সুখময় বৃষ্টি পর্ব : ৭

0
990

সুখময় বৃষ্টি পর্ব : ৭
#লেখা : রায়না মনি

অর্কর সব কথা শুনে ধারা থ মেরে বসে আছে। সাব্বির ছেলেটা এত খারাপ! আর দিয়া আপু কিনা এই ছেলের জন্যই এত পাগলামি করলো।
অর্ক সাব্বিরের নাম্বারটা ফেসবুকে সার্চ দিতেই সাব্বিরের ফেসবুক আইডি পেয়েছিল। অর্ক মেয়েদের নামে একটা ফেইক আইডি খুলে এত দিন সাব্বিরের সাথে কথা বলেছে। কয়েক দিন কথা বলার পরেই সাব্বিরের কথা বলার ধরণ পাল্টে গিয়েছিল। ফোন নাম্বার চাইলো। অর্ক আরেকটা সিম কিনে পাশের বাসার একটা কাজিনকে দিয়ে কথা বলিয়েছে। দিয়া আপুর বড় সেই আপুটা। বিয়েও হইছে তার। কথা বলার পরে সাব্বির একেবারে পাগলামি শুরু করে দিলো। আজ সাব্বির প্রপোজ ও করেছে। এমনকি ঈদের দিন দেখা করার জন্যও আসতে চাচ্ছে।
কী রকমের বেয়াদব ছেলে একটা! দিয়া আপু তার জীবনে থাকতেও এসব করে বেড়ায় সে।

অর্ক ধারার কাছে জিজ্ঞেস করেছিল, ও এখন কী করবে?
ধারা বলেছে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অঝোরের কথা বললো অর্কর কাছে, তার কাছ থেকে পরামর্শ নিবে সেটাও বলেছে। অর্ক বলেছে অঝোর ভাইর সাথে পরামর্শ করে ওকে জানাতে।

সকালে ধারা ওর মায়ের ফোন থেকে অঝোরের নাম্বারে একটা ম্যাসেজ পাঠালো,
‘ আমি ধারা। আপনি কি এখন একটু আমাদের বাসায় আসতে পারবেন? এখন না আসলেও বিকালে কিন্তু অবশ্যই আসবেন। খুব জরুরী কথা আছে আপনার সাথে।’
ম্যাসেজ সেন্ট হওয়ার পরে ডিলিট করে দিলো।
দ্বিতীয় বার যখন অঝোর ওদের বাসায় আসছিল তখন ধারার মা, অঝোরের আর ওর মায়ের ফোন নাম্বার রেখে দিয়েছিল । ধারা অঝোরের নাম্বারটা নেয়নি। ওর ফোনে নাম্বার থাকলে, হয়তো কল দিতে ইচ্ছা করবে বার বার। আর কল দিয়ে কী আবোল তাবোল কথা বলবে তারও ঠিক নেই।
ধারা চাইলে মায়ের ফোন থেকে কল দিয়েই অঝোরের সাথে সব কথা বলতে পারতো, কিন্তু অঝোরকে দেখার লোভ সামলাতে পারলো না। একটা সুযোগ পেয়েছে অঝোরকে বাসায় ডাকার, অঝোরকে দেখার। এই সুযোগ কিছুতেই হাত ছাড়া করতে পারলো না। অঝোরটা ইদানিং ধারার সমস্ত কিছুতে জায়গা করে নিয়েছে। সারাক্ষণ শুধু অঝোরকেই মিস করে । ধারার ইচ্ছা করে সব সময় অঝোরকে দেখতে। কেন এমন হচ্ছে তা ধারা জানেনা, জানতেও চায়না। শুধু জানে অঝোরকে দেখতে পারলেই ধারা ভালো থাকবে।

অঝোর সকালে ঘুম থেকে উঠে রুবিনা আন্টির ফোন নাম্বার থেকে পাঠানো ম্যাসেজটা দেখতে পেল।
ধারার এমন কী জরুরী কথা আছে ওর সাথে? এমন ভাবে ডাকার মতো কী এমন ঘটলো? অঝোর খুব টেনশনে পড়ে গেল। ও কী একটা ম্যাসেজ দিবে? নাকি ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করবে কী হয়েছে? না থাক, ফোনে বলার মতো কথা হলে ধারা নিশ্চয়ই ফোনে বলতো।
ভাবলো বিকালে গিয়ে শুনে আসবে। কিন্তু মাথায় চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, তাই আর বসে থাকতে পারলো না । বেরিয়ে পড়লো ধারাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

ধারা আর অঝোর ধারার রুমের ব্যালকনিতে বসে আছে। ধারা সব কিছুই বুঝিয়ে বলেছে অঝোরের কাছে। অঝোর বললো,
“তা তোমরা এখন কী করতে চাইছো ?”

“আমরা এখনও কিছু ভাবিনি। আপনিই বলুন আমাদের এখন কী করা উচিত ? আমরা কী এখন সব কিছু বলে দেবো আপুর কাছে ? বেয়াদব ছেলেটার চরিত্রটা আপুর কাছে এখনই জানিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে আমার।”

“তা তো অবশ্যই বলবে। তবে আগেই এটা বলবে না যে, তোমরা তার রিলেশনের কথা জানতে পেরেছো। তোমরা ফেইক আইডি দিয়ে ছেলেটাকে পরীক্ষা করেছো।ছেলেটার আসল রূপ ধরতে পেরেছো।
আর সব থেকে বড় কথা তোমরা তো শিওর না যে, ওই ছেলেটাই তার বয়ফ্রেন্ড। তোমরা তো শুধু ধারণা করেছো। যদিও তোমাদের ধারণা হয়তো সঠিকই, তারপরেও।
আগে তার কাছে জিজ্ঞেস করবে, সে কারো সাথে রিলেশনে আছে কিনা? যদি স্বীকার করে তাহলে তো ভালো। আর যদি স্বীকার না করে তাহলে ওই ছেলেটার কথা বলে দেখবে, তার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়। ছেলেটার কথা শোনার পরে হয়তো স্বীকার করবে। তখন তোমাদের যা বলার বলবে। ওই ছেলের চরিত্র তার সামনে তুলে ধরবে। খুব সুন্দর করে তাকে ভালো মন্দ বুঝিয়ে বলবে। উত্তেজিত হয়ে সব কিছু আবার গড়বড় করে ফেলো না।”

ধারা এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে অঝোরের কথা গুলো শুনেছে। কত সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলো কখন কী করতে হবে।
“এখনই অর্ককে জিজ্ঞেস করতে বলি ।” বলেই অর্কর কাছে ফোন দিতে চাইলো।

“আরে থামো, থামো! এভাবে তাড়াহুড়ো করলে সমস্যা কমবে না বরং বাড়বে। শোনো আজকেই কিছু জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। জিজ্ঞেস করবে, তারপর ছেলেটার চরিত্রের কাহিনী বলবে তারপর বিশাল এক ঝড় বয়ে যাবে! এই ঝড়টার জন্য একটা সময় বেছে নিতে হবে।
আর কয়েকটা দিন পরেই ঈদ। এখনই এই ব্যাপারটা কিছুতেই তার সামনে আনা যাবে না। যা বলার সব ঈদের পর বলবে ।”
“কী বলেন ঈদের পর !”

“হ্যাঁ ঈদের পর। সে তো ঈদের পর দিনই কুমিল্লা চলে যাবে না তাই না? বলার জন্য যথেষ্ঠ সময় পাবে ।”

“না মানে এখনও তো কতদিন পরে ঈদ !”

“ধারা বাচ্চাদের মতো কথা বলো কেন? তোমরা কী চাও তার ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে যাক? এখন এসব শুনলে তার মনের অবস্থাটা কেমন হবে বুঝতে পারছো? কয়েকটা দিন পরেই তো ঈদ, অপেক্ষা করো। সব কিছু ভালোয় ভালো মীমাংসা করার চেষ্টা করো ।”

ধারা ভাবলো অঝোরের কথাই ঠিক । দিয়া আপু এখন এসব শুনলে তো ভালো থাকতে পারবে না, ঈদের জন্য তার শপিং ও করা হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তার বেয়াদব প্রেমিকটার ইতিহাস শুনিয়ে, তার ঈদের আনন্দ মাটি করার কোনো মানে নেই।
“না আমরা চাই ঈদটা সে ভালো ভাবে উপভোগ করুক। আসলে আপনার মতো আমি এরকম ভাবে ভেবে দেখিনি।
আমরা তো চাই ওই বাজে ছেলের থেকে আপু দূরে সরে যাক, কিন্তু আপু কি আদৌ দূরে সরে যাবে? যদি আমাদের কথা বিশ্বাস না করে?”
“বিশ্বাস না করার কী আছে, তোমরা তো তার শত্রু না। তোমরা হলে তার আপন মানুষ। তোমরা যে তার খারাপ চাইবে না, এতটুকু তো সে বুঝবে নাকি?”
“দেখি কী হয়।”

ধারা ফোন করে অর্ককে সব কিছু বুঝিয়ে বললো।
অর্ক খুব টেনশনে আছে, তার বোনটা শেষ পর্যন্ত এমন একটা ছেলের খপ্পরে পড়লো! যে ছেলেটা একটা গার্লফ্রেন্ড থাকতেও মেয়েদের সাথে সারাক্ষণ চ্যাটিং করে। এমনকি মেয়েদেরকে প্রেমের প্রস্তাব ও দেয়। দেখা করতেও আসতে চায়। ছেলেটা আবার ওর বোনের কোনো ক্ষতি করবে নাতো?

ঈদের দিন ধারা সেজে গুজে বসে আছে। অপেক্ষা করছে অঝোরের জন্য। ধারার সাজতে ভালো লাগে না, ন্যাচারাল থাকতেই ভালো লাগে। আজ একটু সাজগোজ করলো শুধু মাত্র অঝোরের জন্য।
আচ্ছা এই অঝোরটা এমন কেন? সে কি কিছু বুঝে না? আমার যে সারাক্ষণ তাকে দেখতে ইচ্ছা করে, তার কি একটুও দেখতে ইচ্ছা করে না আমাকে? ফোন করে না ডাকলে তো আসার কথা মনেই আনে না। কেউ একজন যে তার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকে তা হয়তো সে বুঝে না! কবে বুঝবে সে কে জানে !

অঝোর ওর ছোট বোনকে নিয়ে ধারাদের বাসায় আসলো। ধারা অঝোরকে দেখেই বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অঝোরের দিকে। অঝোর একটা সাদা পাঞ্জাবী পরেছে, আর সাদা পাজামা। সাথে মাতাল করে দেওয়ার মতো সেই সুন্দর চুল গুলো কপালে পড়ে আছে, শুভ্রতায় ছেয়ে আছে অঝোরের মুখখানি। অঝোরকে দেখতে এত সুন্দর লাগছে ধারা তা কোনো ভাবেই বর্ণনা দিতে পারবে না। মেয়েদেরকে তো সুন্দর লাগলে পরি বলা যায়, অঝোরকে কী বলবে?

অঝোর ধারার ভাবসাব দেখে একটু অবাক হলো। ধারা এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? মাঝে মাঝেই ধারা ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকে, আর অঝোর অস্বস্তিতে পড়ে যায়। অঝোরের তখন কী করা উচিত তা ভেবে পায়না।
আবার একদিন দেখলো ধারা ওর সামনেই আসেনি, রুমের ভিতর বসে উঁকিঝুঁকি মেরে ওকে দেখেছে।
ধারার মনে ঠিক কী চলছে?
এভাবে তাকিয়ে আছে বাসার লোকজন দেখলে কী ভাববে? সাথে ছোট বোনটা আছে, ক্লাস সিক্সে পড়ে। ও কী রেখে কী ভাবে কে জানে!
অঝোর এখন এই মুহূর্তটা কাটিয়ে উঠতে বললো,
“ধারা আন্টি কোথায় ?”

কথাটা শোনার সাথে সাথেই ধারার মনটা খারাপ হয়ে গেল! এতক্ষণ ধরে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করলো, আর সে এসেই বললো আন্টি কোথায়? কেন ওর সাথে কি একটু কথা বলা যায় না? এই যে মানুষটার জন্য অনেক দিন পর একটু সাজগোজ করলো, মানুষটা একটু ওর দিকে তাকিয়ে থেকে দেখতে পারে না ?
না সে তা করবে কেন, সে তো আবার অন্য জগৎ এর মানুষ মনে হয়।
“মা বাসায়ই আছে, ডেকে দেবো ?” কথাটা বলার পরেই ধারার চোখ পড়লো অঝোরের ছোট বোন অর্নির দিকে। আরে এই মিষ্টি মেয়েটাকে তো এতক্ষণ ও খেয়ালই করেনি। অর্নিকে টেনে নিজের কাছে নিলো। তারপর অর্নিকে নিয়ে উপরে চলে গেল, অঝোরের সাথে আর একটা কথাও বললো না।

চলবে…

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে