মন ফড়িং ❤ ৩৫.

1
2202

মন ফড়িং ❤

৩৫.

রান্নাঘরে নিদ্র স্যুপ রান্নায় ব্যস্ত ছিলো। বিয়ে বাড়ির খবর আপাতত সে নিতে চাচ্ছেনা। নাজমুল সাহেব বারবার ডেকে গেছেন, বরের কাছে যাওয়ার জন্য কিন্তু নিদ্র রাজি হয়নি। বরের আপ্যায়নের জন্য তেমন কাউকে না পেয়ে শেষ মেষ নিজেই সেই দায়িত্ব নিলেন। রশীদ সাহেব আর তার স্ত্রী একটু বসার সময় পাচ্ছেননা। ফাহি পা ঝুলিয়ে খাটের ওপর বসে আছে। আজকে তার বিয়ে! বিয়েটা প্রিয় মানুষের সাথেই হচ্ছে। ভাবতেই ভালো লাগছে তার। ৫ বছরের সম্পর্কটাকে আজকে তারা দুজন বিয়েতে রূপ দিবে। কজন পারে এই কাজটা করতে? রাফিনের জন্য সে ছোট্ট উপহার কিনে রেখেছে। রাফিনের প্রিয় বই হাতে নিয়ে স্মৃতি গুলোকে হাতড়ে বেড়াতে বেশ ভালো লাগে ফাহির! ভালোবাসা শব্দটাই একটা নেশা।
অদ্রি কী করবে বুঝতে পারছে না। ইখলাস সাহেব মুখে বিকট হাসি নিয়ে ফ্লোরে বসে আছেন। মাঝেমধ্যে বিরবির করে কিছু বলছেন। অদ্রি বুঝতে পারছে ইখলাস সাহেব কিছু বলছেন কিন্তু কী বলছেন বুঝতে পারছেনা। কিন্তু কী বলছে জানাটাও দরকার। ইখলাস সাহেবের কাছে যাওয়াও সম্ভব না অদ্রির পক্ষে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না সে। মরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু নিদ্রের জন্যও সম্ভব হচ্ছেনা।
চোখের সামনে গভীর অন্ধকার পথ। যার গভীরতা মাপার ক্ষমতা অদ্রির নেই। গভীর অন্ধকার পথে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটে চলার কোনো মানে হয়না।
দরজায় কারো টোকা পড়াতে অদ্রির চিন্তায় ছেদ পড়লো।
অদ্রি স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করলো
– কে?
রশীদ সাহেব বললেন
– আসতে পারি?
অদ্রি জামাকাপড় ঠিক আছে কিনা দেখে বললো
– আসুন।
রশীদ সাহেব বললেন
– মেয়েটাকে তুমি যদি বউ সাজে একটু দেখতে, তাহলে আমার ভালো লাগতো।
অদ্রি মাথা নিচু করে ভাবলো, সত্যিই তো তার নিজের বাড়িতে বিয়ে কিন্তু সে একটিবারও বর, কনের খোঁজ নেয়নি। এমনকি বাসা ভর্তি মেহমান সে একবারও তাদের সাথে কথা বলেনি। এটা তো একরকম বেয়াদবি!
অদ্রি হাসার চেষ্টা করে বললো
– আমি আসছি।
– তুমি অসুস্থ মানুষ। আমিই ওদের নিয়ে আসি।
– না না। আমি নিজেই যাবো।
– আচ্ছা।
রশীদ সাহেব চলে যাবার পর অদ্রি বিছানা ছেড়ে উঠে আলমারির দিকে এগোলো। আপাতত যে থ্রিপিস পড়া তাতে নিচে নামা যাবেনা। নিদ্র হয়তোবা কিছু বলবেনা কিন্তু মনে মনে লজ্জা পাবে। শত হলেও, নিদ্রের স্ত্রী সে!

অদ্রি থ্রিপিস বের করছিলো এইসময় নিদ্র স্যুপের বাটি নিয়ে রুমে ঢুকলো।
নিদ্র স্যুপের বাটি ছোটো টেবিলের ওপর রেখে অদ্রিকে জিজ্ঞেস করলো
– কী খুঁজছেন?
– রশীদ চাচা বললেন নিচে একবার দেখে আসতে। যে কাপড় পড়ে আছি তাতে নিচে যাওয়া অসম্ভব। তাই নতুন থ্রিপিস পড়বো ভাবছি।
– শাড়ী পড়লে ভালো হয়না। বিয়ে বাড়ি!
– হ্যাঁ হয় কিন্তু এই কাটা হাত নিয়ে কীভাবে পড়বো। আমি নিজেও শাড়ি পড়তে পারিনা।
নিদ্র মুচকি হেসে বললো
– আমিও পারিনা। তাহলে আমিই পড়িয়ে দিতাম।
নিদ্র আলমারির দিকে এগিয়ে এসে গাঢ় রঙের থ্রিপিস খুঁজতে লাগলো।
– আপনার গাঢ় রঙের থ্রিপিস নাই?
– নাহ।
– কিন্তু এই বয়সে এতো হালকা রঙের থ্রিপিস পড়াটা ঠিক মানায় না।
– আপনার পছন্দের একটা থ্রিপিস বের করুন।
– আমার তো হালকা রঙ পছন্দ না। তারপরও এরমধ্যে থেকেই যেহেতু খুঁজতে হবে তাহলে চেষ্টা করে দেখতে পারি।
নিদ্র হালকা আকাশী রঙের থ্রিপিস বের করে ভ্রু – কুঁচকে বললো
– এটা একটু চলে। আপনি এখন থেকে গাঢ় রঙ ব্যবহার করবেন। মনে থাকবে?
– হ্যাঁ থাকবে।

অদ্রির পোশাক পাল্টাতে খুব কষ্ট হলো। হাতে একটু টান লাগলেই মনে হচ্ছিলো জান বের হয়ে যাচ্ছে।
নিদ্রের ডান হাত ধরে অদ্রি নিচে নেমে এলো। নিদ্রের এখন নিজেকে হাজব্যান্ড হাজব্যান্ড লাগছে। রীতা কী কাজে যেন রান্নাঘরে যাচ্ছিলেন, দুজনকে এভাবে নামতে দেখে তারও মন জুড়িয়ে গেলো। মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বললেন।
অদ্রির মাথা শূন্য শূন্য লাগছে। তারপরও ব্যাপারটাকে নিদ্রকে বুঝতে না দেয়াই ভালো। ছেলেটার মুখে আনন্দ যেন ঠিকড়ে পড়ছে। এই আনন্দ মুছে দেয়ার ক্ষমতা তার নেই।
কনে নিচের দক্ষিণের দিকের রুমে বসে ছিলো। রশীদ চাচা মেহমানদের খাবারের ওখানে ব্যস্ত।
রশীদ সাহেবের স্ত্রী মেয়ের পাশেই বসা ছিলেন। অদ্রিকে আসতে দেখে মেয়েকে ধীর স্বরে বললেন
– এই বাড়ির মালিক আর সাথে যে ছেলেটা ওর হাজব্যান্ড। ভালো ব্যবহার করবে।
ফাহি কিছু একটা বলতে যাবে রশীদ সাহেবের স্ত্রী ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন
– আরে মা, তুমি কষ্ট করে এলে কেনো? আমাদের বললেই হতো।
– না তা কেনো হবে? আমারও যে ইচ্ছে করছিলো বিয়ের কন্যাকে দেখতে।
ফাহির হাতে ছোট্ট একটা বক্স দিয়ে বললো
– তোমার জন্য আমি অন্য কিছু কিনতে চেয়েছিলাম কিন্তু অসুস্থতার কারণে পারলাম না। বক্সে ছোট্ট একটা স্বর্ণের আংটি আছে। তোমার ভালো লাগবে আশা করি।
– মা, তোমার এসব দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলোনা। যা করেছো সেটাই অনেক।
– আমি কিছুই করিনি।
নীলিমা তার বোনকে নিয়ে কণের ঘরে এসে,নিদ্রকে এভাবে অন্য মেয়ের সাথে দেখে অবাক হলো।
মেয়েটা দেখতে খারাপ না হলেও সুন্দরী না। এতো সুন্দর ছেলের পাশে এরকম মেয়ে ঠিক মানায় না। মেয়েটার চোখের নিচে কালো দাগ পড়াতে আরও বাজে লাগছে।
আর যেভাবে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে তাতে তো মেয়েটাকে কাছের কেউই মনে হচ্ছে।
ফাহি, নীলিমা আর তার বোনকে দেখিয়ে দিয়ে অদ্রিকে বললো
– আপু, এরা হচ্ছে আমার বরের চাচাতো বোন।
অদ্রি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো
– তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেনো বসো।
নীলিমা ব্যঙ্গ করে বললো
– বসবো কই? চেয়ার আছে কোনো?
অদ্রি বললো
– ঠিকাছে, আমি এনে দিচ্ছি।
নিদ্র প্রতিবাদ করে বললো
– আপনি আমার হাত ধরা ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেননা। আর আপনি নাকি ওদের চেয়ার এনে দিবেন?

অদ্রিকে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে নিদ্র দুটো চেয়ার এনে দিলো।
অদ্রিকে বললো
– বরকে দেখবেন?
– ইচ্ছা ছিলো।
– বরকে পরেও দেখা যাবে। আপনি রুমে চলুন। স্যুপটাও পুরোটা খাননি।
– ঠান্ডা হয়ে গেছে হয়তোবা।
– আমি গরম করে দিবো কিন্তু এখন চলুন।
অদ্রিকে নিয়ে রুমে আসার পর নিদ্র যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। নীলিমা মেয়েটা বিশ্রী ভাবে অদ্রির দিকে তাকিয়ে ছিলো। মেয়েটা কিছু একটা বলে বসলে অদ্রি ভীষণ কষ্ট পাবে। এতো কষ্টের পর আরো কষ্ট পেলে কী হতে পারে, ভাবতেও পারেনা নিদ্র।

চলবে……!

© Maria Kabir

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে