শেষ_পর্যন্ত পার্ট: ৫

0
492

শেষ_পর্যন্ত

পার্ট: ৫

লেখিকা: সুলতানা তমা

নীল ডিম লাইটের আলোতে আলিফার হাসি খুব সুন্দর লাগছে মনে হচ্ছে কোনো এক নীল পরী হাসছে, আমি মুগ্ধ হয়ে ওর হাসি দেখছি….

সকালে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হলো আমার উপরে পানি পড়ছে ঘুম ঘুম চোখে উপরের দিকে তাকিয়ে ভাবছি আব্বু এতো বড় বাড়ি বানালো এতো টাকা দিয়ে আর সেই বাড়ির ছাদ দিয়ে কিনা বৃষ্টির পানি পড়ে
–এই উপরে কি দেখছ (হঠাৎ কারো ধমকে পাশে তাকালাম আলিফা বালতি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমার যে এখন গুন্ডি একটা বউ আছে তারমানে এই পানি আলিফা….)
–কি ভাবছ
–তুমি এভাবে আমাকে ভিজিয়ে দিতে পারলে
–তুমি যদি রাতে আমাকে জরিয়ে ধরে ঘুমাতে পারো সকালে তো এমন কিছু করে প্রতিশোধ নেওয়া আমার প্রধান কাজ (ওর কথা শুনে অবাক হয়ে রাতের কথা মনে করার চেষ্টা করলাম, রাতে কিভাবে যে চোখে ঘুম এসে গিয়েছিল বুঝতেই পারিনি ওকে বুকে নিয়েই….)
–এখন কি ভাবছ বলো রাতে আমাকে জরি….
–আচ্ছা আমি নাহয় ঘুমের মধ্যে তোমাকে বুকে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তুমি কি করছিলে তুমি সরে গেলে না কেন
–আমিও তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সকালে উঠে দেখি আমি তোমার বুকে….
–একদম কান্না করবা না এতে আমার একার দোষ না আর যা হয়েছে ভালোই হয়েছে আসলে কি জানো প্রকৃতিও চায় আমরা একসাথে থাকি তাই তো আমাদের অজান্তেই….
–কি বললে
–সবসময় এতো রেগে যাও কেন আমি তো ফাজলামো করে বলেছি
–রিফাত তুমি কিন্তু বার বার ভুলে যাচ্ছ আমি রাতুলকে ভালোবাসি (সত্যিই তো আমি রাতুল এর কথা ভুলে গিয়েছিলাম এতো দুষ্টুমি করা আমাকে মানায়নি কিন্তু আলিফার সামনে আমাকে দূর্বল হলে চলবেনা)
–রিফাত কি ভাবছ
–ভাবছি তুমি যেহেতু সবসময় এতো রেগে যাও তাই তোমার আলিফা নাম বাদ দিয়ে অন্য একটা নাম দেওয়া প্রয়োজন
–মানে
–আজ থেকে তুমি রাগিণী আমি তোমাকে রাগিণী বলে ডাকবো
–রিফাত (ওরে বাবারে এক চিৎকার দিয়ে হাতের বালতি আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেললো আমার এখানে থাকা ঠিক হবে না কখন জানি আমাকে আছাড় মেরে দেয়, এক দৌড়ে সোজা নিচে চলে আসলাম)

প্রিতি: ভাইয়া তোমার শরীর এমন ভিজা কেন
আমি: কপালের দোষ
প্রিতি: মানে
আমি: তোর ভাবি এক বালতি পানি ঢেলে দিয়েছে
প্রিতি: হিহিহি খুব ভালো করেছে
আমি: তুই হাসছিস
প্রিতি: হ্যাঁ ভাইয়া কারণ তোমাকে অনেক দিন পর এমন ভালো থাকতে দেখছি হাসতে দেখছি আমরা তো চাই তুমি সবসময় এমন হাসিখুশি থাকো আর এখন যেহেতু ভাবি এসেছে আমার বিশ্বাস তোমাকে সবসময় এমন হাসিখুশি রাখবে (যারা আমাকে সবসময় হাসতে দেখতে চায় তাদের কি করে বলি এবারেও আমি ঠকে গেছি আলিফা অন্য কাউকে ভালোবাসে, না না এই কথা কাউকে বলা যাবে না আব্বু শুনলে খুব কষ্ট পাবে আমাকে এখন থেকে ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে না পারলে অন্তত ভালো থাকার অভিনয় করতে হবে)
প্রিতি: ভাইয়া কি ভাবছ
আমি: হুম কিছুনা
প্রিতি: যাও ফ্রেশ হয়ে নাশতা খেতে আসো আর ভাবিকে পাঠিয়ে দিও
আমি: ওকে

রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছি আলিফার মাথা ঠান্ডা হয়েছে কিনা তখনি আলিফা আমাকে দেখে ডাক দিল
–চোরের মতো উঁকিঝুঁকি মারছিলে কেন
–তোমার যা রাগ ভয় হয় তাই
–হুহু যাও ফ্রেশ হয়ে আসো
–হুম
–আর শুনো প্রিতি বলছিল আজ নাকি বৌভাত এর অনুষ্ঠান হবে
–কোথায় আমি তো জানিনা
–আর জানতে হবেও না আমি এসব চাই না তুমি বলে দিবে এসব অনুষ্ঠান যেন না করে
–আজব তো কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি এখন তো বৌভাত করা প্রয়োজন নাহলে….
–নাহলে কি শরীফ চৌধুরীর বড় ছেলে বিয়ে করে ফেলেছে সেটা কেউ জানতে পারবে না তাই তো জানানোর প্রয়োজন নেই কারণ এই বিয়েটা বেশি দিন টিকবে না রাতুল আসলেই আমি তোমাকে ডিভোর্স দিব
–এভাবে কথা বলছ কেন আর বিয়ের পরদিনই ডিভোর্স এর কথা বলছ কেন
–রাতেই তো বলেছি আমি রাতুলকে ভালোবাসি এসব অনুষ্ঠান করার কোনো মানে হয় নাকি
–ঠিক আছে আমি না করে দিব
–হুম আর তুমি রাতুল এর কথাটা মাথায় রেখো প্লিজ ও আসলেই আমি তোমাকে ডিভোর্স দিব মনে রেখো
–হুম নিচে যাও প্রিতি ডাকছে
চোখের পানি আড়াল করে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হতে চলে গেলাম

নাশতার টেবিলে বসে আছি সবাই আছে এখানে কিভাবে বলি অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই
সুমন: রিফাত তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন কিছু নিয়ে টেনশনে আছিস
আমি: হুম না তো
রিয়ান: ভাইয়া লুকাচ্ছ কেন বল কি হয়েছে
রিয়াদ: হ্যাঁ বল আমাদের থেকে লুকানোর কি আছে
আমি: আব্বু কোনো অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন নেই
আব্বু: কি বলছিস বুঝতে পারছিস তুই
আমি: হুম
আব্বু: বিয়েটা হুট করে হয়ে গেছে কাউকে জানাতে পারিনি এখন বৌভাত না করলে তো….
আমি: লাগবে না বলেছি যেহেতু লাগবেই না এইটা নিয়ে আর কোনো কথা বলার প্রয়োজন নেই (রাগে একবার আলিফার দিকে তাকালাম সবার মতো আলিফাও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, এখন অবাক হওয়ার কি আছে ওর জন্যই তো আব্বুর সাথে আজ রাগ দেখিয়ে কথা বলতে হয়েছে)
আব্বু: ঠিক আছে তুই রাগ করিস না আমি কোনো অনুষ্ঠান করবো না, একবার আমার রুমে আসিস
আব্বু নাশতা না করেই উঠে চলে গেলেন আমি বোবার মতো বসে আছি
প্রিতি: আব্বুর রুমে যেতে বলেছেন যাও
আমি: হুম

আব্বুর রুমে দাঁড়িয়ে আছি আজ আব্বুকে কষ্ট দিয়ে ফেলছি জানিনা এখন আব্বু কি বলবেন
–রিফাত কি হয়েছে
–কই কিছু না তো আব্বু
–কিছু না হলে তুই আমার সাথে এভাবে কথা বলতি না
–(নিশ্চুপ)
–দেখ আমি যে শুধু তোদের বাবা তা কিন্তু না আমি তোদের মা বাবা দুটুই আর সন্তানের কিছু হলে মা আগেই বুঝতে পারে তাই আমার থেকে লুকিয়ে লাভ নেই বল কি হয়েছে (আব্বুকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম কিভাবে বলবো আমি এবারেও ঠকে গেছি)
–রিফাত যখন তোর বলতে ইচ্ছে হবে আমাকে এসে বলিস কেমন
–হুম
ভাইয়া ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখ কে এসেছে (রিয়ান এসে হাসতে হাসতে বললো)
আমি: কে এসেছে
আব্বু: একবার গিয়ে দেখ তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে
আমি: কি আব্বু
আব্বু: যা গিয়ে দেখ
রিয়ান আমার হাত ধরে টানতে টানতে ড্রয়িংরুমে এনে দাড় করালো, সামনে তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম আব্বু আমাকে এতো বড় সারপ্রাইজ দিবে ভাবতেও পারিনি
চাচ্চু: কেমন আছিস বাবা
আমি: (নিশ্চুপ)
ছোটমা: কিরে বললি না কেমন আছিস
আমি: কেন এসেছ তোমরা
ছোটমা: আমাদের ছেলেটাকে দেখতে
আমি: সত্যিই কি তোমাদের ছেলেকে দেখতে আসছ নাকি তোমাদের মেয়েকে ভুলে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে আমি কতোটা সুখে আছি সেটা দেখতে এসেছ
ছোটমা: আমরা তো সবসময় চেয়েছি তুই বিয়ে কর
আমি: আর তোমাদের মেয়েকে ভুলে যাই তাই তো
চাচ্চু: নিলাকে কখনো ভুলতে পারবি না জানি তাই বলে তোর জীবনটা একা কাটিয়ে দিবি সেটা তো হয়না তাই আমরা সবসময় চেয়েছি তুই বিয়ে করে নে
আমি: হ্যাঁ আজ বিয়ে করেছি তোমাদের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে তাই তোমরা তোমাদের বৌমাকে দেখতে এসেছ আর সেদিন যে চলে গিয়েছিলে আর একবারো আসার প্রয়োজন মনে করনি নিলা মারা যাওয়ার পর আমি কিভাবে বেচে ছিলাম সেটা জানার প্রয়োজনবোধ করনি তাই না
আব্বু: এতে ওদের কোনো দোষ নেই আমিই নিষেধ করেছিলাম ওদের আসতে তাই ওরা এই তিনবছর আসেনি
আমি: মানে
আব্বু: ওরা এখানে থাকলে ওদের দেখে তোর নিলার কথা বেশি মনে পড়তো তাই আমি ওদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম
আমি: বাহ্ ভালো তো তা এখন কি আমি নিলাকে ভুলতে পেরেছি
আব্বু: না আমিই ভুল ছিলাম ভেবেছিলাম ভুলতে পারবি
আমি: আব্বু আমার ভালোবাসা এতো ঠুনকো ছিল না যে….
আব্বু: বৌমা আসছে আমি চাইনা ও নিলার কথা জানুক।
আর কোনো কথা না বলে ছাদে চলে আসলাম।

ছাদের এক কোণে বসে আছি খুব কষ্ট হচ্ছে সবাই সবার মতো করে ভেবে নিয়েছিল আমি নিলাকে ভুলে যাবো আর এইটা ভেবে চাচ্চু ছোটমা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল ভাবতেই তো অবাক লাগছে
–রিফাত (হঠাৎ ছোট মার কন্ঠ শুনে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিলাম)
–আমার সাথে কথা বলবি না
–কি বলবো
–ঠিক আছে তোর রাগ কমলেই আমার সাথে কথা বলিস এখন এইটা নে
–কি (তাকিয়ে দেখি ছোটমার হাতে একটি ডায়েরি দেখে মনে হচ্ছে পুরনো)
–এইটা নিলার ডায়েরি
–কি নিলার ডায়েরি (ছোটমার হাত থেকে কেড়ে আনলাম)
–হুম স্টোররুমে পরে ছিল জানতাম না সেদিন পেয়েছি তাই আসার সময় নিয়ে এসেছি
–ছোটমা তুমি এখন যাও আমি ডায়েরিটা পড়বো
–ডায়েরিটা আমি পড়েছি তাই আমি চাইবো ডায়েরিতে লিখা নিলার শেষ কথাগুলো তুই অক্ষরে অক্ষরে পালন কর
ছোটমার দিকে অবাক হয়ে তাকালাম উনি আর কিছু না বলে চলে যাচ্ছেন, কি এমন লিখা আছে যা আমাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বলছেন ছোটমা।
তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা খুলে পড়তে বসলাম…..

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here