রোদ চিঠি

0
584

রোদ চিঠি

আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আসিফ। দুপাশে দুজন পুলিশ, তাকে কেন হ্যান্ডক্যাফ লাগায়নি, এটা বুঝতে পারছে না।
একটু পরে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলার শুনানি শুরু হবে, হয়ত আজই তাকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।
রাজনৈতিক মামলা, এলাকায় একটা জায়গা দখল নিয়ে দুটো গ্রুপের মধ্যে তুমুল মারামারি হয়েছে।
একটা ছেলের মাথায় আঘাত লেগে আইসিইউ তে আছে ঢাকার কোন হসপিটালে।
এখন এটেম্প টু মার্ডার কেস যে কোন সময়ে মার্ডার কেস হয়ে যাবে।
ছেলেটি ছিলো বিরোধী পক্ষের।
কিন্তু আহত হওয়ার পরে আসিফের দলীয় লিডার তাকে নিজের দলের কর্মী বলে ঘোষণা দিলেন।
আর নিজের সবসময়ের ডানহাত আসিফকে সন্ত্রাসী বলে মামলা ঠুকে দিলেন!
আসিফ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো, হ্যা এটাই রাজনীতি!
দলের জন্য সব সময়ে সামনে থেকে লড়ে যাওয়া আসিফ এখন সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত।
অবশ্য এসব হয়ত পাপের ফল, এলাকায় সবাই আসিফকে ভয় পায়।
আসিফকে দেখলে মুরুব্বিরা পর্যন্ত রাস্তা ছেড়ে পাশে সরে যায়।
এই ভয়ংকর ইমেজের ফলাফল নিয়ে আজ আসিফ পুলিশের হেফাজতে।
তবে জ্ঞান থাকতে সে কাউকে বিনা কারনে মারেনি।
যারাই ক্লিকবাজী করেছে, তাদেরই মেরেছে।
আসিফের নামেই সব কাজ হয়ে যায়, ওর কারো গাঁয়ে হাত তুলতে হয় না।
দলের লিডারের ডানহাত, আজ তার পক্ষে দাড়ানোর জন্য কেউ নেই।
ছোটভাইটা অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছে একজন উকিল ম্যানেজ করতে, কিন্তু অদৃশ্য কোন প্রভাবে একজন উকিলও রাজী হয়নি আসিফের হয়ে কেস লড়তে।
আসিফকে একটা রুমের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
তবে রিমান্ডে নেওয়া হয়নি তাকে।
কেন হয়নি সেটা একটা রহস্য, হয়ত আজই নেবে, অথবা কারাগারে পাঠিয়ে দেবে।
আসিফ বাইরের দিকে তাকালো।
নভেম্বরের শুরু, শীতল একটা বাতাস বইছে।
এখন সকাল সাড়ে নটা বাজে।
জেল হাজতে কিছু খাওয়া হয়নি, শক্ত রুটি আসিফ চিবুতে পারে না।
কত মানুষ ঢুকছে, কত মানুষ বের হচ্ছে, কালো গাউন পরে উকিল সাহেবরা আসছেন।
আসিফের মনে হলো, তার জীবনটা আজ এখানে কেন, এমন কেন হলো!
কলেজের মোটামুটি ভালো ছাত্র আসিফ কিভাবে আস্তে আস্তে রাজনীতিতে জড়িয়ে পরলো, সেটা নিজেও জানে না।
মনে পরে কলেজের প্রথম দিককার কথা, একটা ছেলে, যার বাবা অফিসার লেভেলের কেউ, কোন একটা মেয়ের ওড়না ধরে টান দিয়েছিলো, কেউ সাহস পাচ্ছিলোমনা ছেলেটিকে কিছু বলার।
আসিফ পুরো কলেজের সামনে ছেলেটিকে চড় মেরেছিলো!
এই সাহসই তার কাল হলো, কলেজের দলীয় নেতা তাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলো, তাদের সংগঠনে যোগ দিতে।
সংগঠন করতে গিয়ে পড়াশোনাটা ঢিল হয়ে যায়।
কয়েকদিনের মধ্যে আসিফ নেতৃস্থানীয় হয়ে যায়।
তবে এই নেতারা সব সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বড় নেতার ডানহাত হয়, নিজে কিছু করতে পারে খুন কম মানুষ!
বাবা বেঁচে থাকতে কত বুঝিয়েছেন, কিন্তু আসিফ শোনেনি। মা তো কাঁদতে কাদতে কাঁদতে কত রাত পার করেছে।
আজ বাবা নেই, ছোট ভাই তাই ছোটাছুটি করছে।
হয়তো এলাকার মানুষ অনেক খুশি, আসিফের জেল হয়ে যাবে।
হয়তো নতুন আসিফ তৈরি হয়ে যাবে।
আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে আসিফের চোখ আটকে যায় একটা মেয়ের দিকে, খুব চেনা লাগছে, শিলা না, সাখাওয়াত স্যারের মেয়ে?
হু, শিলাই তো, বহুদিন পরে দেখলো ওকে আসিফ।
শেষ দেখা হয়েছিলো এক বৃষ্টির দিনে।
শিলা ঢাকায় পড়াশোনা করেছে, আজ এখানে সাদা শাড়ি আর কালো গাউন পরে এসেছে, মানে কোর্টে প্রাকটিস করে হয়তো।
চুলগুলো খোঁপা করা।
মেয়েটা সেই স্কুল থেকেই সাধারণ, দুই বেনী করে স্কুলে যেতো, সাদা ইউনিফর্ম আর সবুজ বেল্ট, সাথে সাদা সবুজ ফিতায় চুল বেনী করা, ভারী মায়াবী একখানা মুখ।
পাতলা গরণের শিলাকে মায়াবতী মনে হতো আসিফের।
সংগঠনের অফিসের সামনে ক্যারাম খেলতে খেলতে অথবা আঁধপোড়া সিগারেটে টান দিতে দিতে আসিফের মনে হতে, শিলার সাথে অনেক কথা আছে।
তবুও সাখাওয়াত স্যারের মেয়ে, এ হিসেবে আর সাহস করে এগোনো হতো না।
তখনো স্যারদের একটা আলাদা সম্মান ছিলো এলাকায়।
এখন হয়তো সবাই আসিফকে ভয় পায়।
শিলা একটু ভারী হয়েছে কি, না খুব একটা নয়।
পরিনত হয়েছে, কিশোরী ভাবটা গিয়ে মিষ্টি এক তরুনী আজ।
কি আশ্চর্য, বুকের বা পাশে আজও একটু হালকা ব্যাথা লাগছে, চোখ ঝাপসা লাগছে।
পা ও মনে হয় অবশ লাগছে।
এই অনুভুতি কোথায় ছিলো এতদিন!
কেউ তো এই কাঁপন জাগায়নি একবারো।
শিলা কি দেখছে আসিফকে?
ইশ আসিফের মনে হলো, শিলা আজ ওকে না দেখলেই ভালো হয়।
হয়ত ওর কোন ফিয়াসে আছে, হয়তো সে অনেক ভালো চাকরি করে, হয়ত অনেক সুন্দর দেখতে।
দিন দশেক হাজতে থাকা ময়লা শার্ট আর রঙচটা জিন্সে আসিফকে না দেখুক শিলা!
সেই দিনটা মনে পরে।
কয়েকটা নেশাখোর বখাটে শিলার পিছু নিয়েছিলো, আসিফ ছিল সংগঠন অফিসের সামনে।
ওর সামনে দিয়ে ভীতু চোখে শিলা হেঁটে গেলো, আসিফ দেখলো পেছনে গেলো ছেলে গুলো, আসিফও গেলো কোনো অজানা কারনে।
ছেলে গুলো শিলাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলো, আসিফ গিয়ে ধুমধুম ঘুষি, একের পর এক। ছেলেগুলো শিলার পা জড়িয়ে মাফ চেয়েছিলো!
তারপর থেকে শিলা স্কুলে যাওয়ার সময় একবার করে তাকাতো সংগঠন অফিসে।
আসিফ জানতো শিলা কখন আসবে, কখন যাবে।
হয়ত কোনদিন ইচ্ছে করে আড়ালে যেত, দেখতো শিলা কয়েকবার তাকিয়েছে না দেখে চলে যাচ্ছিলো, তখন হয়ত আসিফ বের হতো।
হয়তো চোখে চোখে কোন কথা হতো!
একদিন আসিফ অনেক ভেবে ডেকেছিলো শিলাকে।
শিলা, তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো,
শিলা দাঁড়িয়ে পরেছিলো শুনতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসিফ বলেছিলো, আজ না অন্য কোনদিন।
সে দিনটা আর আসেনি।
শিলার স্কুল ফাইনালের পরে ও ঢাকায় কলেজে ভর্তি হয়। ভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছে।
আর একবার দেখা হয়েছিলো, শিলা ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছে সেদিন।
প্রচন্ড বৃষ্টি ছিলো, শিলা ভিজে যাচ্ছিলো, অটো পাচ্ছিলো না।
ঠিক তখনি আসিফ হেঁটে আসছিলো উল্টোদিক থেকে।
আসিফের হাতে একটা ছাতা ছিলো।
আসিফ শিলাকে দেখে ছাতা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলো,
–কেমন আছো শিলা?
-ভালো, আপনি?
–ভিজে গিয়েছো একদম,
-হু,
-ছাতাটা নিয়ে যাও,
-না না ঠিক আছে।
জগলু তখন অটো নিয়ে এলো, আসিফ ছাতা ধরে শিলাকে অটোতে তুলে দিলো।
শিলা একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো, আসিফের বুকে সেদিনও খুব জোরে জোরে শব্দ হচ্ছিল।
আসিফের মনে হচ্ছিল, শিলা কি শুনে ফেলবে!
কিন্তু না, শিলা কিছুই শোনেনি, না বাইরের কথা, না ভেতরের কথা।
নিয়তি আজ একজনকে কাঠগড়ায় আর একজনকে এজলাসে দাঁড় করিয়েছে।

আসিফকে ভেতরে থেকে ডেকে পাঠালো।
আসিফ অবাক হয়ে শুনলো তার জামিন হয়ে গেছে।
তার পক্ষের উকিলের নাম শায়লা হোসেন, শিলা।
আসিফ আদালত থেকে বের হয়ে আসে।
শিলার সামনে গিয়ে ওকে একটা ধন্যবাদ দিতে হবে।
কিন্তু আজও বুকটা কাঁপছে।
এলাকার ত্রাস আসিফ, ওর এত দুর্বল লাগছে কেন, মনে হচ্ছে শিলার সামনে দাঁড়াতেই পারবে না।
ভীরু পদক্ষেপে শিলার সামনে দাঁড়ালো আসিফ।
সেই শান্ত চোখ গুলো কই, আজ যেন চোখ গুলো অনেক দূরন্ত, হয়তো শহর ওর চোখগুলোতে ভাষা বসিয়েছে।
কেউ নেই আসেপাশে, শিলা গাউন হাতে দাঁড়িয়ে।
আসিফ সামনে গিয়ে ডাকলো
-শিলা……
শিলা উত্তর দিলো,
–আজ কি সেই কথাগুলো বলতে পারবে? অনেক দিন আগে যা বলতে চেয়েও বলা হয়নি??
আসিফ নিজের ঠোঁট কামড়ে আকাশের দিকে তাকালো, ভর দুপুরে রোদ ঝলমল করছে!

লেখিকা: শানজানা আলম

( প্রিয় পাঠক আপনাদের যদি আমার গল্প পরে ভালোলেগে থাকে তাহলে আরো নতুন নতুন গল্প পড়ার জন্য আমার facebook id follow করে রাখতে পারেন, কারণ আমার facebook id তে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গল্প, কবিতা Publish করা হয়।)
Facebook Id link ???
https://www.facebook.com/shanjana.alam

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here