ভ্রান্তির অগোচরে {পর্ব~৩}

0
529

ভ্রান্তির অগোচরে {পর্ব~৩}

ঊম্মে হাবিবা জাহান

নাজমার কন্ঠস্বরের এক ঠুং হুংকৃত আওয়াজ ভেসে আসলো। কিসের তবে ভাবি?আশেপাশে দেখেন এমন রাজবাড়ীর মতো বাড়িতে এই এলাকার কোনো মাইয়ার বিয়া হইছে কন?

–‘ তা আসে নাই।তাও রুবির একটা মতামত আছে না? তোমার ভাই আর আমার পছন্দই তো সব না?

–‘ আরে ভাবি বাচ্চা মানুষ রুবি।ওই কি ভালোমন্দ দিন দুনিয়া চিনে।তাছাড়া বিয়া হইলে এমনি সব বুঝবো।তখন দেখবেন আপনারে আইসা আইসা বলবো। সে কত সুখে আছে।পায়ের উপর পা তুইলা রাজ করবো আপনার মেয়ে দেখবেন ভাবি।এখন ওর জন্য এতো ভালো সমন্ধ আরেকটা পাইবেন কন? তাহলে রুবির পাগলামির জন্য এমুন সমন্ধ না করা কত বড় বোকামি বুইঝা দেখেন।কাল আবার আসমু আমি আপনি ভাইয়ের সাথে আলাপ করেন।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্পপোকা ফেসবুক গ্রুপের লিংক: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/



–‘আরে নাজমা বসো এক্ষুনি আসলা।

–‘ না ভাবি কাল তো আসতে হবেই।এখন যায় নাবিলের আব্বা (রুবির ছোট চাচা)আসার সময় প্রায় হয়ে আসলো।

রুবির বাবারা তিন ভাই এক বোন।আগে সবাই একই বাড়িতে থাকতেন তাদের পৈত্রিক বাড়িতে।ছোট ভাই শরীফ খান ব্যবসায় উন্নতি করে বেশ টাকা-কড়ি করেছেন।সামর্থ্য হওয়ায় পর পিতার ছোট বাড়ি ছেড়ে মেইন রোডের কাছাকাছি বাড়ি বানিয়েছেন। আর তার অংশটুকু বড়ভাই নাসির খান আর মেজ ভাই নাজিম খান কিনে রাখেন।

রাতে খাবার টেবিলে একসাথে বসে খাচ্ছিলো রুবি, রোকেয়া আর নাজিম খান। রোকেয়া স্বামীকে ইশারা করলেন মেয়েকে বলতে।নাজিম খান চোখ বন্ধ করে সম্মতিসূচক ইশারা করলেন।

–‘ পরিক্ষা আছে নাকি সামনে তোমার আম্মা বলল সারাদিন শুধু বইয়ে মুখ গুজে থাকো।ঠিকঠাক খাও না!

–‘রুবি খাওয়া থামিয়ে বলল,না আব্বা পরিক্ষা দেরি আছে।এমনি একটা ইসলামের ইতিহাস বই পড়ছিলাম। আর খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাকই করি।আম্মা শুধু শুধু বলছে এমন কথা।

–‘ হ আমি তো হুদাই চিল্লাই।

–‘ আহ! তুমি থামো। রুবি কিছু কথা বলি মন দিয়ে শুনো মা।দেখ আমার বয়স হচ্ছে আমি সুস্থ সবল থাকতে তোমাকে কারো তত্ত্বাবধানে রেখে যেতে চাই।তোমার ভাইয়ের জন্য আমাদের মান-সম্মান সব নষ্ট হয়ে গেছে,তাকে নিয়ে আমার তেমন আশা নাই।মান-সম্মান মত তোমাকে বিয়ে দিতে পারলে অন্তত স্বস্তিতে থাকতে পারবো।তুমি কখনো আমার অবাধ্য হওনি। আমার বিশ্বাস আজও হবেনা।তবু তোমার আপত্তি থাকলে বলতে পারো।নাবিলের আম্মা যে সমন্ধটি এনেছে
আমরা সবাই রাজি। এখন তোমার মতামত জানাও?

–‘আব্বা আমার শুধু একটাই চাওয়া আপনি জানেন দ্বীনদারীতা।বাকি কোন কিছুতেই আমার আপত্তি নেই।আমি আমার চাওয়াটুকু বলে দিলাম এখন আপনারা যা সিদ্ধান্ত নিবেন তাই হবে। রুবির আর খাওয়া হলো না।হাত ধুয়ে উঠে পরলো সে, মনটা ভীষণ দু-টানায় ভুগছে।বাবা-মায়ের উপর কি সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া উচিত হলো? তারা তো গতানুগতিক সামাজিকতায় বেশি আগ্রহী।

বাইরে বেশ বাতাস হচ্ছে।বাতাসের কারণে গাছগুলো এলোমেলো হয়ে হেলেদুলে পরছে একটা আরেকটার উপর। বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।
ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিল রুবি।জানালার পাল্লা খুলে দিতেই বৃষ্টির আগাম শীতল ধারার হাওয়া হুড়মুড় করে ঢুকে গেল তার ঘরে। কোনো কোনো গাছের কটমটমট শব্দ আরো দৃঢ় হয়ে উঠছে,পাতায় পাতায় সংঘর্ষ ঝিরঝির শব্দ। একটা সময় ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নামা শুরু হলো।সুন্দর একটা মুহূর্ত!অন্য সময় হলে রুবি ঠিক হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি গায়ে মাখত কিন্তু মন এখন অমানিশায় কালো মেঘের ঘনঘটা, বৃষ্টির মতো শুভ্র, স্বচ্ছ নয়!বৃষ্টির স্বচ্ছ গোটা গোটা পানির ফোটার মতোই রুবির চোখ থেকেও ঝরছে অশ্রুর ফোয়ারা। হুট করে রুবির মনে পরলো বৃষ্টির সময় তো দোয়া করার জন্য উত্তম একটি সময়।ওযু করে এসে রুবি দু ‘ রাকাত ইস্তেখারার নামাজ পড়ে নিল লম্বা সময় নিয়ে। সিজদায় পরে
বিড়বিড়িয়ে দোয়া পাঠের সাথে অশ্রুপাত করলো। আল্লাহ উপর ছেড়ে দিল সে আর চিন্তা-ভাবনা সবটুকু ভরসাই তার উপর। নামাজ শেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।এখন তার মনে হচ্ছে নিজেকে বেশ হালকা লাগছে।যেদিন থেকে গুণাহের কাজগুলো বাদ দিয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হয়েছে সে টের পাচ্ছে যে সিজদাহ্তে কি অমায়িক শান্তি! আগেও সে নামাজ পড়তো তবে এমন শান্তি পায়নি,কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করতো। এক রাকাত নামাজ শেষ করে মন গুণতে শুরু করতো এখনো আরো তিন রাকাত বাকি!দুই-তিন মিনিট পরই বিজ্ঞাপন শেষ হয়ে মুভির বাকি অংশ শুরু হয়ে যাবে। ইশ! কি হ্যান্ডসাম হিরো একদম চকলেট বয়!মনে ঘুরপাক খেত সেই জেল দিয়ে স্টেট করা চুলওয়ালা,পিটানো পেটে থাক থাক মাংসের ভাজের লম্বাটে হিরো। আবার রং করা রেসমি ঘন চুল ব্যাকলেস ব্লাউজে উন্মুক্ত পিঠের অর্ধাংশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা দৃশ্য ভাসতো কল্পনায়। হিরো হিরোইনকে নিয়ে রোমান্টিক গান যা মনকে উচ্ছ্বসিত করতো বয়ে বেড়াতো কত রঙ-বেরঙের শিহরণ। হিরো একাই শত শত মানুষকে মেরে সাবার করছে। আহ!কত শক্তিশালী সেই হিরো।গান শুনি সুরের মাঝে হারায়,মুভি দেখে নিজের জন্য এমন হিরো প্রত্যাশা করে, নিজেকে সেই হিরোইনের স্থানে বসাতে যাওয়া মানুষ অনুভব করতে পারে না নামাজের স্বাদ,তার গুণাগুণ বোধ করতে পারেনা।যেমন অনেক তেল-মসলার অস্বাস্থ্যকর ফাস্ট ফুড খেতে খেতে আর বাড়ি শাক-সবজি স্বাস্থ্যকর খারাব মজা লাগে না,তখন পানসে লাগে ঠিক সেসব জিনিস তেমনি গান -বাজনা,মুভি,বেপর্দায় চলে নামাজকেও পানসে লাগে। রুবির মন খুব খারাপ হয়ে যায় যখন সে তার পূর্বের দিনগুলোর কথা ভাবে আর খুশিও হয়ে একারণে যে তাকে তো আল্লাহ হেদায়েত দিয়েছে এটাই কয়জন পায়। রুবির পূর্বের দিনগুলো আর বর্তমানের অবস্থা পর্যালোচনা করে সে এই জিকির বেশি বেশি করে”আল্লাহু গফুরুর রাহিম” আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।


আজ রুবির গায়ে হলুদ।গত বুধবারই বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করেছেন বাড়ির গুরুজনেরা। খান বাড়ির একটা নিয়মই হলো তারা যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটা ঘরোয়া মিটিং করে নেয়।সবারই খুব পছন্দ হয়েছে আহনাফ আর তার পরিবারকে।রুবির মতামতের তেমন গুরুত্ব দেওয়া হলো না।সকাল থেকেই আত্মীয় -স্বজনেরা আসতে শুরু করেছে। দুপুর পর্যন্ত বাড়িতে মেহমানে গিজগিজ করছে। বাথরুম যাও
ওয়েটিং,খাবার রুমে ভিড়,রান্না ঘরে ও পা দেওয়ার যো নেই।রুবির মা তো যেন স্বস্তি করে দমটাও নিতে পারছে না।রুবির বাবাও বাইরের সব কিছু নিয়ে ব্যস্ততম সময় পার করছেন।আজ যদি রুবাইয়াত বাড়ি থাকতো তাহলে সে ভরসার একটা হাত পেতেন। কিন্তু সে কি আসবে? এত করে বললাম তাও কি সে আসবে না?জানে না নিজাম খান, লোকের কথায় ছেলেকে তিনিও কম কথা শুনাননি। ভুল করে সে নিজেই অনুতপ্ত ছিল, তারউপর দিনরাত তাকে অপমান অবজ্ঞা করার কোন দরকারই ছিল না কিন্তু তখন নিজাম খান বুঝতে পারেনি। আজ মেয়ের বিয়ের দিন একটা বিশ্বস্ত কাজের হাত প্রয়োজন ছিল।যে সুষ্ঠুভাবে তার মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করবে আর একজন ভাইয়ের চেয়ে সুষ্ঠুভাবে কে-ইবা করবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আবার কিছু কাচা বাজারের লিস্ট নিয়ে বাজারে গেলেন।

সন্ধ্যা নেমেছে পাখিরা ডানা ঝাপ্টে উড়ে যাচ্ছে নীড়ে।নীলাভ আকাশপটে ঢেকে যাচ্ছে তামসিকতার চাদরে।কিন্তু রুবির বাড়ির আঙ্গিনা ঝলমল করছে লাল,নীল,হলুদ,সবুজ ও বাহারী রঙা মরীচা বাতির আলোয়।যা দূরের সেই মহাকাশের নক্ষত্রগুলোর মতো টিপ টিপ করে জ্বলছে নিভছে। মাগরিবের নামাজ পড়ে উঠেছে মাত্র রুবি। রোকেয়া এসে ডাকতেই দেখতে পেল রুবি একদিনেই মায়ের মুখটা একদম ছোট হয়ে গেছে ক্লান্তিতে।
–‘আম্মা তুমি কিছু বলবা?

–‘হু তুই কিছু খেয়ে নে। একটু পরে সাথীরা আসবে পার্লারের মহিলাকে নিয়ে?

–‘ আম্মা আমার খুদা নেই একদম।তুমি খেয়ে নাও কিছু মুখটা একদিনেই টলিয়ে ফেলছো।আর সাথীপু আজ পার্লারে কেন গেছে? আমি তো বলেছি আমি স্টেজে গিয়ে হলুদ মাখবো না। যারা হলুদ দিতে আসবে তারা আমার ঘরে এসেই দিবে আর কোন গায়রে মাহরাম এ্যালাও করবো না আমি।

–‘এতো এমন করলে চলে না রুবি।সামাজিকতা বলতে একটা কথা আছে না। সবকিছুতেই তোর বাড়াবাড়ি।

–‘ সে তুমি যাই বলো আম্মা, আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম আমাকে একটা দ্বীনদার ধার্মিক ছেলে দেখে বিয়ে দাও। কিন্তু তোমরা করনি।ছেলের বড় ব্যবসা দেখেই শেষ তার দ্বীনদারীতা কোন ম্যাটারই করে না তোমাদের কাছে, আজ যদি ধার্মিক একটা ছেলের সাথে আমায় বিয়ে দিতে তোমায় এতো চিন্তা করতে হতো না বানোয়াট কিছু গতানুগতিক সামাজিকতার রীতিনীতি নিয়ে। আম্মা কেন আল্লাহর দেওয়া সহজ সুন্দর দ্বীনকে তোমরা কঠিন করে রিপ্রেজেন্ট করো? এই যে তোমরা যেটাকে সামাজিকতা বলছো না আম্মা,আসলে এটা ইবলিশের একটা চাল মাত্র আর তোমরা বার বার ইবলিশের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে তাকে জিতিয়ে দিচ্ছো হেরে যাচ্ছো নিজেরা, হারাচ্ছো আখিরাত!তুমি একটু বুঝো আম্মা আমাকে, আমি যাবো না।কোনমতেই না।

–‘ আচ্ছা দেখি আমি কি করি।তুই যে ত্যাড়া না করছিস তো হ্যা আর করবি না,হেই আমার জানা।উঠি তাইলে দেখি কি ব্যবস্থা করতে পারি।

–‘ রুবি মায়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হে রাব্বুল আলামিন, আপনি আমার সরল আম্মাকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করুন।
আপনার দ্বীনের স্বাদ বোঝার তৌফিক দান করুন। আপনি তো সর্বশক্তিমান আল্লাহ। হেদায়েত দান করুন আমার পরিবারের উপর।

রাতে হলুদের আয়োজন হয় রুবির ঘরেই।তার কিছু আত্মীয় আর বোনেরা রুবির হলুদ অনুষ্ঠানটা করে।দূর এর জন্য ছেলে পক্ষ থেকে কেউই আসেনি।এতে করে আসার পরের যে ধকল সইতে হতো সেটা থেকে আপাতত মুক্ত রোকেয়া বেগম।

বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
চলবে…
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

▶ লেখকদের জন্য পুরষ্কার-৪০০৳ থেকে ৫০০৳ মূল্যের একটি বই
▶ পাঠকদের জন্য পুরস্কার -২০০৳ থেকে ৩০০৳ মূল্যের একটি বই
আমাদের গল্পপোকা ফেসবুক গ্রুপের লিংক:
https://www.facebook.com/groups/golpopoka/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here