সম্পৃক্ততা পর্ব ৯

0
634

সম্পৃক্ততা – নবম পর্ব।

রিফাত হোসেন।

২২.
তানিশা বিকেলে যখন ছাদের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল, তখন তাঁর বাবা-মায়ের একসাথে আগমন ঘটল। দু’জনকে একসাথে দেখেই হকচকিয়ে উঠল তানিশা। অতটাও চমকে উঠত না, যদি সে সকালে নিজের পছন্দের মানুষের কথা মায়ের কাছে না বলতো। এখন মায়ের সাথে বাবা এসেছে মানে, মা সব জানিয়ে দিয়েছে তাকে। তানিশা বুঝতে পারছে, শীঘ্রই তাকে বিরাট অস্বস্তিতে পড়তে হবে।
পানি দেওয়া থামিয়ে কৌতূহলী কণ্ঠে বলল, – ‘ কিছু হয়েছে?’
তানিশার মা মেয়েকে কী যেন ইশারা করলেন। মুখে বললেন, – ‘ তাহমিদের কথাটা তোর বাবাকে বলেছি দুপুরে। তুই তখন ঘুমোচ্ছিলি বলে আর ডাকাডাকি করিনি। ঘুম থেকে উঠেই তো ছাদে চলে এলি। তাই আমরা এখন ছাদে চলে এলাম।’
বাবার দিকে তাকাতে পারল না তানিশা। মায়ের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিম্নস্বরে বলল, – ‘ মা, এই বিষয়ে পরে কথা বলব।’

পাশ থেকে ধমকে সুরে তানিশার বাবা বললেন, – ‘ পরে কেন?’
তিনি এখনো পুরোপুরি ভাবে বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর মেয়ের জামাই কিনা সামান্য ১০ হাজার টাকার চাকরি করে! একজন সাধারণ রিপোর্টার। এটা কী সহজে মানা যায়? এছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে; ছেলেটা পুরোপুরি অন্যরকম। দেখা গেল বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি থেকে তাকে কিছু দেওয়া হলো; বা একটা ভালো বেতনের চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো; সে তা নেবে না। বলবে, ‘অত টাকার চাকরি করে কী করব আমি? যার টাকা আছে, টেনশন তাঁর আছে। আমি ঝামেলাহীন মানুষ; আগেপিছে কোনো টেনশন নেই। অযথা বড় চাকরিবাকরি করে টাকার ভার নিবো কেন?’ এখানেই খ্যান্ত থাকবে না; আরও বলবে, ‘ টাকা তো আর কবরে নিয়ে যেতে পারব না। আমি মরে গেলে সেগুলো খাবে অন্যমানুষে। সারাজীবন টাকার ভার বয়ে শেষ সময়ে সেগুলো অন্যকে কেন খেতে দিবো? এর থেকে যেভাবে আছি, সেভাবেই ভালো। টাকা নাই, ঝামেলা নাই।’ আজব কথা! ওইরকম মানসিকতা যদি সবার থাকতো, তাহলে পৃথিবীতে বড়লোক শব্দটার উৎপত্তি হতো না। তাহমিদের এই কথাগুলো শুনে মানুষ হিসেবে তানিশার বাবা মজা পেলেও, মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে এইরকম কথাবার্তা তিনি আশা করেন না। কারণ ছেলেটার সাথে সেসময় তাঁর মেয়ে জড়িয়ে থাকবে।

তানিশা বলল, – ‘এখনই-বা কেন?’
– ‘ কারণ ব্যাপারটা যত দ্রুত সংশোধন করা যায়, ততই ভালো।’
– সংশোধন মানে?’ ভ্রু জোড়া উঁচু হয়ে গেল তানিশার।
তাঁর বাবা বললেন, – ‘ না মানে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া আরকি। তুই কি আসলেই তাহমিদকে বিয়ে করতে চাস?’
তানিশা একনজর মায়ের দিকে তাকিয়ে জবাবে বলল, – ‘ হ্যাঁ। কেন, তোমার মত নেই?’
– ‘ না মানে, একটু ভেবে দেখ। তোর উপর আমরা কখনো জোর খাটাইনি। কখনো খাটাবো-ও না।’ ইতস্ততবোধ করলেন তানিশার বাবা।
– ‘ জোর খাটানোর অধিকার তোমাদের আছে বাবা। তোমরা চাইলেই আমার ইচ্ছেকে অগ্রাহ্য করতে পারো। কিন্তু সেটার জন্য একটা যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে। তোমার যদি মনে হয় তাহমিদের সাথে আমার বিয়ে না হলে ভালো হবে, তাহলে এমন একটা কারণ দেখাও, যার জন্য আমি তোমাদের চাওয়াকে সম্মান করতে পারব।’ তানিশার কণ্ঠে দৃঢ়তা প্রকাশ পেলো স্পষ্ট।
তানিশার বাবা এবার আরও বিব্রত হলেন। তাড়াহুড়ো করে তাহমিদ সম্পর্কে নেগেটিভ কিছু ভাবতে লাগলেন। কিন্তু সেরকম শক্তপোক্ত কোনো নেগেটিভ কিছু বের করতে পারলেন না। মাথা চুলকিয়ে বললেন, – ‘ না মানে, ছেলেটা তো সেভাবে কিছু করতে পারেনি জীবনে?’
– ‘ পারেনি তো কী হয়েছে শুনি? ও কী বুড়ো হয়ে গেছে? সুযোগ পেলে অবশ্যই কিছু একটা করবে। তাছাড়া ব্যাংকে আমার একাউন্টে তো বেশ মোটা অংকের টাকা আছে। আমি অত বিলাশীতা করি না যে, এক মাসে সব শেষ করে ফেলবো। ওই টাকা এবং এখন যা রোজগার করছি, তা দিয়ে আমাদের এক জীবন পার হয়ে যাবে।’
– ‘ জীবনে টাকার প্রয়োজন যে কতটা, সেটা বুঝতে আরও কিছুটা সময় লাগবে তোর। যাই হোক, ছেলেটা খুব ভালো, তা আমি জানি। যদিও একটু সমস্যা আছে। তবুও তোর কথা ভেবে আমি দ্বিমত করছি না।’
বাবার কথা শুনে উত্তেজনায় বাবার পা ছুঁয়ে সালাম করল তানিশা। মা’কেও সালাম করল। ‘ইয়াহু’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠল।
মেয়ের কাণ্ড দেখে খিলখিল করে হেসে উঠলেন আফসানা বেগম এবং তানিশার বাবা। তানিশা কিছুক্ষণ পর আবার বলল, – ‘ যাক, অনুমতি তাহলে পেয়ে গেছি।’
– ‘আগেই লাফিও না। আগে ওদের সাথে কথা বলে নেই। আচ্ছা, তাহমিদ কী নিজেই তোকে বিয়ের কথা বলেছে?’ মেয়ের খুশি দেখে হঠাৎ আফসানা বেগম প্রশ্নটা করে বসলেন।
তানিশা ম্লান মুখে বলল, – ‘ আসলে মা, তাহমিদ জানেই না আমি বিয়েসাদী নিয়ে তোমাদের সাথে আলোচনা করছি।’
– ‘ কিহ্! মানে তুই একাই লাফাচ্ছিস; আর ওদিকে বর জানেই না তাঁর বিয়ে নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে।’
তানিশা হাসল। হেসে বলল,
– ‘ আসলে ও এইসব নিয়ে আলোচনা করতে চায় না। ও এখন বরিশাল আছে। ওর ভাবীর বোনের বিয়েতে। ফিরে এলে নাহয় ভাবীর সাথে তোমরা কথা বলো। আপাতত আমাকে যেতে দাও প্লিজ।’
তানিশার বাবার মুখটা ‘হা’ হয়ে গেলেন। নিজের মনেমনে বললেন, – ‘ হায় আল্লাহ! ও তাহলে বিয়ের কথা জানেই না। বিয়ের কথা শুনলে আবার না জানি কোন যুক্তি সামনে হাজির করে দেয়। হয়তো বলবে, জগতের সবাই যদি একটা সময় বিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে চিরকুমার থাকবে কে? কাউকে না কাউকে তো এর দায়িত্ব নিতে হবে। নাহলে শব্দটাই অচল হয়ে যাবে।’ কথাটা বলে নিজেই নিঃশব্দে হেসে উঠলেন তানিশার বাবা। তিনি অনেক আগে থেকেই তাহমিদকে খুব পছন্দ করেন। এটাও বলেছিলেন, তাহমিদকে একটা বড় পোস্ট-এ চাকরি দিবেন। কিন্তু তাহমিদ রাজি হয়নি। ‘বড় পোস্টের চাকরি মানে বড় বড় কাজ। এটা খুব কষ্টকর!’ ; এইরকম একটা যুক্তি দেখিয়ে এড়িয়ে গেছিল। তখন তানিশার বাবা হেসেছিলেন খুব। কিন্তু এখন তিনি চিন্তিত। এইরকম ছেলের হাতে মেয়েকে দেওয়াটা খুব রিস্কি হয়ে যাবে। সেজন্য তানিশার বাবা একটু বিভ্রান্তিতে আছেন।

– ‘ হ্যাঁ-রে, তাহমিদের বড় ভাই যেন কী করে?’ আফসানা বেগম প্রশ্ন করলেন হঠাৎ।
তানিশা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল; মায়ের প্রশ্ন শুনে থেমে গেল। ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, – ‘ চাকরি করে। উনি এখনো ঢাকাতেই আছে। অফিস থেকে ছুটি পায়নি। সকালেই তো আমার সাথে দেখা হলো।’
– ‘ তাই নাকি? কোথায় দেখা হয়েছিল?’
– ‘ বাড়ির সামনেই। আমি হঠাৎ করেই তাকে দেখেছি।’
– ‘ বাড়িতে নিয়ে এলি না কেন? তাহলে সকালেই আলাপকাল হয়ে যেতো।’
– ‘ আসলে মা, তুহিন ভাই তখন ওইরকম অবস্থায় ছিল না। সিএনজির সাথে ধাক্কা লেগে মাথা ফেটে গেছিল।’
তানিশার বাবা ফট করে বলে উঠলেন, – ‘ চোখে কম দেখে নাকি?’
আফসানা বেগম বললেন, – ‘ ওমা, এ আবার কেমন কথা? রাস্তাঘাটে চলার সময় একটু-আধটু এক্সিডেন্ট হয়-ই। সবাই তো আর তোমাদের মতো প্রাইভেট গাড়ি দিয়ে যাতায়াত করে না, যে রাস্তায় পা পড়বে না।’ আফসানা বেগমের কণ্ঠে প্রতিবাদীপক্ষ প্রকাশ পেলো। এতে আপ্লুত হলো তানিশা।
গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, – ‘ একদম ঠিক। বাবা, তুমি চুপ করো। আসলে তুহিন ভাই একটু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিলেন। তাকে দেখে তো আমি ঘাবড়ে গেছিলাম। দু’জন লোক ধরেছিল রেখেছিল তাকে। আরও একটা বিষয় খটকা লাগল আমার কাছে; ওই সময়টাতে তুহিন ভাইয় অফিসে থাকার কথা। অথচ তিনি উদভ্রান্তের মতো হাঁটছিলেন রাস্তা দিয়ে। তাঁর অফিস তো অনেকটা দূরে। সেই ঢাকায়। অথচ এলাকায়, মানে এই সাভারে হাঁটছিলেন। তাকে দেখেও কেমন যেন বিমর্ষ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, নিষ্প্রাণ একটা মানুষ। আমি তাকে নিয়ে ফার্মেসীতে গেলাম। ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিলো, মেডিসিন দিলো, অথচ সে একটা কথাও বলল না। এমনকি আমার সাথেও না। কিছু একটা বলা উচিত ছিল তাঁর।’
মেয়েকে থামিয়ে দিয়ে তানিশার বাবা আবার বলে উঠলেন, – ‘ চাকরিটাকরি খেয়ে ফেলেছে বোধহয়। আজকাল তো এইসব অহরহ হচ্ছে; চাকরি হারিয়ে লোকজন মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছে। উদাসীন হয়ে রাস্তাঘাটে হাঁটাচলা করে। ফলে এক্সিডেন্ট হয়।’
– ‘ বাবা, মানুষের সম্পর্কে নেগেটিভ মন্তব্য করাটা তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে দেখছি।’ কথাটা বলে ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল তানিশা।
বাবার কথা শুনে আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত হয়ে গেছে সে।
মেয়ের রাগ দেখে আফসানা বেগম স্বামীকে বললেন, – ‘ আহ্, তুমি যাও তো এখান থেকে। যেজন্য এসেছিলে, সেটা তো শেষ হয়ে গেছে, এবার যাও।’

তানিশার বাবা গেলেন না। এক চুল পরিমাণ জায়গাও পরিবর্তন করলেন না। সটান দাঁড়িয়ে থেকে একটু কেঁশে আবার বললেন, – ‘ ঠিক আছে। ভাইয়ের প্রসঙ্গ বাদ। আচ্ছা, তাহমিদ কী নেশাটেশা করে?’

– ‘না।’ মুখটা কঠিন করে জবাব দিলো তানিশা।
তাঁর বাবা আবার বললেন, – ‘ সিগারেট খায় নিশ্চয়ই।’
– ‘ না। সেটাও খায় না।’
– ‘ মিথ্যা কথা; আমি দেখেছি একদিন।’
কপাল কুঁচকালো তানিশা। তবে উত্তর দিলো না। তাঁর বাবা আবার বললেন, – ‘ বিয়েটা তো মেনে নিলামই। তাহলে আর মিথ্যাচার করছিস কেন? মিথ্যার আশ্রয় তো অন্যপক্ষ নেবে। তুই আমাদের পক্ষের মেয়ে হয়ে যদি ওদের হয়ে মিথ্যে বলিস, তাহলে তো আমাদের সাথে অন্যায় করা হবে।’
– ‘ যা সত্যি তাই বললাম বাবা। ও সিগারেট খায় না।’
– ‘ এটা তুই জানিস। কিন্তু আমি ভিন্ন কিছু জানি। তাহমিদ ভালো ছেলে, যার একটা প্রমাণ হলো, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ও মিথ্যে বলে না। যেমন আমি একদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাহমিদ, ‘তুমি কি ধুমপান করো?’ ও কিছুক্ষণ ইতস্ততবোধ করে আমাকে সত্যি বলেছিল, ‘ ধুমপান করি, তবে নিয়ম মেনে।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘ সেটা কীভাবে? মানে মানুষ নিয়ম মেনে আবার ধুমপান করে কীভাবে? আমি যতদূর দেখেছি, এটা খুব বাজে নেশা। একবার যাকে ধরে, নাজেহাল করে ছাড়ে। দিনে তাঁর বেশ কয়েকটা লাগবেই।’ ও বলেছিল, ‘ আমার ধুমপান করার নিয়মটা ব্যতিক্রম।’ আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারিনি। ও তাড়া দেখিয়ে চলে গেছিল।’
তানিশা ছোট করে ‘ওহ্’ বলল শুধু। তাঁর বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন,
– ‘তুই কী জানিস, ও এইরকম নিয়ম কেন করেছে?’
– ‘ হ্যাঁ। ঠোঁট কালো হয়ে যাওয়ার ভয়ে ও নিয়মিত সিগারেট খায় না। সপ্তাহে একটা৷ অথবা মাসে একটা।’
– ‘ একেবারে ছেড়ে দিলেই তো পারে।’
– ‘ ও চেয়েছিল সিগারেট খোর হতে। কিন্তু একসময় দেখা গেল, ওর মুখটা ফরসা হয়ে গেল। এখন তুমিই বলো, ফরসা মুখে কী কালো ঠোঁট মানায়? তাই ও সেভাবে ধুমপান করে না। একসাথে দুইদিন ব্যালেন্স করে চলে।’
– ‘ এতকিছু জানিস, অথচ আমাকে মিথ্যা বললি।’
– ‘ তো কী করব বলো? যখন আমাদের বিয়ে হবে, তখন তো ও সম্পর্কে তোমার মেয়ের জামাই হবে। আমি ওর স্ত্রী হয়ে কীভাবে তোমার সামনে ওর ইজ্জতভ্রষ্ট করি?’
আফসানা বেগম মুখ চেপে হাসলেন। তানিশার বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
– ‘ শুধু কী সিগারেট খায়, না আরও কিছু ইরেগুলার অভ্যাস আছ?’
– ‘ ও কী আরও কিছু বলেছিল তোমায়?’
– ‘না।’
– ‘ তাহলে ধরে নাও আর কোনো খারাপ অভ্যাস ওর নেই। থাকলে সততার খাতিরে সেটাও বলতো। ও নিজের সুরক্ষার জন্যই উল্টো পাল্টা কিছু খায় না। অগোছালো হলেও নিজের শরীরের যত্ন নেয়।’
– ‘ হুহ্, পাগলের আবার রূপচর্চা।’ তানিশার বাবা হাস্যকর গলায় কথাটা বললেন।

তানিশা রেগেমেগে এবার ফেটে পড়ল। চেঁচিয়ে বলল, – ‘ তুমি আসলেই খুব খারাপ একটা লোক। আমার সাথে আর কথা বলবে না তুমি। বিয়ের পরে আর তোমার বাড়িতেও আসবো না।’
তানিশার বাবা হেসে উঠলেন উচ্চস্বরে। হাসতে হাসতে বললেন, – ‘ শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ছাগলের চুল আঁচড়াবে, তাই তো? ঠিক আছে। আমার পক্ষ থেকে শুভ কামনা রইল।’

তানিশা আর দাঁড়াল না ছাদে। পানির বালতি রেখেই হনহনিয়ে চলে গেল। আফসানা বেগম রাগী কণ্ঠে বললেন,
– ‘ তুমিও না! অযথাই মেয়েটাকে রাগিয়ে দিলে। ধুর!’ কথাটা বলে আফসানা বেগম নিজেও তাড়াহুড়ো করে ছাদ ত্যাগ করলেন।

২৩.
নুপুর, সজলকে আশ্বস্ত করে বলল, – ‘ অযথাই চিন্তা করছ তুমি। আমি বললাম তো, বাবা আর তোমাকে বিয়ের কথা বলবে না। এখন যদি তুমি চলে যাও, তাহলে বাবা-মা কষ্ট পাবে। ভাববে, তাঁদের কথায় কষ্ট পেয়ে তুমি অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছ।’
– ‘ আমি তোমার বাবা-মায়ের কথায় কষ্ট পেয়ে এখান থেকে যাচ্ছি না নুপুর। উনারা তখন জানতো না বিষয়টা, তাই তোমাকে বিয়ে করার জন্য আমাকে বলেছে। বাট এখন তো সবাই জানে আমার সাথে অন্য একটা মেয়ের সম্পর্ক আছে। এটা তুমি তাঁদের বুঝিয়েছ। এর জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন আমি চাকরি করছি। তাই আমার মনে হয়, আমাকে একটা বাসা নিয়ে থাকতে হবে। দেখো, আসমাকে যে আমার পরিবার মানবে না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তাই আমি চাচ্ছি, আমি একটা বাসা ভাড়া নিবো। যাতে আসমাকে বিয়ে করে আমরা সেখানে থাকতে পারি।’
– ‘ এখানে থাকতে অসুবিধে কী? আমাদের এতবড় বাড়ি। মানুষ মোটে তিনজন।’

সজল আবার কিছু বলার আগেই আফজাল হোসেন ঘরের ভিতরে এলেন। সজলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, – ‘ কী ব্যাপার সজল, শুনলাম তুমি নাকি অন্য জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে চাচ্ছো?’
মামাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে গেল সজল। আমতাআমতা করে জবাবে বলল,
– ‘ আসলে মামা, ওখান থেকে আবার অফিসটা খুব কাছে। রোজ এত দূর থেকে যাতায়াত করতে কষ্ট হচ্ছে।’
– ‘ বাসা কী খুঁজে পেয়েছ?’
– ‘না।’ আস্তে করে জবাব দিলো সজল।
মামাতো বোনকে যতটা সহজে বিয়ের কথা বলতে পেরেছিল, মামাকে তা পারেনি৷ সেদিন সকালের ঘটনাটা জন্য নুপুরও অপ্রস্তুত ছিল। নুপুর যে সজলকে পছন্দ করে, সেটা তাঁরা জানতো। তাই হঠাৎ করেই বিয়ের কথা বলেছিল। পরে নুপুর তাঁদের বুঝিয়েছে। জোর করে বিয়ে দেওয়া যেতো হয়তো, কিন্তু পরিনতি ভালো হতো না। আফজাল হোসেনের অভিজ্ঞ চিন্তাধারা সহজেই বুঝে গেছে ব্যাপারটা। তাছাড়া যেখানে তাঁর মেয়ে নিজেই ব্যাপারটাকে সহজভাবে নিয়েছে, সেখানে তাঁর মাথা ঘামানো ঠিক না।

আফজাল হোসেন কড়া গলায় বললেন, – ‘ তাহলে আগে থেকে কীভাবে বলছ, অফিসের কাছাকাছি কোথাও বাসা পেয়ে যাবে তুমি?’
সজল বিব্রত হলো।
আফজাল হোসেন আবার বললেন,
– ‘ ঢাকা শহরে ব্যাচেলর বাসা পাওয়া অনেক ঝামেলার ব্যাপার। দেখো, তুমি কেন এখান থেকে চলে যেতে চাচ্ছো, তা আমি জানি। আসলে ভুলটা আমাদেরই হয়েছিল। শুধু নুপুরের ইচ্ছেতে তো সব হবে না, তোমার মতামতও নেওয়া প্রয়োজন। আমি না বুঝেই তখন বিয়ের আলোচনা করেছিলাম।’
– ‘ মামা, এগুলো আগের কথা। এখন এগুলো বলে দয়া করে আমাকে লজ্জা দেবেন না।’ কথাটা বলে মাথা নিচু করে ফেলল সজল।
আফজাল হোসেন বললেন,
– ‘শোনো সজল, তুমি এখানেই থাকো। আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলব। তুমি যাকে পছন্দ করো, তাঁর সাথেই তোমার বিয়ে হবে।’
– ‘ বাবা আমাদের সম্পর্ক মানবে না মামা। আপনাকে তো আমি বলেছি।’
– ‘ সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও। এখন মন দিয়ে চাকরিটা করো। ওদিকটা আমি দেখছি।’ কথাটা বলেই হাঁটা দিলেন আফজাল হোসেন।
নুপুর যাওয়ার আগে বলল,
– তোমার আর ওর মধ্যে আমি আসবো না। অতটাও খারাপ আমি নই। এইটুকু বিশ্বাস করো প্লিজ।’

নুপুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দরজার বাইরে আসতেই তাঁর চোখ থেকে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

২৪.
– ‘ আচ্ছা রাইশা, মানহার কথা মনে আছে তোর?’
– ‘ কোন মানহা? পেয়ারা আপার কথা বলছ?’ কোনো ভাবনা ছাড়াই বলে দিলো রাইশা।
– ‘হ্যাঁ।’ সম্মতি জানালো আসমা।

মানহা পাশের গ্রামের মেয়ে। নদীর ওপাড়ে ওদের গ্রাম। আসমা আর মানহা একই কলেজে পড়তো। মানহা নদী পাড় হয়ে এই গ্রামে আসতো; তারপর কলেজে যেতো। আসমার সাথে হঠাৎ পরিচয় হয়েছিল একদিন। মানহা পেয়ারা খেতে পছন্দ করতো, তাই প্রায়ই আসমাদের বাড়িতে আসতো পেয়ারা খেতে। রাইশার সাথেও এভাবেই পরিচয়। রাইশা তাকে পেয়ারা আপা বলে ডাকতো। এতদিন পর আজ হঠাৎ মানহাকে নিয়ে ছোট বোনের কাছে জিজ্ঞেস করছে কেন, তা আসমা নিজেও জানে না। হঠাৎ করেই তাঁর মনে হলো, মানহার একটু খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
আসমা আবার জিজ্ঞেস করতে যাবে, তখনই দেখল দরজার বাইরে তাহমিদ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে ক্ষিপ্ততা। তাহমিদকে হঠাৎ দেখেই আতঙ্কে উঠল আসমা। তাহমিদ পা বাড়িয়ে ভিতরে এলো। চুপচাপ গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে