মমতার বলে

0
879

ইফরঃ এই বাচ্চা রাখা যাবে না! কালই আমার সাথে হাসপাতালে যাবে! ( গম্ভীর ভাবে বললেন )
নিয়াশাঃ নাহ বাবা এ তুমি কি বলছো! এটা আমার সন্তান তাছাড়া যা কিছু ঘটেছে তাতে ওর কোনো দোষ নেই! ( অশ্রুসিক্ত নয়নে )
ইফরঃ ঠিক আছে! তাহলে তুমি তোমার স্বামীর সংসারে ফিরে যাও। ( রেগে বললেন )
নিয়াশাঃ এতোকিছু হওয়ার পরও তুমি এ কথা বলছো? ( অবাক ও অশ্রুসিক্ত চোখে )
ইফরঃ হ্যাঁ বলছি! একে তো তুমি স্বামী সংসার ছেড়ে এখানে এসে পড়েছো, তারপরও ভেবেছিলাম তোমায় অন্য কোথাও আবার বিয়ে দিবো। কিন্তু এই বাচ্চা আসলে তাও সম্ভব নয়! বরং……
নিয়াশঃ বরং কি বাবা? ( ভাঙা গলায় )
ইফরঃ বরং বোঝা বাড়বে আমার। ( গম্ভীর গলায় বলে চলে গেলেন নিজের ঘরে )
নিয়াশাঃ বাবা আমি বোঝা হয়ে গেলাম। আমার অবস্থার জন্য কি তুমি দায়ী নয়? তুমি যদি ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়েটা না দিতে তাহলে কি এসব হতো! তুমি তো তখন টাকার মোহে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলে আর আজ আমি দোষী! ( মনে মনে কথা গুলো বলে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো )

নিয়াশা ইফর সাহেবের দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে বড়। নিয়াশা সবে মাত্র ভার্সিটির থার্ড ইয়ারে পড়ে। মাস কয়েক পূর্বেই ইফর সাহেব নিয়াশাকে বিয়ে দিয়েছেন জাফর আলীর সাথে। জাফর আলী তার ধনী বন্ধুর একমাত্র ছেলে। নিয়াশা একটু সময় চেয়েছিল জাফরকে বোঝার জন্য কারণ এক দেখায় তো মানুষ চেনা যায় না কিন্তু ইফর তো সম্পত্তি দেখে সব ভুলে গিয়েছে। তাই সে ছেলেটার কোনো খোঁজ খবর না নিয়েই একপ্রকার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয় নিয়াশার।
এই বিয়ের পরই শুরু হয় নিয়াশার অসহায় জীবন। প্রতিরাতে নেশাখোর স্বামীর হাতে মার খাওয়া একটা রুটিন হয়ে গিয়েছিলো। এর অন্যতম কারণ ছিলো জাফর অন্য মেয়েদের সাথেও সম্পর্ক ছিলো যার বিষয়ে নিয়াশা কিছু বললেই তার সহ্য হতো না। এমন করতে করতেই কেটে যায় ছয় মাস এবং নিয়াশা এ বিষয়ে কাউকে বা ওর বাবা-মাকে কিছু বললে তারা বলতেন সহ্য করে থাকতে। কিন্তু একদিন নিয়াশার স্বামী এতোটা মারধর করে যে তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হয়। এরপরই ইফর সাহেব মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসেন। দুইদিন আগেই নিয়াশা অসুস্থতার জন্য ডাক্তার দেখালে জানতে পারে সে সন্তান সম্ভবা। এরপরেই এই কথোপকথন নিয়াশা ও ইফর সাহেবের মধ্যে।

দুপুরে নিয়াশার মা নিয়াশার ঘরে গেলে তাকে সারা ঘর খুঁজেও পায় না। শেষে একটা চিঠি পায় বিছানায়। নিয়াশার মা চোখে সঠিক দেখেন না তাই নিয়াশার ভাই নিতুনকে বলে চিঠিটা পড়তে। এর মধ্যে ইফর সাহেবও সেখানে উপস্থিত হয়।

নিতুনঃ
প্রিয় আম্মু ও বাবা,
তোমরা যখন চিঠিটা পাবে তখন হয়তো আমি তোমাদের থেকে অনেক দূরে। তোমাদের কাছে শুধু একটাই প্রশ্ন করবো যদি আমাকে এতোটাই বোঝা লাগতো তাহলে গর্ভে থাকাকালীনই মেরে ফেলতে পারতে। একটা সত্য জানো আজ আমি সুখী নই তার একমাত্র কারণ তুমি বাবা। তোমাকে বারবার বলেছিলাম ছেলেটাকে আমার সুবিধার লাগছে না তুমি একটু সময় নিয়ে খোঁজ খবর নেও কিন্তু তুমি টাকার মোহে অন্ধ হয়ে আমাকে নরকে ফেলে দিলে। ছয়টা মাস আমি কেমন অবস্থায় ছিলাম তা তোমরা কখনো বুঝতে পারোনি পারলে আমাকে সহ্য করে থাকতে বলতে না কিংবা আবর সেই নরকে ফিরে যেতে বলতে না। তুমি আমাকে আমার নির্দোষ সন্তানটাকে মেরে ফেলতে বলেছিলে তাই না? তুমি কি পারবে আমাকে বা নিতুনকে জেনে বুঝে হত্যা করতে? তুমি পারবে কিনা জানিনা কিন্তু আমি কখনো পারবো না নিজের অংশকে মেরে ফেলতে তাই তো আজ পা ফেলেছি অজানার উদ্দেশ্যে।
ইতি
তোমাদের অপ্রিয় ও অভাগী মেয়ে।

নিতুন চিঠি পড়তে পড়তেই কেঁদে ফেলেছে। ইফর সাহেবের স্ত্রীও আচলে মুখ চেপে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। কিন্তু ইফর সাহেবের চোখে বিন্দুমাত্র অশ্রু নেই সে পাথরের মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ ও নিশ্চুপ। হয়তো বাস্তবতার আয়নাটা দেখেও মেনে নিতে পারছে না। আর অন্যদিকে নিয়াশা সন্তানের মমতার বলে অজানার উদ্দেশ্য হারিয়ে গেলো চিনা মানুষদের থেকে।

 

গল্পের নামঃ মমতার বলে

লেখিকাঃ Ipshita Shikdar (samia)

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে