সুখময় বৃষ্টি পর্ব : ১২

0
982

সুখময় বৃষ্টি পর্ব : ১২
#লেখা : রায়না মনি

অঝোর ধারাকে এমন করতে দেখে ওকে ধাতস্থ করে বললো,
“তুমি নির্ভয়ে বলো ।”

ধারার নিজেরও মনে হলো ও এসব কী আবোল তাবোল বলছে। এই কথা কি কেউ এভাবে বলে ? কিন্তু ঠিক কী করে বলবে এই কথা অঝোরকে ? অঝোরই বা কী ভাববে? যা ভাবার তাই ভাবুক, আমার কথা আমি বলবোই। কিন্তু বলবো কী করে? ধারা একটু একটু করে সাহস সঞ্চয় করতে লাগলো। জোরে একটা শ্বাস ফেলে চোখটা বন্ধ করে ফেললো। নিজেকে বললো,
“বলে দে ধারা, বলে দে। এত কিসের ভয় বলে দে।”

ধারার মনে যেন সাহসটা একটু বেড়ে গেল। ধারা আবার নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো, বন্ধ চোখ খুলে ফেলল । শান্ত স্বরে বলতে লাগলো,
” প্রথম যেদিন আপনাকে গ্যারেজে দেখেছিলাম সেদিনই মনের মধ্যে একটা অন্য রকম অনুভূতি কাজ করেছিল। কিন্তু সেদিন ঠিক বুঝতে পারিনি অনুভূতিটা কী ছিল। ওই দিন গ্যারেজে আপনাকে দেখার পর থেকে আমার চোখ শুধু সারাক্ষণ আপনাকেই খুঁজেছে।
যখন চোখ বন্ধ করতাম, তখনও বৃষ্টিতে অপেক্ষারত আপনার মুখ খানি ভেসে উঠতো। আমি শুধু চাইতাম, আমি ভীষণ ভাবে চাইতাম যে বৃষ্টিতে অপেক্ষারত সেই মানুষটার সাথে আমার আবার একটু হলেও দেখা হোক। মাথা থেকে আপনার ভাবনা কিছুতেই সরাতে পারতাম না। কত যে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থেকেছি আপনাকে একটু দেখার আশায়। কিন্তু প্রতিবার আমি নিরাশ হয়েছি, আপনার দেখা মেলেনি! পড়তে বসলেও আপনার চিন্তা মাথায় ঘুরতো, আপনাকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগতো। খুব ইচ্ছে করতো আপনাকে একটু দেখার। ভেবেছিলাম আপনাকে আর একবার একটু দেখতে পারলে হয়তো, আপনার কথা কম মনে পড়বে। ইচ্ছাটা তো আমার পূরণ হলো, আপনাকে আমাদের বাড়িতেই আমি দেখতে পেলাম। কিন্তু আপনাকে নিয়ে আমার ভাবনারা থেমে যায়নি, বরং দেখার পরে ভাবনা আরও বেড়ে গিয়েছিল। সেদিন আপনাকে দেখার পর অনুভূতির পালাটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। পালাক্রমে অনুভূতি গুলো আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে শুরু করল। আপনি জানেন আপনার জন্য আমি প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম! আমার সবসময় ইচ্ছা হতো আমি আপনাকে দেখি। কিন্তু আপনাকে সবসময় দেখার সৌভাগ্য তো আমার হয়নি। কিন্তু যে সময় আমি আপনাকে দেখতে পেতাম সে সময় আমার মনে হতো, আমি যেন আমার জীবনে অনেক বড় কিছু পেয়ে গেছি। আমার বান্ধবী আমার এই অনুভূতির নাম কি দিয়েছিল জানেন? প্রেম। ও বলেছিল আমি নাকি আপনার প্রেমে পড়েছি !
কিন্তু আমি জানিনা আমি আপনার প্রেমে পড়েছি কিনা, আমি শুধু জানি আপনাকে দেখতে পারলেই আমার ভালো লাগবে। আপনি আমার জীবনে থাকলে আমি খুব সুখী মানুষ হবো।
আপনাকে নিয়ে আমি অনেক দিন ধরে একটা স্বপ্ন দেখছি। আমার স্বপ্নটা খুব বড় না।
আমি আপনার সাথে একদিন রূপসা নদীর তীরে ঘুরতে যাবো। আমি পরবো একটা সবুজ রঙের শাড়ি, আর আপনিও একটা সবুজ রঙের পাঞ্জাবী পরবেন।
আমি আপনার হাতটা ধরে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে, পড়ন্ত বিকেলে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করবো।
নিয়ে যাবেন না আমায় রূপসার তীরে ? করবেন না আমার স্বপ্ন পূরণ?
হবেন না আপনি সারা জীবনের জন্য আমার ?

কথা গুলো বলা শেষে সব কিছু নীরব হয়ে গেল।
এতক্ষণ ধারার কথার মাঝে অঝোর একটা কথাও বলেনি। আর ধারার কথা বলা শেষে এখনও অঝোরের দিক থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। কথা গুলো শুনে অঝোরের কেমন অবস্থা হয়েছে, সেটা দেখার জন্য ধারা খুব আগ্রহ নিয়ে অঝোরের দিকে তাকালো।
কিন্তু অঝোরের মুখ দেখে ধারা অবাক হলো! অঝোরের মুখের তেমন কোনো পরিবর্তন নেই, উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ধারা অঝোরকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,
“কী ব্যাপার এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন ?”

অঝোর ধারার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। অঝোরের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো! ধারার দিকে আবার তাকালো। কিন্তু এবার ওর চোখে উদাসী ভাব নেই, আছে এক গভীর করুণতার ভাব। অঝোর বলতে লাগলো,
“ধারা তুমি নিতান্তই বাচ্চা স্বভাবের। আর তাছাড়া তুমি বেশি বড় ও না, এখনও ছোট। তাই তুমি কিছু বুঝতে পারোনা। তুমি কোনোদিক বিবেচনা না করেই একটা কথা বলে ফেলো, কিন্তু সবাইকে তো এমন হলে হয় না।
যদি সবাই এমন ভাবেই সব করতে পারতো তাহলে পৃথিবীতে কোনো মানুষের ভিতরই আর ভেদাভেদ থাকতো না, থাকতো না কোনো দুঃখ-কষ্ট।
তোমার আমার ভিতর যদি কোনো একটা রিলেশনশীপ তৈরি হয় তাহলে তা কত দিনই বা থাকবে?
ধারা তোমার বয়সটাই এখন এমন, দেখা যায় এই বয়সের সম্পর্ক খুব একটা টিকে না।

আর সবচেয়ে বড় কথা হলো তোমার আমার সম্পর্ক টা যদি টিকেও থাকে, তাহলেও তোমার ফ্যামিলির লোকেরা কিন্তু এটা মেনে নিবে না!
আমি এখন একজন অনার্স পড়ুয়া ছেলে, ভবিষ্যতে আমার কর্ম জীবন কেমন হবে সেটা কেউই বলতে পারে না।
যদি আমার রোজগার কম থাকে তাহলে তোমাকে কিছুতেই আমার হাতে তুলে দিবে না!
এই মুহূর্তে এসব কথা তোমার পরিবারের লোকেরা শুনলে, রিলেশন শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যাবে। এখন তো তোমাদের সাথে আমাদের একটু যোগাযোগ আছে, দেখা যাবে এটাও চিরদিনের মতো শেষ হয়ে যাবে!
এখন তো আমার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছো, তখন দেখা যাবে দূর থেকেও তারা আমাকে দেখতে দিবে না তোমায় !
তোমাদের বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, টাকা পয়সার অভাব নেই। বাবা মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে তুমি । আর সেই তোমাকে কি আমার মতো ছেলের হাতে তুলে দিবে? আমাদের তোমাদের মতো এত কিছু নেই, আমার আব্বুর তোমার আব্বুর মতো এত বড় চাকরিও নেই! মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। আর আমি ভবিষ্যতে ঠিক কী চাকরি পাবো তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আমার যদি এখন বড় একটা চাকরি থাকতো, তবুও না হয় তোমার সাথে রিলেশনে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাতাম।
মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে নেই!
তুমিই ভেবে দেখো যদি ফ্যামিলির লোকেরাই সম্পর্ক মেনে না নেয়, তাহলে সে সম্পর্ক করে কী লাভ ? যদি কোনো সম্পর্ক মাঝপথে থেমে যায়, সে সম্পর্ক তৈরি করার কোনো মানেই হয় না!
না পাওয়ার কষ্টটা হয়তো কিছুদিন পোড়াবে, কিন্তু পেয়ে হারানোর কষ্টটা তার থেকে অনেক অনেক বেশি পোড়াবে!

আর হ্যাঁ একদম মন খারাপ করো না। তোমার অনুভূতিটা আজকে আমাকে নিয়ে এমন, পরে হয়তো দেখা যেতে পারে এর থেকেও অনেক বেশি সুন্দর অনুভূতি তোমার জীবনে আসবে।

ধারা এতক্ষণ চুপচাপ অঝোরের কথা গুলো শুনেছে একটা শব্দ ও করেনি। ধারা এতক্ষণ হা করে শুধু অঝোরের কথা গুলোই শুনেছে, কী বলেছে তা মাথায় নেয়নি। শুধু এটাই বুঝেছে অঝোর ওর এই অনুভূতি, স্বপ্নগুলো পূরণ করতে দিবে না! ওর পাশে থাকবে না !ধারার চোখটা ঝাপসা হয়ে গেল! একটা কথাও যেন মুখ থেকে বের হচ্ছে না। অঝোরের কথা শুনে যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে, নড়তেই যেন ভুলে গেছে। শ্বাস টাও আটকে আটকে যাচ্ছে!

অঝোর ধারার অবস্থা টা বুঝতে পারছে কিন্তু ওর কিছুই করার নেই! ধারার দিকে করুণ চোখে তাকিয়েই বললো,
“আই হোপ তুমি আমার কথা গুলো বুঝতে পেরেছো ।”

অঝোরের কথা গুলো ধারার কর্ণকুহরে পৌঁছালো না। ওর চোখটা দিব্যি জ্বলজ্বল করে আছে। চোখের পাতা নড়লেই যেন জলরাশিরা বাদ না মানা ভাবে গড়িয়ে পড়বে!
ধারার জ্বলজ্বল করা চোখ দুটো দেখে যেন অঝোরের চোখও কান্নায় ভেঙে পড়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অঝোর আর কিছুতেই এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। আর কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ওর চোখ থেকে যে পানি ঝরবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অঝোর কোনো রকম বললো,
“আমার তাড়া আছে যেতে হবে, আমি আসছি।”

ধারা কিছু বলবে কী বলবে না তার অপেক্ষা না করেই অঝোর পা বাড়ালো। ধারার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল অঝোরের চোখ থেকে। মনে মনে বলতে লাগলো,
“কিছু কথা চাপা রাখতে হয় সময়ের তালে। তুমি তোমার অনুভূতি গুলো প্রকাশ করে দিলে, আর আমি আমার অনুভূতি গুলো তোমার কাছে আদৌ কোনোদিন প্রকাশ করতে পারবো কী না জানিনা! আমিও যে তোমার ভাবনায় অনেক আগে থেকেই ডুবে আছি।
অনেক সময় দেখা যায় যে যা চায় সেটা পেয়েও হারায়। আবার অনেক সময়, অনেক কিছু পাওয়ার অপেক্ষায়ও থাকতে হয়, কোনো সু সময়ের আশায় ।
ভালো থেকো ধারা। বড্ড ভালোবাসি তোমায় !”

অঝোর চলে যাওয়ার সাথে সাথেই ধারা কান্নায় ভেঙে পড়লো। বুকের ভেতর প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে! অঝোর ওর স্বপ্ন পূরণের সঙ্গী হবে না, এটা ও ভাবতেই পারেনি! অঝোর কেন বুঝলো না ও অঝোরকে ছাড়া কিছুতেই ভালো থাকতে পারবে না! এই অঝোরটা এত নিষ্ঠুর কেন! ভালোবাসাটা বুঝার মতো মন অঝোরের নেই!
ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। ধারার চোখের পানি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে দিচ্ছে। ধারা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না, ধপ করে বসে পরলো। তারপর কষ্টে দিশেহারা হয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,
“তুমি নিষ্ঠুর অঝোর! তুমি খুব বেশি নিষ্ঠুর!
তুমি আমার অনুভূতি গুলোর মূল্য দিলে না! তুমি আমার ভালোবাসাটা বুঝতে চেষ্টা করলে না! তুমি আমায় এভাবে কাঁদিয়ে চলে গেলে! তোমার হৃদয় বলতে কিছু নেই, তুমি হৃদয়হীন !”

হৃদয় পুড়ে যাওয়া কষ্টে, আর কান্নার তোড়ে বিড়বিড় করার শক্তি টুকুও আর পেলো না ধারা। চোখে ঝাঁপসা অন্ধকার দেখতে পেলো, বসা থেকে লুটিয়ে পড়ে গেল ছাদে জমে যাওয়া পানির ভিতর!

অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর ধারা চোখ খুলে তাকালো। এখনও বৃষ্টি থামেনি। মাথাটা বেশ ভারী ভারী লাগছে।
ধারা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো, তারপর টলতে টলতে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে।

নিচে এসে দেখলো দরজা বন্ধ। কিন্তু কীভাবে সম্ভব? আব্বু আর মা কি এসে পরেছে? তাহলে ওকে ডাকলো না কেন? না মা আসলে ও কিছুতেই এভাবে ছাদে পড়ে থাকতে পারতো না! কিন্তু দরজা বন্ধ হলো কীভাবে? ধারা দ্রুত পায়ে দরজার কাছে গেল। গিয়ে বুঝতে পারলো, দরজা ভিতর থেকে লক করা না, বাইরে থেকে লক করা। এটা অঝোরই করে গেছে নিশ্চয়ই।
এখন আর কিছুই ভাবতে পারছে না, মাথার ভিতর খুব যন্ত্রনা হচ্ছে। রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলো, যত দ্রুত সম্ভব গায়ের এই ভেজা কাপড় পাল্টাতে হবে।

ধারা কোনোরকম পা চালিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। শরীর টা ভীষণ দুর্বল লাগছে, মনে হচ্ছে যেন পড়ে যাবে। ধারা রুমে এসেই চেয়ারে বসে পড়লো। শ্বাস টা আগের মতোই আটকা আটকা লাগছে, চোখের পানির রেশটুকুও মুছে যায়নি এখনও।

চলবে…

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে