ভুল এবং ভালোবাসা পর্ব- ১৩

0
1640

ভুল এবং ভালোবাসা
পর্ব- ১৩
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

এতক্ষণে সময় হলো গোসলখানা থেকে আসার? ড্রেসিংটেবিলে আয়নার সামনে বসে ভেঁজা চুলগুলো আচড়াচ্ছিল লাবণ্য। শাশুড়ির কথায় পিছু ফিরে তাকাই সে।
– ইয়ে না মানে মা….(….)….
হয়ছে! আর আমতা আমতা করতে হবে না। টেবিলে খাবার দিয়েছি। খেয়ে যা।
– কিন্তু মা আমি তো রোজা রা….(….)…..?
চলে যাচ্ছিল লাবণ্যর শাশুড়ির, ওর কথা শুনে থেমে যান তিনি। পিছু ফিরে তাকান।
হাসি দিয়ে বলেন, এ রোজা নয় এ উপুষ। দু’দিন ধরে কিচ্ছু খাস না, এভাবে না খেয়ে শুধু শুধু কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস? রোজা রাখলে নামাজও পড়তে হয়, কাল সেহরির পর থেকে এ পর্যন্ত কয় ওয়াক্ত নামাজ পড়েছিস শুনি?
লাবণ্য লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। সত্যি’ই কাল সেহরির পর থেকে একওয়াক্ত নামাজও পড়িনি। যে আমি এক ওয়াক্ত নামাজ যদি ঘুমের জন্য মিস হতো, কান্না শুরু করে দিতাম কেন জাগিয়ে দেয়নি, সেই আমি কি করে দু’দু’ওয়াক্ত নামাজ মিস করলাম? কিভাবে আমায় শয়তান ধরলো?
লাবণ্যর শাশুড়ি ওর কাছে গিয়ে বলে, হয়ছে থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। টেবিলে খাবার দিয়েছি, খেয়ে যান। খেয়ে উপুষটা ভঙ্গ করেন। শাশুড়ি চলে যাওয়ার পরও লাবণ্য একমনে আয়নার দিকে তাকিয়ে ভেঁজা চুলগুলো আঁচড়াচ্ছিল। তখন’ই সেখানে উপস্থিত হয় শিশির। জোরগলায় বলে উঠে, “ভাবি! তুমি এখনো বসে আছ? মা ডাকতেছে তুমি কি শুনতে পাচ্ছো না?”
ননদ শিশিরের কথায় সম্ভিত ফিরে লাবণ্যর। আয়নার সামনে থেকে চটজলদি উঠে পরে।
মৃদু হাসি দিয়ে ননদকে বলে, তুমি যাও! আমি আসছি। শিশির মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে শুভ্রর রুমের দিকে পা বাড়ালো। লাবণ্য গিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। খাবার সামনেই রাখা, কিন্তু কেন যেন ও মুখে দিতে সাহস পাচ্ছে না! কেমন যেন লাগছে ওর! এই কেমন লাগাটা কি ওর রোজার জন্য? হবে হয়তো!
” কি হলো? খাবার নিয়ে আবার ধ্যানে বসছিস নাকি? শুন রোজা রাখছি। বেশী কথা যাতে না বলতে হয় আর। লাবণ্য শাশুড়ির দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকালো।
“মা, আমি রোজা রাখব, না খেলে হয় না?”
লাবণ্যর শাশুড়ি লাবণ্যর দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লাবণ্য পূর্বের ন্যায় বিনীত ভঙ্গিতে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলতেছে, ” মা! প্লিজ…..”
শাশুড়ি এবার চেঁচিয়ে উঠল,
“তুই আমার কথা শুনবি কি না?”
লাবণ্য মনে মনে আল্লাহর কাছে দু’হাত তুললো। এ আল্লাহ মাফ করো আমায়। তারপর কোনো কথা না বলে বিসমিল্লাহ বলে ঢোক গিলে একের পর এক লঙ্কা গিলতে লাগল। ভয়ে শাশুড়ির দিকে মুখ তুলে তাকানোরও সাহস পাচ্ছে না লাবণ্য। সেই কখন থেকে শুধু গিলেই যাচ্ছে তো, গিলেই যাচ্ছে। ঠিক সে সময় শিশিরের সাথে উপস্থিত হয় শুভ্র। খাবার টেবিলের সামনে এসে লাবণ্যর দিকে হা করে তাকিয়ে আছে শিশির- শুভ্র। শিশির ওর মাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই হাত ইশারায় মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করতে বলেন ওনি ওনার মেয়েকে। শুভ্রকে ইশারায় পাশে বসতে বলে শিশির সেখান থেকে চলে যায়। শুভ্রর সামনে খাবার আর পানির জগ এবং গ্লাস দিয়ে শুভ্রর মা ও সেখান থেকে চলে যায়। পুরো একপ্লেট ভাত খেয়ে তবেই মাথা উঁচু করল লাবণ্য। সামনে তাকাতেই দেখে শুভ্র গালে হাত দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। লাবণ্য চোখ ফিরিয়ে নেয় শুভ্রর থেকে। শুভ্র গ্লাসে পানি ঢেলে ভরে, নাও! খাও। না হলে যে হারে খেয়েছ গলায় আটকে যাবে। লাবণ্য কিছু না বলে ঢকঢক করে দু’তিন গ্লাস পানি খেয়ে নেয়। সবশেষে প্লেটে পানি ঢালতে গেলে শুভ্র চোখ বড় বড় করে বলে উঠে, আরে আরে! একি করছ? আম্মা তোমার জন্য এই যে আরো একপ্লেট ভাত দিয়ে গেছে। এগুলো না খেয়ে হাত ধুচ্ছো যে? লাবণ্য চোখ বড় বড় করে বলে, এগুলো আমার নাকি আপনার? মা আপনাকে দিয়ে গেছে! শুভ্র গম্ভীর কন্ঠে বলে, তওবা, তওবা! রোজাদার ব্যক্তির এসব শুনাও যে পাপ।
– কি? আপনি রোজা?!!!(লাবণ্য)
~ হ্যাঁ, তুমি জানো না? আমি রোজা ভাঙ্গি না জীবনেও। (শুভ্র)
শুভ্রর কথা শুনে লাবণ্য কিছুটা লজ্জা পেল। তারপর নিচের দিকেই তাকিয়ে বলল, না মানে আপনার তো রোজা হবে না, তাহলে আপনি রোজা রাখলেন কিভাবে? শুভ্র চোখে মুখে গাম্ভীর্য্যের ছাপ এনে বলে, শুনো! আমি ছেলে। আমি মেয়ে না যে আমার একসাথে ৩টা, ৫টা, ৭টা রোজা কাযা হবে। কি লজ্জা! আমি কি বুঝাতে চাইলাম আর ওনি কি বুঝলেন! লজ্জায় চোখ মুখ লালবর্ণ ধারণ করেছে লাবণ্য। আর তাইতো অন্যদিকে তাকিয়েই বলে, ইয়ে মানে আমি এসব বুঝাতে চাইনি। আমি তো বলতে চাইছিলাম…..(……)…..???
– রোজা ভঙ্গের যতগুলো কারণ আছে শুভ্র এবার সেগুলো গড়গড় করে বলা শুরু করল। লাবণ্যর লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার অবস্থা। শুভ্র সেটা লক্ষ করে মিটিমিটি হাসছে আর বলতেছে, এসব কারণের মধ্যে কোনটা আমাদের সাথে আই মিন আমার সাথে হইছে বলো? তাহলে আমার রোজা কেন হবে না?
লাবণ্য এবার তাড়াতাড়ি হাত ধূয়ে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। শুভ্র স্মিতহাস্য পিছু ডাকল, কি হলো? বলে তো যাও আমার রোজা ঠিক কোন কারণে হবে না? লাবণ্য কোনো কথা না বলে চটজলদি সে স্থান পরিত্যাগ করে। খাবারগুলো ঢেকে রেখে উঠে যাচ্ছিল শুভ্র, সামনে বাবার মুখোমুখি হয়। মুচকি হাসি দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে ওর বাবার জবাব, সাবাস ব্যাটা! এভাবেই পিছনে আঠার মতো লেগে থাক। শুভ্র মাথা চুলকিয়ে সে স্থান ত্যাগ করে।

আসরের নামাজের আযান দিয়েছে। সবাই যে যার মত নামাজ আদায় করতে চলে গেল। নামাজ শেষে এদিক ওদিক ভালো ভাবে দেখে লাবণ্য যে রুমে থাকে সে রুমে ঢুকে পরে শুভ্র। ফ্লোরে জায়নামাজ পেতে সেখানে বসেই কুরআন তেলওয়াত করছিল লাবণ্য। শুভ্রকে দেখে কুরআন শরীফটা বন্ধ করে বক্সের ভিতর রেখে দেয়। কাশি দিতে দিতেই দরজার বাহির থেকে রুমের ভিতরে ঢুকে সে। লাবণ্য খাটের একপাশে মাথা নিচু করে বসেছিল, শুভ্র তার ঠিক সামনের সোফায় বসে। একটা কাশি দিয়ে বলে উঠে শুভ্র, তা মিসেস লাবণ্যর রোজা তো আজকে দিনেই মনে হয় ১৭টা পূর্ণ হলো তাই না? লাবণ্য কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে আছে। শুভ্র হেসে বলল, আল্লাহ! আম্মা তোমায় খাওয়ানোর জন্য একটু মিথ্যে বলল, আর তাতেই তুমি খেয়ে উঠলে?! তুমি তো দেখছি ছোট বাচ্চাদের মতই। ছোটবেলায় রোজা রাখতাম বলে মা কত্ত কিছু বলে রোজা ভাঙাতো। বলত যে, খেয়ে নে। একরোজা হয়ে যাবে। ডাক না দিলে না খেয়েই রোজা রাখতাম, আর আম্মা কত কথা যে বলত। সেসব কথা আজকে তোমায়ও বলছে। আর বাচ্চা মেয়ে সেটা বিশ্বাস করে দিনের বেলায় ইফতার করে ফেলেছে। যাকগে, চিন্তা একটা হয়ে গেছে তোমার। হি, হা, হা, হা……..
শুভ্র হাসছে। লাবণ্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে সে হাসির দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে,
ইস! কত সুন্দর করে হেসে, হাসিয়ে অনর্গল কথা বলতেছে। কি করে পারে মানুষ এতসুন্দর করে কথা বলতে? এতই সুন্দর যে সারাজীবন ধরে সে কথা শুনলেও মুগ্ধতার রেশ কাটবে না। এই মুখ, এই হাসি, এই কথায় বিভোর হয়েই তো একদিন ওর প্রেমে মজেছিলাম। তারপর? কি পেলাম আমি বিনিময়ে? লাঞ্চনা-গঞ্চনা আর একবুক বেদনা। লাবণ্যর সুন্দর ফর্সা মুখটা নিমিষেই কালো অন্ধকারের ন্যায় হয়ে যায়। মনে মনে, আমি যে ওর প্রতি দিনকে দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। না, না! এ হতে পারে না। ওর দেওয়া আঘাত, ক্ষত এখনো বুকের ভেতরে তাজা হয়ে রয়ে গেছে। সেই সব ক্ষতের দাগ এখনো শুকাইনি। না, না! আমি এভাবে হেরে যেতে পারি না। ওর প্রতি আমার কোনো মায়া, কোনো টান থাকতে পারে না। লাবণ্য একলাফে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বিড়বিড় করে কি যেন বলে সে রুম ত্যাগ করল।

চোখের পলকে মাহে রমজান বিদায় নিল। আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর। চিরাচয়িত নিয়মে আজও সবার আগে মানে কাকপক্ষী জাগার আগে শুভ্র জেগে যায়। যেহেতু প্রতিবছর ওরা গ্রামে দাদার বাড়িতে ঈদ করে সেহেতু প্রতিযোগীতাটা শুভ্র ওর বোন এবং কাজিনের সাথেই করত। কার আগে কে গোসল করতে পারে সেই প্রতিযোগীতা। প্রচন্ড শীতের মধ্যে কেঁপে কেঁপে গোসল করার মাঝেও আনন্দ আছে, যদি সেটা কোনো উৎসব বিশেষ করে ঈদের জন্য হয়। শীতে রীতিমত কাঁপছিল শুভ্র, তবুও গোসলটা সেরে আসে। সবার আগে গোসল করতে যেয়ে মনে হচ্ছে এতটাই আগে গোসল করে ফেলেছে যে এখনো ফজরের আযান’ই দিচ্ছে না। কাঁপা কাঁপা শরীরে শুভ্র ওর বোন শিশিরকে ডাক দেয়। শিশির ঘুম থেকে উঠে চিৎকার দিয়ে বলে, আজও তুই প্রথম হয়ে গেলি? এ্যাহেেএ্যাএ্যাএ্যা…….
শুভ্র কাঁপা কাঁপা স্বরেই বোনকে ব্যঙ্গালো ব্যা ব্যা……. শিশির রাগে গজগজ করে মাকে গালগাল দিতে দিতে কাজিনদের ডেকে উঠানোর জন্য বাহিরে চলে যায়। শুভ্র ঠিক এ সুযোগটার জন্য’ই ছিল। শিশির রুম থেকে চলে যাওয়ার সাথে সাথে শুভ্র ঐ রুমে প্রবেশ করে দরজা ভিতর থেকে আটকে দেয়। কম্বল গায়ে লাবণ্য তখনো অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ধীর পায়ে শুভ্র বিছানার দিকে এগুতে থাকে। এই মুহূর্ত লাবণ্যর বিছানার একদম পাশে দাঁড়িয়ে শুভ্র। মনে মনে ভাবছে, আমার কি কাজটা করা ঠিক হবে? ও যদি রেগে যায় কিংবা ভুল বুঝে?! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই শুভ্রর দাঁতে দাঁত লেগে যায়। প্রচন্ড শীতে দাঁতের দাঁতের ঘর্ষণে কম্পনের সৃষ্টি হচ্ছে। শুভ্রর শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে গেছে। না, না! আর একমুহূর্তও ভাবতে পারব না। যা হয় হোক। আমি আগে আমাকে বাঁচায়। এই বলে আগেপাছে কিচ্ছু না ভেবেই শুভ্র লাবণ্যর কম্বলের ভিতর ঢুকে যায়।

তারপর…….

চলবে………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here