মন পায়রা পর্ব-০৫

0
192

#মন পায়রা
#মাশফিয়াত_সুইটি(ছদ্মনাম)
পর্ব:০৫

‘হাউ ডেয়ার ইউ আমাকে এভাবে কেন এনেছেন?দিন দিন আপনার সাহস বেড়েই যাচ্ছে। আমার হাত একবার শুধু খুলে দিন ইফাত তারপর দেখুন আপনার কি অবস্থা করি আমি।’

ইফাত গালে হাত দিয়ে নেশা ভরা দৃষ্টিতে পায়রার দিকে তাকিয়ে আছে। পায়রার কথায় ইফাতের কোনো ভাবান্তর হলো না।পায়রা ভার্সিটি যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় বড় রাস্তায় যেতেই পেছন থেকে কেউ পায়রার মুখে রুমাল চেপে ধরে,কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পর অজ্ঞান হয়ে যায় পায়রা।জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একটা ঘরে আবিষ্কার করল পায়রা। মুখটাও বাঁধা ছিল যার কারণে চেঁচাতে পারেনি অনেক ভয় লাগছিল তার কিন্তু পরিচিত মানুষকে দেখে ভয়টা চলে যায়।ইফাত এসে পায়রার মুখের বাঁধন খুলে দিতেই পায়রার অনেক রাগ হয় আর চেঁচিয়ে উপরোক্ত কথাগুলো বলে।ইফাত এবার বলল,

– কি করবে হাত খুলে দিলে?

– মেরে ফেলব, যখন ইচ্ছে হবে আমাকে তুলে আনবেন? কি করেছি আমি? আমি তো কোনো ছেলের সঙ্গে হেসেও কথা বলিনি।

ইফাত মৃদু হেসে পায়রার বাঁধন খুলে দিল। পায়রার মাথা গরম হয়ে আছে রাস্তার মাঝখান থেকে এভাবে তাকে এখানে নিয়ে আসায় আজ যেন ইফাত বেশ বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। ইফাত পায়রার হাত নিজের হাত আটকে,

– তোমার রাগমিশ্রিত মুখ আমার অনেক ভালো লাগে।

পায়রা আর রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে সর্বশক্তি দিয়ে ইফাতের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। কিন্তু এই থাপ্পড়ও ইফাতের মুখের ভাব ভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারেনি।ইফাতের গালে আঙ্গুলের ছাপ বসে গেছে কিন্তু ঠোঁটে সেই নেশালো হাসি এখনও আছে একটুও রাগ করেনি।পায়রা যেন অবাক হয়ে গেল তার মতে এই ইফাতকে সে কিছুতেই চেনে না। ইফাত পায়রার হাতে চুমু খেয়ে,

– এই নরম হাত থাপ্পড় দিতে পারে!

– আপনার লজ্জা নেই এত অপমান করার পরেও কিভাবে আমার সামনে আসেন খারাপ লাগে না?

– ভালোবাসি তো।

– আমি বাসি না।

– এটাই তো জানতে চাই কেন ভালোবাসো না? কেন এত ইগনোর করো? কেন আমার প্রতি এত রাগ? কেন কষ্ট দিচ্ছ? প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও আমি সবকিছু বদলে ফেলব তোমার মনের মতো হয়ে যাব।

পায়রা চুপ করে আছে কোনো উত্তর নেই তবে পায়রার মনেও ইফাতের জন্য ভালোলাগা আছে কিন্তু ইফাতের এই জোর জবরদস্তি, সামান্য কারণে আঘাত ভালো লাগে না। ইফাত কোনো উত্তর না পেয়ে পুনরায় হেসে,

– কি উত্তর নেই? উওর থাকুক কিংবা না থাকুক আমি তোমায় ভালোবাসি সবসময় এভাবেই ভালোবাসবো।আর লজ্জা এগুলোকে অপমান বলে না এগুলো আমার কাছে ভালোবাসার অন্য রকম প্রকাশ তবে যেদিন সত্যি সত্যি সবার সামনে অপমান করবে যেদিন মনে হবে তুমি মন থেকে আমায় ঘৃণা করো তোমার মধ্যে আমার জন্য এক কণা ভালোবাসা পাবো না সেদিন আর তোমার সামনে আসব না আজীবনের জন্য চোখের আড়ালে চলে যাব পাবে না আমায়।

পায়রা সাহস করে ইফাতের চোখের দিকে তাকাল।ইফাতের চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে কথাগুলো যে অধীর কষ্টে বলেছে তা ঠিক বুঝতে পারছে পায়রা।ইফাতের চোখে চোখ রেখে পায়রা জিজ্ঞেস করল,

– আপনি এমন কেন?

ইফাত এবারো মুচকি হেসে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে,
– তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু তুমি খুব সেয়ানা আমার চোখ ফাঁকি দিচ্ছিলে ইগনোর করছিলে তাই এভাবে ধরে এনেছি এমনি এমনি তো কখনও বললেই আসবে না।

– বাবা-মা জানলে?

– চিন্তা নেই ইনান আর সাবিহা ম্যানেজ করে নিয়েছে। আঙ্কেলকে ওরাই বলে দিয়েছে তোমরা ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ট্যুরে গিয়েছ।

– সাবিহা সব জানতো!

সাবিহা আর ইনান ঘরে এসে,
– সারপ্রাইজ।

পায়রা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে সাবিহার দিকে।সাবিহা পায়রার চোখের ভাষা বুঝে গেছে,
– আপু রাগ করিস না অনেকদিন ঘুরা হয় না তাই আরকি আমিও ইফাত ভাইয়ার প্লানে যোগ হয়ে গেলাম হি হি।

ইনান ইফাতকে ইশারা দিয়ে বাইরে আসতে বলল।ইফাত পায়রা আর সাবিহার উদ্দেশ্য,
– তোমরা এখানে থাকো আমরা আসছি।

বলেই বাইরে চলে এলো। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে নিজেদের একটা বাগান বাড়িতে এসেছে ইফাতরা। ইনান বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখানে অনেক বাতাস ইফাত চেয়ার টেনে বসে,

– ডাকলি কেন?

– তোর গালে আঙ্গুলের ছাপ কেন ভাইয়া?মনে হচ্ছে কেউ মে’রে’ছে আচ্ছা পায়রা তোকে!

ইফাত শান্ত গলায়,
– কিভাবে আদর করতে হয় জানে না তো তাই আদর করতে গিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছে।

ইফাতের কথা শুনে ইনান হু হা করে হাসছে।ইনানের হাসি দেখে ইফাত বলল,
– ভেড়ার মতো ডাকছিস কেন?

– সিরিয়াসলি ভাইয়া আমার হাসি তোর ভেড়ার ডাক মনে হচ্ছে?

– মনে হবে কেন আমি তোকে ভেড়াই মনে করি।

– তুই যাই বলিস না কেন ভাইয়া আজ আমার হাসি বন্ধ হবে না পায়রা তোকে থাপ্পড় মা’রলো আর তুই সেটাকে আদর বলছিস প্রেমে পড়লে মানুষ বদলে যায় তোকে না দেখলে জানতেই পারতাম না।

– হুশ…

পায়রা আর সাবিহা তাদেরকে খুঁজে চলে এসেছে। পায়রা তিক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে,
– আপনারা দুই ভাই মিলে এখানে বসে হাসাহাসি করেছেন তাহলে আমাদের আনলেন কেন?

ইফাত পায়রার দিকে না তাকিয়েই,
– তোমরাও চাইলে এই ভেড়াটার সঙ্গে হাসতে পারো ইনান ওদের তোর সঙ্গি করে নে।

সাবিহা কাঁচুমাচু মুখে,
– ভাইয়া আপনি ইনানকে ভেড়া বললেন!

– কেন ভালো লাগেনি?

ইনান রাগ দেখিয়ে,
– ভাইয়া তুই সবার সামনে আমাকে অপমান করতে পারিস না।

– তোর অপমান বোধ আছে!

– দাঁড়া আমিও বলে দিব তোকে……

বারান্দায় রাখা ফুলের টব থেকে একটা গোলাপ ছিঁড়ে ইফাত ইনানের মুখে ঢুকিয়ে,
– পেটের কথা পেটে রাখ মুখে আনার দরকার নেই।

ইনান মুখ থেকে ফুল বের করে,
– ওয়াক থু শেষ পর্যন্ত মুখে গোলাপ নিতে হলো এখনি বমি করতে হবে।

– যা খচ্চর ওয়াশরুমে যা।

ইনান দৌড়ে চলে গেল পায়রা আর সাবিহা হাসছে ওদের দুই ভাইয়ের এমন খুনসুটি দেখে।ইফাত ধমক দিয়ে,
– হাসছো কেন?

দু’জনে ধমক খেয়ে মুখ চেপে ধরে আছে হাসি থামছে না।ইফাত সাবিহার দিকে তাকিয়ে,
– এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন যাও গিয়ে দেখো বয়ফ্রেন্ড কি করছে।

সাবিহা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।পায়রা আবারো একা হয়ে গেল ইফাতের কাছে।ইফাত আবারও চেয়ারে বসে পড়ল, পায়রার উদ্দেশ্যে,
-চাইলে ঘর থেকে আরেকটা চেয়ার নিয়ে এসে বসতে পারো প্রাকৃতিক পরিবেশে খারাপ লাগবে না।

পায়রা ইফাতের কথা মতো একটা চেয়ার এনে ইফাতের পাশে বসল।এটা বারান্দা বললে ভুল হবে বলতে গেলে একটা মাঝারি আকারের ছাদ, খোলামেলা জায়গা বাড়ির আশেপাশে বিশাল আকারের বড় বড় সবুজ গাছ। বেশিরভাগ ফলের গাছ। বারান্দার কাছাকাছি একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ,গাছ ভর্তি লাল আর হলুদ মিশ্রিত রঙের কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটে আছে। দেখতে ভালোই লাগছে আবহাওয়াটাও সুন্দর রোদও না আবার বৃষ্টিও না। চারিদিকে ঠান্ডা বাতাস বইছে ইফাতের অনেক ভালো লাগছে পছন্দের ওয়েদার, জায়গা আর পাশে পছন্দের মানুষ।

ইফাত পায়রাকে জিজ্ঞেস করল,
– কেমন লাগছে এখানে?

পায়রা মিষ্টি করে হেসে,
– খুব ভালো লাগছে এমন সৌন্দর্য সবসময় কল্পনাই করে এসেছি কখনও বাস্তব হবে ভাবতেই পারিনি আপনার জন্য আজ এত সুন্দর একটা দিন পেলাম ধন্যবাদ।

– হায়রে মেয়ে তাও ভালোবাসবে না।

– সরি।

– কেন?

– তখন থাপ্পড় মা’রা’র জন্য আসলে রাগ উঠে গেছিল আর দেখুন এর আগে আপনিও কিন্তু আমায় থাপ্পড় দিয়েছিলেন শোধ বোধ।

– আমি কি এই ব্যাপারে কিছু বলেছি?

– কখনও যদি মনে হয় ভুল বুঝেন তাই আগেই বলে রাখলাম।

– তুমি চাও না আমি তোমাকে ভুল বুঝি?

– আপনি এভাবে কথা প্যাচান কেন?

– চা খাবে?

– খাওয়া যায় তবে বানাবে কে?

ইফাত কাউকে কল দিল কিছুক্ষণ পর আরাফ দুই কাপ চা নিয়ে এগিয়ে দিল।ইফাত বলল,
– তুমি আনতে গেলে কেন? কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেই হত।

– আপনার চা আমি অন্য কারো হাতে দিতে পারি স্যার? আমি আসি তাহলে।

আরাফ চলে যেতেই পায়রা জিজ্ঞেস করল,
– এই ছেলেটা কি সবসময় আপনার সঙ্গে থাকে?

– সবসময় বলতে আমি যতক্ষন বাড়ির বাইরে থাকি আরাফও আমার সঙ্গেই থাকে।

– কেন থাকে?

– আরাফ আমার এসিস্ট্যান্ট আর এটাই ওর চাকরি।

– ওহ।
____________

ইনান বেসিং এ কিছুক্ষণ ওয়াক ওয়াক করে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছে।সাবিহা এসে চুলে বিলি কেটে,

– এইভাবে শুয়ে আছো কেন? কি হয়েছে তোমার?

– কি হয়েছে মানে দেখলে না ভাইয়া কিভাবে গোলাপটা মুখে ঢুকিয়ে দিলো ভাবলেই গা গুলিয়ে আসছে।

– সামান্য একটা গোলাপ দিয়েছে তাতে এত কাহিনী?

– তাই বলে মুখে দিবে!

– তুমি কি শুয়েই থাকবে নাকি আমায় ঘুরতে নিয়ে যাবে?

– ঘুরতেই তো নিয়ে আসলাম আবার কোথায় নিয়ে যাব!

– এই বাড়ির চারপাশে ঘুরবো নাকি?

– আচ্ছা আচ্ছা বিকেলে বের হব।

পায়রার আজ আর ইফাতের সঙ্গ খারাপ লাগছে না। প্রত্যেকটা মুহূর্ত ভালো কাটছে নতুন এক ইফাতকে নতুন করে দেখছে। ইচ্ছে করছে না এই মুহূর্ত ছেড়ে যেতে। বিকেলে সবাই মিলে ঘুরতে বের হয়েছে জায়গাটা কিছুটা গ্ৰামের মতো ইটের রাস্তা দিয়ে হাঁটছে ইফাত আর পায়রা। ইনান আর সাবিহা অন্য দিকে চলে গেছে নিজেদের মতো সময় কাটাতে।

অনেকটা পথ যেতেই একটা মেলা দেখতে পেল ইফাত আর পায়রা। এতোক্ষণ দু’জনের মধ্যে নিরবতা থাকলেও পায়রা বায়না ধরে বলল,

– ইফাত চলুন না ওই মেলা থেকে ঘুরে আসি।

– মেলায় অনেক মানুষের ভিড় থাকে কোলাহল পূর্ণ জায়গা।

– তাতে কি হয়েছে?

– তোমার তো এসব পছন্দ নয়।

– যাই হোক আজ আমি মেলায় যাব প্লিজ চলুন না।

ইফাত আর কি করবে বাধ্য হয়ে পায়রাকে নিয়ে মেলায় গেল। মাঝখান দিয়ে ছোট একটা চলাচল করার মতো রাস্তা আর তার দু’পাশে সারি সারি দোকান বসেছে ছাউনি দিয়ে। পায়রা আজ অনেক খুশি হেসে হেসে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে ঘুরে দেখছে আর ইফাত মুগ্ধ হয়ে পায়রার দিকে তাকিয়ে আছে। পায়রা একটা চুড়ির দোকান দেখে সামনে গিয়ে দাঁড়াল কালো রঙের কয়েকটা চুড়ি হাতরে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল,

– চুড়ি গুলো কি সুন্দর।

– আপা এই চুড়ির নাম রেশমী চুড়ি আপনার হাতে মানাবে।

পায়রা চুড়ি হাতে নিয়ে ইফাতের দিকে এগিয়ে,
– পরিয়ে দিন তো চুড়ি গুলো।

ইফাত যত্ন সহকারে পায়রার হাতে চুড়ি গুলো পরিয়ে দিতেই পায়রা হাত ঝাঁকিয়ে,
– কেমন লাগছে?

– অনেক সুন্দর।

– তাহলে দুই হাতের জন্য দুই ডজন চুড়ি কিনে দিন।

এই প্রথম ইফাতের কাছে পায়রা কিছু চাইলো ইফাত কি না দিয়ে পারে।ইফাত দোকানদারের দিকে তাকিয়ে,
– আপনার দোকানের সবগুলো রেশমী চুড়ি প্যাক করে দিন।

পায়রা চমকে গিয়ে,
– আরে আমার সব লাগবে না এতগুলো দিয়ে কি করব?

– একেক দিন একেক রঙের চুড়ি পরবে তোমার হাতে কিন্তু সুন্দর মানিয়েছে।

পায়রা হাতটা একটু মেলে,
– আপনাকে এত্তগুলা ধন্যবাদ।

ইফাত প্রতিত্ত্যুরে মৃদু হাসল এই হাসিতে আজ বারবার ঘায়েল হচ্ছে পায়রা। মেলা ঘুরে বাগান বাড়িতে চলে এলো তারা আজকের রাতটা থেকেই কাল বাড়িতে চলে যাবে। রাতের বেলা সবাই মিলে গল্প করে খাওয়া দাওয়া করেছে বেশিরভাগ সময় ইনান ইফাতকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলেছে ইফাতও কম নয় সেও ইনানকে এক চুল পরিমান ছাড় দেয়নি সেও খুঁচিয়ে কথা বলেছে। দুই ভাইয়ের মধ্যেও যে এমন খুনসুটি ঝগড়া হয় ওদের না দেখলে পায়রা আর সাবিহা জানতেই পারতো না খুব ইনজয় করেছে তারা।

চলবে……..

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে