“শপথ”(পর্ব-২)

0
1649

“শপথ”(পর্ব-২)

অবনিকে দেখার পর থেকেই স্যামস্ নিজেকে আর শান্ত করতে পারছে না। কোথাও যেন অবনির মাঝে সে বারবার তার অবন্তিকাকে হারাচ্ছে। সে অবনিকে পছন্দ করে না কিন্তু কোথাও যেন তার মাঝে অবন্তিকা লুকিয়ে আছে। মাঝরাতের নিস্তব্ধতায় স্যামস্ ব্যালকোণ বারান্দার দরজা খুললো। বারান্দায় গিয়ে সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলো। তার এই ফ্যাকাশে জীবনে প্রায় তিন বছর পর আজ সে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। হয়ত সে অবনির ভেতর থেকে অবন্তিকাকে এক ঝলক দেখার পিপাসাতে কাতর। সহস্র স্মৃতি এসে জাপটে ধরলো তাকে। তার মনে পড়ে গেল অবন্তিকাকে প্রথম দেখার স্মৃতি।
সাড়ে তিনবছর আগে হুট করেই বিনা নোটিশে স্যামসের জীবনে ঢুকে পড়েছিল অবন্তিকা নামের দুষ্টু চঞ্চল হাসিখুশি একটা মেয়ে। মেয়েদের থেকে দূরে থাকা এই স্যামসের জীবনের ২৫টা বসন্ত পেরিয়ে যাবার পর প্রেমের বুলেট ঢুকে যায় তার বুকে। তারপর থেকে আজও সে আর সুস্থ নয়।
স্যামসের মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা। যে রাতে প্রথম দেখেছিল সে অবন্তিকাকে।

শুকনো মরিচের গুড়ো দিয়ে কাঁচা আম মাখিয়ে খাওয়ার অবদানে রাতে প্রচন্ড পেট ব্যাথা শুরু হলো অবন্তিকার। ব্যাথায় সে অস্থির হয়ে গেল। তার বাবা মা তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে, নতুন যায়গা, কোনো ডাক্তারদের সাথে পরিচয় নেই। অবন্তিকার বাবা জাহিদ সাহেব তার পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করলেন কিন্তু দূর্ভাগ্য বসত সেই ডাক্তারের ফোন সুইচ অফ। তিনি তো টেনশনে ঘামতে শুরু করলেন। এদিকে পেট ব্যাথায় অবন্তিকার অবস্থা কাহিল। দিশা না পেয়ে তার বাবা বাড়ি ওয়ালার কাছে গেলেন।
আধা ঘন্টা পর ডাক্তার এলো। ডাক্তারকে দেখে অবন্তিকা হতভম্ব হয়ে গেল। সে মনে মনে বললো, “এ তো দেখছি পাশের বাসার সেই ছেলেটা। এই ছেলে ডাক্তার?” অবন্তিকা লাফ দিয়ে বসে বললো-
–“এই আপনি কে?”
অবন্তিকার এমন প্রশ্নে স্যামস্ হতভম্ব হয়ে গেল। এমন প্রশ্নের মুখোমুখি এই প্রথম সে। কি বলবে সে বুঝে উঠতে পারলো না। সে কিছুক্ষণ অবন্তিকার দিকে চেয়ে থেকে বললো-
–“আমি স্যামস্।”
–“আপনার নাম কে শুনতে চেয়েছে?”
–“তুমিই তো এখনই জিজ্ঞেস করলে।”
–“আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনি কে?”
–“আমি তো সেটাই বললাম।”
–“আপনি ডক্টর?”
–” ইয়েস। আমাকে দেখে ডক্টর মনে হচ্ছে না?”
–“একদম মনে হচ্ছে না।”
–“কি মনে হচ্ছে?”
–“পাড়াপড়শী মনে হচ্ছে।”
–“পাড়া পড়শীকে দেখেই পেটব্যাথা সেরে গেল নাকি?
–“আরও বেড়ে গেছে পেট ব্যাথা।”

কথাটা বলেই অবন্তিকা আঁ উঁ করতে শুরু করলো। তার আঁ উঁ শুনে স্যামস্ ঘাবড়ে গেল। এই প্রথম সে নার্ভাস ফীল করছে। বুঝে উঠতে পারছে না যে, সে কি বলবে। সে এক রকম তোতলিয়ে বললো-
–“বেবেবেড়ে গেল কেকেকেন?”
অবন্তিকা কেঁকিয়ে উঠে বললো-
–“পাড়াপড়শী ডাক্তার হলে অসুখ সারে নাকি?”
অবন্তিকার কথা শুনে স্যামস্ ঘামতে শুরু করলো। একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে, কেশে তোতলানোটা সামলে নিয়ে বললো-
–“একটু চুপ করলে আমি ট্রিটমেন্ট শুরু করতে পারি।”
অবন্তিকার মা বিছানাতেই বসে ছিলেন। উনি অবন্তিকাকে বললেন-
–“একটু চুপ থাক, ট্রিটমেন্ট না করলে ব্যাথা সারবে কি করে?”
মায়ের কথা শুনে অবন্তিকা থেমে গেল। স্যামস্ জিজ্ঞেস করলো-
–“আজ সারাদিন কি খেয়েছো?”
–“সন্ধ্যায় কাঁচা আম শুকনো মরিচ মেখে খেয়েছি।”
স্যামস্ চোখ কপালে তুলে বললো-
–“কিহ?”
–“কেন? পৃথিবীতে এই প্রথম আমিই কাঁচা আম মেখে খেয়েছি নাকি?”
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


স্যামস্ আর কথা না বাড়িয়ে সুচ বের করলো ইনজেকশন করার জন্য। সুচ দেখে অবন্তিকা “ওমাগো” বলে চিৎকার দিয়ে শোয়া থেকে বসে পড়লো। অবন্তিকার বাবা অসহায়ের মতো মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। আবন্তিকা চিৎকার করে বললো-
–“আমি কিছুতেই ইনজেকশন করতে দেবো না।”
স্যামস বুঝলো এই পাগলি টাইপের মেয়েটাকে কন্ট্রোল করে ট্রিটমেন্ট করা তার জন্য সহজ হবে না। সে বললো-
–“এটা ছাড়া আর কোনোই উপায় নেই।”
–“নিকুচি করেছি আপনার উপায়ের।”
–“এই মেয়ে এতো কথা বলো কেন? চুপচাপ শুয়ে থাকো। নড়াচড়া করলে কিন্তু দড়ি দিয়ে বেঁধে ইনজেকশন করবো।”
অবন্তিকা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললো-
–“ওরে.. সাহস কত রে?”
–“এই মেয়ে তুমি চুপ করবা?”
অবন্তিকা তার বাবার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে বললো-
–“আব্বু তুমি কি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে নাকি এই হাতুড়ে ডাক্তারকে কিছু বলবে?”
স্যামস্ অবাক চোখে তাকিয়ে বললো-
–“কি আমি হাতুড়ে ডাক্তার?”
–“ভালো ডাক্তার হলে সুচ না ফুঁড়ে একটা মিষ্টি লিকুইড ওষুধ দিয়ে আমার পেট ব্যাথা ভালো করে দিতেন।”

অবন্তিকার কথা শুনে স্যামস্ হাহা করে হেসে ফেললো। তার বুঝতে আর বাকী নেই যে, এই মেয়েটা পুরাই পাগলি। অবশেষে জোর করে ধরে অবন্তিকাকে ইনজেকশন করা হলো।ইনজেকশন করা শেষে সে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করলো, সাথে নানান রকমের প্রলাপ শুরু হলো।
–“ডাকাত ডাক্তার তোমার ভালো হবে না। একদিন আমি ঠিক শোধ নেবো। কেউ আমাকে ভালোবাসে না। আব্বু আম্মু সবাই ভিলেন।”
এই প্রথম স্যামস্ এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। কি বলবে সেটাই বুঝে পাচ্ছে না। মেয়ের মুখে এসব কথা শুনে তার বাবা মাও নির্বাক হয়ে গেছে। স্যামস্ মনে মনে বললো-“তোমার মতো বেয়াড়া পাগলির শরীরে লিকুইড ওষুধ কাজ করবে না।”

অবন্তিকার দুই কাজিন ওদের বাসায় বেড়াতে এসেছে। তাদের সাথে নিয়ে ছাদে বসে ঝাল ঝাল করে কাঁচা আম মাখছে অবন্তিকা। আর মনে মনে বলছে আহা কি টেস্টি!

–“এই তুমি আবার ঝাল আর টক খাচ্ছো?”
হঠাৎ কারো গলার আওয়াজে পেয়ে পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলো ঐ ডাক্তারটা এদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবন্তিকা মুখ ভেঙচি কেটে বললো-
–“খাচ্ছি না, খাবো। কিন্তু আপনার কি ডাকাত?
–“খাবা মানে? খেলেই তো পেটব্যাথা শুরু হবে।”
–“আমার পেট ব্যাথ হলে আপনার কি?”
–“ট্রিটমেন্ট তো আমাকেই করতে হবে?”
–“এই শুনুন হাতুড়ে আপনাকে আমার লাগবে না।”
–“এই ফাজিল মেয়ে তুমি আবার আমাকে হাতুড়ে বলছো?”
–“আপনাকে কে এখানে নাক গলাতে বলেছে হুম? যান নিজের রুমে যান আর আমাদের ছাদের দিকে কখনও তাকাবেন না। আমাকে সুচ ফুটিয়েও আপনার সাধ মেটেনি ডাকাত?”
–“কিহ আমি ডাকাত?”
–“আপনি শুধু ডাকাত নন, ডাকুরাজ।”
–“তাহলে তুমি তো ডাকুরানীর বস।”
–“আসেন আমের সাথে আপনাকেও কেটে কুচি কুচি করি।”
–“কিহ?”
–“আমি তো ডাকুরানীর বস তাই ডাকুরানীর মতোই মানুষও কাটি। আসেন তাড়াতাড়ি আসেন। নাকি টেনে নিয়ে আসবো?”

অবন্তিকার এমন পাগলামি কথা শুনে স্যামস্ চুপ হয়ে গেল। কারণ সে পাগলির সাথে পাগল হতে চায় না। অবন্তিকা আম মাখানোতে মনোযোগ দিলো। স্যামস্ কি আর করবে! এই মেয়েকে কিছুই বুঝানো সম্ভব নয়। পুরাই মেন্টাল প্যাসেন্ট। স্যামস বই পড়াতে মনোযোগ দিলো।

হই হই করে ওরা তিনজন আম মাখানো উৎসব করলো। মাখানো শেষে এক বাটি আম হাতে নিয়ে অবন্তিকা স্যামস্’দের ছাদের কাছে দাঁড়িয়ে বললো-
–“এই ডাকাত সাহেব।”
স্যামস্ চমকে উঠে পেছনে ঘুরে দেখলো অবন্তিকা একটা বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে গেল। অবন্তিকা একটু মুচকি হাসি দিয়ে বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললো-
–“একটু খেয়েই দেখুন, দারুণ টেস্টি হয়েছে।”
কথাগুলো বলতে বলতে সে এক টুকরো আম মুখে দিলো। টকের কারণে অবন্তিকার এক চোখ বন্ধ হয়ে গেল। সেই দৃশ্য দেখে স্যামস্ নার্ভাস হয়ে পেছনের চেয়ারে বসে পড়লো। অবন্তিকা তার এই হাল দেখে হাসতে শুরু করলো। তার হাসি দেখে স্যামস্ বিমুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। সে অবাক হলো এই ভেবে যে, একটা মেয়ে এত সুন্দর করে হাসতে পারে! হাসির আওয়াজও এত সুন্দর হয়!
হাসি থামিয়ে অবন্তিকা বললো-
–“এই যে ডাকাত, হা করে কি দেখেন? নিন একটু খেয়ে দেখুন।”

স্যামস নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
–“আমাকে কি তোমার মতো পাগলি মনে হয়?”
–“এমা ছেলেরা পাগলি কেন হবে? ছেলেরা হয় পাগল।”
কথাটা বলেই অবন্তিকা আবার হাসতে শুরু করলো। স্যামস্ আবার যেন কোনো এক অচেনা গ্রহে হারিয়ে গেল। একটা মেয়ের নির্মল হাসি যে, বুলেটের মতো হৃদয়ে লাগতে পারে তা স্যামসের জানা ছিল না।

অবন্তিকার হাসির আওয়াজ ঘন্টার মত স্যামসের কানে বাজছে। এমন হাসি সে এর আগে কখনো না দেখেছে, না এমন হাসির আওয়াজ কখনো সে শুনেছে। হাসিতেই যেন সে ঘায়েল হয়ে গেছে। সারারাত এপাশ ওপাশ করে শেষ প্রহরে সে ঘুমিয়ে গেল তবুও ঘুম ঠিকঠাক হলো না। ভোরবেলা সে উঠে ছাদে গেল। পাশের ছাদটা শূন্য, কেউ নেই। সে এখানে এই মুহূর্তে খুব করে কাউকে প্রত্যাশা করছে। তার মনে হচ্ছে, এই ছাদটাতে ঐ দুষ্টু মেয়েটা দাঁড়িয়ে থেকে এক ঝাড় কথা শোনাক তারপর হাসতে হাসতে হেলে হেলে পড়ুক। স্যামস্ বুঝে পাচ্ছে না, তার এমন কেন লাগছে!

বিকেলে স্যামস্ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেই অবন্তিকার হাসির আওয়াজ পেলো। বাসার ভেতরে অবন্তিকার হাসির আওয়াজ আসবে কি করে? সে মনে করলো এটা তার ভ্রম। মেয়েটার হাসি এমন ভাবে তাকে ঘায়েল করেছে যে, সারাক্ষণ সেই হাসি তার কানে বাজে, তাই বাস্তব আর ভ্রম এর ভেতরের তফাৎ সে বুঝতেই পারছে না। নিজের রুমে ঢুকতেই আবার সেই হাসির আওয়াজ তার কানে এলো, সে দাঁড়িয়ে গেল। হাসির শব্দ আসছে তার মামনির রুম থেকে। সে নিজের রুমে না ঢুকে তার মামনির রুমের দিকে গেল। দরজাতে দাঁড়াতেই সে দেখলো অবন্তিকা তার মায়ের সাথে বসে গল্প করছে আর হেসে লুটিয়ে পড়ছে। আজব মেয়ে, মায়ের বয়সী একজনের সাথে সে বান্ধবীর মতো গল্প করছে। স্যামস্ ভেতরে না ঢুকে নিজের রুমে চলে গেল। এই মেয়ের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তার নেই।

পরেরদিন বিকেলে স্যামস্ হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে দেখলো অবন্তিকা আর তার মা কাঁচা আম মাখানো উৎসব করছে। এবার সে আর চুপ করে থাকতে পারলো না।
–“এই মেয়ে এসব কি করছো? নিজে তো অসুস্থ হবাই এরপর আবার আমার মামনিকে অসুস্থ করার ষড়যন্ত্র করছো?”
–“এই ডাকাত ডাক্তার, আমার নাম ‘মেয়ে’ নয়, আমার নাম অবন্তিকা। আর আমি মোটেও কোনো ষড়যন্ত্র করছি না।”
–“এই টক আম আর ঝাল খেলে মামনি অসুস্থ হবে নিশ্চিত।”
অবন্তিকা চোখ পাকিয়ে তাকালো স্যামস্ এর দিকে। অবন্তিকার চোখ দেখে সে নার্ভাস ফীল করলো। সবাই যেখানে স্যামস্’কে নমো নমো করে সেখানে এই সিরিয়াস মেয়ে একটুও ভয় পায় না। অতি নার্ভাসে স্যামস্ আর কিছু বলতেই পারলো না।

বিঃদ্রঃ গল্পের কাহিনী এবং চরিত্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবতার সাথে গল্প কখনোই মিলবে না। জীবন কখনও গল্পের মতো সাজানো গোছানো হয় না। গল্পটা শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য লেখা হয়েছে তাই বিতর্কিত মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়।

(পরের পর্ব আসছে…..)
Written by- Sazia Afrin Sapna

পর্ব-১
https://m.facebook.com/groups/884724498624937?view=permalink&id=927587814338605

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here