শিউলিফুল

0
386

লেখক: অনুপম।

পৌষ মাঘের শীতের সকালে প্রাইভেট পড়ে গলার ব্যথাটা অনেক বেড়েছে হাসিবের, বোধহয় টনসিল হবে, গুটিকতক ঔষধ ও কিনে খেয়েছে ফার্মেসি থেকে ব্যথা কমানোর, কিন্তু ব্যথা কমেনি, গলার নিচে কিছু একটা অনুভব করে হাসিব,
ডাক্তার দেখিয়েছে, বলেছে টনসিল অপারেশন করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের ছেলে হাসিব, প্রাইভেট হাসপাতালে অপারেশন করাতে অনেক বেশি টাকা লাগে,

তিন সপ্তাহ ঘুরে পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি হলো,
বুধবারে হাসিব হাসপাতালে ভর্তি হলো, হাসিবের পরনে সবুজ পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা, হাতে ব্যাগ, ব্যাগে একটা থালা, একটা পানির বোতল, আর কয়েকটা পাঞ্জাবি আর পাজামা, কম্বলও আছে একটা।

নাক, কান, গলা বিভাগে দিয়ে এলে হাসিবের খালাতো ভাইয়ের বন্ধু সে একটা ক্লিনিকের এজেন্ট সদর হাসপাতালে পোস্টিং তার, বেড খালি ছিলো না, একটু অপেক্ষা করতে হলো, ব্যাগটা অন্য একটা বেডের নিচে রেখে দাড়িয়ে রইলো, একটু ইতস্তত করতে লাগলো, দরিদ্র হলেও হাসিব এমন পরিবেশে অভ্যস্ত নয়, একটা রোগীর ছুটি হলে সে বেডে গিয়ে বসলো হাসিব। ব্যাগটা বেডের নিচে রাখলো। তারপর একটু ঘুরতে গেল। এসে দেখলে তার বেডে অন্য একটা মাঝবয়সী পুরুষ শুয়ে। হাসিব নার্সকে ডাকলো, নার্স অন্য একটা বেড দিলেন হাসিবকে বেড নাম্বার ১৬, শেষ বেড। দক্ষিণ পশ্চিমের কোণায়,
সারাদিন বাইরে কাটালো হাসিব, সন্ধ্যায় বেডে বসলো, রাত আটটা, দিনের নার্স বদলে রাতের নার্স আসলো, সাথে ইন্টার্নি করা নার্সট পাল্টে অন্যজন আসলো।
হাসিব অন্যজনের বেডে বসে তার সাথে গল্প করছিলো, ইন্টার্নি করা নার্সটা সবাইকে ঔষধ দিয়ে ১৬ নাম্বার বেডের কাছে গিয়ে বললো,
এই বেডের রোগী কে, হাসিব বললো আমি,

নার্স:- আপনি রোগী?
হাসিব: হ্যা আমি।

সবাই হাসতে লাগলো।
হাসপাতালের পাশেই হাসিবের খালাতো ভাইয়ের শশুর বাড়ি, ভাই বলেছিলো তার শালা ৯ টায় আসবে তাকে নিতে,
তাই হাসিব তিন, চার বার নার্সদের রুমের দরজায় গিয়ে ফিরে এলো,
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তো বাহিরে থাকার নিয়ম নাই।
পরেরবার রুমে ঢুকতে গেল, তখনই নার্সটা একটা ট্রে নিয়ে বাহিরে আসতে লাগলো, হাসিব হকচকিয়ে গেল,

নার্স:- এই যে, কিছু বলবেন?

হাসিব:- তোতলাতে তোতলাতে বললো, আমার ভাইয়ের বাসা পাশে আমি ওখানে থাকবো।

নার্স:- এভাবে তো যাওয়া যায় না, আপনি ম্যাডামকে বলুন।

বড়নার্সকে বললো হাসিব।

বড়নার্স:- এইযে হাসিব, আপনি তো বাড়ি যেতে চাচ্ছেন, রাস্তায় আপনার কিছু হলে দায় হবে আমাদের, আপনার কাছে দামি ফোন আছে। যাওয়া যাবে না। এখানেই থাকেন।

হাসিব:- আমি তো খেয়ে আসিনি, আর এখানের খাবারও নেই নি।

বড়নার্স:- তাহলে আপনি লিখে দিয়ে যান আপনার কিছু হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।

ছোটনার্স কলম আর কাগজ দিলো, হাসিব লিখে চলে গেল হাসপাতাল গেটে। সেখানে ভাইয়ের শালা ছিলো। তার সাথে বাড়ি গিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। সকালে খেয়ে গোসল করে হাসপাতালে গেল, গিয়ে আর রাতের নার্সটাকে পেল না।

সারাদিন হাসপাতালে কাটালো হাসিব, দুপুরে বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসলো।
রাত আটটা ত্রিশ মিনিট হাসিব বেডে বসে বই পড়ছিলো। গতদিনের নার্স টা এসে বললো এইযে তোমার ঔষধ নাও।
কথাটা খুব মধুর লাগলো, আর তুমি করে বলাটা হাসিবের অনেক আপন লাগলো।

ঔষধ খেয়ে নার্সকে বলেই সেদিনও হাসিব বাড়ি চলে গেল।
অপারেশন এর আগের রাতে হাসিব বাড়ি যেতে চাইলে নার্সটা বললো কাল তো তোমার অটি, তুমি আজ এখানেই থাকো,।

হাসিব:- আজ তো আর্জেন্টিনার খেলা, এখানে তো টিভি নাই। তুমি একটু বলো, সকালেই চলে আসবো অপারেশন এর আগেই।

নার্স:- শোনো, কাল অপারেশন, কখন কি করতে হয়, তুমি এখানেই থাকো, তোমার অসুখ আগে নাকি খেলা, খেলা পরেও দেখতে পারবে। ম্যাডামকে এই কথা বললে আমায়ও বকবে।

হাসিব:- আমি তো খাইনি, তুমি ঔষধ দাও আমি বাড়ি থেকে খেয়ে আসি।

নার্স :- যাও তাড়াতাড়ি এসো।

হাসিব খেয়ে চলে আসলো। আর্জেন্টিনার খেলা শুরু হওয়ার আগে হাসিব নার্সের কাছে যেয়ে বললো তোমার কি আনড্রয়েড ফোন?

নার্স:- না, সিম্পল ফোন, কেন কি করবে?

হাসিব:- খেলার খবরটা দেখার জন্য।
আচ্ছা তোমার নাম কি?

নার্স:- আমার নাম হীরা, শোনো তুমি ফোন নিয়ে আসো। ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড অর্থোপেডিক্স,।

হাসিব:- মা ফোন দিবে না। আমি ঘুমালে বেহুশ থাকি হারিয়ে যাবে ফোন।

হাসিব হাসপাতালের গেটে গিয়ে ঘুরতে লাগলো খেলা দেখার জন্য। সেখান থেকে দুটো চিপস নিয়ে আসলো, নার্সরুমের দরজায় গিয়ে কিছুক্ষন দাড়িয়ে রইলো, তারপর হুট করে ঢুকে গিয়ে বললো এটা তুমি খাও, হীরা বললো না তুমিই খাও। হাসিব কিছু না বলেই চলে আসলো।

সকাল দশটায় অপারেশন হীরা হাসিবের হাতে ক্যানোলা করে দিলো, অনেকক্ষণ ধরে শিরা খুজলো, কয়েকবার সুচ ফুটালো, হাসিব একটা শব্দ ও করলো না। স্যালাইন দিয়ে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেল, হীরা তাকিয়ে রইলো হাসিবের দিকে। হীরা চলে গেল ডিউটি শেষ করে।

হাসিব শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, হীরা হাসিবের সামনে দাড়িয়ে, যে হাসিবকে রোগী মনে করতো না আজ সে কত অসুস্থ, হাসিবকে ডাকলো হীরা,

হীরা:- কেমন আছো?

হাসিব ঘাড় নাড়লো।

ঔষধ দিলো, হাসিবের মা খাইয়ে দিলো,
হীরা হাসিবের মাকে ঠান্ডা জাতীয় খাবার খাওয়াইতে বললো।

একটু পরে হীরা একটা জুস এনে দিলো হাসিবকে,
সেদিন জুস খেয়েই কাটালো হাসিব।

তারপরের রাতে হাসিব বাড়ি গেল, পরেরদিন হাসিবকে ছুটি দেওয়ার কথা, হাসিব ভাবলো হীরা তো আটটায় চলে যাবে। হাসিব সকাল সাতটায় উঠে ফ্রেশ হয়ে একটা চিরকুট লিখলো, যাওয়ার পথের শিউলি গাছ থেকে শিউলি ফুল নিলো এক মুঠো।

কয়েকবার হাতে নিয়ে হীরার কাছে গেল হাসিব, মানুষ থাকায় দিতে পারলো না। হাসিব গিয়ে বেলকনিতে দাড়ালো, হীরা ড্রেস পাল্টে বোরকা পরে বের হলো। হাসিবকে দেখে জিজ্ঞেস করলো কেমন আছো, হাসিব বললো ভালো।
তখনই হীরা একটা বড় আপুকে ডাকলো।

তার সাথে হীরা চলে গেল। পিছন থেকে ডাকলো, কিন্তু হাসিবের স্বর অস্পষ্ট, শুনতে পেল না, পিছু পিছু হাসপাতাল গেট পর্যন্ত গেল। কত ডাকলো কিন্তু স্বর হীরার কানে পৌছালো না। হাসপাতাল গেট পার হয়ে হীরা ফিরে চাইলো, হাসিব সেখানে ছলছল চোখে দাড়িয়ে রইলো।
হাসিবের ছুটি হয়ে গেল সেদিন। আসার সময় হাসিব বেডের পাশের ট্রে তে শিউলি ফুল গুলো রেখে আসলো।

একমাস পরে হাসিব আবার গেল হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে,। অনেক খুজলো হীরাকে, পেলো না কোথাও, ফিরে এলো হাসিব।
গলার অপারেশন, ঠান্ডা খাবার খাওয়া বারণ,
শীতকাল, গরম জল খাওয়ার জন্য হাসিব একটা জল গরম করার জগ কিনেছিলো। একদিন জল গরম করতে গিয়ে ভুল করে জলে হাত লাগে হাসিবের আটকে যায় হাসিব,

হাসিব শুয়ে আছে বেডে, বেড চলছে সদর হাসপাতালের বারান্দা দিয়ে, হাসিবের চোখ ঝাপসা, শরীর ঢাকা চাদর দিয়ে শুধু হাতটা ঝুলে আছে , হীরা বারান্দা দিয়ে আসতেছিলো, হাসিবের হাতটা হীরার হাতের সাথে লাগলো, হীরা দেখলো হাতে সেই ক্যানোলার দাগ যেটা হাসিবের হাতে করেছিলো ও। হীরা পিছু পিছু গেল, হাসিবের মা চিনলো হীরা কে, হাসিবের চোখ বন্ধ, হঠাৎ হাত নড়লো, হাত দিয়ে পাশের ট্রে দেখালো হীরা হয়তো শিউলি পেয়েছিলো, হীরা বুঝতে পেরে দৌড়ে চলে গেল হাসপাতালের পাশের গলি থেকে মুঠো ভরে শিউলি নিয়ে আসলো, হাসিবের হাতে দিলো। হাসিব হাসলো এক চিলতে, হাসিব হাতটা উপুর করলো নিচেই হীরার হাত, শিউলি ফুল গুলো হীরার হাতে পরলো।
হীরা হাসিবের হাত ধরলো, ডাক্তার হাসিবকে দেখছে, ডাক্তার চলে গেল, হীরা খেয়াল করলো হাসিবের হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, চোখের মনি স্থির, চোখ দু’টো সিলিং এর দিকে। হাসিবের হাত হীরার হাতে আর ওদের হাতের মুঠোয় শিউলি ফুল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here