সম্পৃক্ততা পর্ব ৭

0
530

সম্পৃক্ততা – সপ্তম পর্ব।

রিফাত হোসেন।

১৭.
উঠোনে বড় পাটিটা বিছানো হয়েছে। পড়ন্ত বিকেল। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। পাটিতে সবাই বসে আছে। পরপর তিনটে ঘর আছে এ বাড়িতে। সামনে আছে একটা বারান্দা, তাঁর সামনে বিশাল আকারের একটা দুয়ার। দুপুরে ফ্রেশ হয়ে সবার সাথে খাওয়াদাওয়া করেছে তাহমিদ। এখন সবার সাথেই বসে গল্প করছে।

হাফিজ উদ্দিন মেয়ে ফাতেমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– ফাতেমা, জামাই বাবাজি এলে খুব ভালো হতো।

ফাতেমা জবাবে বলল,
– বাবা, উনি কিছুদিন পর আসবেন। তাহমিদের অফিসের বসকে আমি চিনি। তাই ওকে বলে সহজেই তাহমিদের ছুটির ব্যবস্থা করতে পেরেছি। ওর ভাইয়ের অফিসে একটু বেশিই ঝামেলা। তাই হুটহাট করে ছুটি পাওয়া যায় না। উনি বলেছেন, বিয়ের আগে চলে আসবে।

– তা সে আছে কেমন?

ফাতেমা মৃদুস্বরে বলল,
– উনি ভালো আছে বাবা।

হাফিজ উদ্দিন কিছু বললেন না আর৷ ভাবতে লাগলেন নিজের সংসার জীবনের কথা। কত কষ্ট করে মেয়েদের বড় করে তুলেছেন। অথচ এখন মেয়েদের অন্যের ঘরে দিয়ে দিতে হচ্ছে। চাইলেও রোজ রোজ মেয়েদের মুখখানি দেখতে পারবেন না। কোনো উৎসব বা বছরে দুই একবার ঘুরতে আসা ছাড়া মেয়েদের একটু সঙ্গ দিতে পারবেন না। হঠাৎ করেই মেয়েগুলো এতবড় হয়ে গেল যে, তাঁদের পরের ঘরে দিয়ে দিতে হচ্ছে।

আসমা চুপচাপ বসে ছিল এক কোণায়। তাহমিদ আড়চোখে বারবার তাকে দেখছিল ; আর ভাবছিল, মেয়েটাকে কী বিয়েতে বাধ্য করা হচ্ছে? এইরকম কিছু হলে তো অন্যায় হবে। একজন মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে কিছু আছে। অন্য একজন মানুষ হয়ে, কারোর ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আসমার যদি বিয়েতে মত না থাকে, তাহলে জোর করে বিয়ে দিয়ে ওর বাবা-মা অন্যায় করছেন।
তাহমিদ বেশ কয়েকবার ভেবেছে কিছু বলবে। কিন্তু কী দিয়ে শুরু করবে, তা ভেবে পাচ্ছিল না। এবার হঠাৎ করেই তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল। সে একটু কেঁশে গলা পরিষ্কার করে নিলো। সবাই একসাথে তাকালো তাঁর দিকে। তুলি পাশ থেকে বলে উঠল,
– ভাইয়া কি গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ?

তুলির কথায় পাত্তা দিলো না তাহমিদ। সে আসমার দিকে তাকিয়ে প্রবল দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
– আসমা, আপনি অত গম্ভীর হয়ে বসে আছেন কেন?

আসমা চমকে উঠল হঠাৎ তাহমিদের কথা শুনে। কপাল ভাজ করে তাকিয়ে রইল। তাহমিদ পরক্ষণেই আবার বলে উঠল,
– আপনি কী এই বিয়েতে রাজি নন? মানে আপনাকে কী জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে?

তাহমিদের কথা শুনে তুলি পাশ থেকে আবার বলল,
– ভাইয়া, কাকে কী বলছ? আসমা আপুকে জোর করে বিয়ে দিতে যাবে কেন?

তাহমিদ তুলির দিকে তাকিয়ে বলল,
– না মানে, উনি কেমন চুপচাপ বসে আছেন। নববধূরা তো এইরকম থাকে না সাধারণত। বিয়ের আগে তাঁদের বেশ হাসিখুশি এবং আনন্দে থাকতে হয়।

তুলি হো হো করে হেসে বলল,
– ভাইয়া, বিয়ে হচ্ছে রাইশার, আর তুমি বলছ আসমা আপুকে, হা হা হা।

তুলির কথা শুনে থমকে গেল তাহমিদ। লজ্জাও পেলো বেশ কিছুটা। হাফিজ উদ্দিন, হুমাইরা, ফাতেমা উচ্চস্বরে হেসে উঠল তুলির কথা শেষ হতেই। আসমাও মুখ টিপে হাসল। তাহমিদ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অবাক কণ্ঠে বলল,
– মেজো কে রেখেই সেজোর বিয়ে হচ্ছে নাকি?

আসমা অদ্ভুত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো শুধু। তাহমিদ আবার বলল,
– এ কেমন কথা! ভাবী বলল, তাঁর বোনের বিয়ে। যেহেতু ভাবীর পর সিরিয়ালে আপনিই আছেন, তাই আর জিজ্ঞেস করিনি, কোন বোনের। দেখো কী কাণ্ড!

আসমা মুখ খুলে কিছু বলার আগেই হাফিজ উদ্দিন, তাহমিদের সাথে তাল মিলিয়ে বলে উঠল,
– এটাই ওকে বুঝায় কে? এই সামান্য একটা কারণে আমাকে কত মানুষের কথা শুনতে হচ্ছে। অথচ আজ যদি রাইশার আগে আসমা বিয়ে করতো, তাহলে লোকের বাঁকা কথাবার্তা শুনতে হতো না।

আসমা চোখ পাকিয়ে তাকালো বাবার দিকে। কিন্তু হাফিজ উদ্দিন মেয়ের চোখ রাঙানোকে অগ্রাহ্য করে আবার বললেন,
– তাহমিদ বাবা, তোমার মতো একটা ছেলে হাতের কাছে পেলে আমি আসমার বিয়েই আগে দিতাম। কিন্তু সে তো এমন একটা ছেলেকে পছন্দ করেছে, যে আমাদের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে। ছেলেটার নাম সজল মাস্টার৷ ওর দাদা আগে চেয়ারম্যান ছিল। ছেলে যেমনি হোক, বংশের একটা ব্যাপারস্যাপার আছে। আসমার সাথে তো আর সম্পর্ক শুধুমাত্র মাস্টারের সাথে হবে না; ওদের পুরো পরিবারের সাথে হবে। আমি নিশ্চিত, আমার মেয়েটা ওখানে দু’দিনও টিকটে পারবে না। অত্যাচার করে মেরে ফেলবে ওরা। ছেলেটার দাদাকে গ্রামের লোকজন ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান করছিল গ্রামের উন্নয়ন করার জন্য। অথচ সে এমন হারামজাদা ছিল যে, সারাজীবন খালি নিজের সম্পত্তি বাড়াইছে। এখন এমন অবস্থা হইছে যে, গ্রামের সবার যত সম্পত্তি আছে, ওগো একাই তাঁর থেকে বেশি সম্পত্তি আছে। এছাড়াও ওদের যা ব্যবহার। আল্লাহ মাফ করুক, ওইরকম পরিবারের ছেলের সাথে আমি মরে গেলেও নিজের মেয়ের সম্মন্ধ করব না।

আসমা রাগে গজগজ করছে। একজায়গায় বসে থেকেও ছটফট করছে সে। তাহমিদ আড়চোখে একবার আসমার রাগী মুখ দেখে হাফিজ উদ্দিনকে বলল,
– এটাই কী সমস্যা? মানে এই সমস্যা সমাধান হলেই কি আপনি ওই মাস্টারের সাথে আসমার বিয়ে দেবেন?

– না। আরও একটা সমস্যা আছে।

– কী?

– ওরা অনেক বড়লোক। ওরা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সাথে সম্মন্ধ করবে না।

তাহমিদ কী যেন ভেবে বলল,
– ওহ্। তাহলে এই দু’টোই সমস্যা।

ফাফিজ উদ্দিন বললেন,
– না। আরও একটা আছে। ওই মাস্টারও সুবিধার না। বাপ-দাদার মতো টাকার ক্ষিধে না থাকলেও চরিত্রে ঝামেলা আছে। দেখতে একেবারে বাংলা সিনেমার নায়কদের মতো। তাই এতদিন শহরে না গিয়া গ্রামে থেকে, গ্রামের মেয়েদের মাথা খাইছে।

এ-কথা শোনার পর আসমা আর বসে ছটফট করতে পারল না। বসা থেকে দাঁড়িয়ে, তেড়ে এলো বাবার সামনে। চেঁচিয়ে বলল,
– একদম চুপ বাবা। সবাই চুপ। আর কেউ যদি ওই মাস্টার বা মাস্টারের পরিবার নিয়ে কথা বলো, তাইলে সুই-সুতো দিয়ে সবার মুখ সেলাই করে দিবো। যত্তসব পাগলের কারখানা।

আসমা আর দাঁড়ালো না ওখানে। রেগেমেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তাহমিদ হাসল; সাথে যোগ দিলো ফাতেমা, তুলি আর রাইশা। কিছুক্ষণ পর সবাই আবার কথা বলতে লাগল ভিন্ন প্রসঙ্গে। কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়। আসমা ফিরে এলো না তখনো। তাহমিদ হঠাৎ বলল,
– আমি একটু গ্রামটা ঘুরে আসছি৷

তাহমিদ বেরিয়ে পড়ল।

১৮.
মানুষ একটা সময় নিজের ভুল বুঝতে পারে৷ কিন্তু ভুল শুধরে নিতে পারে না। কারণ ততক্ষণে আর সময় থাকে না। নদীর জল একজায়গায় আটকানোর জন্য যেমন বাধ দেওয়া হয়, তেমনি সম্পর্কে নিজেকে আবদ্ধ রাখার জন্য নিজেকে কন্ট্রোল করতে হয়। নিজেকে যেমন একজন সিদ্ধান্তকারী ভাবতে হয়, তেমনি একজন মতামতকারী ভাবতে হয়। অর্থাৎ সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করার জন্য নিজেকে একজন সঠিক সিদ্ধান্তকারী ভাবতে হবে। আবার যেকোনো বিষয়ে কাছের কারোর সাথে আলোচনা করতে হয়। শুরুতেই সিদ্ধান্ত নয়, মতামত জানাতে হয়।

বনানীর হাইওয়ে রোডের পাশে থাকা রেস্টুরেন্টে বসে আছে তুহিন এবং রাসেদ। রাসেদ পেশায় একজন উকিল। দু’জনের বন্ধুত্ব ইউনিভার্সিটি থেকেই। আজ অফিস যায়নি তুহিন। গতকালও যায়নি। যাওয়ার কোনোরকম ইচ্ছেও ছিল না। অবশ্য খুব শীঘ্রই এমন এক মুহূর্ত আসতে চলেছে, সে চাইলেও আর ওই অফিসে যেতে পারবে না। শুধু অফিস নয়, সে বাড়িতেও যেতে পারবে না। বাড়িতে যেতে তাঁর বিবেক বাধা দিবে। বিশেষ করে যখন ফাতেমা নামের নির্দোষ মেয়েটি বাড়িতে থাকবে। মেয়েটির সামনে দাঁড়ানোর মতো সাহস তুহিনের নেই। সে তাঁর সাথে খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছে।

ফাতেমা বাড়িতে নেই আজ দু’দিন হতে চলল। গতকাল সকালে ফাতেমা থাকাকালীন সময়ে তুহিন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু অফিসে যায়নি। ফাতেমা চলে যাওয়ার পরই সে আবার বাড়িতে ব্যাক করেছিল। সারাদিন বাড়িতে ছিল। সন্ধ্যায় হঠাৎ ডাক পড়ল তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকার। সে বিরক্ত হয়েছিল বটে, তবে না করতে পারেনি। গিয়েছিল এক রেস্টুরেন্টে। খাওয়াদাওয়া শেষে হঠাৎ মেয়েটা বলে উঠল, তাকে বিয়ে করতে হবে। অবাক কাণ্ড! এক বউ থাকতে নাকি আবার বিয়ে?
মেয়েটার সাথে তুহিনের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল বিয়ের আগে। এরপর মেয়েটার অন্য একজনের সাথে বিয়ে হয়ে যায়। তুহিনও ফাতেমাকে বিয়ে করে সংসার করতে থাকে। শুরু থেকে ফাতেমার প্রতি একটা সংকোচবোধ ছিল বটে, তবে আস্তে আস্তে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এর মাঝে হঠাৎ আবার চলে আসে মেয়েটা। সে জানায়, তাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছিল। তুহিন আবার মেয়েটার ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপর থেকে এভাবেই চলছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, সে নিজেই নিজের জীবনকে জটিল করে তুলছে।

রাশেদ চুপচাপ খাচ্ছিল এতক্ষণ। আর ভাবছিল বন্ধুর জীবনের জটিলতার কথা। অনেকক্ষণ পর এবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠল,
– দোস্ত, উকালতি করে কতোশত কেস ডিশমিশ করেছি। কিন্তু তোর এই কেসটা সত্যিই আমাকে বড্ড ভাবাচ্ছে।

তুহিন মাথা তুলে তাকালো রাশেদের দিকে। রাশেদের পরণে একটা সাদা রঙের শার্ট। সে কাজ থেকে সরাসরি এখানে এসেছে। হাতে কিছু ফাইলও আছে। এইসব অন্যায়মূলক কাজ নিয়ে একজনের উকিলের সাথে আলোচনা করার বোধগম্য তুহিনের হতো না, যদি রাশেদ তাঁর প্রিয় বন্ধু না হতো! তুহিন কোনো বাক্যকয় করল না। কফির কাপে চুমুক দিলো শুধু। রাশেদ বলল,
– একটা কথা বলতো, মেয়েটার সাথে কি তোর শারীরিক কোনো সম্পর্ক হয়েছে?

তুহিন চমকে উঠল রাশেদের কথা শুনে। ভীমড়ি খাওয়া কণ্ঠে উত্তর দিলো,
– আরে না না। ওইরকম কিছু হয়নি আমাদের মাঝে।

– তাহলে তুই মেয়েটার কথায় এত পাত্তা দিচ্ছিস কেন? সরাসরি বলে দে, তুই ওকে বিয়ে করতে পারবি না।

– বলেছি। তখন ও বলেছে, ওর কাছে আমাদের একসাথে যা ছবি আছে, সেসব ফাতেমাকে দেখিয়ে দেবে।

– তুই না বললি, ওর সাথে শারীরিক কোনো সম্পর্ক হয়নি৷ তাহলে ছবি কীসের?

– ওভাবে কোনো সম্পর্ক হয়নি। বাট যখন আমরা দেখা করেছি, তখন ও প্রায়ই আমাকে জড়িয়ে ধরতো, ছবি তুলতো৷ হাত ধরাধরি করে হেঁটেছি। সেসময়কার ছবিও তুলেছে। এখন সেসব ছবি দিয়েই হুংকি দিচ্ছে।

রাশেদ অবাক হলো। ব্যাপারটা আসলেই খুব জটিল। মেয়েটা যে খুব ধুরন্ধর, তা রাশেদ বুঝতে পারছে। সে বলল,
– তুই এখন কী করতে চাচ্ছিস?

– বুঝতে পারছি না। সেজন্যই তোর কাছে এলাম।

রাশেদ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
– ওকে কী তুই বিয়ে করতে চাচ্ছিস?

তুহিন নিঃশ্বাস আটকিয়ে বলল,
– না না। আমার বাড়িতে স্ত্রী, ভাই-বোন সবাই আছে। ওদের মুখ দেখাবো কীভাবে? তাছাড়া ফাতেমাকে ঠকাবো কীভাবে আমি?

– মেয়েটার সাথে সম্পর্ক করে তুই কী ফাতেমাকে ঠকাসনি? এখন ভালোমানুষি দেখালে তো চলবে না। বিয়ের আগে প্রেম করেছিস, সেটা আলাদা ব্যাপার। কিন্তু বিয়ের পরেও ওর সাথে সম্পর্ক করেছিস৷ এটাকে বলে পরকীয়া। তুই জানিস এটা কতবড় অন্যায়? ফাতেমা যদি তোর নামে মামলা করে, তাহলে তুই শেষ।

তুহিন উত্তর দিলো না। দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়ল। রাশেদ আবার বলল,
– মেয়েটার কী পরিবার নেই?

– আছে। ওর স্বামী আছে। আমার সাথেই চাকরি করে। ওর মাধ্যমেই তো আবার মেয়েটার সাথে আমার দেখা হলো। ওর স্বামীর সাথে আমার সম্পর্কটা ভালো; বন্ধুত্বপূর্ণ। তাই আমি ওর সাথে একদিন বাড়িতে গিয়েছিলাম। তখনই ওর স্ত্রীর সাথে দেখা হয়েছে।

রাশেদ হেসে দিলো এবার। খিলখিল করে হেসে বলল,
– আরে ইয়ার, তুই তো দেখি চারিদিক দিয়ে ফেঁসে গেছিস। তোদের এই প্রেমকাহিনী ফাঁস হলে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস সব হারাবি। আবার এমনও হতে পারে, ছেলেটা অফিসের কারোর সাথে এটা শেয়ার করল। এভাবে অফিসে ছড়িয়ে যাবে। এইসব খবর তো চাপা থাকে না। তখন অফিসে তোর ইজ্জতভ্রষ্ট হবে। এরপর জানবে তোর বউ। তারপর তোর ভাই, বোন। সবাই জানবে। তুই মামা শেষ। তাঁর থেকে বলিকি, সব তো শেষ হয়েই যাবে, তুই আগেই মেয়েটাকে বিয়ে কর৷ রোমান্স কর। যা হওয়ার তা হবে।

রাশেদ রসিক সুরে গড়গড় করে কথাগুলো বলে আবার হাসতে লাগল। আশেপাশের দুই-একজন বাঁকা চোখে তাকালেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তুহিন হুংকার ছেড়ে বলল,
– ধুর শালা! আমি আছি বিপদে, আর তুই ফাজলামি করছিস। মজা কম নিয়ে আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার কর।

রাশেদ হাসি থামিয়ে বলল,
– তুই এই বিপদেই জড়াতি না, যদি স্ত্রীকে নিজের মনে জায়গা দিতি।

রাশেদকে সমর্থন করে বলল,
– এটা ঠিক বলেছিস। ফাতেমার সাথে আমার সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক না। ও আমাকে আপনি বলে ডাকে। আমিও খুব একটা কথা বলি না। দেখছিস না, বিয়ের পর এতবছর হয়ে গেল, অথচ আমাদের সন্তান নেই৷ আসলে সেরকম কোনো চিন্তাভাবনা আমি করিনি। ও নিজেও লজ্জায় কিছু বলেনি।

– তোরা কী সাংসারিক জীবনে অসুখী?

– না। ও আমায় খুব ভালোবাসে। মেয়ে মানুষ, একটু-আধটু লজ্জা তো পাবেই। আমি নিজেই ওর সাথে সহজ হতে পারিনি। ও মেয়ে হয়ে কীভাবে হবে বল? তবে আমাদের মধ্যে এই নিয়ে কখনো মনমালিন্যতা হয়নি। ও খুব ভালো একটা মেয়ে।

– এইরকম একটা মেয়েকেই তুই দিনেরপর দিন ঠকিয়ে যাচ্ছিলি। ভাবতে পারছিস, কতবড় অন্যায় করেছিস। বিয়ে হওয়ার পরেও পুরোনো প্রেমিকার সাথে সম্পর্ক রেখেছিস, এটা খুব বড় অন্যায়। দেখ, এইসব ফাঁস হলে ওই মেয়েটার কী ক্ষতি হবে জানি না, কিন্তু তোর আর ফাতেমার অনেক ক্ষতি হবে। স্ত্রীকে একটু গুরুত্ব দিতে শিখ। আবার সম্পর্কে জড়ানোর আগে তোর উচিত ছিল, ফাতেমার পরামর্শ নেওয়া।

– ধুর, ওর পরামর্শ নিলে আরও ঝামেলা হতো৷ ও কী আমায় বলতো, যাও, তুমি ওর সাথে প্রেমে করো! রাশেদ তুই খুব বোকা উকিল।

রাশেদ হাসল। হেসে বলল,
– এখন কী মনে হচ্ছে না, পুরোনো প্রেমিকার সাথে আবারও সম্পর্কে না জড়ালেই ভালো হতো?

তুহিন মাথা নাড়ল। রাশেদ আবারও বলল,
– এবার বল, আমি বোকা উকিল, না তুই বোকা স্বামী?

তুহিন নিজের মনে বলল,
– বোকা স্বামী!
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
– সেসময় যদি তুই নিজের স্ত্রীর কাছে পরামর্শ নিতি, তাহলে আজ এইরকম একটা জটিলতায় জর্জরিত হতি না। আমার বাড়িতে স্ত্রী আছে। আমি জানি স্ত্রী কেমন হয়! দেখ, একটা স্ত্রী নিজের ভালো কতটা বুঝে তা আমি জানি না, কিন্তু একজন স্ত্রী তাঁর স্বামী এবং সন্তানের ভালো যেভাবে বুঝতে পারে, তা পৃথিবীর অন্য কেউ পারে না। তোর ওই গালফ্রেন্ডকে আমি স্ত্রী বা নারী বলেই ভাবি না। যে মেয়ে তাঁর স্বামীকে ঠকায়, সে আবার কেমন স্ত্রী! ও জাস্ট একটা মেয়ে। স্ত্রী অথবা নারী শব্দের গভীরতা খুব বেশি। তুই যদি ফাতেমার কাছে পরামর্শ চাইতি, তাহলে ফাতেমা সঠিক কাজটাই করতো৷ তোকে আগলে রাখতো। তোদের মধ্যে যে দূরত্বটা ছিল, ও নিজেই সেটা পূরণ করে দিতো। ফলে কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগই পেতি না তুই। ঠিক কি না বল?

তুহিন মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। রাশেদ আবার বলল,
– তুই যে আবার কোনো ভুল না করে আমার কাছে সবটা শেয়ার করেছিস, এতে আমি খুশি হয়েছি৷ এটা করে তুই নিজেই নিজের উপকার করেছিস। শোন, মেয়েটা যদি তোকে সত্যিই ভালোবাসতো, বা একজন ভালো মানুষ হতো, তাহলে নিজের স্বামীকে ঠকিয়ে তোর জীবনটা ধ্বংস করতে আসতো না। আবার তোকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করতেও চাইতো না। তুই নিজে যে অপরাধ করেছিস, তাঁর জন্য আল্লাহ তোকে ক্ষমা করবেন কিনা জানি না। কিন্তু যদি আমার পরামর্শ শুনিস, তাহলে হয়তো স্ত্রীর কাছে ক্ষমা পেতে পারিস। শুনবি আমার পরামর্শ?

– শুনবো।

– বেশ। তাহলে শোন, তুই এখন সরাসরি বরিশাল যা। যেভাবেই পারিস, কালকের মধ্যেই ওখানে চলে যা। তারপর ফাতেমার কাছে সব স্বীকার কর।

তুহিন হকচকিয়ে বলল,
– বলিস কি! ফাতেমাকে বললে, ও তো চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে। ও খুব রাগী, আমি দেখেছি ওর রাগ।

রাশেদ হেসে আবার বললাম,
– বললাম না, নিজের স্বামীর ভালো একজন স্ত্রীর থেকে কেউ ভালো বুঝবে না। তুই যদি এখন নিজে থেকে ওর কাছে সব অন্যায় স্বীকার করিস, তাহলে ও ভাববে, তুই নিজের ভালো বুঝতে পেরে ওর কাছে ক্ষমা চাচ্ছিস। ফলে ও তোকে স্বামীর জায়গায় থেকে না সরিয়ে স্ত্রী হিসেবে তোকে সাপোর্ট দিবে। কিন্তু ও যদি নিজে থেকে কখনো এইরকম কঠিন সত্যি জানতে পারে, তাহলে ভাববে তুই ওকে স্ত্রীর জায়গাটা কখনো দিসই তো। ফলে ও রেগেমেগে উল্টো পাল্টা কিছু করবে। তুই যদি স্ত্রীর সাথে মিশতি, তাঁর সাথে মন খুলে কিছুক্ষণ কথা বলতি, তাহলে স্ত্রীর মর্ম বুঝতে পারতি। একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর জন্য কতটা কী করতে পারে, তা কখনো বুঝার চেষ্টা করিসনি তুই। সেজন্য আজ এই অবস্থা। শোন, যদি নিজের ভালো চাস, তাহলে আমার কথা শোন, ফাতেমার কাছে যা। দু’জনে একান্তে কিছুটা সময় কাটা। তোর মনে ওর প্রতি যে দূরত্ব আছে, সেটা পূরণ করে দে। আমার বিশ্বাস, ও নিজে থেকেই কিছুটা অনুমান করতে পারবে। নিজেই তোকে জিজ্ঞেস করবে, কী হয়েছে। বিপদের সময় স্ত্রী-সন্তানের থেকে বড় শক্তি পৃথিবীতে আর কিচ্ছু নেই।

– আমার চাকরি! আমি তো এখনো ছুটি পাইনি। ইনফ্যাক্ট এখনো আবেদন করিনি।

– এইসব জানাজানি হলে তুই এমনিতেও চাকরিটা করতে পারবি না। একবার ভাব, তোর সেই বন্ধুর কাছে তোর জায়গাটা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। ওর সাথে কী একই জায়গায় কাজ করতে পারবি আর?

তুহিন নিশ্চুপ। রাশেদ আবার বলল,
– এদিকের ব্যাপারটা আমি দেখে নিবো। দেখ, সেরকম ভাবে কোনো অঘটন ঘটাসনি তুই, তাই মেয়েটা মামলা-টামলা করলেও খুব একটা সুবিধে করতে পারবে না। তবুও যদি কিছু করে, আমি দেখে নেবো। এইরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। সবাই তো আর আমার কাছে পরামর্শ চায়নি। তুই চেয়েছিস, তাই তোকেই বললাম। আমার বিশ্বাস, তোরা সুন্দর একটা জীবনে ফিরতে পারবি। এখন তুই শ্বশুর বাড়ি যা। সব স্বাভাবিক হলে আবার যখন ফিরে আসবি, তখন চাকরির ব্যবস্থা করা যাবে। আপাতত নিজের যা জমানো আছে, তা দিয়ে চলাফেরা কর।

তুহিন সমর্থন করল রাশেদের কথায়। দু’জনে আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে নিজেদের গন্তব্যে যাওয়া শুরু করল।

১৯.
– ‘আচ্ছা, আপনি কাউকে ভালোবাসেন?’
আসমার প্রশ্নে ভ্রু-কুঁচকে তাকালো তাহমিদ। কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো,
– ‘হ্যাঁ।’
আসমা অবাক হলো। যদিও অবাক হওয়ার মতো কিছু বলেনি তাহমিদ। তবুও সে অবাক হতে বাধ্য হলো। এইরকম এলোমেলো একটা মানুষের জীবনে ভালোবাসা থাকতে পারে, তা ভাবেনি সে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
– ‘কতটা ভালোবাসেন তাকে?’
– ‘অনেকটাই। পরিমাপ করার যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয়নি। আবিষ্কার হলে আমি তা দিয়ে ভালোবাসা পরিমাপ করে আপনাকে জানাবো।’
আসমা ফিক করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
– ‘ তবে এই যন্ত্রের আবিষ্কারককে অবশ্যই প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা হতে হবে। কোনো সাধারণ মানুষ এই যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারবে না। সারাজীবন চেষ্টা করবে, আর ভীমড়ি খাবে।’
এ-কথা বলে উচ্চস্বরে হেসে উঠল আসমা। তাহমিদ অবাক চোখে দেখল আসমাকে। কী স্নিগ্ধ হাসি মেয়েটার! তানিশাও মাঝে মাঝে জোরে জোরে হেসে ওঠে। তাহমিদ কখনো মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে তানিশার হাসিমাখ মুখটা দেখেনি। অথচ তাঁর উচিত ছিল, একবার অন্তত দেখা। যে মেয়েটাকে তাকে এত ভালোবাসে, তাঁর হাসিমাখা মুখটা দেখল না, অথচ অন্য একটা মেয়ের দিকে সে ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে। খুব আফসোস হচ্ছে তাহমিদের।

সকাল ৭ টা ৩০ মিনিট। আকাশ কিছুটা মেঘলা। তবে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আসমার একটা বাগান আছে। ফুলগাছ সহ আরো অনেক গাছই আছে সেখানে। রোজ সকালে বাগানের গাছগুলোতে পানি দেয় আসমা নিজেই। মাঝে মাঝে রাইশা সাথে আসে। তবে আজ এসেছে তাহমিদ। তাহমিদ যে এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, তা ভাবনার বাইরে ছিল আসমার।
ছোট গোলাপ গাছটাতে পানি দিচ্ছিল আসমা; সেসময় তাহমিদ আবার বলে উঠল,
– ‘আপনি সজল মাস্টারকে খুব ভালোবাসেন, তাই না?’
– ‘ হ্যাঁ, খুব।’ মুচকি হেসে জবাব দিলো আসমা।
তাহমিদ আবার জিজ্ঞেস করল,
– ‘সবাই দেখছি আপনাদের এই সম্পর্কের বিপক্ষে। মানে কেউ আপনাদের পক্ষে নেই।’
– ‘না থাক; তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।’
– ‘আমার জীবনে যে ভালোবাসাটা আছে, তাঁর পক্ষেও কেউ নেই। সবাই আমার ভালোবাসার বিপক্ষে। এমনকি আপনি যদি আমার ভালোবাসার সম্পর্কে সবকিছু জানেন, তাহলে আপনিও বিপক্ষে চলে যাবেন।’
– ‘কক্ষনো না। আমি আপনার ভালোবাসার পক্ষে আছি, এবং থাকবো।’ বেশ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে কথাটা বলল আসমা।
তাহমিদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
– ‘আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর আপনি আমার বিপক্ষে চলে যাবেন। এমনকি আমাকে পাগল বলবেন।’
– ‘ ধুর! আপনি সুস্থ একজন মানুষ। আপনাকে আমি পাগল বলতে যাবো কোন দুঃখে. আপনি বলুন দেখি, আপনার সেই ভালোবাসার মানুষটির নাম কী?’
– ‘ ওর কোনো নাম নেই। তবে একটা সংখ্যা আছে।’
আসমা চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– ‘ সংখ্যা মানে; মানুষের নাম নেই, অথচ সংখ্যা আছে! এ আবার হয় নাকি।’
– ‘যা সত্যি তাই বললাম। সংখ্যাটি হলো, ‘009’। এটা অবশ্য মোবাইল নম্বর। যেহেতু ওর কোনো নাম নেই, তাই ওর পরিচয় হিসেবে আমি ‘009’ ব্যবহার করি।’
আসমা রাগে চোখ-মুখ লাল করে বলল,
– ‘আপনি কী পাগল? এইরকমটা হয় নকি। পাগল ছাড়া এই ধরনের কথা কেউ বলতে পারে।’
আসমার কথা শুনে জোরে হেসে উঠল তাহমিদ। আসমা কী যেন বুঝতে পেরে নিজের ভুল শুধরে নিয়ে বলল,
– ‘ না না, ঠিক পাগল না। আপনি একজন নির্বোধ মানুষ। সংখ্যা কারোর পরিচয় হতে পারে না। নিশ্চয়ই তাঁর একটা ভিন্ন পরিচয় আছে। আচ্ছা, সে থাকে কোথায়?’ কথা বলার সময় আসমার মুখ কপট বিব্রত দেখালো।
তাহমিদ দ্রুত বলল,
– ‘আমার মস্তিষ্কে ওর বসবাস।’
তাহমিদের কথা শুনে আসমার মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল। চোখ বড় করে বলল
– ‘ হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি? দেখুন, সহজ বিষয়টিকে আপনি জটিল করছেন।’
তাহমিদ হাসল। হেসে বলল,
– আমি সহজ বিষয়টিকে জটিল করছি বা। এই ‘009’ একটি সংখ্যা। এই সংখ্যার নম্বর থেকে একটা মেয়ে ফোন দেয় আমাকে। সবাই এটাকে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলে তাচ্ছিল্য করলেও আমি এর থেকে দূরে যেতে পারিনি৷ আপনি সজল মাস্টারের থেকে দূরে যেতে পারেননি, কারণ আপনি তাকে ভালোবাসেন। আমিও বোধহয় এই ‘009’ পরিচয়ের মেয়েটিকে ভালোবাসি বলেই তাঁর থেকে দূরে যেতে পারিনি। আপনি সজল মাস্টারকে ঠিক যতটা ভালোবাসেন, আমার মনে হয় আমিও ওই মেয়েটিকে ততটাই ভালোবাসি। কারণ আমরা কেউ নিজেদের ভালোবাসা থেকে দূরে যেতে পারেনি। ভালোবাসার জন্য সবার অবাধ্য হয়েছি।

চারিদিকে আঁধার নেমে আসছে। মেঘ গর্জন নিয়ে উঠেছে। আকাশের মেঘলা ভাবটা ঘন হয়ে এসেছে। আসমা তাগাদা দিয়ে বলল,
– ‘এক্ষুনি বৃষ্টি নেমে পড়বে। বাড়ি চলুন তাড়াতাড়ি।’

আসমা হাঁটা দিলো। ভেবেছে তাহমিদ তাঁর পিছনেই আসছে। কিন্তু তাহমিদ নড়ল না এক-পা ও। স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আকাশের দিকে তাকালো।
মিনিট কয়েক পরেই ঝুমঝুম করে
বৃষ্টি নামল। তাহমিদ আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে