রত্নগর্ভা

0
659

আমরা মোট ছয় বোন। বুঝতেই পারছেন ভাইয়ের আশাতে বোনের সংখ্যার পাল্লা ভারী হয়েছে দিনদিন। হয় মা বাবার নিজেদের ইচ্ছায় নয়তো আত্মীয় পরিজন নতুবা পাড়া প্রতিবেশীর কথার চাপে আমার মা একে একে জন্ম দেন আমাদের ছয় বোনকে। মাকে দেখতেন যেই মহিলা ডাক্তার তিনি এক প্রকার জোর করেই জরায়ু কেটে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। অতি ব্যবহারে সেটা যে, যে কোন দিন নয়তো মায়ের মৃত্যুর কারণ ও হতে পারতো।

আমার বাবা ছিলেন সাধারণ চাকুরীজীবি। মা কোথাও কাজ করতে পারতেন না। পরপর এতগুলো প্রেগন্যান্সী, বাচ্চার যত্ন আর সংসারের চাপে ওনার শরীর ও খুব একটা ভালো যেতোনা কখনোই। মোটামুটি আয় দিয়ে সংসার চলে গেলেও স্বাচ্ছন্দ্য শব্দটা কখনোই ছিলনা। ঈদে শুধু নতুন কাপড় পেতাম আর বাকী সময় বড়বোনদের ছোট হয়ে যাওয়া কাপড় দিয়েই দিন যেতো। সেগুলোও যে খুব একটা পরার যোগ্য থাকতো তাও কিন্তু না। আমি আর আমার পরের সবচেয়ে ছোট বোন ঝুমা, আমরা মায়ের থেকে দূরে দূরেই থাকতাম। কারণ মা কোন কারণে রেগে গেলেই ধুমধাম আমাদের ছোট দুবোনের গায়ের ওপর ঝাল মেটাতেন। বড় আপাই মূলত আমাদের দেখাশোনা করতো।

আমাদের ঐ পাড়ায় আমরা বলতে গেলে একঘরেই ছিলাম। আর্থিক দৈন্যতা সাথে প্রায় সব ঘরেই ছেলে থাকাতে সবাই একটু সাবধান থাকতো। সবার বুঝি ধারনা ছিল আমাদের এতোগুলো বোনকে তো বাবা বিয়ে দিয়ে পার করতে পারবেননা তাই ওরা নিজেরাই বুঝি পাড়ার কোন না কোন ছেলেদের কাঁধে ঝুলে পরবে। মা ব্যাপারটা বুঝতেন বুঝি তাই স্কুল আর বাসার বাইরে আমাদের কোন খেলা বা বিনোদনের কোন ব্যবস্থাই ছিল না। মা সারা বছর অসুস্থ থাকলেও বড় চার বোনের ওপর কড়া নজর রাখতেন। আত্মীয় স্বজনরাও আমাদের থেকে একটু দূরেই থাকতেন পাছে কোন দায়িত্ব না এসে পরে তাদের কাঁধে। বছরে একবার দাদীবাড়ি বেড়াতে যেতাম আমরা। কিন্তু দেখা যেত আমাদের বোনদেরকেই সবচেয়ে অনাদর করা হতো। হবে না ই বা কেন এতোগুলো মানুষের মুখে রোজদিন ভালো খাবার জোটানো কি চাট্টিখানি কথা। তার ওপর অন্য চাচাদের ছেলেমেয়েরাও তো আছে। অথচ রান্নাঘরের কাজে পুরোটা সময় আমার মাকেই দিতে হতো।

বাবার সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল বেশ ভীতিকর। সংসারে এতগুলো মেয়েমানুষের লাগাম ধরে রেখে বাইরে লোকের টিটকারী শুনে, ওনার মেজাজ ও খুব একটা ভালো থাকতো বলে মনে হয়না। বড় আর মেজো আপা তাও বাবার সাথে পড়াশোনা নিয়ে কথা বললেও আমরা ছোট চারজন পালিয়েই থাকতাম। খামোখা সামনে পরে মার বা বকা খাওয়ার কি মানে? বাবা আমাদের কারো বাসায় দাওয়াতে নিয়ে যেতেন না। গেলেও হয় একবোন বা বড় জোর দুজন যাওয়ার সুযোগ পেতো। কি জানি লোকে দাওয়াতে লটবহর নিয়ে যেতে নিষেধ করতো কি না।

আমি যখন প্রাইমারী স্কুল শুরু করি তখন আমার বয়স বোধহয় তিন বছর। বাড়ি থেকে মা কে জ্বালাই দেখে যে কোন এক বোনের কাঁধে আমাকে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। আমার অক্ষরজ্ঞান বলতে গেলে তাই উঁচু ক্লাসের সাথেই হয়। অবশ্য বোনদের মর্জির ওপর একেকদিন যে একেক ক্লাসে বসার সুযোগ পেতাম। আল্লাহ আমার মা বাবাকে এতোগুলো মেয়ে দিলেও অন্যদিকে খানিক স্বস্তিও দিয়েছেন আর তা হলো আমার বড় চার বোনই ছিল ভীষণ মেধাবী। তারা সবাই যার যার ক্লাসে বৃত্তি পাওয়া।

বড় আপা যখন মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় হলো হুট করে বাসায় ঘটক নামে একজনের খুব আনাগোনা বেড়ে গেলো। এতোগুলো মেয়ে ঘরে পিঠাপিঠি তার ওপর নিজের আয়ও তেমন না, সাথে সবগুলো মেয়ের পড়াশোনার খরচ সব মিলিয়ে হিমশিম খাওয়া বাবা বোধহয় আপাকে বিয়ে দিয়েই দিতেন। বড় আপার কান্নাকাটিতে বাবার মন খানিক নরম হয়। শর্ত ছিল আপা এমন রেজাল্ট করতে হবে যেন বাবা নিজেই বলতে বাধ্য হন আমার মেয়েকে আমি বিয়ে দেবোনা। ভালো রেজাল্ট বলতে আসলে কি বোঝায় তৃতীয় শ্রেনীতে পড়া আমি তখন তেমন কিছু না বুঝলেও রোজ রাতে আপা যখন একা একা কাঁদতো আমি ঠিক টের পেতাম। আপার গায়ে হাত বুলিয়ে বলতাম, ‘বিয়ে করলে বুঝি পড়া যায়না আপা? কত লোকের বিয়ে হতে শুনি। তারা তো তোমার মতো কাঁদেনা।’ বড় আপা কোন জবাব দিতেন না আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখ মুছে নিয়ে ঘরের সামান্য আলোয় আবার বই নিয়ে বসতেন।

বড় আপার যেদিন রেজাল্ট বের হয় বাসায় সেদিন ছিল দারুন থমথমে অবস্থা। আমাদের ছয়বোনের জন্য দুটি রুম বরাদ্দ থাকলেও বড় আপা এক রুমে দরজা আটকে বসে থাকে সকাল থেকে। পাড়ায় আপার সমবয়সী আরো দুজন ছেলেও পরীক্ষা দিয়েছে। বিকেল নাগাদ পুরো পাড়ার সবাই বাড়ি বয়ে আপাকে দেখতে আসে। শুধুমাত্র স্কুলের স্যারদের একটু বাড়তি যত্ন আর আপার ঐকান্তিক চেষ্টায় আপা সম্মিলিত মেধাতালিকায় পঞ্চম হয়। এই প্রথম পুরো পাড়ায় সবাই আমাদের সমীহ করে চলতে শুরু করে। এতো মেধাবী মেয়ে ঘরে থাকলে সে বাড়ির লোকদের যে একটু পাত্তা দিতেই হয়।

আপনারা জানেন কি না জানিনা এক বোন ভালো ফলাফল করলে তার ধকল নেমে আসে অন্য ভাইবোনদের ওপর। সে হিসাবে বাসায় আমাদেরও খুব মনোযোগী হয়ে উঠতে হয় পড়াশোনায়। অবশ্য আপা নিজের পড়ার পাশাপাশি বাকিদের যত্নও নিত সমানভাবে। ইন্টারেও বড় আপা দারুন রেজাল্ট করে। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল, বর্তমানে স্বনামধন্য গাইনিকোলজিস্ট। আপার গাইডেন্সেই আমার আর দুই বোন মেডিকেলে, আমরা দুই বোন বুয়েটে আর সবচে ছোট জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। বোনদের বিয়ে থেকে শুরু করে যাবতীয় সমস্যায় বাবা মার পরিবর্তে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় বড় আপা। এমনকি মা বাবাকেও সে তার কাছেই রেখেছে। বড় আপা বিয়ের সময় তার স্বামীকে বলেছিল, ‘আমি আমার পরিবারের সবচেয়ে বড়। ওদের বিপদে আপদে আমাকেই দাঁড়াতে হবে প্রথম। এটা মেনে নিয়ে যদি আমাকে বিয়ে করতে পারেন তবেই আমি বিয়ে করবো।’ আমাদের ভাগ্য ভালোই বলা চলে কারণ আমরা বড় আপার স্বামী নামে একজন বড় ভাই পেয়ে যাই।

ছয় মেয়ের বাবা মা হওয়ার দুঃখ বাবা মা আসলে আপার মেট্রিক পাসের পর থেকে ভুলে যেতে বাধ্য হন। কারণ কোন মেয়েকে নিয়ে তাদের আর পরবর্তীতে কোন চিন্তায় পরতে হয়নি। আমাদের একের পর এক বোনদের ভালো ফলাফলে বাবা মা দুজনেই বুঝতে পেরেছিলেন তাড়াহুড়া করে আমাদের বিয়ে দিয়ে বিড়াল পার না করে আমাদের নিজেদের পায়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারলেই তাদের জীবন পূর্ণতা পাবে। যার শুরুটা অবশ্যই করে দেয় বড় আপা তার মেট্রিকের ফলাফল দিয়ে।

………………

ছোটবোনের অনার্সের রেজাল্ট হয়েছে আজ। এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম আমরা সব বোনেরা। আমাদের নিজেদের কাছে করা শপথ যে আমরা পূরণ করতে পেরেছি। মায়ের রত্নগর্ভা উপাধি পাওয়ার জন্য সব কাগজ আমি আগেই তৈরী করে রেখেছিলাম। ঝুমার রেজাল্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

কোন সমস্যা ছাড়াই মা এই বছর নির্বাচিত হয় পুরস্কারের জন্য। মায়ের হাতে রত্নগর্ভা মায়ের পুরস্কার তুলে দিয়ে কিছু বলার জন্য মাইক্রোফোন দেয়া হয়। মা আমাদের নিয়ে কি বলেন সেটা শোনার জন্য স্টেজে তখন অধীর আগ্রহে বসে আছি আমরা ছয় বোন।

– আমার যখন একে একে ছয়টা মেয়ে হয় তাদের প্রত্যেকের জন্মের পর কতটা গঞ্জনা আমায় সইতে হয়েছে সেটা শুধু আমি জানি আর জানেন আমার সৃষ্টিকর্তা। দিনে দিনে কথা শোনার পরিমাণ শুধু বেড়েই গেছে। মেয়েদের সহ নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে একসময় চার দেয়ালে বন্দি করে নেই। আমার পেটের মেয়েদের নিয়ে কেউ কিছু বললে যে আমার বুকে বাঁধে তা বোঝার মতো মানুষ যে ছিল খুবই হাতেগোনা। যেন মেয়ের মা হয়েছি বলে যে যা খুশী বলার অধিকার রাখে আর মেয়েগুলো যেন মানুষের পর্যায়েই পরেনা। কি অদ্ভুত মানসিকতা লোকের। একদম ছোট দুটো মেয়ে পরপর হওয়ায় আমার শরীর বেশ ভেঙে পরে। সত্যি বলতে কোনরকমে সংসারটুকু শুধু টেনে গেছি। দুবেলা ওদের মুখে খাবার তুলে দেবার জন্য চুলায় আগুন দিয়েছি। আমার মেয়েরা একটু বুঝ হতে না হতেই আমাকে চেষ্টা করেছে যতটা আরাম দেয়া সম্ভব। আর ওদের পড়াশোনা, বড় হওয়ার বাকী সব ঝক্কি সামলেছে আমার বড় মেয়ে নূরজাহান। আমার সংসার, আমার জীবন আলোকিত করতেই বুঝি সৃষ্টিকর্তা তাকে আমার ঘরে দিয়েছেন। আমার এই পুরস্কারের সবচেয়ে বড় ভাগীদার যে আমার এই মেয়ে।

ক্রমাগত চোখের জল মুছতে থাকা বড় আপাকে আমরা পাঁচবোন তখন জড়িয়ে ধরে রেখেছি। বংশের বাতি জ্বালানোর জন্য ছেলে ছেলে করে একটা জীবন মানুষের কথা শুনে মাথা নীচু করে যাওয়া আমার বাবা মায়ের জীবনে এরকম একটা দিন উপহার দেয়ার স্বপ্ন যে বড় আপাই আমাদের দেখিয়েছিল। মায়ের সাথে এই পুরস্কারের যথাযথ ভাগীদার যে সে ও আসলে।

জা. জান্নাতুল ফেরদৌস

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে