মন ফড়িং ২১


Notice: Trying to get property 'post_author' of non-object in /var/www/wptbox/wp-content/plugins/wappPress/wappPress.php on line 104

Notice: Trying to get property 'post_author' of non-object in /var/www/wptbox/wp-content/plugins/wappPress/wappPress.php on line 104
0
1909
মন ফড়িং ❤
২১.
 দুপুরের দিকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। নিদ্র বসার ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলো। খুব জোরে বৃষ্টি পড়া শুরু হলে নিদ্রের মনোযোগ খবরের কাগজ থেকে সরে গেলো।
হুট করেই উদাসীনতা ভর করলো। দরজা খোলাই ছিলো। বাহিরের বৃষ্টি পড়া দেখে নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। খবরের কাগজ টি-টেবিলের ওপর রেখেই উন্মাদের মতো উঠানে নেমে এলো।
সাদা রঙের টাউজার কাঁদা লেপ্টে ঈষৎ খয়েরী রঙে রূপ নিয়েছে। পড়নের আকাশী রঙের গেঞ্জিতে বৃষ্টির পানির ফোটায় ভিজতে শুরু করেছে।
নিদ্রের কাছে সময়টাকে বোতল বন্ধী করতে ইচ্ছে করছে। বৃষ্টির ঠান্ডা পানিতে ক্লান্তি, উদাসীনতা উবে যাচ্ছে।
নিদ্র স্থির করলো, যতক্ষণ পর্যন্ত বৃষ্টি হবে ততক্ষণ সে ভিজবে। ঠান্ডা লাগলে লাগুক। তাতে তার আনন্দে কেউ ভাগ বসাতে পারবেনা।
অদ্রি দুপুরে সবার আগেই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। খুব ক্লান্ত লাগছিলো, তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে হাতের ব্যথাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। নিদ্র বুঝতে পারলে, কষ্ট পেতো। শুধু শুধু নিজেকে দোষারোপ করতো। সকালে নাস্তা দিতে গিয়ে যা শুরু করেছিলো। অদ্রি হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছিলো না।
নিদ্র প্রথম পরোটা শেষ করে দ্বিতীয় টায় হাত দিবে আর তখনই অদ্রির মনে হলো হাতে কেউ সজোড়ে টান মেরেছে। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো আর নিদ্রও সাথে সাথে বললো
– আমার জন্যই আপনাকে কষ্ট পেতে হচ্ছে।
অদ্রি তাড়াতাড়ি ব্যথাটাকে হজম করে, মুখে হাসি এনে বললো
– তেমন কিছুই না। মাঝেমধ্যে একটু টান লাগে আরকি।
– অদ্রি, আমাকে মিথ্যে বলে লাভ নাই। আপনার মুখের এক্সপ্রেশনে বোঝা যাচ্ছে একটু টান না কী!
– আপনি সবসময় একটু বেশি বুঝেন।
– আপনার গতকাল রাতে যে পরিমাণ রক্ত ক্ষরণ হয়েছে তাতে তো আমারই অবস্থা খারাপ। কোলে করে কোনোমতে বিছানায় শুয়ে দিয়েই আমি রশীদ সাহেবকে ফোন করলাম। পুরো রাত আমি চোখ বন্ধ কর‍তে পারিনি। সামান্য একটা ফোসকা থেকে এতো কিছু হতে পারে জানা ছিলোনা আমার। তার উপর আপনি বেহুশ হয়ে পড়ে আছেন।
– আপনি আগে নাস্তা শেষ করুন। আমাদের কাছে অনেক অনেক সময় আছে গল্প করার। তাই না?
– ফিউচার জানার ক্ষমতা আমার নেই। বলা কি যায় এক মিনিট পরে কী হবে?
ধরুন না গতকালের ঘটনাটার কথা। দরজা খুলতে গিয়ে আপনার হাত কেটে গিয়ে আপনি অজ্ঞান!
– রক্তের গন্ধটা নাকে যাওয়ার পর থেকেই খারাপ লাগছিলো তারপর পেটের ভিতর থেকে বমি আসতে চাইলো কিন্তু তার আগেই ঠাস।
কথাটা বলে অদ্রি হাসতে শুরু করলো।
নিদ্র পরোটার টুকরা মুখে পুড়ে দিয়ে বললো
– আমার কিছু হলে, কষ্টটা আপনি বুঝবেন।
অদ্রির আর কিছু বলার সাহস ছিলোনা। মনে মনে বলছিলো
– আমি কষ্টটা বুঝতে চাইনা। চাইনা।
নিদ্র বললো
– এরপর থেকে আমি রুড বিহেভ করতে গেলে আমাকে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিবেন।
– তারপর?
– আমি চুপ হয়ে যাবো।
– আমি তো চাইনা আপনি চুপ থাকুন। আপনি কথা না বললে কীভাবে বুঝবো, অভিমান ভর করেছে আপনাকে?
– ভালোবাসলে প্রিয় মানুষের নীরবতার ভাষাও বোঝা যায়।
– আপনি বুঝতে পারেন?
– হ্যাঁ, পারি। আপনার হাতে প্রচুর ব্যথা হচ্ছে কিন্তু আপনি আমাকে বুঝতে দিতে চাচ্ছেন না।
অদ্রি, আপনি রুমে গিয়ে রেস্ট নিন। নোংরা প্লেট, বাটি আমিই কিচেনে রেখে আসবো। প্লিজ, অদ্রি আমার কথাটা শুনবেন?
অদ্রি মুচকি হাসলো।
– বুঝেছি আপনি কথা বলবেন না। দেখুন একটু সুস্থ হোন তারপর অনেক অনেক গল্প করা যাবে।
– আচ্ছা, আপনি থাকুন।
অদ্রি চলে যাওয়ার পর নিদ্র নোংরা বাসন কিচেনে রেখে এসে ঘুমানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হলো।
বৃষ্টির শব্দে অদ্রির ঘুম ভেঙে গেলো। জানাল দিয়ে বৃষ্টির পানি এসে ফ্লোর ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। অদ্রি জানালা আটকে দিতে গিয়ে দেখলো – নিদ্র জানালা বরাবর নিচে দাঁড়িয়ে ভিজছে। ছেলেটাকে আধাপাগল মনে হচ্ছে অদ্রির।
পুরো টাউজারে কাঁদা লেপ্টে আছে। বৃষ্টির পানিতে কাঁদা ধুয়ে যাচ্ছে আর সে আবার কাঁদা লেপ্টে নিচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে গায়ের রঙটা আরো বেশি ফর্শা মনে হচ্ছে।
অদ্রি এই আধা পাগলের পাগলামি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। বৃষ্টির পানি এসে তাকেও ভিজিয়ে দিচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই।
নিদ্র দোতলার জানালার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় নিচে আসতে বললো।
অদ্রি ডান হাতের ব্যান্ডিজ দেখালো। নিদ্র নিজের মাথায় টোকা দিয়ে হাসলো।
অসম্ভব সুন্দর হাসি।
নিদ্র অদ্রির জন্যই এখানে এসে দাঁড়িয়ে ভিজছিলো। মনে ক্ষীণ আশা ছিলো হয়তোবা ম্যাডামের রূপ একটু দেখা গেলেও যেতে পারে।
মেয়েটার চোখের নিচে কালো দাগ গাঢ় থেকে গাঢ় হচ্ছে দিন দিন, নিদ্রের তাই মনে হলো।
অদ্রিকে নিজের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিদ্র ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিতেই অদ্রি লজ্জা পেয়ে জানালার পাশ থেকে সরে দাঁড়ালো।
রিতা অদ্রির রুমের দিকে আসছিলেন। লিলিকে নিদ্রের রুম থেকে বের হতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন।
মেয়েটার তো সাহস কম না। এভাবে অন্য কারো রুমে যায় নাকি? আর কী বা করতে গেলো ওখানে?
চুরি টুরি করলো না তো? বিদেশ থেকে এসেছে, রুমে রাখা ব্যাগে টাকাপয়সা থাকাটা স্বাভাবিক।
লিলি রিতাকে এইসময় এখানে দেখবে ভাবতে পারেনি। অনেক কষ্টে একটু সুযোগ পেয়েছে রঙিন ভাইজানের রুমে আসার কিন্তু ভাইজান রুমেই নাই। কিন্তু তার ব্যবহার করা টি-শার্ট ছিলো।
বুকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ থেকে যেই না বের হলো আর তখনই সামনে রিতা পড়লো।
সেদিনও অদ্রির কাছে ধরা খেয়েছে আর আজকে রিতার কাছে। তার ভাগ্যটাই খারাপ।
কী বলবে ভাবতে ভাবতেই রিতা তাকে ডাকলেন।
– এই মেয়ে ওই রুমে কেনো গিয়েছিলে?
– এঁটো থালাবাসন আছে কিনা দেখার জন্য।
– যার রুম তার অনুমতি নিয়েছিলে?
– হ্যাঁ।
লিলি এবার খুব সুন্দর করে মিথ্যা বলে দিলো। রিতার প্রতিউত্তরের অপেক্ষা না করে নিচে নেমে রান্নাঘরে পা বাড়ালো।
রিতা অদ্রিকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে বললো
– ব্যথা কমেছে?
– কিছুটা।
– লিলিকে নিদ্র না কে যেন ওনার রুম থেকে বের হতে দেখলাম।
নিদ্র তো তার রুমে নেই। তাহলে লিলি কী করতে গিয়েছিল?
– জিজ্ঞেস করেননি কেনো গিয়েছিল?
– বললো এঁটো থালাবাসন আনতে গিয়েছিল।
– নিদ্র তো নিজেই নোংরা বাসন কিচেনে রেখে এসেছিলো। নাহ, এই মেয়েটা কী শুরু করেছে আবার! আল্লাহ জানে।
– লিলিকে ডেকে পাঠাবো?
– না, ওই মেয়ে কিছুই স্বীকার করবেনা। উল্টো বেয়াদবি করবে। আমি নিদ্রকে বলে দেখবো কিছু হারিয়েছে নাকি।
– আর একটা কথা।
– বলুন।
– আসমা আন্টি আপনার সাথে কথা বলতে চান।
– আচ্ছা, তাকে বলুন আমি আসছি।
– তুমি তো অসুস্থ। তাকেই ডেকে আনি।
– আমার একটু হাঁটতে ইচ্ছে করছে। এই সুযোগে হেঁটে আসাও হবে।
নিদ্র রাস্তায় বসে ভিজছিলো। তেমন কোনো যানবাহন এই রাস্তায় যাওয়া আসা করেনা। তার উপর আবার ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।
৫-৬ জনের একটি দল বেশ হৈহল্লা করতে করতে নিদ্রের পাশ দিয়েই যাচ্ছে। বয়স কতো হবে ৯-১১ এর মধ্যে। মফস্বলের কাঁচা-পাকা অশান্ত পুচকের দল, যাদের আনন্দ, হৈহল্লা করতে তেমন বিশেষ কিছু লাগেনা। একটু জোরে বৃষ্টি, খুব ঠান্ডা, অভেদ্য কুয়াশা আর কাকা ফাঁটা রোদ্দুর হলেই হলো। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দল বেঁধে চলছে আমেজ।
দলের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা আর স্বাস্থ্যবান যে ছেলেটা, সে বেশ জোরালো ভাবে বলছে
– শোন, আজকে কেউ আমার হুকুমের বাইরে যাবিনা।
সবচেয়ে পুচকে টা বললো
– ভাই আমি কিন্তু আফনের কথা মাইনা চলি।
আরেকটা বাচ্চা পুচকের মাথায় থাপ্পড় দিয়ে বললো
– তুইই বেশি ত্যারামি করোস।
ঝগড়া লেগে যাবে এই অবস্থায় হুকুমজারি করা হলো
– কেউ ঝগড়া না থামালে আজকের কদম অভিজান বন্ধ করে দেয়া হবে।
নিদ্রের মাথায় বুদ্ধি উঁকি দিলো। বৃষ্টির দিনে কদম ফুলের মতো সুন্দর উপহার আর দ্বিতীয়টা হয়না।
রিতার চিল্লাচিল্লিতে অদ্রি প্রায় দৌঁড়ে আসমা জামানের রুম থেকে বসার ঘরে এসে উপস্থিত হলো। পুরো বসার ঘরে কে যেন কাঁদা মাটি দিয়ে মাখিয়ে রেখেছে। বেশ বড় বড় পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে।
নিদ্র ছাড়া এই কাজ আর কেউই করেনি।
রিতা বললেন
– দেখো তো পুরো বসার ঘর থেকে শুরু করে সিড়ি পর্যন্ত কাঁদা মাটি দিয়ে নোংরা করে রেখেছে। আর কতো কাজ করা যায়?
– লিলি কই? ওকে ডাকুন।
লিলিকে ডাকা হলো। অজ্ঞতা তাকেই সব পরিষ্কার করতে হলো।
রিতা বললেন
– সব নিদ্র না কী যেন তার কাজ।
– আমি তাকে নিষেধ করে দিবো। আপনি এখন রেস্ট নিন।
অদ্রির বিছানার উপর কয়েক গুচ্ছ ভেজা কদম ফুল রাখা।হলুদ  আর সাদার অদ্ভুত মিশ্রণ! প্রথমে অদ্রি বিরক্ত হলো, তার বিছানাটা ভিজে উঠেছে। তাও একেবারে মাঝ বরাবর। পরোক্ষণেই মুচকি হেসে কয়েকটা কদম হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নিলো। ছোটো বেলায় সে নিজেই গাছে উঠে কদম ফুল পাড়তো। ওদের বাসার পাশেই কদম গাছ ছিলো কয়েকটা। ভরা বর্ষায় যখন পুরো গাছ জুড়ে কদমে হলুদ হয়ে যেতো তখন তার ছোটো ঘরটাতেও রাতের বেলা কদমের ঘ্রাণ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো।
নিজেই গাছে উঠে হাত ভরে কদম নিয়ে হাসি মুখে বাসায় ফিরতো। বাবা কিছু বলতেন না কিন্তু মা খুব রাগ করতেন।
মা – বাবার কথা মনে পড়ায় চোখের কোণায় ভিজে উঠেছে অদ্রির।
ফুলগুলো তাকে অতীতের মধুর স্মৃতির প্রতিচ্ছবি ছাড়া আর কিছুই না।
নিদ্র পেছন থেকে অদ্রির কোমর জড়িয়ে ধরে বললো
– খুব সুন্দর তাই না?
অদ্রি কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললো
– অসম্ভব সুন্দর মানে আমি ঠিক আপনাকে বোঝাতে পারবোনা। ঘ্রাণটাতো আরো বেশি সুন্দর।
অদ্রির ঘাড়ে ঠোঁট ঘষে দিয়ে বললো
– ভালো লেগেছে? একদম ফ্রেশ কদম ফুল। বৃষ্টির ঠান্ডা পানিতে ভিজে একদম সেজেগুজে আপনার কাছে এসেছে। আপনার অনূভুতি টা কেমন?
– প্রথম প্রশ্নের উত্তর – ভালো লাগার উপরে কিছু থাকলে সেটাই লেগেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর – আমার অনুভূতি গুলো আপনার জন্যই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
কাঁধে চুমু দিয়ে বললো
– আমি কী করলাম শুনি?
– এতোটা ভালোবাসতে নেই। আমি এতো ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নই।
চলবে…..!
© Maria Kabir

Notice: Trying to get property 'post_author' of non-object in /var/www/wptbox/wp-content/plugins/wappPress/wappPress.php on line 104