মায়াবী হরিণী পর্ব ১

0
4018

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ১
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

“ স্যারের নজর এতো টা খারাপ, যখনই ছোঁয়া নাস্তা নিয়ে যায়, ড্যাবড্যাব করে ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, ছোঁয়া কে আস্ত গিলে খাবে এমন ভঙ্গি। ” মায়ের সামনে অভিযোগ করায় মা ও ক্ষেপে যায়। রেগে রেগে জবাব দেয়,
“ শুধু কি ছোঁয়া কেই নজর দেয় না-কি তোর দিকেও কুনজর দেয়?”

মা সুহানা খাতুনের প্রশ্নের উত্তরে মেয়ে তারানা বলল,
“ কি যে বলো মা! বলতেও লজ্জা লাগে। ও শুধু ছোঁয়া কে না, ছোঁয়া যখন কোমর বাঁকা করে নাস্তা রাখে তখন ওর বুকের দিকেও তাকিয়ে থাকে। ”
“ যাক বাবা! ভণ্ড মাস্টার তাহলে তোকে নজর দেয়নি!”
“ নাহহ মা, আমি তো ওর মতো এতো সুন্দরী না। যে আমার দিকে নজর দিবে। এই মেয়ে বাসায় থাকলে আমার বিয়েই হবেনা। ”
“ তুই ঠিক বলেছিস। তোর ওই লুইচ্চা স্যারের সাথে ওর বিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বিদায় করে দিবো ওকে। ”

মা মেয়ের কথা আড়াল থেকে শুনে ছোঁয়ার চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এ এক বোবা কান্না, সারাজীবন কাঁদতে হবে, কেউ দেখবেও না, জানবেও না, শান্তনা দেওয়া তো দূরেই থাক।

পরেরদিন,

স্যারের পড়ানো প্রায়ই শেষ এই সময় সুহানা খাতুন ছোঁয়ার হাতে নাস্তার প্লেট ধরিয়ে দেয়। নাস্তা বলতে, দুইটা টোস্ট বিস্কুট আর এক কাপ চা।
ছোঁয়া বুঝতে পারছে হয়তো কোন বিপদ হবে তার। তবুও বিস্কুট এর প্লেট এক হাতে, অন্য হাতে চায়ের কাপ ধরে স্যারের সামনে গেলো। কোনরকম প্লেট আর কাপ রেখেই ঘুরে আসতে গেলে তারানা চিল্লিয়ে বললো,
“ আপনি তো বড় অসভ্য স্যার, প্রতিদিন ছোঁয়ার বুকের দিকে নজর দেন, আজ আবার কোমরেও নজর পড়লো! আপনার কুনজর এ তো মেয়েটার বিয়েই হবেনা! ”
তারানার কথা শেষ হওয়া মাত্রই সুহানা ঘরে ঢুকে। ছোঁয়ার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়, আর বলতে শুরু করে,
“ কি রে হারামজা…., শরীর দেখিয়ে পয়সা ইনকাম শুরু করবি নাকি! ”
বলেই স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ তোমরা ও দু টাকার মাস্টার, লজ্জা শরম খুইয়ে মেয়েদের দিকে তাকাও। লজ্জা থাকা উচিৎ। ”

ফুয়াদ থতমত খেয়ে যায়, কি হচ্ছে এসব! কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসুক ভাবে বলল,
“ কি সব বলছেন আন্টি? আমি পড়াই ঠিকই, কিন্তু কখনো এতো খারাপ দৃষ্টি দিই নি৷ মিথ্যা অপবাদ কেন দিচ্ছেন? ”
“ মিথ্যা অপবাদ মানে! প্রতিদিন খেয়াল করি। আর কতো মিথ্যে বলবেন আপনি? শাক দিয়ে মাছ ঢাকছেন? ”
তারানা চিৎকার করে বলল।

তারানার গলা এমনিতেই বড়, চিল্লাচিল্লি শুনে পাশের বাসার আন্টি চলে আসে। পাশাপাশি ফ্লাট, এ বাড়িতে কি হয় ও বাড়ির সবাই টের পায়। ও বাড়ির যা খবর এই বাড়িতে বসেই জানতে পারে সবাই৷
এসেই ফুয়াদ কে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লেখা বেগম বললেন,
“ ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই জন্যই শিক্ষক সমাজ আজ ঘৃণিত। মেয়েরা এদের কাছে পড়া শিখবে নাকি যৌন…!”

ছোঁয়া কানে আঙুল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুহানা খাতুন ছোঁয়ার কানে আরেকটা চড় মেরে দেয়। আর চিৎকার করে বলল,
“ এক হাতে কি তালি বাজে! এই হারামি মা… র ও দোষ আছে। বাপ মা নেই, শাসন করবে কে?”
ছোঁয়া মাত্রই এসএসসি দিয়েছে, আর তারানা সামনের বছর দিবে৷ ক্লাস টেনে এইবার। একবছরের ছোট মেয়ে কিভাবে তাকে অপমান করছে। মন চাচ্ছে মাটি খুঁড়ে নীচে ঢুকে যায়। কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে উপরে চলে যায়। বাপ মা মরা মেয়ে গুলো হয়তো কপাল পোড়াই হয়৷

ফুয়াদ জোর গলায় বললো,
“ দেখুন আন্টি, আপনাদের ভুল হচ্ছে। হ্যাঁ, ওই মেয়ের দিকে তাকিয়েছি, কিন্তু শুধু চোখ দেখতাম। কখনো আপনাদের মতো নীচু মন মানসিকতা নিয়ে দেখিনি। ”

আন্টি আবার চিল্লাতে চিল্লাতে বললো,
“ আইছে আমার সাধু পুরুষ, সব গুলারে আমার চেনা আছে। ”
সুহানা খাতুন বলল,
“ এই ছেমরি রে আমি ঘরে রাখতে পারবোনা, ওরে এখুনি এই ভণ্ড মাস্টারের লগে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেন ভাবী৷ ”
যেই বলা সেই শুরু, ফুয়াদ কে আটকে কয়েক বাসার প্রতিবেশী মিলে বিয়ের আয়োজন করে বসে৷ ছোঁয়া কেও ফুয়াদের পাশে জোর করে বসিয়ে রাখা হয়েছে৷ বিয়ে করতে না চাইলেও জোর করে বিয়ে দিবেই এমন পরিস্থিতির স্বীকার ফুয়াদ৷ কি ভুল টাই না করেছে এই মেয়ের চোখ দেখে৷ মেয়েটার চোখে একটা নেশা আছে, কালো চোখের মনির ভিতর অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে। সেই গভীর কালো গর্তে ডুব দিয়ে কষ্ট গুলো খুঁজে পেতে তার সমাধান করতে খুব ইচ্ছে করতো। চোখ দুটো তে একপ্রকার মায়া আছে। একদম মায়াজাল, যে জালে একবার আটকে যাবে, কখনো ছুটতে পারবেনা। মায়ার অতলে আরও ডুবে যেতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু কখনো ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে নেই বলে একপলক দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিতো ফুয়াদ। কে জানতো এই একপলক দৃষ্টি তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে কখনোই ওভাবে দেখত না ফুয়াদ।
অবশেষে ফুয়াদ আলীর সাথে মাইশা ইসলাম ছোঁয়ার বিয়ে হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বিয়ে করাতে একপ্রকার রেগে যায় ফুয়াদ। বিয়ের পর যখন সবাই ছোঁয়ার হাত তার হাতে তুলে দেয়, তখন রেগে গিয়ে ছোঁয়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“ জোর করে বিয়ে করতে বাধ্য করলে আমাকে। না বউ হিসেবে মানবো, না তোমাকে নিয়ে সংসার সম্ভব।”
ছোঁয়া বুঝে যায়, এতিমের কখনো সুখ আসবার নয়। শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

অল্প কিছু কাপড় আর ছোঁয়ার ব্যবহার্য জিনিসপত্র একটা ব্যাগে দিয়ে দেয় তারানা। একপ্রকার দুজন কে বাড়ি থেকে বের করে যেনো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সুহানা।
ফুয়াদ খুব জোরে জোরে হাটছে, ছোঁয়া ওর সাথে হাটতে পারছেনা। কিন্তু অবলম্বন একমাত্র ফুয়াদ ই। আর যাওয়ার কোন যায়গা নেই বলে একপ্রকার দৌড়াচ্ছে ফুয়াদের সাথে।

চারিদিকে খাঁ খাঁ রোদ, দু’জনেই ঘেমে নেয়ে একাকার। হঠাৎ ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে ফুয়াদ। ছোঁয়া ও দাঁড়ালো৷ ফুয়াদ চিৎকার করে বলল,
“ আমার পিছনে আসছিস কেন? চলে যা আমার আশেপাশে থেকে। ”
“ কোথায় যাবো?”
এবার আর ছোঁয়ার মায়া ভরা চোখের দিকে না তাকিয়েই বলল,
“ জাহান্নাম থেকে এসেছিস, যে যাওয়ার জায়গা নেই! সেখানেই চলে যা।”
“ বাপ মা মরা মেয়ের যাওয়ার জায়গা থাকে না। আচ্ছা, আমি আমার ব্যবস্থা করে নিবো। আপনি চলে যান৷ আর আপনার সাথে সাথে হাটবো না। ”

ফুয়াদ হাঁটতে শুরু করে, আর ছোঁয়া একবার ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফুটপাতের উপর বসে পড়ে। কি আর করার, যাবেই বা কোথায়?

চলবে….

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে