স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_২২

0
2070

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_২২
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

জুয়েল- তমা!

তমা- আপনি আমাকে চিনেন?

জুয়েল- হ্যা, তোমাকে না চিনি কিভাবে?স্যারের মেয়ে তুমি

তমা- উনি কোথায়?আমাকে উনার কাছে নিয়ে চলুল।

জুয়েল- উনি কে?তন্ময় স্যার!

তমা- হ্যা

জুয়েল- দীর্ঘশ্বাস ফেলে,,আসো আমার সাথে।

রুমে গিয়ে দেখি একজন লোক বিছানায় শুয়ে আছে।শরীরটা পুরো কঙ্কাল হয়ে গেছে।মুখে ক্লান্তির ছাপ।বুঝতে পারলাম উনিই আমার বাবা।দেওয়ালে টাঙ্গানো বাবার অনেক আগের ছবিটার সাথে বর্তমান অসুস্থ চেহেরার কোন মিল নেই। নিজের বাবাকে এই অবস্থায় এতদিন পর দেখে কান্না করে দিলাম।

জুয়েল- স্যার আপনার মেয়ে তমা আসছে

তন্ময় চোখ খুলে দেখে সত্যি সত্যি ওর মেয়ে ওর কাছে এসেছে।মেয়েকে দেখে খুশিতে মনটা ভরে উঠল।হাতের ইশারা দিয়ে মেয়েকে ওর কাছে এসে বসতে বলল

তন্ময়- কেমন আছিস মা

তমা- কাঁপা গলায়,, ভালো।

তন্ময়- শুনলাম তোর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে?

তমা- হ্যা

তন্ময় – নতুন সংসার জীবনে ভালো থাক সেই দুয়া করি।

তমা- …….

তন্ময়- আজকে তোকে সামনে থেকে দেখতে পেরে খুব শান্তি লাগছে।জানিস তোর মাকেও এখন খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু ওর চোখের সাথে চোখ মিলানোর সাহসটুকুও আমার নেই।তাই শুধু তোকে আসতে বলেছি।

মারে আমার ভুলের জন্য আমাকে মাফ করে দিস।আর তোর মাকেও বলিস আমাকে যাতে মাফ করে দেয়।নাহলে মরেও যে আমি শান্তি পাব না।অনেক কষ্টে জড় গলায় তন্ময় কথাগুলো বলল।

তমা- কি বলব বুঝতে পারছিলাম না।আজকে বাবাকে এই অবস্থায় দেখে শুধু মায়া হচ্ছে।

তন্ময়- জুয়েল তমাকে আমার সেই ডাইরিটা এখন দাও।

তমা- বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।কিসের ডাইরি!

তন্ময়- তোকে যে কথাগুলো বলতে চাই তা আমি ডাইরিতে লিখে রেখেছি। তোর সব কিছু জানার অধিকার আছে।তাই আজকে তোকে ডাইরিটা পড়ার জন্য দিয়ে দিলাম।এটা পড়ার পর যদি মনে হয় তুই আমাকে ক্ষমা করতে পারবি তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিস।

.
.
ফারিদ- তমাকে বাসায় না পেয়ে তমার মায়ের বাসায় আসলাম।আন্টিকে এতবার ডাকার পরও যখন উনি সাড়া দিচ্ছেলেন না তখন খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম।তমার রুমে ঢুকার সময় দেখি ফ্লোরে একটা কাগজ পড়ে আছে।কাগজটা উঠিয়ে দেখি কিছু লিখা আছে সেখানে।পড়তে গিয়েই মাথায় বাজ পড়ল।
তার মানে তমা ওর বাবার কাছে গেছে। ও এখান থেকে জার্নি করে ঢাকায় গেছে!তাও আবার এই অবস্থায়!আমি জানি এরপরে কি হবে।আর সেটা বুঝতেই পেরে আমার বউটার জন্য টেনশন হচ্ছে।ওর এই অবস্থায় এতবড় ধাক্কাটা ও সামলাবে কি করে!যে করেই হোক আমাকে সেখানে ঠিক সময়ে পৌঁছতে হবে।এই সময় ওর এখন আমাকে খুব প্রয়োজন।

তমার বাবার এড্রেস এখনি নিতে হবে।আন্টিকে এখন দরকার।হয়ত উনার কাছেই এড্রেসটা পাওয়া যাবে। আন্টির রুমে গিয়ে দেখি উনি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।

ফারিদ- আন্টি,, আমার এখনি আংকেলের এড্রেসটা প্রয়োজন।আমার বউকে এই অবস্থায় আমি এখন একা ছাড়তে পারবনা।

মেঘ – প্রথমে ফারিদের কথাগুলো মাথায় না ঢুকলেও পরে দিয়ে ঢুকল।ফারিদের কথা কিছু বুঝলাম আর বাকিটা বুঝার মতন অবস্থায় এখন নেই তাই ওর কথায় কোন আগ্রহ দেখালাম না।
পরে ড্র‍য়ার থেকে একটা কার্ড বের করে ফারিদকে দিল।

ফারিদ- থ্যাংকস আন্টি।আমি এখনি আমার বউয়ের কাছে যাচ্ছি। আন্টি প্লিজ নিজের খেয়াল রাখবেন।আল্লাহ সহায় আছেন।

এরপর তাড়াতাড়ি করে মাকে কল দিয়ে তমার মায়ের বাসায় আসতে বললাম।উনাকেও এখন একা ছাড়া যাবে না।উনাকে সার্পোট দেওয়ার জন্য এখন কাউকে খুব প্রয়োজন।

.
.

বাবার লোক জুয়েল আমাকে একটা রুমে নিয়ে গেল।সেখানের টেবিলে ডাইরিটা ছিল।ডাইরিটার পৃষ্ঠা তুলে পড়া শুরু করলাম।

বাবা আর মায়ের প্রেমের কাহিনী পড়ে বুঝতে পারলাম তাদের মধ্যে অনেক ভালোবাসা ছিল।তাহলে কিভাবে এই ভালোবাসায় দূরত্ব বাড়ল।তা জানার জন্য ডাইরিটা পড়তে লাগলাম।
বিয়ের ৩ বছরেও আমাদের ভালোবাসায় কোন ফাটল ধরেনি।ঠিক আগের মতই ভালোবাসাটা ছিল।কিন্তু এর পরে আমাদের অনেক চেষ্টার পরেও যখন বাচ্চা হচ্ছিল না তখন আমি আর মেঘ দুইজনে ডিপ্রেশনে পড়ে যাই। অনেক কষ্টে মেঘকে এই ডিপ্রেশন থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করলেও নিজের ডিপ্রেশনটা কিছুতেই দূর করতে পারছিলাম।একটা বাচ্চার জন্য মনে মনে খুব মরিয়া হয়ে উঠছিলাম।আর তার কারণেই হয়ত আমাদের আগের ভালোবাসাটা আগের থেকে অনেকখানি কমে যায়।এরসাথে ভালোবাসাটা কমার ক্ষেত্রে আরেকটা কারণ ছিল পুষ্পের প্রতি আমার দুর্বলতা।আমাদের ফ্ল্যাট এ নতুন ভাড়াটিয়া হিসেবে পুষ্পরা আসে।প্রথম প্রথম ওদের বাসা থেকে পুষ্পের চিৎকারের শব্দ আসত।প্রথম দিকে ব্যাপারটা না বুঝতে পারলেও পরে ওর বাবা মায়ের সাথে কথা বলে ব্যাপারটা বুঝতে পারি।পুষ্প একজন মানুষিক রোগী।জীবনের প্রথম প্রেমিকের ভালোবাসার কাছে ধোকা খাওয়ার পর ও অনেকটা মানুষিক রোগীর মতন আচরণ করতে থাকে।পুষ্পের এই চিৎকার, জিনিসপত্র ভাঙ্গচোরের আওয়াজ, ফ্ল্যাটের মানুষদের সাথে খারাপ আচরণ দেখে ওকে অনেকেই অনেক কটু কথা শুনাত।যেটা আমার খুব খারাপ লাগত।তাই এই ছোট মেয়েটাকে সাহায্য করার জন্য আমি নিজেই এগিয়ে আসি।প্রথমদিকে ও নিজেও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করত এরপর ও আস্তে আস্তে অনেকটা উন্নতির পথে আসে।ধীরেধীরে আমাদের বাসায় পুষ্পের যাতায়াত চলতে থাকে।ও প্রায়ই মেঘের কাছ থেকে আমার আর মেঘের ভালোবাসার কাহিনী জানতে চাইত।স্বামী- স্ত্রীর ভালোবাসার প্রাইভেসির মধ্যে যতটুকু কথা বলা যায় ততটুকু গল্প মেঘ ওকে শুনাত।হয়ত এইসব শুনার পর পুষ্পের আমার প্রতি দুর্বলতা বাড়তে থাকে।এরপর প্রায়ি যে টাইমে আমি বাসায় থাকতাম ও সেই টাইমে আমার বাসায় এসে উপস্থিত হয়।মেঘের উপস্থিতেই ও মেঘকে ইগনোর করে আমার সাথে গল্প জুড়িয়ে দিত।প্রথম প্রথম তা লিমিটের মধ্যে থাকলেও এরপর তা লিমিট ক্রস করে।বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারতাম না।কারণ এই রকম টাইপের রোগীর কাছে অনেক হিসাবনিকাশ করে কথা বলতে হয়।ফলে নিজের স্ত্রীকেও তেমন সময় দিতে পারতাম না।এতে যে মেঘ মন খারাপ করত তা বুঝতে পারতাম তাই পুষ্পের অবস্থার ব্যাপারে মেঘকে বুঝাতাম।এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

.
.

ধীরে ধীরে ওর সাথে অধিক সময় কাটানোর ফলে আমি নিজেও ওর প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ি।নিজের পরিবার, স্ত্রীকে গুরুত্ব না দিয়ে বাইরের একটা মেয়েকে বেশি গুরুত্ব দিলে, তার সাথে বেশি সময় কাটালে ওর প্রতি দুর্বল হয়ে যাব এটাই স্বাভাবিক।যেটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কাজ ছিল।পুষ্পকে নিয়ে মেঘের সন্দেহ দিনদিন বাড়তে থাকে।একদিন এই বিষয় নিয়ে মেঘ অনেক রাতে আমার সাথে ঝগড়া করে।আমি পুষ্পের প্রতি দুর্বল ছিলাম সেটা আমি নিজে জানতাম, কিন্তু মেঘকে সেটা বুঝতে দিতাম না এইটা আমার কাছে অনেক বড় একটা অপরাধের মতন মনে হত।সেই অপরাধবোধটা কেমন করে জানি আমাকে হিংস্র বানিয়ে দিল।মেঘ আমাকে আর পুষ্পকে নিয়ে অনেক খারাপ কিছু বলছিল যেটা শুনে আমি অনেক রেগে যাই যদিউ ওর রাগটা স্বাভাবিক ছিল কিন্তু এরপর ও আমাকে ক্যারেক্টারলেস বলাতে আমার মনের সেই অপরাধবোধটা থেকে হঠাৎ করে তখন অনেক রাগ জন্মায়।নিজের অপরাধ ঢাকতে আর ও আমাকে ক্যারেকটারলেস বলাতে আমি একটা পশু হয়ে যাই।আর তাই সেদিন মেঘকে জানোয়ারের মতন মারতে থাকি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে