শেষ_পর্যন্ত পার্ট: ৪

13
555

শেষ_পর্যন্ত

পার্ট: ৪

লেখিকা: সুলতানা তমা

সেদিন যদি সব ঠিকঠাক হতো তাহলে আজ নিলা আমার পাশে থাকতো কেন সেদিন এমন হলো, আজ নিলাকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে আমি ওর শেষ কথা রেখেছি….

রিয়ান: ভাইয়া তুমি ছাদে এসে বসে আছ আর সবাই তোমাকে খুঁজছে
আমি: হুম একটু পর আসছি যা
রিয়ান: এতোক্ষণ ধরে ছাদে থেকেও হয়নি রাত প্রায় একটা বাজে চলো (এতোক্ষণ আকাশের তারাটা দেখতে গিয়ে কখন একটা বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি, বুঝবো কিভাবে নিলার কথা ভাবলে যে আর কিছুই মনে থাকে না আমার আর এতোক্ষণ তো আমি আকাশের নিলাকেই দেখছিলাম)
রিয়ান: ভাইয়া কি হলো চলো
আমি: হুম আসছি
রিয়ান: ভাইয়া এবার অন্তত রাতের আকাশে তারা দেখার অভ্যাস ছাড়ো কেন মিছিমিছি ভাবো ওই তারায় নিলা আপু আছে ভুলে যেও না এখন তোমার বউ আছে
আমি: তাতে কি হয়েছে বউ পেয়েছি বলে নিলাকে ভুলে যাবো শুন আলিফাকে আমি নিলার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারবো না শুধু নিলার পাশে একটুখানি জায়গা দিব ওকে
রিয়ান: ঠিক আছে এতো রেগে যাচ্ছ কেন তোমার যা ভালো মনে হয় তাই করো এবার নিচে চলো
আমি: হুম

নিচে এসে দেখি সবাই আমাকে খুঁজছে
রিয়াদ: কোথায় চলে গেছিলি
আমি: আব্বু কোথায়
প্রিতি: আব্বু রুমে রেস্ট নিচ্ছেন তুমি রুমে যাও ভাবি একা আছে
সাগর: এদিক নিয়ে তোর ভাবতে হবে না তুই রুমে যা
আমি: হুম

রুমের দিকে যাচ্ছি আর ভাবছি আলিফা আমার উপর খুব রেগে আছে এখন তো আমাকে একা পেয়ে সব রাগ জারবে, রুমে এসে চারদিকে চোখ বোলালাম আলিফা তো কোথাও নেই গেলো কোথায় মেয়েটা, হঠাৎ জানালার কাছে চোখ আটকে গেলো জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে, আলিফাকে বউ সাজে সাজানো হয়েছে খুব সুন্দর লাগছে ওকে তবে নিলার চেয়ে বেশি না নিলাকে তো বউ সাজে একদম পরীর মতো লেগেছিল
আলিফা: বিয়ের আগে তো আমার কথা শুনার সময় হয়নি আপনার এখন সময় হবে
আমি: আপনি এখনো কাঁদছেন
–কাঁদবো না তো কি করবো বিয়ের আনন্দে ডান্স করবো
–কি হয়েছে বলুন বিয়ে তো হয়েই গেলো এখনো রেগে আছেন আর এখনো কাঁদছেন কেন
–শুনুন আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে মানতে পারবো না আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি (কথাটা শুনে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছি না, তিনবছর আগে নিলা আমার সাথে বেঈমানি করেছিল কেন করেছিল আজো জানতে পারিনি আর আজ যাকে আঁকড়ে ধরে একটু ভালো ভাবে বাঁচতে চাইলাম সেও কিনা অন্য কাউকে ভালোবাসে, পৃথিবীতে কি আর কেউ নেই আমার সাথেই কেন এমন হয়)
–কি হলো চুপ হয়ে আছেন যে
–আসলে কি বলবো বুঝতে পারছি না
–আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন কিন্তু আমিও তো অন্য কাউকে ভালোবাসি
–বিয়ের আগে বললেন না কেন বিয়েটা ভেঙ্গে দিতাম
–সময় কোথায় ছিল হুট করে আমার বাসায় গেলেন আব্বুরও আপনাকে পছন্দ হয়ে গেলো আর বিয়েটা আজই হয়ে গেলো তাও আমি অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু আপনাকে কেউ না কেউ ডেকে নিয়ে যেতো তাই আর বলা হয়নি
–হুম এখন কি চান
–জানিনা
–জানিনা বললে তো হবে না বিয়ে হয়ে গেছে আগে জানতে পারলে নাহয় বিয়ে ভেঙ্গে দিতাম
–আগে বললেও এই বিয়েটা আমাকে করতে হতো কারণ আব্বু আমার কাছে কখনো কিছু চাননি শুধু এই বিয়েটা…..
–তাহলে তো দোষ আমার একার না আপনারও এই বিয়েতে ইচ্ছে ছিল
–কিসের ইচ্ছে আমি তো পরিস্থিতিতে পড়ে বিয়েটা করেছি আপনি যদি হুট করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে না যেতেন তাহলে কি এতোসব হতো
–ওকে সব দোষ আমার এবার বলুন আপনি কি চান আমার কি করতে হবে
–আমি জানিনা আমি কিছু বুঝতে পারছি না আর রাতুল বিয়ের কথা জানেনা জানলে কি করবে বুঝতে পারছি না
–রাতুলটা কে
–আমি রাতুলকেই ভালোবাসি
–ওহ
–কিভাবে কি হয়ে গেলো কি করবো এখন….
–খুব ভালোবাসেন রাতুলকে তাই না (মেয়েটা কিছুক্ষণ কেমন যেন অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো আমার দিকে)
–হুম অনেক ভালোবাসি আমার নিজের থেকেও বেশি (ওর চোখে পানি কি বলবো বুঝতে পারছি না, ওকে কি করে বুঝাই আমিও যে ওকে ভালোবেসে ফেলেছি আমি ওর মাঝে নিলাকে খুঁজে পেয়েছি আমি ওকে আঁকড়ে ধরে বেচে থাকতে চাই)
–রাতুলকে জানাননি এখনো আপনার যে বিয়ে হয়ে গেছে
–জানানোর সুযোগ পেলাম কোথায়
–এখন জানিয়ে দিন
–ফোনটা তো বাসায় রেখে এসেছি
–ওহ তাহলে এখন কি করা যায় মানে আমাকে এখন কি করতে হবে
–রাতুল বাহিরে আছে সাতমাস পর দেশে ফিরবে আর ও ফিরে আসলে আমি ওর কাছে চলে যাবো
–হুম
–রাতুল ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা অভিনয় করে যাবো সবার সামনে
–আমি অভিনয় করতে পারবো না
–তাহলে আমি সুইসাইড করবো
–আরে আজব মেয়ে তো আপনি এখানে সুইসাইড এর কথা আসছে কেন
–আমার কথা মতো চলবেন বলুন নাহলে আমি সুইসাইড করবো আর আপনাকে ফাঁসিয়ে যাবো
–ঠিক আছে সুইসাইড করতে হবে না আমি শুনবো আপনার কথা
–আপনি আমাকে ভালোবাসেন
–এসব আর জেনে কি করবেন বাদ দিন না আপনি বরং আপনার আর রাতুল এর প্রেম কাহিনী বলুন
–এখন ভালো লাগছে না এসব বলতে
–ওকে তাহলে আমি শুয়ে পড়ি
–আরে খাটে শুচ্ছেন কেন আমি কোথায় ঘুমাবো
–কেন আমার পাশে
–মাথা খারাপ হয়ে গেছে এতোক্ষণ কি বললাম আপনাকে
–ওহ সরি আপনি সোফায় শুয়ে পড়ুন
–আমি সোফায় ঘুমুতে পারিনা
–তাতে আমার কি
–আপনি গিয়ে সোফায় ঘুমান
–সম্ভব না
–ওকে (আরে এই মেয়ে এমনভাবে আমার দিকে এগুচ্ছে কেন মনে হচ্ছে এখনি মেরে ফেলবে আমাকে)
–আরে কি করছেন এভাবে কিলাচ্ছেন কেন
–আপনি সোফায় ঘুমাবেন বলুন
–ওকে ঠিক আছে এবার থামুন
–হুম যান
–(বাপরে নিলা তো রাগি ছিল আর ও তো দেখছি পুরো গুন্ডি মেয়ে)
–এই মিনমিনিয়ে কি বলছেন
–কই কিছু না

কি আর করার সোফায় এসে চুপচাপ শুয়ে পড়লাম নিজের বাড়ি নিজের রুম অথচ আমাকে সোফায় ঘুমাতে হচ্ছে, আলিফা ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো এখান থেকে ওকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ডিম লাইটের নীল আলোতে ওকে অসাধারণ লাগছে
–একটা কথা বলবো (হঠাৎ আলিফার কথায় চমকে উঠে ওর দিক থেকে চোখ ফেরালাম ও হয়তো বুঝতে পেরেছে আমি যে ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম)
–কি হলো বলবো
–হুম বলুন
–আপনি খুব ভালো আমরা বন্ধু হতে পারি
–(বউ থেকে বন্ধু হায়রে কপাল)
–কিছু বললে
–নাতো
–আমরা আজ থেকে বন্ধু এখন থেকে দুজন দুজনকে তুমি করে বলবো ঠিক আছে
–ওকে
–আচ্ছা তুমি কখনো কাউকে ভালোবাসনি
–বেসেছি তো এইযে তোমাকে
–আমার আগে কাউকে ভালোবাসনি (নিলার কথা মনে পড়ে গেলো ওকেই তো আমি ভালোবেসেছিলাম আর এখনো বাসি শুধু আলিফা…..)
–কি হলো বলছ না কেন
–হুম বেসেছিলাম এখনো ওকে ভালোবাসি
–নাম কি ওর
–নিলা
–ওকেই যখন এখনো ভালোবাস তাহলে আমাকে আবার ভালোবাস বলছ কেন আর আমাকে বিয়েই বা কেন করেছ নিলা কোথায়
–(মৃদু হাসলাম)
–কি হলো বল
–সময় হলে সব জানতে পারবে
–ওহ, আচ্ছা ওর সাথে তোমার কিভাবে দেখা হয়েছিল প্লিজ বলোনা
–তুমি যেদিন রাতুল এর সাথে তোমার প্রেম কাহিনী বলবে সেদিন নাহয় আমিও নিলার কথা বলব
–তুমি তো দেখছি আস্ত একটা…. (এইরে আবার রেগে গেছে)
–রেগে যাচ্ছ কেন
–তো কি করবো আমি বলতে বলেছি কিন্তু তুমি বলছই না
–আমি যখন জানতে চেয়েছিলাম তখন কি তুমি বলেছিলে
–আমি বলিনি তো কি হয়েছে তোমাকে বলতে হবে
–সরি
–উফফফফ
–এই কি হচ্ছে বালিশ ছুড়ে মারছ কেন
–তোমাকে তো এখন আমার….
–কি আদর করতে মন চাইছে আসলে দোষটা তোমার না আজ তো আমাদের বাসররাত তাই আদর করার ইচ্ছে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক (দুষ্টুমি করে বললাম)
–রিফাত আমি কিন্তু তোমাকে খুন করে ফেলবো (যতো দুষ্টুমি করছি আলিফা ততো বেশি রেগে যাচ্ছে তাহলে আর একটু রাগালে দোষ কি)
–কেন ভুল কি বললাম আজ তো আমাদের বাসর রাতই আর সব স্বামীরাই বউয়ের প্রেমে খুন হতে চায় তাই চাইলেই তুমি আমাকে তোমার প্রেমে খুন করতে পারো
–রিফাত আমি কিন্তু খুব রেগে যাচ্ছি
–রাগ থেকে যদি হয় দারুণ কিছু তাহলে তো রাগই ভালো হাহাহা
–ছাড়াচ্ছি তোমার মাথা থেকে বাসর রাতের ভূত (ও দেখছি আমার কাছেই আসছে একটু বেশিই রাগিয়ে ফেললাম নাকি)
আলিফা এসে আমাকে বালিশ দিয়ে মারতে শুরু করলো
–আলিফা কি করছ
–তোমার মাথা থেকে ভূত তাড়াচ্ছি
–আমই মনে হয় একমাত্র পুরুষ যে কিনা বাসররাতে বউয়ের হাতে মাইর খাচ্ছি
–তোমাকে তো মারাই উচিত এতোক্ষণ কি বলেছ এসব
–আমি তো দুষ্টুমি করেছি তোমাকে রাগানোর জন্য
–কেন আমাকে রাগাতে ভালো লাগে (ওর হাত থেকে বালিশটা কেড়ে নিয়ে ওকে আমার বুকের উপর শুয়ে দিয়ে শক্ত করে জরিয়ে ধরলাম, আলিফা আমার চোখের দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে আছে)
–ইচ্ছে করেই তোমাকে রাগাই কারণ রাগলে তোমাকে খুব বেশি সুন্দর লাগে।
আলিফা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, নীল ডিম লাইটের আলোতে আলিফার হাসি খুব সুন্দর লাগছে মনে হচ্ছে কোনো এক নীল পরী হাসছে, আমি মুগ্ধ হয়ে ওর হাসি দেখছি…..

চলবে?

Comments are closed.