সুখময় বৃষ্টি পর্ব : ৮

0
1000

সুখময় বৃষ্টি পর্ব : ৮
#লেখা : রায়না মনি

দিয়া ওর রুমের জানালার কাছে বসে আছে। মনটা খুব ভালো। বেশ কয়েক দিন পর আজকে আবার সাব্বিরের সাথে মন খুলে অনেকক্ষণ কথা বললো। ঈদ গেছে কালকে, অথচ সাব্বির ঈদের দিনটায় ওকে সময়ই দিতে পারেনি। তবে আজ তা পুষিয়ে দিয়েছে। আর তিন দিন পরেই সাব্বিরের সাথে দেখা হবে। বাসায় থাকতে আর একদমই ভালো লাগছে না। কুমিল্লা যাওয়ার জন্য মনটা এখন আকুপাকু করছে।

“আপু কী করো ?”

অর্কর কণ্ঠ শুনে দিয়া দরজার দিকে তাকালো, দেখলো অর্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
“করি না কিছু একটু বাইরের প্রকৃতি দেখছি । আয় ভিতরে আয়।”

অর্ক এসে বিছানার উপর বসলো। কী থেকে যে কী বলবে ভেবেই পাচ্ছে না। কথা গুলো বলার পরে দিয়া ঠিক কীভাবে আচরণ করবে তাও বুঝতে পারছে না। অর্ক ঘেমে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
“আপু একটা কথা ছিল ।”

“কী কথা বলে ফেল।”

“আপু সত্যি কথা বলবা কিছু লুকাবা না।”

অর্কর কথা শুনে দিয়া আড়চোখে অর্কের দিকে তাকালো। অর্ক হঠাৎ করে ওর কাছে কী জানতে আসলো?
“এত ভনিতা না করে বলে ।”

অর্ক আমতা আমতা করে বললো,
“আপু তুমি কি কাউকে ভালোবাসো? রিলেশনে আছো?”

অর্কর কথা গুলো শুনেই দিয়ার মাথাটা ঘুরে উঠলো। অর্ক এসব জিজ্ঞেস করছে কেন? অর্ক কি কিছু জানতে পেরেছে নাকি? কিন্তু অর্ক জানবে কীভাবে? অর্কর এসব জানার কথা না। হয়তো এমনি জিজ্ঞেস করছে।
“অর্ক তুই কী বলিস এসব! আমি করবো প্রেম! এইসব তুই ভাবিস কীভাবে? আর আমি যে তোর বড় বোন সেটাও কি তুই ভুলে গেলি নাকি?”

“না আপু কিছুই ভুলিনি, বোন বলেই জিজ্ঞেস করলাম। অন্য কেউ হলে আমার জানার ইচ্ছা ছিল না। তার মানে তুমি বলতে চাইছো তুমি রিলেশনে নেই?”

“অবশ্যই না ।”

“আমি কিন্তু আগেই বলেছি মিথ্যা বলবা না। আমি কী তোমার এতই পর হয়ে গেলাম যে আমার কাছ থেকে তুমি এখন সব লুকিয়ে রাখো ।”

দিয়া কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। অর্ক আর ধারার কাছে সাব্বিরের কথা ঠিকই বলতো শুধু ভয়ে বলেনি। ও ভেবেছিল ওর ভাইটার অনেক রাগ আছে, যদিও ওর সাথে কোনোদিন রাগ দেখায়নি, তবুও যদি কোনো দিন রাগের মাথায় বাসার লোকজনের কাছে বলে দেয়। মিথ্যা বলে কুমিল্লা চলে গেছে একটা ছেলের জন্য, এসব যদি বাসার লোকজন শুনতো, তাহলে দিয়ার কপালে শনি ছিল। দিয়া লজ্জায় মুখও দেখাতে পারতো না তাদের সামনে। তাই এই বিষয়টা সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছিল। সাব্বির জব পেলে বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতো, কেউ কিছু বুঝতে পারতো না। এখন কি অর্কর কাছে সব বলে দিবে ?
“আমি তোকে এখন কিছু কথা বলবো তুই কারো কাছে বলবি না। আর ভুল বুঝবি না আমাকে।”

“বলো তুমি ।”

দিয়া কতক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললো,
“আসলে আমি একজনকে ভালোবাসি, খুব বেশি ভালোবাসি। ও আমাকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসে। ফেসবুকে ওর সাথে আমার পরিচয়। আমি যখন এখানে ছিলাম, ও অনেক বারই আমার সাথে এসে দেখাও করে গেছে। ও অনেক ভালো একটা ছেলে, চাকরি পেলেই আমাকে বিয়ে করবে বলেছে। ওর সাথে একদিন তোকে আর ধারাকে দেখা করাবো, দেখবি তোদের ও ওকে অনেক ভালো লাগবে। ওর সাথে মিশলে বুঝতে পারবি, ও কতোটা অমায়িক। ওর বাড়ি কুমিল্লায়। ওরা দুই ভাই বোন। ওর ছোট একটা বোন আছে ।”

অর্ক বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে সাব্বিরই দিয়ার বয়ফ্রেন্ড। ছেলেটা যে কত খারাপ তা তো ওর বোন জানে না, ওর বোনের চোখে সে কতো ভালো ছেলে সেজে আছে!
“আপু তুমি ওই ছেলের জন্যই কুমিল্লায় গিয়েছো তাই না?”

“অর্ক ভুল বুঝিস না আমাকে, ও আমাকে এতটাই ভালোবাসে যে, ও আমাকে না দেখে থাকতে পারে না। ওর পক্ষে তো প্রতিদিন কুমিল্লা থেকে খুলনা আসা সম্ভব না, তাই আমি কুমিল্লা কলেজে গিয়ে ভর্তি হয়েছি। ওই কলেজটা আমার পছন্দেরও ছিল আগে থেকে, তাই ও অনুরোধ করার পরেই রাজি হয়ে গেলাম। প্লিজ অর্ক বাসার কারো কাছে বলিস না কখনো ! সবাই আমাকে খারাপ ভাববে !”
অর্ক ভাবছে ওর বোনটা কী পরিমাণ বোকা! একটা ছেলে বললো, আর তাকে বিশ্বাস করে চলে গেল। কারো সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা করলো না, পরামর্শ নিলো না। এতটা ভরসা তার প্রতি, এতটা অন্ধ বিশ্বাস! যখন শুনবে তার ভরসার মানুষটা একটা চরিত্রহীন, তখন কেমন আঘাত পাবে!
“তোমার ঐ ভালো বয়ফ্রেন্ডের নাম সাব্বির তাইনা?”

দিয়া খুব উৎসাহী গলায় বললো,
“আরে হ্যাঁ, তুই জানলি কীভাবে ?”

“জানি তো আরও অনেক কিছুই ! শুনলে ঠিক থাকতে পারবে তো?”

“কী জানো তুই? তুই কি সাব্বিরকে চিনিস?”

“হ্যাঁ চিনি। আমার কথা গুলো তুমি ঠান্ডা মাথায় শুনো । যাকে তুমি এত ভালো ভালো বলছো, সে আসলে খুবই খারাপ একটা ছেলে। সে তোমাকে ঠকাচ্ছে ! ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে! সে একাধিক মেয়েদের সাথে রিলেশনে জড়িয়ে আছে। সে যেমন তোমার প্রতি ভালোবাসা দেখায়, তেমন অন্য মেয়েদের প্রতিও দেখায়।
তোমার আচরণে আমাদের সন্দেহ হয় দেখে, তোমার ফোনে সোমা টু নামে যেই নাম্বারটা আছে, সেটা নিয়ে কল দিই। দেখি সাব্বর। তারপর তার সাথে আমি ফেইক আইডি দিয়ে ফেসবুকে কথা বলি। তারপরই তার কুৎসিত চরিত্রটা সামনে চলে আসছে!

দিয়া রাগে দিশেহারা হয়ে গেল!
“শাট আপ অর্ক! সাব্বিরের সম্পর্কে আর একটা বাজে কথাও বলবি না তুই। তোর সাহস হয় কী করে আমার পিছনে গোয়েন্দাগিরী করার? সাব্বিরের নামে মিথ্যা ফেইক আইডির গল্প বানাবি, আর আমিও সেটা বিশ্বাস করবো? আমাকে বোকা পেয়েছিস তুই? সাব্বিরকে তুই আমাকে চিনিয়ে দিতে আসছিস? তোকে এত বছরে যে টুকু চিনেছি, তার থেকে অনেক বেশি ভালো করে সাব্বিরকে এক বছরে চিনেছি। ও আমার জন্য জীবন টাও দিতে পারবে।
ভালো পেয়ে তোর কাছে সব বললাম, আর তুই সাথে সাথে শত্রুতা শুরু করে দিলি! আসলে আমি ভালো থাকবো সেটা তোর সহ্য হয়না। আজ চিনে গেছি তোর আসল রূপ!”

অর্ক বোনের মুখে এমন কথা শুনে খুব অসহায় বোধ করতে লাগলো! বোনের ভালো চায় দেখেই কত কী করলো, আর সেই বোন ওকে যা ইচ্ছা তাই বলে দিলো! ওর কথা বিশ্বাস করেনি!
“আমি তোমার ভালো চাই, আমি কেন তোমার সাথে শত্রুতা করবো? এই চিনেছো তুমি আমাকে?
বিশ্বাস করো আমি মিথ্যা বলিনি। আমি প্রমাণ ও দিতে পারবো। আর ধারা আপিও সব জানে, তার কাছে জিজ্ঞেস করে দেখো আমি মিথ্যা বলি কিনা। সাব্বির ছেলেটা একটুও ভালো না, তার ম্যাসেজ গুলো দেখলেই বুঝতে পারবা ।”

“সাব্বিরের নাম আর মুখেও আনবি না তুই! আমি এখন ভালোই বুঝতে পারছি তুই আর ধারা হইলি বিচ্ছু। তোরা আমার ভালো দেখতে পারিস না। তোদের কত বড় সাহস আমার ফোন থেকে চুরি করে নাম্বার নিয়ে, তোরা কথা বলিস! তারপর আবার খুব সুন্দর করে ওকে নিয়ে গল্পও বানালি, কিন্তু আফসোস তোদের এই মিথ্যা গল্প কোনো কাজে লাগাতে পারলি না। বেরিয়ে যা রুম থেকে! আর হ্যাঁ, সাব্বিরের কথা যদি আম্মু, আব্বুর কাছে বলে দিস, তাহলে আমি আর আসবো না এখানে ।”

অর্ক রাগে ফেটে পড়লো! ইচ্ছা করছে সব ভেঙ্গেচূড়ে ফেলতে। ওর বোনটা এমন স্বার্থপর হয়ে গেছে! একটা বাজে ছেলের জন্য ওর সাথে কীভাবে খারাপ ব্যবহার করলো! ভেসে যাক সব কিছু! যাকে ভালো কিছু বললে বুঝে না, তাকে ও আর কিছু বলবে না।
সবার সাথে রাগ দেখালেও শুধু ওর বোন দুইটার সাথে কখনো রাগ দেখায় নাই। আর সেই বোন আজ ওর সাথে কেমন বাজে ব্যবহার করলো! রাগে অর্কর মাথা কাজ করছে না, হনহন করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। আবার ফিরে আসলো দিয়ার রুমের সামনে। তারপর বললো,
“আজ তো কিছু বিশ্বাস করলে না, যেদিন বিপদে পড়বে সেদিন মনে করবে আমার বলা কথা গুলো।”

“আমার কথা তোর আর না ভাবলেও চলবে, সর চোখের সামনে থেকে।”

অর্ক রুমে যেয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লো। মন মেজাজ সব বিষাক্ত হয়ে গেছে! আপন বোন হয়েও এরকম করতে পারলো!
এর মাঝেই ফোনটা বেজে উঠলো, দেখলো ধারা কল দিয়েছে। রিসিভ করলো না, ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখে চোখ বন্ধ করে রইল।

দিয়া ঠিক করলো কালকেই কুমিল্লা চলে যাবে। আর অর্ক কেও দেখে নিবে। যেদিন সাব্বিরের সাথে বিয়েটা হয়ে যাবে, সেদিন দেখবে অর্ক মুখ কোথায় লুকায়। সাব্বিরকে নিয়ে বাজে কথা বলে কত বড়ো সাহস !

চলবে…

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে