স্বপ্ন পুরে ১

0
407

স্বপ্নপুরে ১

-“আর কতো ফাহাদ? কতো সময় নিবি তুই? তোর জন্য একটা মানুষ শান্তিতে ঘুমোতে পর্যন্ত পারছেনা। প্রতিদিন তোর একটাই কথা যতদিন না আমি ঐ নূপুর পরিহিতা মেয়েকে পাই আমি বিয়ে করবোনা। এইটা কি ধরনের কথা? সে যদি বাস্তবে থাকতো না হয় খুজেঁ পাওয়ার একটু আশা থাকতো। কিন্তু স্বপ্নে কিভাবে সম্ভব? না তুই মেয়েটাকে চিনিস আর না তার কোনো ঠিকানা তোর কাছে আছে। তোর জন্য ফাহিম বিয়ে করেও একটু শান্তি পাচ্ছেনা। প্রতিদিন শ্বশুরবাড়ি ফেলে একটা বার ছুটে আসে মেয়েটা অসুস্থ বাবা মাকে দেখতে। আর তুই? দিব্যি নেচে খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। তোর বাবা? তাকিয়ে দেখ এই বয়সে সংসারের এতো চাপ নিতে গিয়ে দুই দুই বার হার্ট এট্যাক হয়েছে। কোনদিন না আবার ছেড়েই চলে যায় কে জানে।” কন্ঠটা কিছুটা ভারী শুনাচ্ছে মায়ের। কিছুক্ষন থেমে আবারো বলতে লাগলো

-” তোর বাবার কথাটাও তো একটু ভাব।” চুপচাপ নাস্তার টেবিলে বসে মায়ের বকবকানি শুনছিলো ফাহাদ। এ তার নতুন গল্প নয় বিগত দুই বছরের গল্প। প্রতিদিন তিনবেলা ঘ্যানরঘ্যানর করেই যাচ্ছে।এতোদিন তো ফাহিমও করতো। ভেবেছিলাম আল্লাহ সহাই হয়েছে বলেই হয়তো তার বিয়েটা হয়ে আমাকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু না। সে আর উদ্ধার কই। ফাহিম চলে যাওয়ার পর মনেহয় মায়ের চেঁচামেচিই দ্বিগুন হয়ে গেছে। কোনো টু শব্দটাও করলোনা ফাহাদ। এইটা তার স্বভাব বা বদ অভ্যাস ও বলা যেতে পারে। চুপচাপ বকাবকি সহ্য করাই শ্রেয় মনেহয় তার কাছে। খাবার খেয়ে উঠেই বেরিয়ে পরলো অফিসের উদ্দ্যেশে। গাড়ির সামনে আসতে আসতে বিরবির করে, “কোথায় তুমি? কেনো আসোনা আমার কাছে? কেনো ধরা দাওনা আমায়। লুকোচুরি করেই বা কি আনন্দ পাচ্ছো তুমি? তবে জেনে রেখো বিয়ে যদি এই জীবনে করতেই হয় আমি তোমাকেই করবো। শেষ নিঃশ্বাস অবধি খুজেঁ যাবো তোমায়। “খুব বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে গাড়িতে উঠে পরলো ফাহাদ। গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে।
আমি ফাহাদ আরমান। দু বছর হলো গ্রেজুয়েশন কমপ্লিটের। বাবা মায়ের চিল্লাচিল্লিতে নিজেদের ব্যবসাই দেখছি। বাবা আরমান হোসেন। একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। রিটায়ার্ড হয়ে ও থেমে থাকেন নি তিনি। ব্যবসা করছেন।এখন নিজের ব্যবস্যা দেখছেন। আর মা আশা আরমান। একজন মাধ্যমিক স্কুল টিচার। আর কিছুদিনের মধ্যে সেও রিটায়ার্ড হতে যাচ্ছে। ফাহিমা আরমান। আমার ছোট বোন। পাঁচ’ছ মাস আগেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বামীর পরিবার সহ এখন পাশের এলাকায় আছে। প্রতিদিনকার সবার একটাই কথা বিয়ে কেনো করছিনা। কিভাবে করবো? আমি যে মন প্রাণ জুড়েঁ কাউকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। চোখটা বন্ধ করলেই সেই নূপুরের নিক্কনধ্বনি কানে এসে বাজে। বার বার মনেহয় কেউ তার লম্বা চুল ছেড়ে আমার উপস্থিতির অপেক্ষার প্রহর গুনছে। বারবার বলছে, “আর কতো ফাহাদ। আমি আর কতো অপেক্ষা করবো। কি মিষ্টি তার কথার স্বর।” তাকে ফেলে কিভাবে অন্যকে নিয়ে সংসার সাজাবো? কোনো মেয়ের দিক তাকানো তো দূরের কথা বিয়ে কিংবা ভালোবাসা এইসব সম্পর্কজনক কোনো কথা মনে হলেই সেই পা দুটি চোখের সামনে ভেসে উঠে। মনে হয় যেনো তাকে ঠকাচ্ছি আমি। কি করবো আমি? কি তার সমাধান। কোথায় না খুঁজেছি তোমায়।আর কোথায় বাকি? অফিসের সামনে এসেই গাড়িটা থামালো ফাহাদ। যদিও এই মূহুর্তে অফিসে নয় মনজুড়ে আছে ঐ নূপুরওয়ালি।কিন্তু বাবার কষ্টটাও আর সহ্য করতে পারছেনা। মনের সাথে যুদ্ধ করেই অফিসে ঢুকে পরলো ফাহাদ।
-” গুড মর্নিং স্যার।”
-” মর্নিং। “পুরোটা দিন অফিসিয়াল কাজ করতে করতেই শেষ হয়ে গেলো। দুপুরের খাবারটা পর্যন্ত খাওয়া হয়নি তার।
কিছুদিন আগেও শুধু অপেক্ষা করতো কখন রাত হবে, কখন ঘুমোবে, আর কখন তার সেই নূপুরকন্যার ঝুমঝুমানো নূপুরেরধ্বনি শুনতে পাবে। কিন্তু এখন? এখনতো মনেহয় তার জীবনে যদি রাতটাই না আসতো তবেই ভালোহতো। হঠাৎ কানে বেজে উঠলো নূপুরধ্বনি। হয়তো কোনো মেয়ে তার নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু সে এতোটুকুও পাশ ফিরে তাকায়নি। কারন সে ধ্বনি তার স্বপ্নকন্যার নিক্কনধ্বনি নয়। বিগত পাঁচটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে এই নূপুরওয়ালিকে নিয়ে। মোবাইলটা বাজছে। স্ক্রিনে ফাহিমের নামটা ভাসছে। আবারো কিছুক্ষন কথা শুনাবে নিশ্চয়ই। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও রিসিভ করতে হবে তাকে। আর নয়তো অযথা টেনশনে ভূগতে থাকবে।
-” হ্যা ফাহিম বল। ”
-“ভাইয়া তুই কি ফ্রি আছিস? ”
-“হ্যা আছি। কেনো?”
-” একটু বাসায় আসবি?”
-” কেনো ঐ একই ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে? “ফাহাদের কথা শুনে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে
-” ভাইয়া একটু কি ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াস হওয়া যায়না?” ফাহাদ জানতো এমনটাই হবে।
-” কিভাবে হবো তুই বল। আমি চোখটা বন্ধ করলেও যেনো তাকে খুজেঁ পাই। আগেতো স্বপ্নে ছিলো কিন্তু এখন? এখনতো মনেহয় আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে মিশে আছে মেয়েটা। চোখটা বন্ধ করলেই খুজেঁ পাই তাকে। জানিস ফাহিম দেখতে দেখতে কেমন পা গুলোও বড় হয়ে যাচ্ছে।”
-” ভাইয়া আমি জানিনা কি বলবো তোকে। কি বলা উচিত আমার। শুধু এইটুকুই বললাম আব্বু আম্মুর দিকটা একটু ভেবে দেখ।”
-” হুম।আমাকে আর কিছুদিনের সময় দে আমার মন বলছে খুব শীগ্রই আমি মেয়েটার খুজঁ পাবো। ”
-“আমি জানিনা কিছু।নেহা মেয়েটা কিন্তু খুব ভালো তুই চাইলে আমরা তাকেও দেখতে পারি।”
-“আর কতো দেখবি বল প্রতিবারই তো একটা আশা নিয়ে ছুটেছি যদি ঐ মেয়েটাকে খুজেঁ পাই। কিন্তু নাহ পাইনি। ”
-“ভাই তোর কি এইটা জানা আছে মানুষ সেটাই স্বপ্ন দেখে যেটা দিনের বেলা কল্পনা করে। ”
-” আর তুইও হয়তো ভূলে গেছিস, ‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখো, স্বপ্নতো সেটাই যেটা তোমাকে ঘুমোতে দেয়না।’আমার কল্পনা, স্বপ্ন, বাস্তব সবখানেই ঐ মেয়েটার বিচরন।” ভাইয়ের কথা শুনে পুনরায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে ফাহিমা।সে জানতো এইকথাগুলোই শুনাবে। তারপরও যদি একটু আশার আলো মিলে সেই ভেবেই ফোন করেছিলো সে। কিন্তু আশার আলোতো দূরে থাক ভাইয়ের কষ্টটাই অসহ্যনীয় হয়ে উঠেছে। ফাহিমাকে চুপ থাকতে দেখে,
-“আর কিছু বলবি?”
-” নাহ। আচ্ছা আসিফ অফিস থেকে আসবে এখন। পরে কথা হবে।বাই।” বলে কলটা কেটে দেয় ফাহিম। ফাহাদকে সে কিছুতেই বুঝাতে পারছেনা। স্বপ্ন আর বাস্তব এক নয়। স্বপ্ন শুধুমাত্র তার ভাবনা।
-“কি হলো কি ভাবছো?”
-” তুমি কখন এলে?”
-” মাত্রই তো এলাম। এভাবে বসে আছো কেনো? কিছু হয়েছে? কি ভাবছো?”
-” সে আর নতুন কি! মা প্রতিদিন একই কান্না করে বেড়ায় ভাইয়াকে নিয়ে। কিছুতেই বুঝাতে পারছিনা আমি তাকে। “গায়ের শার্টটা খুলতে খুলতে,
-” ওকে ওর মতো থাকতে দাও ফাহিম। ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রনা অনেক। সেটা তুমিও জানো। কারন আমাকে তুমি হারাতে হারাতে গিয়েই পেয়েছো। তাও ফাহাদের জন্যই। আমাদের কি উচিত না ফাহাদের পাশে থাকা।”
-” আমি থাকবোনা কখন বললাম তোমাকে? আমরা বাস্তবে দুজন দুজনকে চেয়েছি। হ্যা এইটা ঠিক আমরা হারাতে গিয়েও ভাগ্যের জোড়ে এক হয়েছি। কিন্তু ভাইয়া? কোন সূত্রে পথ চেয়ে বসে আছে বলো? স্বপ্নের মানুষকে কিভাবে খুঁজবে সে? না তার চেহারা সে দেখে আর না নাম জানে শুধুমাত্র ঐ নূপুর পরা পা। আচ্ছা তুমিই বলো এটা দিয়ে কি একটা মানুষ খুঁজা সম্ভব? আর মানুষ হাসির প্রেমে পরে। কথার প্রেমে পরে, সৌন্দর্যের প্রেমে পরে সে কিনা পরলো একটা পায়ের? তাও আবার স্বপ্নে। এইসব না একমাত্র ভাইয়ার দ্বারাই সম্ভব।”
-” আরে তুমি এতো উত্তেজিতো কেনো হচ্ছো বলোতো।” কিছুটা ইমোশনাল হয়ে,
-“আসিফ মা খুব ভেঙে পরেছে ভাইয়াকে নিয়ে। এতোদিন শুধু কথা বলতো এই কয়েকদিন যাবৎ শুধু কান্নাই করে বেরাচ্ছে। আমি মেয়ে হয়ে কি করে মায়ের চোখের পানি সহ্য করি বলো।” ফাহিমের পাশে বসে মাথাটা টেনে বুকে ধরে,
-“দেখবে খুব শীগ্রই একটা সমাধান বের হয়ে যাবে। তুমি দেখো। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও আল্লাহ তো তার বান্দাদের কখনো ফিরিয়ে দেয়না তুমি জানোনা?”
-” হুম।”
-” আর তুমি এভাবে ভেঙে পরলে মাকে কে সামলাবে বলোতো?”
-” আমি কিছু বুঝতে পারছিনা আসিফ। ভাইয়াকে এভাবে দেখতে আমারও ভালো লাগছেনা।”
-” আচ্ছা ঠিক আছে। বুঝলাম।এসব নিয়ে পরে আলোচনা করবো।এখন চলোতো খাবো। অনেক রাত হয়েছে। ”
-“তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো আমি খাবার টেবিলে দিচ্ছি।”বলেই উঠে ডায়নিং এ পা বাড়ালো ফাহিমা।
বাসায় এসে কোনোরকম খাবারটা খেয়ে দ্রুত রুমে চলে এলো ফাহাদ। মা দেখতে পেলে আবারো এখন শুরু করবে কান্নাকাটি। রুমে এসে গা থেকে শার্ট খুলতে খুলতে সামনে দেয়ালের ওপর ওয়ালমেটের দিকে তাকিয়ে আছে ফাহাদ। শ্যামবর্ণধারী একটা পা। একদম সাদা ফকফকে তার পায়ের নখ। তার মধ্যেই সেই নূপুর। পা অনু্যায়ী নূপুর টা যেনো কিছুটা বড়ই ছিলো। কিন্তু স্বপ্নে এখন একদম ঠিকঠাক হয়ে লাগে মেয়েটার পায়ে। এইচ এস সি পরিক্ষার পর থেকে একটা জিনিস খেয়াল করে ফাহাদ। কিছুদিন যাবৎ একটা স্বপ্নই সে বারবার দেখছে। একটা মেয়ে পায়ে নূপুর পরে ধীর গতিতে হেটে যাচ্ছে। ঝুমঝুম করে বাজছে তার নূপুরের নিক্কনধ্বনি। নদীর পাড় ঘেঁষে যেনো স্নিগ্ধ বিকেলে হেটে বেড়াচ্ছে।হাতে তার একগুচ্ছ কাশফুল। বাঁধনহীন চুলগুলো কোমড় ছাড়িয়ে পিঠের দিকে ছড়িয়ে পরে আছে। কিন্তু সে শুধুই পা গুলোই দেখতে পায়।স্বপ্ন ভেবে সে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। সব শয়তানের কর্মকান্ড ভেবে সে প্রতিদিন দোয়া দূরুদ পরে ঘুমাতে যেতো। কিন্তু না। তা ধীরে ধীরে সূর্যের মতো প্রখরতা বাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো মেয়েটার মুখটা একবারও সে দেখতে পায়নি। ছোটবেলা থেকেই কিছুটা আকাঁআকিঁর অভ্যাস ছিলো তার। রোজ একটা স্বপ্ন দেখতে দেখতে একদিন রং ও তুলির সাহায্যে একেই ফেললো পা জোড়া। বিভিন্ন রকম স্টাইলে এঁকেছে কিন্তু এই নূপুরজোড়া যেনো একমাত্র তার জন্যই বানানো হয়েছে। এতোটা নিখুঁত ভাবে আঁকতে পেরে নিজেই অবাক হয়ে যায় ফাহাদ। কয়েকটা ছবি একেঁ ওয়ালমেট করে দেয়ানে টানিয়েছে সে। ওয়ালে তাকিয়েই অনেকটা সময় পার করে দিলো ফাহাদ।রাতে আবারো সেই স্বপ্ন দেখে কাটিয়ে দিলো আরো এ রাতটি। প্রতিদিনের ন্যায় আবারো সকাল এলো। নাস্তার টেবিলে এসে দেখে মা বসে আছে। চোখগুলো ফুলে আছে। মা বাবার এতো কষ্ট দেখেও কিছু করতে পারছেনা সে।তবে রাতে একটা ডিসিশন নিয়েছে ফাহাদ।
চলবে,,,
স্বপ্নপুরে
গল্পবিলাসী – নিশি

কেমন হবে প্রেম কাহিনী? আইডিয়া হয় কিছুর? কি আইডিয়া আসে ঝটপট জানিয়ে দিবেন কেমন 🙂

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here