সম্পৃক্ততা পর্ব ৩

0
568

সম্পৃক্ততা — তৃতীয় পর্ব।

রিফাত হোসেন।

৭.
খাবার টেবিলে তুহিনকে দেখেই তাহমিদের হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে মলিন হয়ে গেল। উজ্জীবিত মুখটাতে আঁধার নেমে এলো। তুহিনের পাশে বসে আছে ফাতেমা আর তৃষ্ণা। তাহমিদ কপাল কুঁচকিয়ে সবাইকে একনজর দেখে চেয়ারে বসল। প্লেটে ভাত নিলো নিজেই। হঠাৎ তুহিন বলে উঠল,
– তুই কি ঠিক করেই নিয়েছিস এ জীবনে আর শুধরোবি না?

তাহমিদ মাথা তুলে তাকালো তুহিনের দিকে। তুহিনের চোখে-মুখে ক্ষিপ্ত ভাব। তাহমিদ আড়চোখে তৃষ্ণার দিকেও তাকালো। দাঁতে দাঁত চেপে বড় ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– জাস্ট একবার গাল টেনেছিলাম। সেভাবে তো মারিওনি। এই সামান্য কারণে ও আবার তোমার কাছে অভিযোগ জানিয়েছে।

তাহমিদের কথা শুনে যেন আকাশ থেকে মাটিতে আঁছড়ে পড়ল তুহিন। খাওয়া বন্ধ করে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
– এইসব কী বলছিস? মানে তুই আবার আমার বোনটাকে মেরেছিস। এত সাহস তোকে কে দিয়েছে শুনি?

তাহমিদ থতমত খেয়ে গেল। সে ভেবেছিল, তৃষ্ণা তাঁর নামে বিচার দিয়েছে বড় ভাইয়ের কাছে। অথচ এখন মনে হচ্ছে, গাল টানার ব্যাপারটা বড় ভাই আগে জানতোই না; সে নিজেই এখন বলে দিলো।
তাহমিদ আর কিছু বলতে পারল না। আমতাআমতা করতে লাগল। ফাতেমা আর তৃষ্ণা খিলখিল করে হাসছে। তুহিন কয়েক মিনিট চুপ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে গিলে নিলো। এরপর প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে কিছুটা কটজ বলল,
– শোন তাহমিদ, আমার অফিসে একজন ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেওয়া হবে। আমি কথা বলেছি স্যারদের সাথে। পরশু ইন্টারভিউ। বেতম মোটামুটি বেশ ভালো। আমার বেতনের থেকেও বেশি বেতন।

তাহমিদ বিরক্তির স্বরে বলল,
– ভাইয়া, আমি পত্রিকার চাকরিতেই ভালো আছি। অন্য চাকরির কোনো প্রয়োজন নেই আমার।

– দশ হাজার টাকার বেতনের চাকরি করে কী সারাজীবন পাড় করবি তুই?

– হ্যাঁ।

– ইঞ্জিনিয়ারিং করেও মাত্র দশ হাজার টাকার বেতনের চাকরি করছিস। এটা কিন্তু লজ্জার বিষয়। তাছাড়া আজকাল মাত্র দশ হাজার টাকায় কিচ্ছু হয় না। সংসার হলে বুঝবি।

তাহমিদ হেসে উঠল। মলিন হাসি। মনে মনে ভাবতে লাগল, ভাইয়া কবে বুঝবে সংসারের প্রতি আমার কোনো ঝোঁক নেই। আমি স্বাধীন। সংসারে আবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা নষ্ট করার মতো বোকামি আমি করব না কখনোই।
তুহিনের আক্রোশ আরও বেড়ে গেল। সে রাগে কটমট করে উঠল। কঠিন মুখ করে বলল,
– হাসছিস কেন?

তাহমিদ হেসেই বলল,
– তুমি কত টাকা বেতন পাও?

নড়েচড়ে বসে উত্তর দিলো তুহিন।
– তেইশ হাজার টাকা।

– বাড়িভাড়া দাও কত?

– আট হাজার।

– বাজারসংশ্লিষ্ট যাবতীয় খরচ; গ্যাস, বিদ্যুৎবিল, এইসব মিলিয়ে কত টাকা চলে যায় প্রতি মাসে?

তুহিন বিস্মিত চাহনিতে সবার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো।
– পাঁচ-সাত হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। মাছ-মাংসের যা দাম, প্রতি শুক্রবারে বাজারে গেলে একেবারে ছাটাই করে দেয়।

তাহমিদ মুচকি হেসে বলল,
– বাড়িভাড়া আট হাজার, আর অন্যান্য খরচের ছয় হাজার ধরলাম। সুতরাং এখানে অলরেডি ১৪ হাজার টাকা শেষ। তাই তো?

তুহিনের বিস্ময়ের শেষ নেই। তাহমিদ এইসব কেন জিজ্ঞেস করছে, তা বুঝতে পারছে না সে। শুধু মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ সূচক ইশারা করল। তাহমিদ আবারও মুচকি হেসে বলতে লাগল,
– বাকি আছে ৯ হাজার টাকা। তোমার যাতায়াত খরচ, তৃষ্ণার প্রতিদিনের হাতখরচ, ভাবীর খরচ, এইসব মিলিয়ে প্রতি মাসে ২-৩ তিন হাজার টাকা খরচ হয়। আরও বেশি হয়। এছাড়া বেতন পেলে সবার জন্য কিছু না কিছু কিনে আনো তুমি; এখানে আরও ১ হাজার টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ ৯ থেকে আমি ৩ হাজার টাকা বাদ দিলাম। থাকে মাত্র ৬ হাজার টাকা। এই টাকা তুমি সঞ্চয় করো৷ কখনো আবার খরচও হয়ে যায় নানান কারণে। তবুও আমি ধরলাম প্রতি মাসে তোমার কাছে সবশেষে থাকে ৬ হাজার টাকা।

এইটুকু বলে থামল তাহমিদ। দেখল, উপস্থিত সবাই মুখটা ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সবার চাহনিতেই আছে মারাত্মক কৌতূহল। তুহিন মাথা ঝাঁকালো এবারও। তাহমিদ আবার বলল,
– আমার বেতন ১০ হাজার টাকা। আমার অফিস কাছেই। বাস ভাড়া মাত্র ১০ টাকা। সুতরাং যাতায়াত মাত্র ২০ টাকা। এছাড়াও সন্ধ্যায় একটু আড্ডা দেই বন্ধুদের সাথে। চায়ের দোকানে বসি শুধু। খুব বেশি হলেও ১ হাজার টাকা আমার প্রতি মাসে খরচ হয় সবমিলিয়ে। জামা-কাপড় তো তেমন কিনিই না। অর্থাৎ, বাকি ৯ হাজার টাকা প্রতিমাসে আমার কাছে থাকে। এবার তুমিই বলো ভাইয়া, কার চাকরিতে টাকা বেশি?

তুহিন দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
– ফাজলামি করছিস। সবকিছু সামলানোর পর আমার কাছে ৬ হাজার টাকা থাকে। তুই তো সংসার এক টাকাও দিস না; তোর কাছে ৯ হাজার টাকা থাকবেই।

তাহমিদ অভিজ্ঞদের মতো আঙ্গুল উঁচু করে বলতে লাগল,
– সঞ্চয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাইয়া। আসল কথা এটাই যে, সারামাস খেটে তোমার কাছে থাকে মাত্র ৬ হাজার টাকা। মাত্র ৬ হাজার টাকা সঞ্চয় করেও তুমি বেশ আনন্দে চাকরি করছ। আর আমার কাছে থাকে ৯ হাজার এটা। এই ৯ হাজার টাকা আমার জন্য অনেক। তুমি যদি ৬ হাজার নিয়ে আনন্দে থাকতে পারো, তাহলে আমি ৯ হাজার টাকা নিয়ে কেন লজ্জা পাবো? আমার তো তোমার থেকেও খুশি থাকা উচিত। প্রতিটি মানুষের উচিত, যা প্রয়োজন, তা নিয়েই খুশি থাকা। আমি তো অফিসে গিয়ে বলব, আমার বেতন আরও কমিয়ে দিন। এত টাকা দিয়ে আমি করবটা কী শুনি? ৯ হাজার টাকা; বাপ্রে! এগ্লা আমি খরচ করব কীভাবে? কে খাবে আমার এত টাকা?

তাহমিদের কথা শুনে হো হো শব্দ করে হেসে উঠল ফাতেমা আর তৃষ্ণা। তাঁদের হাসির শব্দে যেন পুরো পাড়া কেঁপে উঠল। বাড়ির সামনের বটগাছে থাকা কাক উড়ে চলে গেল। এইরকম সাংঘাতিক হাসির শব্দে সে আর ওখানে বসে থাকার মতো দুঃসাহস দেখালো না। তাহমিদ নিজেও মিটমিট করে হাসল। সাথে চোখ-মুখে এমন একটা ভাব আনলো, যেন সে আমেরিকার কোনো সমাবেশে বক্তিতা দিয়ে অনেক মানুষের হাততালি এবং প্রেসিডেন্টের প্রসংশা পেয়ে গেছে।
তুহিন ধমক দিলো সবাইকে।
– চুপ করো সবাই।

হাসি থামিয়ে দিলো সবাই। চমকানো চোখে তুহিনের দিকে তাকালো। তুহিনের খাওয়া প্রায় শেষ। সে ওঠে দাঁড়াল। তাহমিদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাইকোলজিস্ট এর কাছে যা।

কথাটা বলে হাসল তুহিন। তাহমিদ হেসে বলল,
– আমি যে রোগে আক্রান্ত হয়েছি, সেই রোগ সারানোর ক্ষমতা কোনো সাইকোলজিস্ট এর নেই।

তুহিন মুখে কিছুই বলল না আর। মনে মনে বলল, এর সাথে কথা বলা মানেই সময় নষ্ট করা। ধুত!
হাত ধুঁয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল তুহিন। তাহমিদ নিজের খাবার শেষ করতে লাগল। এ সময় ফাতেমা হঠাৎ বলে উঠল,
– সত্যি বলছি ভাই, আজকের মতো আগে কখনোই হাসি পাইনি। কী দারুণ যুক্তি দিলা তুমি। একটা কোমায় থাকা রোগীকেও এইসব কথা বলে জাগিয়ে তুলতে পারবে তুমি।

কথাটা বলে ফাতেমা প্রসংশা করল, না টিপ্পনী কাটল, তা বুঝতে পারল না তাহমিদ। কিছু বললও না এ প্রসংগে।
খাওয়াদাওয়া শেষ করল তাহমিদ ফাতেমাকে বলে বাড়ি থেকে বের হলো। তাঁর বন্ধু ফোন দিয়েছে। কী যেন কথা আছে বলল। সে এখন ওখানেই যাচ্ছে।

৮.
এমনও হয়, প্রিয় মানুষটা কাছাকাছি আছে; খুব কাছাকাছি, অথচ তাঁর মুখটা দেখা যাচ্ছে না! একেবারে চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তবুও তাঁর মুখ দেখার উপায় নেই। আবছায়া চারিদিকটা। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। মৃদু বাতাস বইছে। মাঝে মাঝে কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ শোনা যাচ্ছে। সবকিছু একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলছে। কিন্তু বুকের ধুকপুকানি অনির্দিষ্ট গতিতে বেড়ে যাওয়ায় বিরক্ত আসমা। কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। চোখ দু’টো অন্ধকারে হাতড়ে মরছে। একবার ডানে তাকালো, একবার বামে, কখনো আবার সামনে-পিছনে। মুহূর্ত এমন এক যন্ত্রণার, আসমার মনে হচ্ছে ও মরে যাবে। এভাবে বাঁচা যায় নাকি? হৃদপিণ্ডটা যেন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। কেন যে এখানে আসতে গেল; কে জানে!

সজল মৃদু হেসে বলল,
– অনেকদিন পর তোমাদের বাড়ির কাছে এলাম। প্রায় কয়েক বছর পর।

আসমা অস্থির কণ্ঠে বলল,
– বাড়ির কাছে না, আপনি একেবারে বাড়িতেই এসেছেন। এই কুয়োতলা আমাদের বাড়িরই একটি অংশ।

– তা অবশ্য ঠিক। তবুও ঘরে না যাওয়া পর্যন্ত বলতে পারছি না, তোমাদের বাড়িতে এলাম।

– আপনি কী চাচ্ছেন আমাদের ঘরে যেতে?

– এইরকম কিছু চেয়ে তোমাকে অন্তত বিপদে ফেলতে চাই না।

সজলের কথা শুনে হাসল আসমা। চিন্তিত মুখে এই হাসি খুব বেমানান। তাঁর থেকেও বেমানান হতো, যদি সে একটু না হাসতো। আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। তাঁর পরণে এখন বাদামি রঙের একটা শাড়ি। সাথে লাল রঙের ব্লাউজ। চুলগুলো খোলা। যদিও তাঁর এই শাড়ি, ব্লাউজ কিংবা খোলা চুল সজল দেখতে পাচ্ছে না। দু’জনেই অন্ধকারে চোখ হাতড়াচ্ছে। জ্যোৎস্নার আলো যা-ও আসার কথা ছিল; মাথার উপরে থাকা পেয়ারা গাছটা তা-ও আসতে দিচ্ছে না। যেন সে দু’জনের প্রতি খুব রেগে আছে। তাই কাউকেই, অন্যের মুখটা দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে না। রাত প্রায় ১০ টা বাজতে চলল। বাড়ির সবাই ঘুমে বিভোর। কুয়ো তলায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে সজল আর আসমা।
কিছুক্ষণ আগেই আসমা ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মোবাইলটা বালিশের নিচে রেখে শুয়েছিল। পাশে ছিল ছোট বোন, রাইশা। ঠিক সেসময় হঠাৎ টুন করে একটা শব্দ হয় মোবাইলে। থমথমে ঘরে শব্দটা যেন আসমার বুকে এসে আঘাত করেছিল। রাইশা একটু নড়েচড়ে উঠলেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আসমা আস্তে আস্তে বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করে। কাঁথার ভিতরে মাথায় ঢুকিয়ে মোবাইলের পাওয়ার বাটনে চাপ দেয়। স্ক্রিনে তাকাতেই দেখে সজলের ম্যাসেজ। সজল লিখেছে, ‘তোমাদের কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে আছি। তাড়াতাড়ি এসো।
আসমার সেসময় কান্না পাচ্ছিল। যদি কেউ দেখে ফেলে, তাহলে তো বাতাসের সাথে বদনাম ছড়িয়ে যাবে। ফোনে ম্যাসেজ কিংবা ব্যালেন্স, কিচ্ছু ছিল না। না পারছিল যেতে, আর না পারছিল সজলকে ‘চলে যান’ কথা বলতে। অনেকক্ষণ বিভ্রান্তিতে থাকার পর সে ঢিপঢিপ পায়ে বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। কুয়ো তলায় এসে থেমে যায়। সজলকে চোখের দেখা না দেখতে পেলেও বুঝতে পারে, মানুষ তাঁর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।

সজল কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার বলল,
– আসমা, তুমি কী খুব ভয় পাচ্ছ?

আসমা মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
– খুব, খুব বেশিই ভয় পাচ্ছি আজ। রাতেরবেলা আপনি যে কেন আসতে গেলেন।

সজল হাসল। তাঁরও কিছুটা চিন্তা হচ্ছে বটে। তবে প্রকাশ করল না। প্রেমিকার কাছে সবকিছু প্রকাশ করতে নেই। সে যদি আবার হুট করে ভীতু প্রেমিক বলে ওঠে, তখন লজ্জায় আর দাঁড়ানো যাবে না। সজল হঠাৎ আসমাকে একটা প্রস্তাব দিলো। বলল,
– আসমা, তোমার হাতটা একটু ধরব?

প্রস্তাবটা পেয়ে চমকে উঠল আসমা। সজলের চোখ দু’টো অন্ধকারে সয়ে গেছে। সে আসমার শ্যামলা চেহারার চমকানো মুখটা দেখতে পাচ্ছে। কিছুটা আবছায়া বটে; কিন্তু আবছায়াটুকু অনুভূতি দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে। ভালোবাসার মানুষকে অনুভব করতে পারার থেকে বড় কিছু আর হয় নাকি!
আসমা মাথা নিচু করে বিড়বিড় করতে লাগল। সজল বুঝল, আসমা খুবই ভয় পাচ্ছে। তাই হাত ধরার অনুমতি দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখাচ্ছে না। সজল মনেমনে ফন্দি এঁটে বসল। রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
– আসমা, তুমি কী জানো, আমাদের মাঝে এখন দূরত্ব কতটা?

– জানবো কীভাবে? আমি তো দেখতেই পাচ্ছি না আপনি কতটা দূরে আছেন। জাস্ট কথা শুনছি। আসলে কিছুক্ষণ আগে দুই বোন মিলে মোবাইলে একটা মুভি দেখছিলাম। তাই চোখটা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেছে। ঠিক হতে সময় লাগবে একটু।

– অনুমান করে বলো। আমার কণ্ঠ শুনছ, আমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছ। এতকিছু শুনেও বুঝতে পারছ না, আমাদের মাঝে এখন কতটা দূরত্ব আছে।

আসমা মাথা চুলকিয়ে উত্তর দিলো।
– পারছি তো। উমম, চার-পাঁচ ফুট দূরত্ব তো হবেই।

এ-কথা বলে একটা হাত সোজাসুজি সামনের দিকে বাড়িয়ে দিলো আসমা। হাতটা গিয়ে ঠেকল সজলের বুকের মাঝখানে। সে আরও চমকে উঠল। হাতটা সরিয়ে নিতে যাচ্ছিল; কিন্তু এর আগেই সজল হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল,
– প্রথমে তুমি আমাকে স্পর্শ করেছ; এরপর আমি। সুতরাং বলতে পারবে না, আমি অন্যায় ভাবে তোমাকে স্পর্শ করেছি।

হাতটা সরিয়ে নেওয়ার জন্য জোড়াজুড়ি করল না আসমা। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে উৎকণ্ঠিত গলায় শুধু বলল,
– আসতে কথা বলুন। বাবা জেগে যাবে। তখন স্পর্শ করার শখ ঘুচিয়ে দিবে।

সজল নিঃশব্দে হাসল। আসমা শান্ত হয়ে হেলান নিলো অচল কুয়োর দেয়ালে। সজল জিজ্ঞেস করল,
– কুয়োটা কী এখনো ব্যবহার করো?

আসমা জবাব দিলো।
– না। পানি শুকিয়ে গেছে। এখন তো কল আছে।

সজল মিটমিট হেসে বলল,
– জানো, এই কুয়ো দেখে বারবার একটা দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

আসমা কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল,
– কোন দৃশ্য?

– ছোটবেলায় যখন ক্রিকেট খেলতে এখান দিয়ে মাঠে যেতাম; তখন দেখতাম তোমার বাবা কুয়ো থেকে পানি তুলে, তোমাকে গোসল করিয়ে দিচ্ছে৷ তখন বোধহয় তুমি ক্লাস ওয়ানে পড়তে। আমি সিক্সে পড়তাম। তোমার পরণে সেসময় ছোট একটা প্যান্ট ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

আসমা হতভম্ব হয়ে গেল সজলের কথা শুনে। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে, দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা চেপে ধরল। কপট রাগী গলায় বলল,
– ছি: ছি:! এইসব কেমন কথা, হুহ্!আপনি কী আমাকে লজ্জা দেওয়ার জন্যই এসেছেন?

– না। এখন তোমাকে লজ্জা দিয়েও কোনো লাভ নেই। তোমার লজ্জায় লাল হওয়া মুখটা তো আমি দেখতে পারব না। যা সত্যি, তাই বললাম।

– বাবা ঠিকই বলেন, আপনি মাস্টার আসলেই সুবিধার না। আপনার মতলবের কোনো ঠিক নেই। মতলব ঠিক থাকলে কী আর একটা মেয়ের গোসল দেখার মতো অন্যায় কাজ করতেন।

– ধুর! ক্লাস ওয়ানে পড়া বাচ্চা আবার মেয়ে হয় কীকরে? ওইসময় তো তুমি একটা খুকি।

আসমা মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলল,
– সে যাই হোক। খুকি বা মেয়ে, সবই তো এক। আপনার উচিত হয়নি ওভাবে উঁকিঝুঁকি মারা।

– উঁকিঝুঁকি মারিনি তো। সোজা হাঁটতাম, নিজের অজান্তেই চোখ চলে যেতো। আর অদ্ভুত ভাবে প্রতিদিন আমি যখন যেতাম, তখনই তুমি গোসল করতে।

– আসলে বাবা প্রতিদিন বেলা করে বাড়িতে ফিরতো। মা তো সন্ধ্যায় সব কাজ সেড়ে গোসল করতো। আমি আবার ছোট ছিলাম বলে পানি তুলতে পারতাম না। তাই বাবার সাথে গোসল করতাম। আচ্ছা, আপনি কী এইসব বলার জন্য এসেছেন?

– না।

– তাহলে?

– আসলে মায়ের সাথে আজ ঝগড়া হয়েছে। ভালো লাগছিল না বলে তাই এখানে এলাম।

আসমা অবাক হয়ে বলল,
– ঝগড়া করেছেন কেন? বাবা-মায়ের সাথে ঝগড়া করা ঠিক না। এইরকম মানুষকে আমি পছন্দ করি না।

– আরে আগে কথাটা শোন। ঝগড়া করার একটা কারণ আছে। স্কুল থেকে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন মা হঠাৎ একটা টিকিট ধরিয়ে দিলো হাতে। কাল ভোর সকালের ট্রেনের টিকিট। ঢাকা যাওয়ার। ঢাকা আমার এক মামা থাকে; একটা বড় পোস্ট এ চাকরি করে। তিনি নাকি আমাকে দ্রুত ঢাকায় যেতে বলেছেন। একটা ভালো চাকরির ব্যবস্থা করেছে। যদিও মা আগেই এইসব নিয়ে বকবক করতো আমার সাথে। কিন্তু আজ কোনো আলোচনা ছাড়াই বাবাকে দিয়ে টিকিট কাটিয়ে নিয়েছে। মেজাজটা এই কারণেই বিগড়ে গেছে।

আসমা কিছুটা ধাক্কা খেলেও নিজেকে সামলে নিলো। বলল,
– বাহ্, বেশ ভালো তো। শুনুন, ঢাকায় যান। এতে বরং ভালোই হবে। আপনি যদি একটু শক্তভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তাহলে নিজের বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন, আমাকে বিয়ে করতে চান। আপনি তখন ভালো অবস্থায় থাকবেন; আপনার বাবা-মা আপনাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে না।

– সে নাহয় ঠিক আছে। কিন্তু আরও একটা সমস্যা আছে।

– কী সমস্যা?

সমস্যার কথাটা বলতে সংকোচবোধ করছে সজলের। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
– আমি তো আর শিওর না। অযথা আসমাকে চিন্তিত করা কী ঠিক হবে? বাবা হয়তো মজা করে বলেছিল কথাটা।

সজল গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– না, আসলে তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।

– সবসময় তো আর নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা ভাবলে চলবে না। বাবা-মা’কে খুশি রাখা আপনার দায়িত্ব। এটা এড়িয়ে যেতে পারেন না আপনি।

সজল হয়তো কিছু বলতে যাচ্ছিল ; কিন্তু তাঁর আগেই কোত্থেকে যেন রাইশার কণ্ঠ শোনা গেল। রাইশা ফিসফিস করে বলল,
– মেজোপু, কোথায় তুমি?

আসমা চমকে ওঠে বলল,
– রাইশা তুই এখানে!

রাইশা হেসে বলল,
– হ্যাঁ আমি। তুমি যে উনার ম্যাসেজ পেয়ে ঘর থেকে চলে এসেছ, তা আমি জানি। আমি তখন জেগেই ছিলাম। তুমি ফোনটা রেখে এসেছিলে। ম্যাসেজটা দেখেই তো আমি বুঝলাম, তুমি কুয়ো তলায় আছো।

রাইশা সজলের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
– তা মাস্টার মশাই, রাত তো অনেক হলো। আর কত জ্বালাবেন আমাকে বোনটাকে?

সজল বলল,
– তোমাকে না বলেছিলাম আমাকে মাস্টার মশাই বলবে না। এটা শুনলে নিজেকে বুড়ো বুড়ো মনে হয়।

রাইশা হেসে উঠল। আসমা ওকে সাবধান করে দিয়ে বলল,
– আস্তে।

রাইশা আবার ফিসফিস করে বলল,
– ঠিক আছে।

সজল রাইশাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– রাইশা, তা তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে?

– হ্যাঁ। তবে তারিখটা এখনো ঠিক হয়নি। দুই একদিনের মধ্যে তারিখ ঠিক হবে।

– তা হবু বরকে কেমন দেখতে? তোমার পছন্দ হয়েছে তো? সম্মন্ধ করে বিয়ে হচ্ছে; ভেবেচিন্তে রাজি হয়েছ তো?

– পছন্দ হবে না কেন? উনি বেশ ভালো মানুষ। তাছাড়া আমি রাজপুত্র চাই না। ওরা এক জীবন চার-পাঁচটা করে বিয়ে করে। আগে তো আরও বেশি করতো। নিজের সংসারের ভাগ অন্য কাউকে দেওয়ার মতো মেয়ে আমি না। স্বামী হিসেবে ভালো একজন মানুষ চেয়েছি; আল্লাহ চাওয়া পূরণ করেছেন। রাজপুত্রদের থেকে আমি দূরে থাকি।

– যাক, শুনে খুশি হলাম।

– শুধু খুশি হলে তো হবে না; এবার আমার আপাটাকে যেতে দিন। একটা মুভি দেখছিলাম। অর্ধেক দেখা হয়েছে। সকালে বাকিটুকু দেখতে হবে। এখন না ঘুমালে খুব সকালে উঠতে পারবে না। বেলা হলেই আবার স্কুলে চলে যাবে।

আসমা বলল,
– আসলে উনি কাল ভোরের ট্রেনে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। তাই এইসময় দেখা করতে এসেছেন।

রাইশা মুখটা ‘হা’ করে বলল,
– তাই নাকি? তা ঢাকার মেয়েদের দেখে আমার আপুটাকে আবার ভুলে যাবেন না তো।

রাইশার কথা শুনে আসমার হৃদস্পন্দন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মুখ গিয়ে কোনো কথা বলতে পারলো না।
সজল, রাইশার প্রশ্নের প্রতিউত্তরে বলল,
– আসলে আমার যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। ইনফ্যাক্ট আমি এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। মা হুমকি দিচ্ছে; বলছে, আমি ঢাকায় না গেলে তিনি নিজের ক্ষতি করবেন। এইসব এর কোনো মানে হয়? সবার মা ছেলেকে নিজের কাছে রাখতে চান; আর আমার মা আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে চান।

আসমা নিঃশ্বাস আটকিয়ে বলল,
– সন্তানের ভালোর জন্য কিছু কিছু মা নিজের ইমোশনকে সেক্রিফাইজ করে থাকেন। যারা পারেন না, তাঁরা সন্তানকে আটকে রাখেন৷ এর দ্বারা এটা প্রমাণ হয় না, সেসব মায়ের মতো আপনার মা, আপনাকে ভালোবাসে না। আপনি ঢাকা যান। মায়ের কথা শুনুন। যে মা আপনাকে জন্ম দিয়েছে, তাঁর একটা ইচ্ছা আপনি পূরণ করবেন না? আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব; বিশ্বাস করুন।

এইটুকু বলে আসমা থেমে গেল। অন্ধকারে কয়েক ফোঁটা চোখের জলও ফেলল সাথে। সজল ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগল। রাইশা বলল,
– আপনারা কথা বলুন। আমি ঘরের দিকে যাচ্ছি। বাবা জেগে গেলে আমি খবর দিয়ে যাবো।

রাইশা চলে গেল। ও চলে যাওয়ার পর সজল বলল,
– আসমা, একটু সামনের দিকে যাবে প্লিজ। যাওয়ার আগে চাঁদের আলোয় তোমার মুখটা একবার প্রাণভরে দেখতে চাই।

আসমা সম্মতি দিলো। হাত বাড়িয়ে সজলের একটা হাত ধরল। এরপর পেয়ারা গাছের নিচ থেকে খোলামেলা জায়গায় গেল। জ্যোৎস্নার আলোয় সজল মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগল আসমাকে। আসমার ম্লান মুখটা দেখে তাঁর চোখের পাতা ভিজে এলো।

এ সময় নিশ্চয়ই তৃতীয় কেউ থাকলে সেই পরিচিত গানের একটা লাইন বলল,
‘ হতেও পারে, এই দেখা শেষ দেখা।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে