লাভ ম্যারেজ পর্বঃ ০৪

0
1200

লাভ ম্যারেজ পর্বঃ ০৪
– আবির খান

রাত ১১.৫০,

নিরবের মা ঘুমিয়ে পরেছে। কিন্তু নিরব ঘুমাতে পারছে না। ওর মনটা ছাদে পরে আছে। প্রিয়ন্তির কথা মতো ছাদে যাবে কি যাবে না এই ভেবে অস্থির হয়ে আছে নিরব। প্রিয়ন্তিকে না দেখেও ভালো লাগে না। কিন্তু যদি কেউ দেখে তাহলে অনেক বড় ক্ষতি হবে ওদের। নিরব আর পারছে না নিজের সাথে যুদ্ধ করতে। তাই সব ভুলে ছাদে চলে যায়।

নিরব আস্তে আস্তে ছাদে উঠে। ছাদের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই নিরব দেখে একটা মেয়ে নীল শাড়ী পরে চুলগুলো পিছনে ছেড়ে দিয়ে অন্য দিকে ফিরে তাকিয়ে আছে। নিরবের প্রথমে ভয় হয় যে এটা আবার ভুত নাকি। পরে যখন পায়ের দিকে তাকায় দেখে না নূপুর পায়ে পা টা ঠিকই আছে। নিরব নিঃশব্দে আস্তে আস্তে প্রিয়ন্তির পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়।

প্রিয়ন্তিঃ এতো দেরি করলেন কেনো আসতে??

নিরবঃ আমি এসেছি আপনি বুঝলেন কি করে??

প্রিয়ন্তিঃ ভালো লাগা বা ভালোবাসার মানুষটা কাছে আসলে তাকে এমনিই অনুভব করা যায়।

নিরবঃ বুঝলাম না। আমি এর মধ্যে কোনটা??

প্রিয়ন্তি এবার নিরবের দিকে ঘুরে তাকায়। কাজলটানা চোখ, ঠোঁটে হালকা লিপিস্টিক আর সেই তিলটা আহ। নিরব পাগল হয়ে যাচ্ছে প্রিয়ন্তিকে দেখে। প্রিয়ন্তি আস্তে আস্তে নিরবের অনেক কাছে এগিয়ে আসছে। নিরবের হৃদস্পন্দন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। প্রিয়ন্তি এখন নিরবের একদম কাছে। নিরবের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে প্রিয়ন্তি। নিরবও প্রিয়ন্তির সেই মায়াবী চোখ পড়ছে। সে চোখ কিছু বলতে চায়। সে চোখ কিছু পেতে চায়।

প্রিয়ন্তিঃ আপনার সারাটাজীবন আমাকে দিবেন??

প্রিয়ন্তির এই প্রশ্নে নিরব স্তব্ধ হয়ে যায়। তাও নিজেকে সামলে নিরব বলে,

নিরবঃ কিভাবে??

প্রিয়ন্তিঃ আমাকে ভালোবেসে।

নিরবের মনে আজ খুশির ঝোড়ো হাওয়া বইছে। তার মনের কল্পনার মতো দেখতে মেয়েটা তাকে নিজে থেকে বলছে তাকে ভালোবাসে। খুশিতে নিরবের চোখের কোনা বেয়ে দু একফোটা অশ্রু ঝরছে।

প্রিয়ন্তিঃ কি আমাকে ভালোবাসবেন?? আপনার এই বুকে আমাকে একটু জায়গা দিবেন??

নিরব আর কিছু ভাবে না। প্রিয়ন্তিকে ওর বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। আর নিরবে অশ্রু ফেলে। এ যে খুশির অশ্রু। এ যে ভালোবাসার মানুষটাকে পাওয়া খুশির অশ্রু৷ অনেকটা সময় নিরবের বুকে মাথা রেখে প্রিয়ন্তি ভালোবাসাবিলাস করে। একটু পর প্রিয়ন্তি মাথা তুলে নিরবের দিকে তাকায়। নিরবকে ইশারা করে প্রিয়ন্তি বলে মাথাটা একটু নিচে নামাতে। নিরব মাথা নিচে নামাতেই প্রিয়ন্তি যা করে তা নিরব কল্পনাতেও ভাবে নি। জীবনে প্রথম ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে প্রথম ভালোবাসার পরশ পায় ওর ঠোঁটে। নিরবও সেই পরশকে সায় দিয়ে অনেকটা সময় তাতে হারিয়ে যায়। একসময় দুজন ক্লান্ত হয়ে যায়। প্রিয়ন্তি নিরবকে ছেড়ে দিয়ে লজ্জায় অন্য দিকে ফিরে শ্বাস নিচ্ছে। নিরবের কাছে যেন এসব স্বপ্ন লাগছে। ভাবতেও কেমন অবাক লাগছে। এতো সুন্দর একটা পরী শুধু তার। নিরবের মনে প্রিয়ন্তির জন্য ভালোবাসা আরো বেরে যায়। তার মতো নূন্যতম একটা ছেলেকে প্রিয়ন্তি ভালোবাসে। নিরব এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে প্রিয়ন্তিকে জড়িয়ে ধরে কোনো সংশয় ছাড়া।

নিরবঃ আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি ব্যক্তি শুধু তোমাকে পেয়ে।

প্রিয়ন্তিঃ আমিও আপনাকে।

নিরবঃ উহুম…আপনি নয় আজ থেকে শুধু তুমি।

প্রিয়ন্তিঃ আচ্ছা তুমি। লজ্জা পেয়ে।

নিরবঃ আহ তোমার তুমিটা শুনতে কত্তো মধুর লাগে।

প্রিয়ন্তিঃ আচ্ছা তুমি আমাকে ভালোবাসোতো??

নিরবঃ যেদিন প্রথম তোমাকে এই দোলনার কাছে দেখেছিলাম, সেদিন থেকে তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি এতো নূন্যতম যে বলার সাহসটুকু পাইনি।হয়তো তুমি না বললে আমি কোনোদিনই বলতে পারতাম না। অসহায় কণ্ঠে।

প্রিয়ন্তিঃ আমি তা জানি। যে আমি না বললে তুমি জীবনেও আমাকে বলবে না ভালোবাসি।

নিরবঃ ময়না…

প্রিয়ন্তিঃ হুম…

নিরবঃ ভালোবাসি…

প্রিয়ন্তিঃ তোমার থেকে অনেক অনেক বেশি আমি ভালোবাসি।

নিরবঃ কিন্তু আমাদের এই ভালোবাসা কি তোমার পরিবার মেনে নিবে??

প্রিয়ন্তিঃ কোনোদিনও না। কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া একমুহূর্তও বাঁচতে পারবো না। আমার পরিবার কোনোদিনও তোমার মতো আরেকটা ভালো মানুষ অামাকে এনে দিতে পারবে না। আমার শুধু তোমাকেই চাই। শুধু তোমাকে। নিরবকে ঘুরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয় প্রিয়ন্তি।

নিরবঃ কেঁদো না আমাকে ছাড়তে হবেনা। আমি যেভাবে হোক তোমার পরিবারকে মানিয়ে নিবো।

প্রিয়ন্তিঃ সবাইকে পারলেও আমার বাবা আর ভাইকে পারবে না। তারা অনেক ডেঞ্জারাস। আমার ভয় হচ্ছে যদি তারা তোমার কিছু করে।

নিরবঃ তোমার ভালোবাসা সাথে থাকলে দেখো আমার কিচ্ছু হবে না। আর তারাতো এখন জানবে না। আমার পরীক্ষাটা শেষ হলেই আমার ভার্সিটি শেষ। তখন একটা চাকরি আমি নিশ্চিত পাবোই। তাহলে তোমার পরিবারও আর কিছু বলবেনা। আমাদের মেনে নিবে।

প্রিয়ন্তিঃ তাই যেন হয়।

নিরবঃ হবে হবে। দেখো। আমার উপর বিশ্বাস রাখো। ও আমি মানিয়ে নিবো।

প্রিয়ন্তিঃ সত্যিই পারবে তো??

নিরবঃ হ্যাঁ। তোমার দোলনাটায় কি আজ বসতে পারি?? মজা করে।

প্রিয়ন্তিঃ আমার মনে বসে গেছো। এখন এটায় বসার আবার পারমিশন চাচ্ছো!! তুমিও না। চলো একসাথে বসি।

নিরব আর প্রিয়ন্তি দোলনায় বসলো। নিরব শুধু প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রিয়ন্তিঃ এভাবে কি দেখছো??

নিরবঃ জানো আগে ভাবতাম চাঁদটা বুঝি সবচেয়ে বেশি সুন্দর। কিন্তু আমার জানা ছিলো না যে এ পৃথিবোতে আরেকটা চাঁদ আছে। যে ওই চাঁদের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।

নিরবের কথা শুনে প্রিয়ন্তির মুখটা লজ্জায় একদম গোলাপি হয়ে উঠেছে। লজ্জাসিক্ত মুখটা লুকানোর জন্য প্রিয়ন্ত নিরবের কাঁধে মাথা রাখে।

নিরবঃ এই লজ্জামাখা তোমার মুখটা আমাকে আরো দূর্বল করে দেয় তোমার প্রতি। সত্যিই অনেকটা বেশি ভালোবাসি এই মায়াবতীকে। তোমার মায়ায় সারাটাজীবন কাটাতে চাই একসাথে। থাকবে তো??

প্রিয়ন্তিঃ অবশ্যই। আচ্ছা তুমি গান পারো??

নিরবঃ উমম শুনবে??

প্রিয়ন্তিঃ হ্যাঁ। তুমি মন খুলে গাও। বাসায় শুধু আজ মা আছে। ভাইয়া আর বাবা ঢাকার বাইরে।

নিরবঃ ও তাই এই সুযোগে আজকে মনের কথাগুলো বললেন রাণী?? মজা করে।

প্রিয়ন্তিঃ হুম। তুমি গান শুনাও। জানো আমার খুব ইচ্ছে ছিলো এই দোলনায় আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে বসে দক্ষিণা বাতাস খাবো আর তার কাঁধে মাথা রেখে গান শুনবো।

নিরবঃ আচ্ছা। তোমার ইচ্ছেটা এখনই পূরণ করছি।

নিরব গান ধরলো,

আমার সকল অভিযোগে তুমি
তোমার মিষ্টি হাসিটা কি আমি?
আমার না বলা কথার ভাঁজে
তোমার গানের কত সুর ভাসে!
তোমায় নিয়ে আমার লেখা গানে
অযথা কত স্বপ্ন বোনা আছে!
আমার হাতের আঙুলের ভাঁজে
তোমাকে নিয়ে কত কাব্য রটে!
ভুলিনি তো আমি
তোমার মুখে হাসি
আমার গাওয়া গানে তোমাকে ভালোবাসি
আসো আবারও কাছে
হাতটা ধরে পাশে
তোমায় নিয়ে যাব আমার পৃথিবীতে
এই পৃথিবীতে
তোমার পথে পা মিলিয়ে চলা
তোমার হাতটি ধরে বসে থাকা
আমার আকাশে তোমার নামটি লেখা
সাদার আকাশে কালো-আবছা বোনা
তোমায় নিয়ে আমার লেখা গানে
অযথা কত স্বপ্ন বোনা আছে!
আমার হাতের আঙুলের ভাঁজে
তোমাকে নিয়ে কত কাব্য রটে!
ভুলিনি তো…

এভাবে শুরু হয় নিরব আর প্রিয়ন্তির ভালোবাসার গল্প। ওদের মাঝে ভালোবাসাটা ছিলো অন্যরকম। খুব মজার আর এডভেঞ্চারাস। প্রিয়ন্তির বাবা আর ভাইয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ওরা অনেক জায়গায় ঘুরতে যেতো। অনেক মজা করতো। প্রেম ভালোবাসায় ভরপুর দিনগুলো যেতো ওদের। কিন্তু বরাবরের মতো একজনের চোখ কখনোই ফাঁকি দেওয়া যায়না। সে হলো মা। একদিন রাতে প্রিয়ন্তির মা প্রিয়ন্তির রুমে আসে। প্রিয়ন্তি তখন পড়ছিলো।

মাঃ প্রিয়ন্তি…

হঠাৎ কারো ডাক পরায় প্রিয়ন্তি কেঁপে উঠে। নিজেকে ঠিক রেখে বলে,

প্রিয়ন্তিঃ কিছু বলবে মা??

প্রিয়ন্তির মা প্রিয়ন্তির ঠিক সামনে খাটের উপর বসে। আর বলে,

মাঃ যা করছিস তা ভেবে করছিস তো?? এর পরিনতি কি তোর জানা আছেতো??

প্রিয়ন্তি ওর মায়ের কথা শুনে ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তাও না বুঝার মতো ভান করে বললো,

প্রিয়ন্তিঃ কি বলছো মা?? আমি আবার কি করছি??

মাঃ দেখ মা, ছেলেটার বাবা নাই শুধু মা আছে। তোর বাবা আর ভাই যদি জানতে পারে ওকে মেরে ফেলবে।

প্রিয়ন্তি বুঝে গেছে মা সব জেনে গেছে।

প্রিয়ন্তিঃ মা আমি ওকে অনেক বেশি ভালোবাসি। ও আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমাকে অনেক যত্ন করে আমার খেয়াল রাখে ঠিক তোমার মতো। আমিতো ওকে ছাড়া বাঁচবো না মা। কাঁদো কণ্ঠে।

মাঃ জানিরে মা। তোর মুখের হাসি আমি দেখেছি। তাতে যে তুই কতটা খুশি ওর সাথে তা বুঝেছি। কিন্তু ওকি পারবে তোর বাবা আর ভাইকে বুঝাতে??

প্রিয়ন্তিঃ মা, ও বলেছে ও পারবে। কয়দিন পর ওর পরীক্ষা শেষ হলেই ও একটা চাকরি পাবে। তখন বাবাকে বলবে।

মাঃ তাহলে ভালো। জানিস ছেলেটাকে আমারও অনেক ভালোলেগেছে। তোদের যখন একসাথে দেখি খুব ভালো লাগে। মনে হয়, না আমার মেয়েটা অনেক ভালো আছে। আগে তুই মন মরা হয়ে বসে থাকতি। মা হয়ে অামার খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু এখন খুব ভালো লাগে তোকে দেখলে। আমার পুরো সাপোর্ট আছে তোদের সাথে। আল্লাহ ভরসা।

প্রিয়ন্তিঃ সত্যিই বলছো মা?? অনেক খুশি হয়ে।

মাঃ হ্যাঁ রে পাগলি সত্যিই। তুই যেটায় খুশি সেটায় আমিও খুশি।

প্রিয়ন্তি ওর মাকে জড়িয়ে ধরে আর দুঃখ কষ্ট বিনিময় করে মা আর মেয়ে।

পরদিন বিকালে,

নিরবঃ ময়না কি হয়েছে এতো চিন্তিত লাগছে কেন তোমাকে??

প্রিয়ন্তিঃ একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছে। চিন্তিত কণ্ঠে।

নিরবঃ কি সমস্যা?? কি হইছে?? উত্তেজিত হয়ে।

প্রিয়ন্তিঃ আম্মু না…

নিরবঃ আম্মু না কি??

প্রিয়ন্তিঃ আম্মু না আমাদের…

নিরবঃ আমাদের??

প্রিয়ন্তিঃ কথা জেনে গেছে।

নিরবঃ কিহহহ!!! কিভাবে?? এখন কি হবে। তোমাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে?? আল্লাহ আমি এখন কি করবো?? না না আমার কাছ থেকে তোমাকে কেউ নিতে পারবে না। প্রিয়ন্তির হাত শক্ত করে ধরে নিরব ওর বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে।

প্রিয়ন্তিঃ এত্তো ভালোবাসো আমায়?? খুশি মনে।

নিরবঃ অনেক বেশি ময়নাপাখি৷ অসহায় কণ্ঠে।

প্রিয়ন্তিঃ হুম। তুমি পাশ করেছো।

নিরবঃ মানে?? অবাক হয়ে।

প্রিয়ন্তিঃ তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম যে আমাকে হারানোর ভয় তোমার আছে কিনা।

নিরবঃ তার মানে আম্মু জানে নি??

প্রিয়ন্তিঃ না জেনেছে। আর বলেছে তার মেয়ের জামাইকে তার অনেক পছন্দ হয়েছে। আর তার ফুল সাপোর্ট আছে আমাদের সাথে।

নিরবঃ কি বলো সত্যিই??

প্রিয়ন্তিঃ জ্বিইইই সত্যিই। এখন তাড়াতাড়ি এক্সামটা শেষ করে একটা চাকরি নেও আর বাবাকে বলো আমাদের কথা।

নিরবঃ আচ্ছা।

নিরব প্রিয়ন্তিকে কাছে টেনে নেয়। আর বলে,

নিরবঃ ময়না…

প্রিয়ন্তিঃ হুম…

নিরবঃ ভালোবাসি যে…

প্রিয়ন্তিঃ আমিও অনেক।

এভাবে নিরব আর প্রিয়ন্তির মাঝে ভালোবাসাটা দিন দিন অনেক বাড়তে থাকে। প্রিয়ন্তি এখন ভার্সিটিতে উঠেছে। আর নিরবেরও পরীক্ষা শেষ। শুধু রেজাল্টের অপেক্ষায়৷ সব কিছু খুব ভালোই যাচ্ছিলো কিন্তু একদিন হঠাৎ করে নিরবের…
চলবে…?

কোনো ভুল হলে জানাবেন।

{গল্পের অবস্থা অনুযায়ী গল্প ছোট বড় হয়ে থাকে}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here