শেষ_বিকেল

0
1229

শেষ_বিকেল

© আবির খান।

“মামা, একটা সিগারেট দেওতো।” “কোনটা?” “আরে দেও একটা। দামী টাই দেও।” “এই নেও।” “কতো??” “১৪ টাকা” টাকা দিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে আঙুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে হাতটা উপরে উঠিয়ে সিগারেটের দিকে তাকালাম। আহ! কি সুন্দর করে পুড়ছে আর ধোঁয়া উড়ছে। আমি এখনো টান দেই নি। জীবনে আজ অব্ধি কখনো সিগারেট খাইনি। আজ খাব। কারণ এই জ্বলন্ত সিগারেটের মতো আমার মনটাও আজ জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কেন জানি মুখে নিতে ইচ্ছা করছে না। হাতে নিয়েই একটা ফিল হচ্ছে। খাওয়ার কি দরকার! এসব সিগারেট খাওয়া মানে নিজেকে শেষ করা। আসলে নিজেতো শেষ হয়না, শেষ হয় তার পরিবার। কেউ ছেলে হারায়, কেউ ভাই হারায়, কেউ স্বামী হারায় আবার কেউ বাবাকে হারায়। হাতে আছে এই বেশ। হেঁটে হেঁটে চলে আসলাম আমার যেখানে আসার কথা ছিল।

এখন শেষ বিকেল। এসময় আকাশটা এক অন্যরকম আভা ধারণ করে। অনেকে এসময়কে গোধূলি বিকেলও বলে। এসময় চারদিকটা আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে থাকে। কারণ সূর্যি মামাটা যে একটুপর তার বাসায় যাবে। বাতাসটাও হয় শীতল। আশপাশটা কেমন জানি চুপচাপ থাকে। এসময়টা এককালে আমার খুব পছন্দের ছিল। হ্যাঁ ছিল তবে এখন আর নেই। হয়তো আজ পর্যন্ত আছে। কাল থেকে আর থাকবে না। এই গোধূলি বিকেলের সময়টা যখন শেষ হতে থাকে তখন রাতের আঁধারের মতো বিষন্নতাও আমার মনে নেমে আসে। আগে অবশ্য আসতো না। আজ এই শেষ বিকেলের থেকে হয়তো প্রতিদিন সময় করে আসবে। আর সারাটা রাত কাটবে বিষন্নতায় আর বেদনায়। হয়তো পুরুষ মানুষ বলে হাউমাউ করে কাঁদাও যাবে না। হয়তো ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে তার কথা ভেবে নিরবে অশ্রু ফেলতে হবে। হ্যাঁ আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছি আমার ভালোবাসাটাকে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলতে।

কি খুব অবাক হলেন?? জানেন আমিও হয়েছি। যখন শুনলাম, আমার মায়ার নাকি কাল বিয়ে। আমাদের মাঝে ভালোবাসার সময়টা বেশি দিনের না। এইতো মাত্র ২ বছর ৭ মাস ১৪ দিন হলো। মায়াকে কিভাবে পেয়েছি?? ওকে আমি খুব একটা বলতে গেলে সিনেমাটিক ভাবে পেয়েছি। ভার্সিটিতে সেদিন ক্লাস শেষে সেকি বৃষ্টি। পুরো ঝুম বৃষ্টি। ভাগ্যে ভালো আমার আদুরে ছোট বোনটা আমার ব্যাগে ছাতাটা ভরে দিয়েছিল। খুব যত্ন করে আমার। ছাতা বের করে বের হবো ঠিক তখনই খেয়াল করলাম একটা মেয়ে খুব অস্থির হয়ে আছে। কেমন জানি ছটফট করছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টিটা নেমে তার খুব ক্ষতি করেছে। আমি কি যেন ভেবে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি কোনো সমস্যায় আছেন??” সে বলল,”হ্যাঁ। আমার মা নাকি হঠাৎ অনেক অসুস্থ হয়ে পরেছে। তাড়াতাড়ি বাসায় যাবো। খুব টেনশন হচ্ছে। কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যে যাবো?? আর রিকশা বা বাস পাবো বলেও মনে হয় না। কি যে করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।” মেয়েটা এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল। কথার ফাঁকে খেয়াল করলাম মায়াবী চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে গিয়েছে। আমি তাকে বললাম, “আমাকে দু’মিনিট সময় দিন আমি আসছি।” বলেই আমি দৌড়ে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে বুঝিয়ে ওর বাইকের চাবিটা নিয়ে আসি। চাবি নিয়ে আবার মেয়েটার কাছে চলে এসে বলি,” এই ছাতাটা আপনি আপনার উপর ধরে রেখেন। যাতে যতটা সম্ভব না ভিজেন। আমি বাইক নিয়ে আসছি। তারপর আপনাকে বাসায় দিয়ে আসছি।” তাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে নেমে বাইক নিয়ে আসি তার সামনে। ছাওনিতে দাঁড়ানো সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে৷ আমি কখনোই এমন কাকভেজা ভিজিনি। আজ মানবতার খাতিরে সব মাফ৷ মেয়েটাকে ডাক দিলাম। মেয়েটা অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছাতা হাতে আমার কাছে আসে। আমি বললাম,” আরে উঠুন। দেরী হচ্ছে না।” সে চুপচাপ উঠে বসে। আমি আস্তে করে বাইক স্টার্ট দিয়ে চালিয়ে আসি। খুব সাবধানে চালিয়েছি। এই ভেবে যাতে আমার ছাতি নিয়ে আবার সে পিছন থেকে উড়ে না যায়। তাকে তার বাসার সামনে নামিয়ে দিলাম। সে যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল আমাকে দেখে। আমি বৃষ্টিতে ভিজে পুরো একাকার অবস্থা। শুধু তার জন্য। তার সাহায্য করার জন্য। সেদিন সে শুধু বলেছিল,” আপনি অনেক ভালো। ধন্যবাদ।” বলে তার বাসার ভিতরে চলে যায়। সেদিনের পর থেকে তার আর আমার মাঝে ধীরে ধীরে এক অন্যরকম সম্পর্ক গড়ে উঠে। যাকে আমরা বলি ভালোবাসা। তাহলে আজ এতো দিন এতো মাস পর এমন কি হলো যে মায়া আমার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই জানতে ইচ্ছে করছে তাইতো?? বলছি।

মায়ার বাবা একজন শিক্ষিত মার্যিত একজন মানুষ। সমাজে তার অনেক নাম আছে। তিনি অনেক কষ্ট করে মায়া এবং ওর ছোট বোন নেহাকে বড় করেছেন। ওর বাবা ওর জন্য একটা বড় ঘর থেকে সুমন্দ পেয়েছে। ছেলের পরিবার বেশ ধনী। ছেলে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। মায়া খুব আরামেই থাকবে। কিন্তু আমি?? আমিতো মায়াকে আরামে রাখতে পারবো না। কারণ আমি বেকার। বাবা-মাকে চালাই খুব কষ্ট করে। ভাড়া থাকি। মধ্যবিত্ত পরিবার আমাদের। ৪ জন থাকতেই খুব কষ্ট হয়ে যায়। এরমধ্যে মায়া কি থাকতে পারবে না?? অবশ্যই পারবে। কিন্তু এই সমাজের বেকার ছেলেরা চাইলেই তার মনের ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারে না। বাস্তবতার শক্ত শিকলটা তার পা দুটোকে পেচিয়ে ধরে। ঠিক যেমনটা আমার। মায়ার বাবা কোনো দিন আমার হাতে ওকে তুলে দিবেন না। কারণ একজন মেয়ের বাবা-মা চায় না তার মেয়েকে এমন একজন ছেলের হাতে তুলে দিবে যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তারা চায় তার মেয়েটা আরামে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। তাই আমি মায়াকে বুঝিয়ে বলেছি, “মায়া বাস্তবতাকে মেনে নেও। সবাই সব কিছু পায় না।” ও কিছু বলেনি। তবে ফোনের ও পাশে ওর নিঃশব্দে কান্না আমি ঠিকই অনুভব করতে পারছিলাম। ওর কাল বিয়ে। তাই বিয়ের আগে এই শেষ বিকেলে একবার ওর সাথে শেষবারের মতো দেখা করতে এসেছি। আমি ওর জন্য সেই চেনা পরিচিত জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি।

ওহহ!! পুরনো স্মৃতিগুলো মনে করতে করতে হাতের সিগারেটটা কখন যে শেষ হয়ে গেলো বুঝতেই পারি নি। ওইতো মায়া আসছে। আজ আর আমার মায়া আসছে না। ও আজ অন্যকারো মায়া৷ তবে একদা ছিল ও আমার৷ হ্যাঁ ছিল। সত্যিই ছিল।

আমিঃ এতো দেরী করলে??

মায়াঃ জ্যাম ছিল। তুমি কখন এসেছো??

আমিঃ এইতো কিছুক্ষন হলো।

আমি জানি ও আমার সামনে আপ্রাণ চেষ্টা করছে খুব স্বাভাবিক থাকার। কারণ ও জানে আমি খুব ইমোশনাল। ও কান্না করলে আমিও ভেঙে পরবো। মেয়েটা আমাকে খুব বুঝে। মনের কথাগুলো না বলেই সব বুঝে যায়।

আমিঃ চলো ওখানে বসি।

আমি আর মায়া আমাদের পছন্দের জায়গাটায় গিয়ে বসলাম। সবসময় একসাথে বসতাম। আজও বসেছি। কিন্তু আজ মাঝে অনেকটা দূরত্ব। আমিই বানিয়েছি। আজ ও অন্যের আমানত। খিয়ানত কিভাবে করি।

মায়াঃ খেয়েছো??

আমিঃ হ্যাঁ।

মায়াঃ আজও মিথ্যা বলছ। নেও।

একটা বাটি আমার দিকে মায়া এগিয়ে দিল। আপনি না জানলেও আমি জানি এর মধ্যে কি আছে। আমার পছন্দের একটা খাবার ওর হাতের রান্না করা। পায়েস। আমি নিলাম। কারণ ওর হাতের শেষ পায়েস এটা।

মায়াঃ খাও।

আমি বাটির ঢাকনা খুলে প্রথমেই ঘ্রাণ নিলাম। সেই আগের পরিচিত ঘ্রাণটা। আজ মনে হয় ঘ্রাণ টা মনে গিয়ে আঘাত করলো। ব্যাথা অনুভব করছি। সাথে থাকা চামচটা দিয়ে খেতে শুরু করলাম। মায়ার থেকে অন্য দিকে ঘুরে বসে খাচ্ছি। কারণ মানব দেহে কান্নাটাকে আটকানো খুব কঠিন। সবাই পারে না। তাই আমিও পারছিনা। চোখ দিয়ে ঝাপসা দেখছি আর মন ভরে শেষ বারের মতো ওর হাতের পায়েস খাচ্ছি। মন বলছে, ও হয়তো আমার আড়ালে কাঁদছে। আমি খাওয়া শেষ করলাম। মায়া সত্যিই বলেছে, আমি কিছু খাইনি। কারণ জানতাম প্রতিদিনের মতো মনে করে হয়তো আজও পেয়াসের বাটিটা ও আনবে। ও এনেছে। চোখটা মুছে মিথ্যা একটা হাসি নিয়ে ওর দিকে তাকালাম। ওর অশ্রুসিক্ত চোখে চোখ রেখে বললাম,

আমিঃ আগের মতোই খুব মজা হয়েছে। তবে আজ একটু বেশি। ধন্যবাদ আনার জন্য।

মায়াঃ ওটা কি?? আমায় দিবে না??

ও হ্যাঁ আপনাদেরতো বলতেই ভুলে গেছি। আমার অন্য হাতে কিন্তু ওর জন্য আমার কিনা একটা শেষ উপহার আছে।

আমিঃ হ্যাঁ হ্যাঁ। এই নেও।

মায়া ব্যাগটা নিয়ে খুলে দেখে একটা ডাইরি আর কলম।

আমিঃ যখন মন চাইবে মনের কথাগুলো সব এখানে লিখবে। আর এইযে কলমটা দেখছো এটা শেষ হলে কিন্তু আবার ফেলে দিও না। এটার শিশ পরিবর্তন করা যায়। কালি শেষ হলে আবার নতুন শিশ ভরে লিখ। আর ডাইরিতে যেদিন লেখা শেষ হলে মাঝে মাঝে পড়ো। হয়তো এই ডাইরে দেখে আমার কথা মনে পরলেও পরতে পারে।

মায়াঃ কিছুই কি করার নেই আবির?? অসহায় ভাবে।

আমিঃ বাস্তবতা বড় কঠিন মায়া। তার কাছে মাঝে মাঝে হেরে যেতে হয়। না হলে কেউ ভালো থাকে না।

এই শেষ বিকেলে আমি মায়ার চোখে স্পষ্ট নোনা জল দেখছি। আমি কি করবো?? আমার ভালোবাসা যে আমার বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়েছে। এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে যাওয়ার ও কোনো উপায় আমার নেই। কারণ আমার ভালোবাসার পূর্ণতার জন্য আমি দুটি পরিবারকে কষ্ট দিতে চাই না। তাই এই নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি।

মায়াঃ কাল আসবে বিয়েতে?? আস্তে করে।

আমিঃ হাহা। পাগল নাকি?? আমি গেলেতো বিয়েই হবে না।

মায়াঃ কেন?? অবাক হয়ে।

আমিঃ আমি হতে দিবো না।

মায়াঃ আর দেখা হবে না??

আমিঃ অনেকে বলে দুনিয়াটা নাকি গোল। দেখা হলে হতেও পারে। তবে আমি চাই না আর দেখা হোক। এই প্রায় ৩ বছরের রিলেশনে আজ অব্ধি তোমাকে আমি একবারও অপবিত্র হতে দেই নি আমার জন্য। সবসময় তোমার ছায়া হয়ে ছিলাম। আজ ছায়াটা ছেড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাও মায়া। আর কখনো আমার কথা ভেবো না। হয়তো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমার কথা মনে পরতে পারে। তখন সব ভুলে নামাজ পড়ো। আল্লাহ খুশি থাকলে তুমি সব সময় ভালো থাকবে। এখন যাও। বিকেল শেষের পথে। সন্ধ্যা হবে আঁধার নেমে আসবে। অন্ধকারে সব হারিয়ে যাবে।

মায়াঃ তাড়িয়ে দিচ্ছ??

আমিঃ না, নিজেকে তোমার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। আর শোনা, তোমাকে আমি এতোটাও ভালোবাসি নি যে ভুলে থাকতে পারবো না। অবশ্যই পারবো। যাও। আর কখনো এসো না।

মায়াঃ কষ্ট পেলাম আবির। অনেক কিছু বলার ছিল। হয়তো বলে আর লাভ নেই। তবে এইটুকু জেনে রাখ, এই বাস্তবতা আমাকে আমার মনকে পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে। ভালো থেকো।

মায়া অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো।

আমি ইচ্ছা করেই ওকে তাড়িয়ে দিয়েছি। আর একটু থাকলে হয়তো সব কিছুর বিরুদ্ধে চলে যেতাম। কান্নায় চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। আর হারানোর কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। মায়া, তোমাকে কষ্ট দিয়ে এই #শেষ_বিকেলের সাথে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেলো।
ভালো থেকো তুমি।

#শেষ_বিকেল

– সমাপ্ত।

© আবির খান।

– কোনো ভুল হলে মাফ করবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here