মন পায়রা পর্ব-০৬

0
179

#মন পায়রা
#মাশফিয়াত_সুইটি(ছদ্মনাম)
পর্ব:০৬

‘আজ আপনার জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে পেরেছি জানেন বাবা আমাকে কখনোই একা ছাড়ে না বন্ধুদের সঙ্গেও দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে দেয় না।বাবার কাছে কত বায়না ধরেছিলাম এই কাঁচের চুড়ি গুলো কিনে দিতে কিন্তু বাবার এক কথা এগুলো দিয়ে নাকি হাত কেটে যাবে। তবে আপনার জন্য সব স্বপ্ন গুলো পূরণ হলো অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।’

– আর কতবার ধন্যবাদ দিবে? এই ধন্যবাদ শব্দটা আমার ভালো লাগে না তারপরেও তোমার জন্য হজম করে গেছি।

– আচ্ছা আর দিব না তবে সত্যি সত্যি আমি অনেক হ্যাপি শুধু মাত্র আপনার জন্য।

বাগান বাড়ি থেকে সকালেই বেড়িয়ে গেছে সবাই। ইনান-সাবিহা অন্য একটা গাড়িতে এই গাড়িতে ইফাত আর পায়রা। ইফাত ড্রাইভ করছে আর পায়রার ছটফটানি দেখছে ইফাত ভাবতেই পারেনি পায়রা এতটা খুশি হবে। পায়রার খুশিতে ইফাতের অনেক ভালো লাগছে। পায়রার বাড়ি থেকে একটু দূরে গাড়ি থামালো ইফাত পায়রা ব্রু উঁচিয়ে,

– এখানে থামালেন কেন একেবারে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আসুন।

– তোমার পরিবার জানে তুমি ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছ এখন আমার গাড়ি থেকে নামলে তো সন্দেহ করবে।

– ওহ ভুলেই গিয়েছিলাম।

পায়রা গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা ধরল কিছু একটা ভেবে গাড়ির কাছে গিয়ে ইফাতের দিকে তাকিয়ে,

– এই প্রথম আপনার জন্য আমার মুহূর্তগুলো ভালো কেটেছে এই মুহূর্ত গুলো কখনও ভুলবো না।

– তুমি চাইলে এর থেকেও সুন্দর মুহূর্ত তৈরি করতে পারো হাসি খুশি থাকতে পারবে।

– কিভাবে?

– আমাকে বিয়ে করে।

– মাথা থেকে এসব ঝেড়ে ফেলুন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি কিন্তু ভালোবাসা সৃষ্টি হয়নি বাই।

পায়রা চলে যাচ্ছে যতক্ষন পায়রাকে দেখা গেল ততক্ষণই ইফাত তাকিয়ে ছিল যাওয়ার দিকে,অদৃশ্য হয়ে যেতেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল ইফাত।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ড্রয়িং রুমে সবাইকে দেখতে পেল পায়রা।আবরার,অশমি তাদের বাবা-মাও বসে গল্প করছে বলতে গেলে রোজ তারা আসে। পায়রাকে দেখেই আতিফা বেগম কাছে ডেকে,

– কিরে কোথায় গিয়েছিলি পায়রা মা?

– বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলাম খালামণি।

অশমি পায়রার হাত ধরে,
– চুড়ি গুলো অনেক সুন্দরতো কে কিনে দিয়েছে রে পায়রা?

পায়রার মা ও জিজ্ঞেস করলেন,
– সত্যি অনেক সুন্দর এদিকে তো তেমন পাওয়া যায় না কে কিনে দিল?

পায়রা হেসে চুড়ির দিকে তাকিয়ে,
– ইফাত কিনে দিয়েছে আমি বলেছিলাম দুই হাতের জন্য দুই ডজন চুড়ি কিনে দিতে কিন্তু উনি দোকানের সব রেশমী চুড়ি আমার জন্য কিনে নিয়েছেন।

সবাই পায়রার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে পায়রা এবার বুঝতে পারলো সে কি বলে ফেলেছে এখন কিভাবে এড়িয়ে যাবে ভাবছে। পলাশ শেখ বললেন,

– তোমরা তো ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলে তাহলে ইফাতকে পেলে কোথায়?

পায়রা কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না তখনি সাবিহা বলে উঠল,
– আসলে জেঠু ফ্রেন্ডদের সঙ্গেই ঘুরতে গিয়েছিলাম কিন্তু ইফাত ভাইয়া আর ইনানের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওই যে উনাদের বাগান বাড়ি যাচ্ছিলেন কি একটা কাজে যেন, আমরা উনাদের চিনি উনারাও আমাদের চেনেন তাই।

– ওহ।

– হ্যা তারপর উনারাও জোর করলেন যাতে উনাদের সঙ্গে যাই আর জায়গাটা নাকি সুন্দর তাই গেলাম জানো জেঠু জায়গাটা অনেক সুন্দর পায়রা আপুরও ভালো লেগেছে কি রে আপু বল।

পায়রা শান্তি পেল সাবিহার সঙ্গে তাল মিলিয়ে,
– হ্যা বাবা জায়গাটা অনেক সুন্দর আর কাছাকাছি একটা মেলা হচ্ছিল ওখানে ঘুরেও এসেছি। সারাটাদিন অনেক ভালো কেটেছে অনেক আনন্দ পেয়েছি।

পলাশ শেখ তৃপ্তির হাসি হেসে,
– তোরা খুশি হয়েছিস এটাই অনেক আমি কাজের চাপে তোদের কোথাও নিতেই পারি না।ইফাত যদি আবার ওদিকে যায় তাহলে ওকে বলে দিব যাতে তোদেরও নিয়ে যায়।

– আচ্ছা বাবা তাহলে আমরা ঘরে যাই ফ্রেশ হতে হবে।

– আচ্ছা যা।

পায়রা আর সাবিহা দু’জনে উপরে চলে গেল আবরার এবং অশমি ভালো করেই বুঝতে পারছে ফ্রেন্ড নয় বরং সরাসরি ইফাতের সঙ্গেই ওরা ঘুরতে গেছে। আসমা বেগম বললেন,
– ইফাতের জন্য তোমার এই বদমেজাজি মেয়ের মুখে আজ আনন্দ দেখলাম সবসময় এমন থাকলেই হয়।

পলাশ শেখ স্ত্রীর কথায় বললেন,
– ইফাত ছেলেটা কিন্তু এমনিতে অনেক ভালো একেবারে এনায়েতের মতো দায়িত্বশীল এমন একটা ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হতাম।

আতিফা বেগম আজ সবার সামনে আবরার আর পায়রার বিয়ের প্রস্তাব দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু এখন আর প্রস্তাব দেওয়া উচিত হবে না বলে মনে করলেন। সবার কথা শুনছেন তিনি বুঝতে পেরেছেন ইফাতকে তাদের পছন্দ হয়তো একদিন মেয়ের জামাই করে ফেলবেন।

ঘরে এসে সাবিহার গালে একটা চুমু খেয়ে পায়রা বলল,
– কি সুন্দর মতো গুছিয়ে সত্য বলে দিলি তোর জন্য আমি গর্বিত।

– চুমু দিলে হবে না গিফ্ট দে।

– ইফাত তোকে কতকিছু কিনে দিল আবার আমার কাছে চাইছিস কেন?

– ইফাত ভাইয়া দিয়েছে তুই দেসনি।

– আমার বোন বলেই তোকে দিয়েছে।

– দেখলি ইফাত ভাইয়া কত ভালো উনার সঙ্গে থাকলে তুই খুশি থাকবি এখনও সময় আছে উনাকে হ্যা বলে দে।

– আবার এক কথা যা তো।

সন্ধ্যার নাস্তা করে আবরারের পরিবার বাড়িতে চলে গেল। বাড়িতে এসে অশমি মুখ কালো করে উপরে চলে গেল আবরারেরও রাগ হচ্ছে ইফাতের উপর। আবরার অশমির পাশে বসে,
– রাগ হচ্ছে?

– হুম ইফাত পায়রার সঙ্গে সময় কাটাল ওরে চুড়িও কিনে দিল।

– তোর চুড়ি পছন্দ হয়েছে? তোকে কিনে এনে দিব ঠিক আছে।

– লাগবে না ওদের একসঙ্গে দেখলে আমার বিরক্ত লাগে রাগ হয়।

– রাগ তো আমারও হয়।
____________
ইফাত পায়রাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে অফিসে চলে গেছিল কিছু কাজ ছিল সেগুলো করে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে নয়টা বেজে গেছে।ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে এসে বসলো খাবার টেবিলে সবাই আছে বুঝাই যাচ্ছে ওর জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল।

ইফাত খাবার খাচ্ছে বেশ কয়েকবার বাবার সাথে চোখাচোখি হয়েছে।ইফাত নিজেই বলল,
– কিছু বলবে বাবা?

– বলতে তো অনেক কিছুই চাই।

– একে একে সব বলে দাও।

– তোর মায়ের কাছ থেকে অনেক কথাই শুনলাম কিন্তু এড়িয়ে গেছি কিন্তু আজ তো সত্যি ঘটনা গুলো।

– হেয়ালি না করে কোন ঘটনা সেটা বলো।

– পলাশের মেয়ের সঙ্গে তোর কি চলছে বাবা? আমাদের বাগান বাড়িতে ঘুরতে গিয়েছিলি ওকে নিয়ে?

ইফাতের গলায় খাবার আটকে গেছে অনবরত কাশছে।ইতি বেগমকে সরিয়ে এনায়েত মির্জা নিজেই দাঁড়িয়ে গিয়ে ছেলের দিকে পানি এগিয়ে দিলেন।ইফাত পুরো পানি খেলো, এনায়েত মির্জা জিজ্ঞেস করলেন,
– এবার ভালো লাগছে?

– হুম।

ইতি বেগম রাগি চোখে,
– খাওয়ার সময় ছেলেকে আজেবাজে প্রশ্ন করছো কেন? খেয়ে নিক।

– তুমি চুপ থাকো ইফাত বাবা তুই আমার প্রশ্নের উত্তর দে।

ইফাত ইনানের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাল।ইনান অসহায় দৃষ্টিতে ইশারা করে বুঝাল,
– বিশ্বাস কর ভাইয়া আমি কিছু বলিনি।

ইফাত শান্ত কন্ঠে,
– হুম গিয়েছিলাম।

এনায়েত মির্জা বুকে হাত দিয়ে,
– একটা রাত ওখানেই কাটিয়েছিস?

– হুম কিন্তু তুমি বুকে হাত দিয়ে রেখেছ কেন?

– যাতে হার্টটা বেড়িয়ে না আসে। তুই একটা মেয়ের সঙ্গে এক রাত থেকেছিস?

– হুম থেকেছি তবে আলাদা ঘরে।

– তোর নানার কসম খেয়ে বল আলাদা ঘরে থেকেছিস।

ইতি বেগম ক্ষেপে গেলেন ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন,
– ওই তুমি আমার বাবাকে মাঝখানে টেনে আনছো কেন?

– তুমি চুপ থাকো তো পুরো কথা শুনতে দাও,ইফু বাবা তুই বল।

– ইফু বলবে না বাজে লাগে শুনতে।

– আচ্ছা তুই উওর দে বাপ।

– তুমি বিশ্বাস করতে পারলে বাবা তোমাদের না জানিয়ে বিয়ে না করে একটা মেয়ের সঙ্গে একঘরে থাকব?

– যখন শুনেছিলাম তুই পায়রাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিস তখনও বিশ্বাস করিনি তাই আর কি জানতে চাইলাম।

– জানলে কিভাবে?

– সেটা তোর জানতে হবে না এবার বল তুই পায়রার পেছনে ঘুরঘুর করছিস কেন?

– পেছনে না আমি পায়রার সামনাসামনি ঘুরি।

এনায়েত মির্জা ইনানের দিকে তাকিয়ে,
– ইনু বাবা আমার হার্টটা চেপে ধর মনে হয় খুলে যাচ্ছে।

ইনান বোকার মতো বাবার বুক চেপে ধরল। এনায়েত মির্জা আবারো জিজ্ঞেস করল,
– ইফু বাবা কেন ঘুরিস মেয়েদের বিরক্ত করিস তুই তো এমন ছিলি না।

– আমি তো শুধু পায়রাকে বিরক্ত করি অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাইও না।

এনায়েত মির্জা ইতি বেগমের দিকে তাকিয়ে,
– আমার বাচ্চার মা গো আমার মাথায় একটু বাতাস করো মনে হচ্ছে হার্টটা মাথার উপর দিয়ে বের হয়ে যাবে।

ইনান অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে,
– বাবা কি বলছো হার্ট মাথার উপর দিয়ে কিভাবে বের হয়?

– তুই চুপ থাক।ইফু বাবা পায়রার পিছনেই কেন ঘুরিস?

– কারণ পায়রাকে আমি ভালোবাসি।

– ইফাতের মা এ আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আমার ইফাত কিনা একটা মেয়েকে ভালোবাসে আবার সেটা কি সুন্দর করে আমাকে বলছে।

ইতি বেগম মুখ বাঁকিয়ে,
– আমি তো আগেই বলেছিলাম বিশ্বাস করলে না তবে ছেলের পছন্দ আছে পায়রা মেয়েটাকে আমারও পছন্দ হয়েছে।

– তাহলে কি পলাশের সঙ্গে কথা বলবো?

– বলে লাভ নেই বাবা পায়রা আমাকে পছন্দই করে না।

– কেন করে না আমার এত সুন্দর শান্তশিষ্ট ছেলেকে কেউ পছন্দ না করে থাকতে পারে।(ইতি বেগম)

– জানি না আর বাবা অভিনয় একটু কমিয়ে খেয়ে নাও আমার খাওয়া শেষ আমি ঘুমাতে গেলাম।

ইফাত হাত ধুয়ে চলে গেল এনায়েত মির্জা বুক থেকে হাত সরিয়ে,
– আমি অভিনয় করছি!

ইতি বেগম ভেংচি কেটে,
– শুধু অভিনয় না নাটকও করছো।

ইতি বেগমও চলে গেলেন। এনায়েত মির্জা গালে হাত দিয়ে,
– মা ছেলে এক রকম।

অসহায় দৃষ্টিতে ইনানের দিকে তাকিয়ে,
– ইনু বাবা তুইও কি তোর মায়ের মতো হয়েছিস?

ইনান কি বলবে ভাবছে ইতি বেগম আবারো এদিকে আসছেন। দু’জনের মন রাখার জন্য ইনান হেসে বলল,
– আমি ভাইয়ার মতো হয়েছি বাবা।

এনায়েত মির্জা কপাল চাপড়িয়ে,
– কেউ আমার মতো হল না কোথায় যাব আমি ইতি গো আমার সব ছেলে তুমি কেড়ে নিলে।

ইতি বেগম টেবিলে বারি দিয়ে,
– সব বলতে কি বুঝাও তোমার মাত্র দুইটা ছেলে ছোটটাও তোমার মতো একটা নাটকবাজ হয়েছে।

– এখন আমাকে নাটকবাজ মনে হচ্ছে তোমার? বুঝেছি আমাকে আর ভালো লাগে না কেন ভালো লাগে না এখনও সবাই বলে আমাকে দেখতে নাকি ইয়াং লাগে।

– ইনান একটা কস্টেপ নিয়ে আয় তো তোর বাবার মুখে লাগিয়ে দেই।

এনায়েত মির্জা মুখে আঙ্গুল দিয়ে,
– আর কথা বলবো না চুপ করে গেলাম।

ইতি বেগম মুচকি হাসছেন।

চলবে……

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে