ভালোবাসার রাত পর্ব ১৫

0
1517

#ভালোবাসার-রাত

#রোকসানা রাহমান

পর্ব (১৫)

রিদ মহাআশংকার হস্তিনস্তি করার জন্য উঠতে নিলেই তিল টেনে ধরে রিদের হাত। রিদ থমকে দাড়াতেই রিদকে টেনে নিজের বেডের উপর ফেলে দিলো। পেটের উপর চেপে বসে নিজের হাত থেকে স্যালাইনের সুইটা খুলে রিদের গলায় ধরে বললো,

“” বিয়ে ক্যানসেলের কথা আরেকবার মুখে আনলে এটা ঢুকিয়ে আপনার গলার কন্ঠ বন্ধ করে দিবো! খুব শক্ত মানুষি দেখানো হচ্ছে?””

তিলের খোলা চুলগুলো তিলের মুখের সামনে এসে ভিড় করছে। রাগে চোখমুখ ফুলে আছে। রিদ তিলকে এমন রুপে এই প্রথম দেখেছে তবুও তার মধ্যে ঘাবড়ানোর কোনো লক্ষন নাই। তিলকে একটা মিস্টি হাসি উপহার দিয়ে নিজের হাত দিয়ে তিলের মুখ থেকে চুলগুলো সরানোর বাহানায় বললো,

“” তুই দেখি ‘র’ বলা শিখে গেছিস,তিল। দেখি আমার নামটা বলতো!””

রিদের এমন কথায় তিল নিমিষেই পানি হয়ে গেলো। মাত্রই যেন একটা অন্য রাজ্যে সে বিরাজ করছিলো। চারপাশটা দেখে নিয়ে নিজেকে রিদের উপর আবিষ্কার করে,তাও রিদের পেটের উপর বসে আছে। হাতে সুই, রিদের দিক তাক করানো। তিলের হাত, পা কাঁপছে। খুব খারাপভাবে কাঁপছে।

“” সলি,লিদ ভাইয়া। আমি আপনাল পেটে কিভাবে আসলাম???””

তিলের ভয়ংকর রুপটা যাকে এক বিন্দু অবাক করতে পারলোনা কিন্তু এই এখনকার পাংশুটে রুপটা রিদকে বেশ অবাকই করছে। শুধু অবাক বললে ভুল হবে তাকে খুবই হতাশ করেছে।

রিদ তিলকে নিজের পেট থেকে সরিয়ে বেশ বিরক্ত নিয়েই বললো,

“” মনে হচ্ছে বিয়েটা ক্যানসেলই করতে হবে””

তিল ফ্যালফ্যাল নয়নে রিদের দিকে তাকিয়ে আছে তাতে রিদের কিছু যায় আসলোনা। যেভাবে হুট করে এসেছিলো ঠিক সেভাবেই হুট করে বেড়িয়ে গেলো।

~~
খাবার টেবিলে সবাই বসে বসে রিদের অপেক্ষায় থাকলেও রিদের আসার কোনো নাম গন্ধ নাই।

“” ছেলেটার যে কি হলো,খাবারের প্রতি এত অবহেলা কেন? দিনে দিনে কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে!””

বড় আম্মুকে আশ্বাস দিয়ে তিল ভাতের প্লেট নিয়ে রিদের রুমের দিকে এগোয়। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলো।

“” ঐখানেই দাড়া,এক পা এগুবি তো তোর পা কেটে রেখে দিবো। সামান্য ‘র’ বলতে পারিস না। আবার আমার জন্য ভাত নিয়ে আসছিস? আগে ‘রিদ’ বলে ডাকবি তারপর খাবো।””
“” এমন কেন কলছেন লিদ ভাইয়া? আমি কি ইচ্ছে কলে….””

তিলের দিকে রিদ তেড়ে এসে বললো,

“” হ্যা,ইচ্ছে করেই এমন করিস। নাহলে সবার সাথে সব ঠিক শুধু আমার কাছে আসলেই তোমার কন্ঠ র তে আটকে যায় না? তোর কন্ঠ ছেচে ফেলতে ইচ্ছে করছে। যা আমার সামনে থেকে বেড়িয়ে যা!””
“” লিদ ভাইয়া,প্লিজ!””
“” থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো একে তো নামটার অপমান করছে আবার সাথে ভাইয়াও ডাকা হচ্ছে। আমি কোনো বোনকে বিয়ে করবোনা। যা বিয়ে ক্যানসেল!””

তিল যেভাবে নিশ্চুপ হয়ে রিদের রুমে ঢুকেছিলো ঠিক সেভাবে বের হয়ে আসছে। কথায় কথায় বিয়ে ক্যানসেল না? আসছে আমার বিয়েওয়ালা করবো না আমি আপনাকে বিয়ে। দেখি তখন আপনি কিভাবে বিয়ে ক্যানসেল করেন। যত্তসব!

তিল ঠাস করে ভাতের প্লেটটা বড় আম্মুর সামনে রাখলো।

“” তোমার ঐ ছেলেকে বলে দিবা তিল এতো বিয়ের জন্য লাফাই না। আমার তো এখনো বিয়ের বয়সই হয়নি। যখন হবে তখন যাকে তাকে করে নিবো। তোমার ঐ বুড়ো ছেলেকে তিল বিয়ে করবেনা। এই আমিও বিয়ে ক্যানসেল করে দিলাম,হুম!””

তিলের দিকে সবাই হা করে তাকিয়ে রইলো। কি হচ্ছে তারা কিছুই বুঝতে পারছেননা। তিল মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে নিজের রুমে চলে গেলো।

আয়নায় দাড়িয়ে তিল বারবার রিদ রিদ বলে প্রাকটিস করে যাচ্ছে। ঠিকই তো এতো বড় দামড়ী মেয়ে হলাম অথচ সামান্য রিদটাই বলতে পারছিনা? এটা কোনো কথা??? তিল সমানে রিদ রিদ বলে চিল্লিয়ে যাচ্ছে! নিজের ফোনটাতে ভয়েস রেকর্ড করেও বারবার প্লে করে দেখছে যে রিদই শুনা যাচ্ছে,একটাবারও সে রিদের জায়গায় লিদ বলছেনা। কিন্তু উনার সামনে গেলেই কেন এমনটা হয়??

তিল ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের ঘোরই সে স্বপ্নের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে।

হঠাৎই রিদের মুখটা ভেসে উঠে,পুরো শরীরে রক্তমাখা, এটা তো সেই ছোট্টকালের রিদ যে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়ে স্কুলে যেতো! সাদা শার্টটাও এমন রক্তে মাখা! চোখভর্তি পানি,ছলছল চোখ নিয়ে তিলের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা হাত তিলের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেন জানি সেখানে নিজেকে দেখতে পারছেনা,তিল। তবে স্পষ্ট বুঝতে পারছে রিদ তিলের দিকেই হাত বাড়িয়ে দিছে তাহলে সেখানে তিল নাই কেন?? ঘুমের ঘোরেই তিল ছটফট করতে করতে নিজেকে খুজতে থাকে। তার রিদ ভাইয়ার হাতটা ধরার জন্য তো তার নিজের হাতের প্রয়োজন! কিন্তু সে নিজেকে দেখতে পারছেনা সেখানে সে হাতটা কই পাবে???

রিদের হাতটা আসতে আসতে শক্তি হারিয়ে ফেলছে। তিলকে ছোয়ার যে তীব্র ইচ্ছে ছিলো সেটা আসতে আসতে অসার হয়ে আসছে। রিদের হাতটা শুন্য থেকে মাটিতে গিয়ে ঠেকছে। রিদের চোখগুলোও বন্ধ হয়ে আসছে। ঠোটদ্বয় বিড়বিড় করে বলছে,,,

“” তুই আমাকে মেরে ফেললি,তিল??””

তিল শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠে,পুরো শরীরে ঘামে নেয়ে ফেলেছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে,মনে হচ্ছে কয়জনম ধরে সে পানির ছোয়া পায়নি।

“” এতো জোরে জোরে কেউ নাক ডাকে? তোর জন্য আমার ঘুম ভেংগে গেলো।””

হঠাৎ এমন কন্ঠ শুনেই তিল বুঝতে পারলো তার পাশে আরেকজন চুপটি মেরে বসে আছে। সে আর কেউ নয় একটু আগে যাকে নিয়ে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছে সে!

তিল রিদের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে অঝোরে কাদতে থাকে। তিলের এমন কান্ডে রিদ থতমত খেয়ে গেলো।

“” তোর নাকের ডাকে ঘুৃম ভাংলো আমার আর কাদছিস তুই?””

রিদের কথায় তিল আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ইচ্ছে করছে নিজের এই মানুষটাকে নিজের বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে যাতে কোনো বিপদের আঁচ লাগতে না পারে।

“” তুই এভাবে জড়িয়ে ধরলে তো আমার এখনি তোকে বিয়ে করে ফেলতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু আমি তো বিয়ে ক্যানসেল করে দিয়েছি,তিল! এখন কি করি বলতো!””
“”আমার খুব ভয় কলছে,একটু জলিয়ে ধলুননা প্লিজ!””

তিলের কন্ঠে এমন কিছু ছিলো যা রিদের দুষ্টুমির ভাবটা কাটিয়ে দিলো। এভাবে সে তিলকে কখনোই কথা বলতে দেখেনি। কি এমন হলো মেয়েটা আমাকে এভাবে জড়িয়ে কাদছে কেন? কোন ভয়ের কথাই বা সে বলছে???

রিদ নিজের হাতদুটো দিয়ে তিলকে আবদ্ধ করে বললো,

“” কি হয়েছে আমার বউটার?? কিসের কান্না কাদছে শুনি?””

রিদের মুখে বউ ডাকটা শুনে নিমিষেই তিলের চোখের পানি শুকিয়ে গেলো। উপরংচ লজ্জায় লাল হয়ে রিদকে ছেড়ে দিতেই রিদ আবার চেপে ধরে বললো,

“” বিয়েটা আজকেই করে ফেলি,কি বলিস? নে কবুল বল!””

একটু আগেও যে মেয়েটা ভয়ে কেঁপে উঠেছিলো সেই মেয়েটাই লজ্জায় কেঁপে উঠছে। তিলের মনে হলো এই কবুল শব্দটাতেই মিশে আছে অসংখ্য রঙের লজ্জা যেগুলো একের পর এক তিলকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। উনি এতো নির্লজ্জ কেন? আমাকে কি লজ্জা দিয়েই মেরে ফেলবে? এতো লজ্জা দিলেতো আমি মরেও আবার জীবীত হয়ে যাবো!

“” কি হলো,কবুল বল!””
“”ইশ! আমি এমনি এমনি কবুল বলবো কেন? দেনমোহর লাগবে!””

রিদ তিলকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে ওর থুতনিতে হাত রাখে। মুখটা উচু করে বললো,

“” আমার এই তুতলি বউয়ের আবার দেনমোহরও চাই?””
“” চাই ই তো!””
“” তা কেমন দেনমোহর শুনি,লাল নাকি নীল,নাকি হলুদ দেনমোহর?””
“” জানিনা। যান তো এখান থেকে।””
“” তাহলে কবুল বলবি কাকে?””
“” যাকে খুশি তাকে!””
“” কিহ!!””

রিদকে একপ্রকার ঠেলেঠুলে পাঠিয়েই তিল আবার বিছানায় এলিয়ে পড়ে। চোখের পাতা এক করলেই বারবার রিদের সেই রক্তমাখা মুখটা ভেসে উঠছে,কানে বারংবার বেজে যাচ্ছে একটা কথাই **তুই আমাকে মেরে ফেললি,তিল??**

আমি কেন উনাকে মারতে যাবো? তিল কিছুতেই ঘুমুতে পারলোনা। সারাটা রাত ছটফটিয়েই পার করে দিলো!

বিয়ের ব্যস্ততা,পরীক্ষার পড়ার ব্যাস্ততা আর রিদের ছোটখাটো শাস্তি নিতে নিতে বিয়ের ডেট খুব কাছেই চলে এসেছে। এদিকে তিল লাল জামা পড়তে পড়তে এই কালারটার প্রতি তার তেতো চলে এসেছে। তাই বিয়ের শাড়ি সে লাল কিনবেনা,রিদের সাথে ঝগড়া করে সে নীলকালারের বেনারশী কিনে নিয়েছে। কেন জানি এখন আর রিদের রক্তবর্ন চোখ তিলকে ভয় পাওয়াতে পারেনা। হয়তো রিদ নিজেই চাইনা তিল তাকে আর ভয় পাক। এবার নাহয় একটু ভালোবাসাই দেওয়া যাক। অনেকতো হয়েছে!

বিয়ে বাড়ি মানেই ব্যস্ততা,মেহমানের আনাগোনা আর গানবাজনা তো আছেই। তার মধ্যেও টাইম করে তিলের পড়াটা আদায় করে নেওয়ার কাজ নিয়েছে রিদ। আজকেও তার অনিয়ম হয়নি। তিলের ইংলিশ খাতায় দুটো রসগোল্লা একে দিয়ে বললো,

“” যা ২০০ বার কান ধরে উঠবোস কর!””
“” কিহ! পালবোনা!””

তিল নাকমুখ কুচকিয়ে না করে দেওয়াতে রিদ যেন আরো বেশি উৎসাহ পেলো। পড়ার সময় তিলের ভুল ধরে শাস্তি দিতে তার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় ছোটবেলার সেই তিলকে পড়াচ্ছে!

রিদ কন্ঠটা একটু শক্ত করে বললো,

“” কি বললি আবার বলতো!””

তিল মনে মনে রিদকে হাজারটা বকা দিতে দিতে কানে হাত দিলো। উঠবস ও শুরু হয়ে গেছে। রিদের বেশ হাসি পাচ্ছে কিন্তু হাসিটাকে আটকে একটু রাগ রাগ হয়েই বললো,

“” মুখটা অমন লাল বানরের মতো করে লাভ নেই। পরীক্ষায় লাড্ডু পাবি পরে আব্বু এসে আমাকে সব দোষ দিবে। তুই তো এই সুযোগ খুজেই বেড়াস,কিভাবে আব্বুর কাছে আমাকে খারাপ বানাবি তাইনা?””
“” আপনাল মাথা! কাল গায়ে হলুুদ অথচ আজকেও আমাকে পলানো হচ্ছে! আপনাল সাথে বিয়ে ক্যানসেল!হুহ!

রিদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিজের ফোনের রিংটোন বেজে উঠে।

“” দাড়া, আমি আগে কথা বলে নেই তারপর আবার শুরু করবি। তুই যে ফুটকি দেখা যাবে একবার উঠবস করে ১০ বার করেছিস বলবি!””

তিল মুখটা ভেংচি কেটে কানে হাত দিয়েই দাড়িয়ে রইলো। রিদ কলটা রিসিভ করে কথা শেষ না করেই তিলকে রেখে বেড়িয়ে পড়লো,

“” কোথায় যাচ্ছেন?””

তিলের কথার উত্তর দেওয়ারও যেন সময় নেই!

চলবে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে