সুখময় বৃষ্টি পর্ব:১৩

0
991

সুখময় বৃষ্টি পর্ব:১৩
#লেখা : রায়না মনি

ধারা নিজেকে সামলে ভেজা কাপড় ছেড়ে লং কামিজ আর প্লাজু পরে নিলো। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এক দণ্ডও দাঁড়াতে পারলো না। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো চাদর গায়ে দিয়ে। মনে পড়ে গেল অঝোরের কথা। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো আবার। অঝোরের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুম এসে চোখের পাতা দুটো বুজিয়ে ফেললো তা টের পায়নি ধারা।

কারো তীব্র কণ্ঠের স্বরে ধারার ঘুমটা ভেঙে গেল। অনেক কষ্টে চোখ খুলে দেখলো মা দাঁড়িয়ে আছে। ধারা বুঝতে পারলো না এখন সকাল না বিকাল। শরীরটা আগের মতোই খারাপ লাগছে যার কারণে উঠে না বসে শুয়েই রইল। রুবিনা বললো,
” দরজা ভিতর থেকে লক থাকার কথা ছিল। কিন্তু দরজা পেলাম বাইরে থেকে লক করা! কীভাবে এসব হলো? কে আসছিল? আর তুই নিচে ওভাবে রেখে উপরে এসে ঘুমিয়ে আছিস!

ধারার এখন কথা গুলো শুনে কেমন যেন খুব অসহ্য লাগছে! কিছুতেই অঝোরের কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তাই মায়ের কাছে এখন কিছু একটা বানিয়ে কোনো রকমের বলতে পারলেই হলো,
“মা লাইজু আন্টির পিচ্চি ছেলেটা আসছিল। ও বাইরে থেকে দরজা লক করে রেখে গেছে। ভিতর থেকে দরজা লক করতে আমার একদম খেয়ালই ছিল না ।”
কথা গুলো বলার সময় কেমন যেন কথা গুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল। স্পষ্ট ভাবে কিছুই শুনতে পেল না রুবিনা । রুবিনা একটু ঘাবড়ে গেল। কী হলো ধারার? এভাবে কথা বলছে কেন?
“ধারা কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”

ধারা অস্পষ্ট স্বরে বললো,
“না মা আমি ঠিক আছি।”
এবার রুবিনা কিছু বুঝতেই পারলো না। রুবিনা মেয়ের কাছে গিয়ে হাত ধরে টের পেল জ্বরে ধারার গা পুড়ে যাচ্ছে!
“এ কী অবস্থা হয়েছে তোর! জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে আর তুই কিছু বলছিস না আমার কাছে। কখন জ্বর আসলো?
বৃষ্টিতে ভিজছিস আজকে?”

“একটু ভিজছিলাম।”

“কত করে বললাম সাথে যেতে, গেলি না।
আবার এই অবস্থা নিয়েও চুপ চাপ পড়ে আছিস। দুপুরে খেয়েছিস?”
ধারা আর কিছু বলতেই পারলো না। কথা বলার শক্তি টুকু আর পাচ্ছে না। চোখ বন্ধ করে ফেললো।
মেয়ের এমন অবস্থা দেখে রুবিনা তড়িঘড়ি করে নিচে চলে গেল। ডাক্তার ডাকতে হবে।

আট দিন পরে ধারা একটু সুস্থ হলো। এমন জ্বর এর আগে কখনোই আসেনি ধারার। এতদিন অঝোরের কথা অতটা মনে পড়েনি, কারন নিজেই ছিল মরার মতো পড়ে। কিন্তু আজ একটু সুস্থ হতে না হতেই অঝোর আবার মনটা জুড়ে বসলো। এই অঝোরের কথা মনে পড়লেই শরীরটা আরও বেশি খারাপ লাগে ধারার। ধারা হাতের দিকে তাকিয়ে আছে করুণ চোখে। স্যালাইন দেওয়ার জন্য দাগ হয়ে গেছে হাতে। ধারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশে বসে থাকা অর্কর দিকে তাকালো। ধারা অসুস্থ শুনে অর্ক এসেছিল দেখতে। আজকেই চলে যাবে। ধারা যথেষ্ট শান্ত স্বরে বললো,
“তোকে একটা কথা বলবো অর্ক ।”
কথাটা ধারা শান্ত স্বরে বললেও একটা চাপা কষ্ট যেন গলাটা রোধ করে ফেলছে ক্রমশ।

অর্ক এতক্ষণ ধারার দিকেই তাকিয়ে ছিল। ধারার কথা শুনে বললো,
“হুম, বলো ।”

ধারার গলাটা কেমন যেন আটকে যাচ্ছে! চোখ দুটোও ভীষণ জ্বালা করছে! কান্নারা যেন বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ধারার গলাটা আটকা আটকা লাগলেও বললো,
“তোর মনে আছে আমি তোকে বলেছিলাম, যদি কোনো রিলেশনশীপে জড়িয়ে যাই তাহলে সর্বপ্রথম তোকেই জানাবো ?”

অন্য কোনো সময় হলে হয়তো অর্ক এই কথা নিয়ে বিভিন্ন ভাবে মজা নিতো। কিন্তু ধারার এই অবস্থা দেখে শান্ত ভাবেই বললো,
“হ্যাঁ বলেছিলে। তা কোনো রিলেশনে জড়িয়ে গেছো নাকি?”

ধারার চোখে পানি টলমল করে উঠলো। বুকের মাঝে এক তীব্র কষ্ট জমাট বেঁধে ফেলেছে। ধারা কোনো রকম বললো,
“রিলেশনে জড়াইনি। জড়াতে আর পারলাম কই! জড়াতে গিয়ে উল্টো আরও দূরে ছিটকে পড়লাম!”

অর্ক ধারার চোখে পানি দেখেই অবাক হয়ে গিয়েছিল, ধারার মুখে এমন কথা শুনে আরও বেশি অবাক হলো! এই রূপের ধারাকে ও আগে কখনোই দেখেনি।
অর্ক বিস্মিত কণ্ঠে বললো,
“মানে ?”

ধারার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো! চোখের পাতা দুটো বুজিয়ে ফেললো, সাথে সাথে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল চোখ থেকে। ধারা বহু কষ্টে চোখ দুটো খুললো। তারপর রুদ্ধ কণ্ঠে বললো, “অঝোর…”
ধারা শুধু অঝোর নামটাই উচ্চারণ করতে পারলো। আর যেন কোনো কথা মুখ থেকে বের হচ্ছে না। ধারা আর কোনো ভাবেই কান্নাটা চাপিয়ে রাখতে পারল না। কান্নারা যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে চোখ থেকে ঝরে পড়ার জন্য।
অর্ক নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে ধারার দিকে। কিছু বলতেই যেন ভুলে গেছে এই মুহূর্তে। আর অঝোর ভাইর কথা বললো কেন আপি? তাহলে কি অঝোর ভাইর সাথেই…

ধারা কাঁদতে কাঁদতেই বলতে লাগলো,
“অঝোর আমার ভালোবাসাটা বুঝেনি! আমার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই তার কাছে! আমি তার কাছে আমার অনুভূতি গুলো প্রকাশ করার পর, সে আমাকে কীসব হাবিজাবি কথা শুনিয়ে এড়িয়ে চলে গেল! থাকবে না সে আমার জীবনে!
আমি তাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবো না অর্ক!”

অর্ক ধারার কথা গুলো শুনে হতবাক হয়ে গেল! ধারাকে কী বলে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত অর্ক তা ভেবে পেল না।
আর ধারার মতো মেয়েকে কেউ রিজেক্ট করতে পারে অর্ক আগে কখনো ভাবেনি। অঝোর ভাই কি পাগল নাকি যে ধারা আপির প্রপোজ একসেপ্ট করেনি?
“আপি শান্ত হও, এভাবে ভেঙে পড়েছো কেন? কান্নাকাটি কোনো কিছুর সমাধান না। আচ্ছা অঝোর ভাইকে তুমি প্রপোজ করার পর সে কী বলে রিজেক্ট করে দিয়েছে?”

ধারা একটু নিজেকে সামলে নিলো। অঝোরের প্রতি এখন একটু রাগ ও লাগছে। অঝোর যা যা বলেছিল ধারাকে, ধারা তার কিছুই অর্ককে বুঝিয়ে বলতে পারবে না। ধারার মাথায়ই অঝোরের কোনো কথা ঢুকেনি, অর্ককে কী বলবে। ধারা যা বুঝেছে সেটাই অর্ককে বললো,
“সে কত কিছু বক বক করেছে। তার কথার তেমন কিছুই আমি বুঝতে পারিনি, তবে তার কথার ভাবভঙ্গি দেখে আমি এটা ঠিকই বুঝেছি যে, সে আমায় রিজেক্ট করেছে। থাকবে না সে আমার সাথে। আমাকে একা ফেলে রেখে সে চলে গেছে! আসলে কী বলতো আমার মনে হয় তার হৃদয় বলতেই কিছু নেই!”

“আমি কি কথা বলে দেখবো তার সাথে? আমি কথা বলে দেখি তার সমস্যাটা কোথায়।”

“নারে অর্ক সে তো আমাকে ফেলে রেখে চলেই গেছে। তার সাথে তুই আর কী বলবি! আর তাছাড়া তার কথা তোর মাথায়ও ঢুকবে না। সে কী বলে না বলে। লেকচার দেয় টিচারদের মতো। অনেক টিচার আছে না গম্ভীর স্বভাবের?
তারা শুধু ধমক ধামক দিতে পারে। অঝোর ও তো তেমনই! ভালোবাসাটা বুঝে না, সে শুধু লেকচার দিতেই জানে ।”

“নিজেকে স্ট্রং রাখো আপি। ভাগ্যে থাকলে সে তোমার কাছেই আসবে ।”

ধারা কিছুই বললো না, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

অর্ক আবার বললো,
“আপি আমাকে এখন যেতে হবে। নয়তো বাস ছেড়ে চলে যাবে । আসি আমি।”

“সাবধানে যাস। পৌঁছে ফোন দিস।”

অনেক অনেক দিন পার হয়ে গেছে। এত দিনের ভিতর অঝোরের না তো একটা কল এসেছে আর না তো একটা ম্যাসেজ। ধারা মনে মনে সব সময় চেয়েছে অঝোরের একটা হলেও কল বা ম্যাসেজ আসুক। কিন্তু আসলো না! ধারা রাগে কষ্টে নিজের মোবাইলটা আছাড় মারলো। চালাবে না আর মোবাইল। যে মোবাইলে অঝোরের কল ম্যাসেজ না আসবে, সে মোবাইল রেখে কী হবে? দরকার নেই মোবাইলের। ফেসবুক আইডি টাও অনেক দিন আগে নষ্ট করে ফেলেছে। কোনো কিছুরই আর দরকার নেই।
অঝোরের কথা ভেবে ভেবে লেখা পড়ার যেই হাল করেছিল, তার মূল্য ধারা চোখের পানি দিয়ে দিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে! A+ পায়নি, 4.80 পেয়েছে। তার জন্য আব্বু খুব বকেছে! যে আব্বু কোনো দিন একটা ধমক দেয়নি, সেই আব্বু বকেছে। রেজাল্টের পরে বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল, সব প্লান ভেস্তে গিয়েছে! সব হয়েছে অঝোরের জন্য, তার জন্যই তো লেখা পড়ার বারোটা বেজে ছিল।
ইন্টারে ভর্তি হওয়ার পরে ধারা আবার লেখা পড়ায় মনোযোগী হয়ে উঠলো। এরপর আর আব্বুর বকা খাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।

ধারা এখন খুব চেষ্টা করে অঝোরকে মন থেকে সরাতে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। অঝোর ধারার বুকের মাঝেই বসত গড়েছে মনে হয়। বৃষ্টি নামলেই অঝোরের স্মৃতি বড্ড পোড়ায় ধারাকে। বৃষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে ওর চোখেও বৃষ্টি হয়, সেটা কেউ দেখে না, কেউ জানে না!

বিকাল বেলা ধারা ড্রয়িং রুমে বসে আছে, পাশের বাসার কয়েকটা বাচ্চা ছেলে মেয়েও আছে ধারার সাথে। তাদের সাথেই ধারা এখন খেলনা নিয়ে খেলছে। কলিং বেলের শব্দ কানে আসতেই ধারার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই অসময় কে এলো? ধারা মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো। বাচ্চাগুলোর উদ্দেশ্যে বললো,
” তোরা খেলতে থাক, আমি দেখে আসি কে এসেছে ।”

ধারা দরজার কাছে গিয়ে ডোর ভিউতে উঁকি দিলো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। ধারা মনে মনে বললো,
“আশ্চর্য তো! কলিং বেল বাজলো অথচ বাইরে কেউ নেই।”
ধারা ব্যাপারটা বোঝার জন্য বললো,
“কে ?”
ধারার বলার সাথে সাথে বাইরে থেকে উত্তর এলো, “আমি…”
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার কণ্ঠ শুনে ধারা ভীষণ ভাবে চমকে গেল! এই কণ্ঠ যে ধারার খুব পরিচিত। কত কত দিন পরে আবার এই কণ্ঠটা শুনতে পেল। তাহলে কী…
ধারা আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়ালো না, দরজার কাছ থেকে দৌঁড়ে বাচ্চা গুলোর আছে চলে এলো। বললো,
“শোন, আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার পর তোরা দরজা খুলে দিবি। ঠিক আছে ?”
বাচ্চা গুলো এক সাথে বললো,
“ঠিক আছে ধারা আপু !”

ধারা আর দাঁড়ালো না, এক দৌঁড়ে নিজের রুমে চলে এলো। দরজাটা বন্ধ করে দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো। ধারার শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত গতিতে চলছে। ধুকপুকুনি টাও বেড়ে গেছে। এত দিন পরে আজকে আবার অঝোর আসছে ! ধারা কিছুতেই ভাবতে পারছে না। অঝোরের জন্য এত দিন কষ্ট হলেও আজকে অঝোর আসাতে যেন এক অন্যরকম আনন্দ হচ্ছে। কষ্ট গুলো আনন্দের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
ধারা অধীর অপেক্ষায় আছে কখন নিচ থেকে অঝোরের কণ্ঠে ‘ধারা’ ডাকটি শুনতে পাবে। অঝোর ওকে ডাকার সাথে সাথেই ও সবকিছু ভুলে গিয়ে অঝোরের সামনে যাবে ! ধারার মনে এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে!

অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। ধারা অধীর অপেক্ষায় ছিল এতক্ষণ। কিন্তু না তো ড্রয়িং রুম থেকে কোনো ডাক আসলো, আর না তো ওর রুমের দরজার কড়া নড়লো! তাহলে কি অঝোর ওর সাথে দেখা করবে না? ধারার মনে আবার কালো মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করলো!
অঝোর কি ওকে একেবারে ভুলেই গেল তাহলে?

চলবে…

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে