইরফান, তাকে দেখলাম না। সে এখনো ফেরেনি।

শাশুড়িমা আমাকে গাড়ি দিয়ে পাঠালেন। শুধু তাই নয়, জোরজবরদস্তি করে আমার হাতে নগদ কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেন। আমার নিজেকে প্রচন্ড ছোট লাগছে। এভাবে কি আমাকে বেঁধে রাখছে? ছি!

আপাতত আমি এসব কিছু ভাবছি না। শুধুমাত্র বাবার কথা চিন্তা করছি। মা বাবাকে এসব কিচ্ছু জানাননি। টেনশন করে আবার শরীর খারাপ করবে।

হসপিটালে যেতে যেতে বাবা বললেন- তোর অনেক ভাল বিয়ে হয়েছে মা। সুখে থাকবি। তবে একটা কথা মনে রাখিস। নিজে কামাই করবি কিন্তু। আর পড়াটা শেষ করবি। নিজে স্বাবলম্বী হবি। আগেও বলতাম, এখনো বলছি। চাকরি করবি, নিজের পায়ে দাঁড়াবি। তোর মা যে লোন নিয়েছে, সেটা শোধ করবি।

আমার চোখ ফেটে কান্না আসছে। শুধুমাত্র আমি জানি আমার মনের ভেতর কি তুফান চলছে! ভালো থাকব? যার সাথে বিয়ে হয়েছে তাকে একনজর দেখতে পর্যন্ত পারলাম না! আর আমি নাকি ভাল থাকব। আমার শ্বশুরবাড়ি আমাকে টাকা দিয়ে কিনে রাখছে আর আমি নাকি ভালো থাকব!

প্রথম কেমো দিয়ে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাবার অনেক কষ্ট হয়েছে। আমি, বাবা আর প্রমি গিয়েছিলাম। মা বাসায় ছিলেন।

বাসায় এসে আমি চমকে উঠলাম! গতকাল ইরফানের ঘরে যে নায়কের ছবি দেখেছিলাম সেই নায়ক আমাদের বাসায় বসে আছে। সে একটা সাদা পাঞ্জাবি পরে আছে। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব? আমি কি ভুল দেখছি?

আমাকে আরো হতবাক করে দিয়ে নায়ক আমাকে বলে ওঠে- তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বাসায় চল প্রত্যাশা!

মানে কি? এই নায়ক কি তবে ইরফান?

[চলবে]

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ