স্যার যখন  স্বাম সিজন২ পার্ট_০২

0
4089

স্যার যখন  স্বাম সিজন২
পার্ট_০২
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

তমার এক হাত নিজের এক হাত দিয়ে শক্ত করে ধরলাম আরেকটা হাত ওর গালে রেখে বললাম,”জানো তিলোত্তমা,একটা মানুষ কখন পরিপূর্ণ হয়?”
“না,”
“যখন তার কাছে আপন মানুুষের অমায়িক ভালোবাসা থাকে আর নিজের সন্তান থাকে।অর্থাৎ ভালোবাসা আর সন্তান থাকলে একটা মানুষ পরিপূর্ণ হয়।”
……
“তোমার কাছে এখন তোমার আপন মানুষদের ভালোবাসা আছে আর এর কয়েকবছর পর তোমার বিয়ে হলে যখন শুশুড়বাড়ির লোকদের ভালোবাসা আর এরপর তোমার সন্তান হবে তখন তোমার মনে হবে জীবনটা আসলেই অনেক মধুর।নিজেকে তখন পরিপূর্ণ হবে।লাইফের এখনো অনেক ভালো কিছু তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তিলোত্তমা।তাই প্লিজ পাস্টে যা কিছু খারাপ হয়েছে তা ভুলে নতুন করে বাঁচ।তোমার মা আছে,আমি, আমার পরিবার তোমার সাথে সবসময় আছি আর থাকবো তাই নিজেকে কখনো একা মনে করবে না।সবসময় হাসিখুশি থাকবে।তোমার হাসিভরা মুখটা অনেক মিষ্টি লাগে।”
হালকা হেসে মাথাটা নাড়ালাম।
.
.
“আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি,”
“হ্যা কর।”
“না,থাক।আমি এখন বাসায় যাব।”

অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।এতটা শান্ত আর নরম গলা আজকে প্রথম ওর কণ্ঠ থেকে শুনলাম।
“হ্যা চল।আমিও এখন উঠবো।”
.
.
মামণির রুমে গেলাম।দেখি শুয়ে আছে।কেন জানি চোখের পানিগুলোকে আর সামাল দিতে পারছিলাম না।মামণির পা দুটো ধরে কান্না করে দিলাম।কান্নার শব্দ শুনে উনি জেগে উঠলেন।

“তমা, মা কি হয়েছে?কাঁদছিস কেন?”
“মামণি আমাকে ক্ষমা করে দাও।আর কখনো তোমার কথার অবাধ্য হবো না।এবারের মতন ক্ষমা করে দাও।”চোখের পানিগুলো অবিরত পড়েই চলছে।
“এইরকম ভাবে বলছিস কেন তুই?কিছু হয়েছে?বলনা?ক্ষমার কথা এখানে আসছে কেন?”
“আমি তোমার কথার অবাধ্য হয়ে তোমাকে কষ্ট দিয়ে রাজশাহীতে গিয়ে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি।জানিনা মাথার মধ্যে তখন কি ভূত চেপেছিলো।এখন বুঝতে পারছি মায়ের কাছ থেকে সন্তান দূরে গেলে কতটা কষ্ট কতটা ব্যথা লাগে।এখন থেকে তুমি যা বলবে আমি তাই শুনবো। আর তোমার কথার অবাধ্য হবো না দেখে নিও তুমি।তুমি চেয়েছিলে না আমি এইখান থেকে পড়াশুনা করি তাহলে তাই হবে।খুব ভালো করে এইবছর পড়বো যাতে তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে যেতে পারি।”
“তুই তোর ভুল বুঝতে পেরেছিস সেটাই অনেক।আর কান্নাকাটি করিস না।কালকে থেকে আহাদের কাছে পড়া শুরু করবি কেমন।এখন চল মা মেয়ে মিলে কালের নাস্তাটা করি গিয়ে।”
.
.
কয়েকদিন পর,,নিজেকে আস্তে আস্তে সামলিয়ে নিয়েছে।কিন্তু রাতের বেলায় বেশি কষ্টটা হয়।কেন জানি অতিত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছি না।বার বার অতীতের স্মৃতিগুলো ভয়ানক স্বপ্ন হয়ে আমাকে তাড়া করে।
.
.
“দিপা আপু আমি কিন্তু সব দেখেছে।”
“কি…কি….দেখেছিস….?”
“এত তোতলাতে হবে না।আগে বল ছেলেটা কে ছিল?”
“তার মানে দেখেই ফেলেছিস।”
“হুম তোমাদের ছাদে উঠার সময় দেখি তুমি এক ভাইয়ার সাথে কথা বলছ লুকিয়ে লুকিয়ে। ব্যাপারটা কি?”

কিছুটা লজ্জার ভঙ্গিতে দিপা আপু বলল,”তুইতো এখানে ছিলে না তাই হয়ত কিছুই জানতি না।আসলে বাসা থেকে ওর সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।তোকে সারপ্রাইজ দেব ভেবেছিলাম কিন্তু দিতে পারলাম না তার আগেই সব পন্ড হয়ে গেল।”
“সত্যি তুমি বিয়ে করছ?কবে?”
“এইতো আর কয়েকদিন পর।আচ্ছা বাসায় আয়।তোর সাথে অনেক কথা আছে।”
“হুম আসবোইতো।আচ্ছা আগে এটা বল তোমাদের বিয়েটা লাভ নাকি এরেঞ্জ?”
“অবশ্যই এরেঞ্জ ম্যারেজ।লাভ ম্যারেজে আমি বিশ্বাস করি না।কারণ যে যুগ পড়েছে কে ভালো আর কে খারাপ তা বুঝার কোন উপায় নেই।ছেলে হলে লাভ টাভে প্রবলেম ছিল না কিন্তু আমিতো মেয়েমানুষ যদি কাউকে লাভ করতে গিয়ে ওর কাছে প্রতারণার শিকার হয় বা ও বিয়ের আগেই আমার বড় ক্ষতি করে আমার বিশ্বাসটা ভেঙ্গে ফেলে তখন আমার কি হবে?বুঝলি,, সবাইকে দেখে খুব ইচ্ছা করত একটা লাভ করেই ফেলি। পরে এইসব খারাপ চিন্তা যখন মাথায় আসে তখন লাভের প্রতি ইন্টারেস্টটা হারিয়ে ফেলি।তাই ভাবলাম পরিবার থেকে আমার জন্য যাকে ঠিক করা হবে তাকেই বিয়ে করেই ফেলবো। ব্যস পরিবার থেকে অভির সাথে আমার বিয়ে ঠিক করল আর আমিও রাজি হয়ে গেলাম।”
“হ্যা আপু খুব ভালো করেছ।আসলেই ঠিক বলেছ এই যুগে কাউকে বিশ্বাস করাটাই টাফ আবার যদি সে ছেলে হয়।”
“নারে, সব ছেলেরা খারাপ না।এখনো কিছু ভালোমানুষ আছে।ভালো মানুষের জন্য এখনো পৃথিবী টিকে আছে।নাহলেতো কবেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত।”
.
.
কিছুটা বিরাশ আর হতাশার ভঙ্গিতে হেসে,,”তা জিজুর সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলছিলে কেন?বিয়ের আগে এইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলাতো মোটেও ভালো না।”
“আরে,,ও কল করে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে।সামনাসামনি আমার সাথে নাকি কথা বলতে চাই।বাইরে যাওয়াও বারণ।তাই ওকে বললাম ছাদে এসে দেখা করতে।”
“ও এইজন্য বুঝি জিজু চোরের মতন লুকিয়ে লুকিয়ে আসছে তার হবু বউকে দেখবে বলে।আর তার সাথে হাতে এই ব্রেসলেট পড়িয়ে দিয়েছে”
“হ্যা, “বলে লজ্জায় মাথাটা নিচু করে করল।”এই শোন,,এই কথাটা যেন কেউ না জানে”
“আচ্ছা।কেউ জানবে না”

তমার দিকে এতক্ষণ পর ভালো করে খেয়াল করল দিপা।

“তমা এটা কি তুই!”
“কেন?সন্দেহ আছে।”
“না, মানে ঢোক গিলে,আসলে বিশ্বাস করতে পারছি না।আজকে প্রথম তোকে থ্রিপীস পড়তে দেখলাম।অন্যান্য সময় টপ জিন্স কি পড়ে থাকস।আজকে এই গোলাপি রংয়ের থ্রিপিসে, You are looking so pretty, dear.”
একটু মুচকি হাসলো তমা।

“উফফো দেখ না কি গাধীটায় না আমি। এতদিন পর তোর সাথে কথা হল, তোর রাজশাহীতে থাকার গল্প আমাকে বলবি না।আর এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে আমাদের বাসায় চলতো।তোর কাছে কত কি শুনার বাকি আছে?”
“আপু…উ এখন না পরে।বাসায় যাব।”
“আরে সেতো যাবি। তা কি বলতে হবে নাকি?চল চল, মা,নিপা আছে।ওদের সাথে দেখ করে কথা বলবি।আজকে অনেকদিন পর আবার আড্ডা দিব।বেশ জমবে।”বলতে গেলে একেবারে জোর করে টেনে বাসায় নিয়ে গেল দিপা আপু।
.
.
দিপা আপুদের বাসায় গেলাম।অনেকদিন পর আন্টি আর নিপাকে দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেল।
নিপা যে এত কথা বলতে পারে তা এর সাথে না মিশলে বুঝা যাবে না।দিপা আপুর বিয়ের জন্য কি কি শপিং করল সেগুলো দেখাচ্ছে।এমন সময়,,

“আরে তমা কখন আসলে?”
“এইতো এখন।ইশ উনি এই টাইমে বাসায় কি করে?উনার না ভার্সিটিতে থাকার কথা এখন?”(মনে মনে)
“এমনভাবে আমার দিকে চেয়ে আছ কেন?”
“আপনার কি আজকে ভার্সিটি নেই।”
“ম্যাম আপনি কোন দুনিয়ায় আছেন?”
“মানে,,”
“আজকে যে শুক্রবার সে কথা কি আপনার মনে নেই।”
“ও শিট,, আমার তো খেয়াল নেই। যদি জানতাম আজকে শুক্রবার আর উনি বাসায় থাকবেন তাহলে এর বাসায় জীবনেও আসতাম না।”
.
.
এদিকে নিপা আমাকে ধরেই রেখেছে।কিছুতেই আসতে দিচ্ছে না।তাই বাধ্য হয়ে ওর আর দিপা আপুর শাড়িগুলো দেখেই যাচ্ছি।

আহাদ: “মা,চটপটি খাবো। চটবাটির বাটিটা এখানে নিয়ে আসো না।”
“আরে টেবিলে আছে।যা ওইখান থেকে নিয়ে আয়।”
“উহুম উঠতে পারবো না এখন।এইজন্যতো তোমাকে বললাম নিয়ে আসতে।”
“উফ,তুই পারিসও বটে আহাদ।”

কিছুক্ষণ পর আন্টির এনে দেওয়া চটপটি উনি খেয়ে যাচ্ছেন আর আড়চোখে যে আমাকে দেখছেন তা আমি বেশ বুঝতে পারছি।আস্ত লুচু একটা।উনি আমার থেকে কম করে হলেও ১২ বছরের বড়।গায়ের রং দুনিয়ার কালো। এইরকম বুড়া একটা ছেলে যার গায়ের রং কুচকুচে কালো সে যদি হ্যাবলার মতন চটপটি খেতে থাকে আর আড়চোখে একটু পর পর একটা মেয়েকে দেখতেই থাকে তাহলে আমি কেন দুনিয়ার সব মেয়েই বলবে লুচু একটা।আমার ও ঠিক তেমন হচ্ছে।খুব অস্বস্থি লাগছে।
.
.
“তমা আপু আচ্ছা বলতো ওইখানে কোন হ্যান্ডসাম ছেলে তোমাকে প্রপোজ করছে?আসলে কি জানতো অনেকেই আছে যারা কোন মেয়েকে অনেক ভালবাসলেও সে কথা নিজের মধ্যে আটকে রাখে।ভালবাসার কথা সেই মেয়েকে ঠিকভাবে বলতে পারে না।পরে যদি সে মেয়েকে অন্য ছেলে প্রপোজ করে আর তাদের মধ্যে রিলেশন হয়ে যায় আহা….সেই ছেলেটার না জানি তখন ভিতরে ভিতরে কত কষ্ট হয়?”
“what?”
“না, মানে আপু বলছিলাম যে ধর এইখানে কোন একটা ভালো মনের ছেলে তোমাকে ভালবাসে কিন্তু সেই ছেলেটা তার মনের কথা তার মনের মানুষটাকে বলতে পারেনি পরে দিয়ে আরেক ছেলে এসে যদি তোমাকে প্রপোজ এরপর তোমাদের মধ্যে রিলেশন হয় তাহলে আগের সেই ছেলেটার কি অবস্থা না হবে?….কথাটা বলে মুচকি হেসে নিপা ওর ভাইয়ের দিকে তাকালো।

আবার ওর ভাইয়ের থেকে চোখ দুটি ফিরিয়ে নিপা বলতে লাগল,,”রাজশাহী থাকাকালীন তোমাকে কেউ প্রপোজ করছে নাকি আগে সেটা বল।দেখি সেই ছেলের ভালবাসার হৃদয় এখনো ঠিক আছে নাকি ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেছে “এই বলে নিপা ওর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আবারো মুচকিভাবে হাসতে লাগল।

নিপার এই কথা শুনে আহাদের গলায় খাবার উঠে গেল।
.
.
“আরে ভাইয়া, নে নে পানি খা।ঠিক আছিস তো।”
“হ্যা ঠিক আছি।আর এইসব কি গল্প করছিস তুই হ্যা।ছোট, ছোটদের মতন থাকতে পারিস না।”
নিপা ওর ভাইয়ের কানেকানে বলল,”আরে ভাইয়া এইসব কথা তমা আপুর কাছ থেকে এখন না জানলে কিভাবে হবে?যদি ওর অন্য কারোর সাথে রিলেশন থাকে।এখন তো দিপা আপুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন পর যদি তমা আপুর লাভারের সাথে আন্টি বিয়ে ঠিক করে ফেলে তখন কি হবে? বুঝতে পারছতো ব্যাপারটা।”
“ওই সব বুঝতে পারছি।আর কিচ্ছুটা আমাকে বুঝাতে হবে না।দূর হো।এইসব ফালতো গল্প বাদ দিয়ে পড়তে বস গিয়ে।যতসব আজাইরা গল্প করে বড়দের সামনে।”
“আজকাল কারোর ভালো করতে নেই।আচ্ছা তাহলে যাই গিয়ে।বিষয়টা ভাইয়া ভাবিয়া দেখিও” মুচকি করে হেসে বলল নিপা।”

“তমা আপু আমি পড়তে যাচ্ছি। তুমি ভাইয়ার সাথে গল্প কর।”
“না, না আমি বাসায় যাব।আচ্ছা নিপা,দিপা আপু আসি তাহলে।আন্টিকেও বলিও আমি চলে যাচ্ছি।”
“হ্যা আসো, তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি।”
“লাগবে না।”

গরম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।যেটা আমি সবচেয়ে ভয় পাই।তাড়াতাড়ি করে কেটে পড়তে চাইলে উনি আমার হাত ধরে বাইরের বাগানে নিয়ে আসলেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে