ভবঘুরে পর্বঃ ২২

0
309

ভবঘুরে পর্বঃ ২২
লেখাঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ

বহু জোর-জবরদস্তিতে উরবিকে রাশি রাশি দামি প্রসাধনের বদলে এক চিমটি ‘ফেয়ার এন্ড লাভলি’ মুখে ডলানো গেল। এতেও তার রাজ্যির অস্বস্তি। বসার ঘরে অতিথিরা বসে আছে কনে দেখার অপেক্ষায়। ইশতিয়াক সাহেব আবারো তাড়া দিলে সালমা এসে উরবির কাঁধ ধরে চিরাচরিত ‘কনেদেখা’ কায়দায় নিয়ে এলো তাকে। নিরু-ও এলো পিছুপিছু। সঙ্গে আসা আণ্ডাবাচ্চা-গুলো তখন অস্থির হয়ে সারাবাড়িতে ছুটে ফিরছিল। শুরতে উরবি নিজস্ব ভঙ্গিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। তা দেখে সালমা উরবির কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
– নম্রভাবে হাঁটো উরবি।
জবাবে উরবি একটা বিষদৃষ্টি মামণির দিকে নিক্ষেপ করে নিজেকে যথাসম্ভব বিনয়ীভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করল। সুমুখে বসে থাকা সকলকে সালাম করে সোফার গদিতে বসতেই সে অনুভব করল একজোড়া রিনরিনে দৃষ্টি তার দিকে ড্যাব-ড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে। এই সেই চিকনা জামাই, যে কি না ঢাকা থেকে নাচতে নাচতে কনে দেখতে এসেছে! দেখে মনে হচ্ছে পেটে বোম মারলেও কিছু বের হবে না এর। হালকা-পাতলা শরীরের গড়ন। ছোট ছোট করে ছাঁটা ঘন কালে চুল। অপ্রশস্ত কপালে নিচে বোকাটে দু’টো চোখের পাতা স্থির। উরবি হালকা মাথা উঁচিয়ে এক-নিমেষ অগ্নিঝরা দৃষ্টি ছুঁড়ে লোকটাকে ঝলসে দেবার চেষ্টা চালাল সে। কেল্লাফতে! লোকটা ত্রস্ত- হকচকিয়ে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে আবারো উরবির দিকে তাকাল আড় চোখে। উরবি তখন ভয় দেখান শেষে সযত্নে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। ছেলের মা আদুরে সুরে বলল,
– নাম কী মা তোমার?
আশ্চর্য কাণ্ড! ইন্টারভিউ দিতে এসেছে নাকি সে! চাপা একটা রাগ পুষে রেখে উরবি চোখ তুলে বাবার দিকে ত্যারচা চোখে তাকিয়ে বলল,
– এতক্ষণ কী করলে বাবা? আমার নামটাও বল নাই?
ইশতিয়াক সাহেব মেয়েকে কয়েক নেনো সেকেন্ড চোখ রাঙিয়ে থামিয়ে দিয়ে মহিলার দিকে তাকিয়ে ছদ্ম হেসে বলল,” ঐ যে বলেছিলাম। মেয়েটা একটু দুষ্টু আছে।”
মহিলা অপ্রতিভ চোখেমুখে উল্টো টানে ভাটা পড়ল। কিন্তু তৎক্ষনাৎ সামলে নিয়ে বললেন,
– তোমার বাবা বলেছেন সব। তবুও মেয়ের বলাটা একটা রীতি বা আলাপ শুরু করা পন্থা বলা যায়। তুমি মেয়ে কিন্তু মিষ্টি আছ। একটু বাচ্চামি আছে মনে, বোঝা যাচ্ছে। সেসব ব্যাপার নাহ্। বয়সে কেটে যাবে।
উরবি কিছু না বলে নতমুখে একটুখানি হাসল। এমনটাই তো বলা হয়েছিল। তবুও সে অন্যথা করে বাবার সঙ্গে স্বভাবসুলভ এমন কথা বলে ফেলেছিল৷
উরবির হৃদয়কাড়া মুচকি হাসি দেখে এবার ছেলের বাবা লাফিয়ে উঠে বলল,
– মেয়ে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। মেয়ের হাসি ঝাক্কাস সুন্দর। আমি রাজি৷
এবার মহিলা চক্ষু বিস্ফারিত করে স্বামীকে উরুতে রাম-চিমটি কেটে বলল,
– তুমি রাজী হলে কী? তুমি বিয়ে করছ নাকি? চুপ থাকো।… তিয়াস, তুমি কী বল বাবা? ডোন্ট ওয়রি,টেক ইউর টাইম।
উল্লেখিত তিয়াস এবার লাজুকলতার ন্যায় লজ্জায় নুইয়ে পড়ে বলল,
– তোমরা যা বলো তাই, মা। তোমাদের পছন্দই তো আমার পছন্দ৷
ঘোমটার আড়ালে থেকে উরবির মনে হল, বিনা টিকিটে বাংলা সিনেমা জোর করে গিলানো হচ্ছে তাকে৷ আর সে-ও সেই ছায়াছবির একজন মুখ্য অভিনেত্রী! বিরক্তিকর আলাপ-আলোচনা !
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


ছেলের বাবা অনেক বড় কাজ সিদ্ধি হওয়ার মতোন চিৎকার করে উঠল,
– আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। বিয়েটা কবে হচ্ছে তাহলে?
উরবি নিজের চোখে সর্ষে ফুল দেখল। সিনেমার মূল সিনটাই যে ‘স্কিপ’ করা হচ্ছে সেটা কি কারো খেয়ালে নেই! নিরুটা করছে কি খাম্বার মতো আড়ালে দাঁড়িয়ে। তিক্ত চোখে একবার আড়ালে নিরুর অবস্থান দেখে নিয়ে সে নিজেই নির্লজ্জের মতো সেই মূল সিনটার কথা মনে করিয়ে দিল,
– আসলে… আমি ওনার সঙ্গে আলাদা কিছু কথা বলতে চাই।
ছেলের মা এবার আহ্লাদে ফুটকড়াই হয়ে নিজের ডায়লগটা পেশ করল,
– ‘এ তো খুব ভালো কথা। আমিতো আরো ভেবেছিলাম পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, ওসব করতে লজ্জা পাবে। এখন মনে পড়ল তুমিতো চিরকাল ঢাকাতে থেকে এসেছ। বড় হও মা। বড় হও। যা তিয়াস, যা…।’ মহিলা একপ্রকার ছেলেকে ঠেলে-ঠুলে উরবির পিছুপিছু পাঠালেন। তিয়াস বাবাজি লজ্জায় একসা হয়ে মৃদুপদে উরবিকে অনুসরণ করে গেল। কিন্তু উরবি ঘরের কোথাও একদণ্ড স্থির না হয়ে ঘুরেফিরে সোজা আমবাগানের দিকে চলল। বাইরে বেরিয়ে সে ঘোমটাটা ফেলে আঁচলটা কোমরে গুঁজে নিজস্ব কায়দায় গটগট করে হাঁটা ধরল। শেষমেশ আমবাগানের মাঝখানে গিয়ে থামল। তিয়াস নামে ছেলেটা তখন উরবির সঙ্গে ব্যালান্স রেখে পাশাপাশি হাঁটছিল আর দেখছিল এলোমেলো চরিত্রের মুগ্ধকরা চঞ্চল মেয়েটাকে। প্রথম দেখাতেই মনে ধরেছে তার। উরবি কোমরে হাত দিয়ে আমগাছের মগডালে একটা আমের দিকে তাকিয়ে তিয়াসকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– শুনেন, ঐ আমটা পেরে দিতে পারলে আমি আপনাকে চোখ বন্ধ করে বিয়ে করব। ধরেন একটা চুক্তি হয়ে গেল। আমটা আপনি পাড়তে পারলেই আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে। শ্বশুর বাড়িতেই ফুলশয্যা। হাঃহাঃ। খেলাটা দারুণ না? ইউনিক একদম।
তিয়াসের আত্মসংযম যথেষ্ট। একে তো মেয়েদের সঙ্গ দেওয়া তার খুব একটা হয়নি তারওপর আজ তার মেয়েটার অদ্ভুত আচরণে নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। সে মুখে হাত দিয়ে একটু কেশে প্রাণপণে নিজের লাজুকতা ঝেড়ে নিয়ে বলল,
– ফুলশয্যা নাকি কণ্টকশয্যা হবে বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, আপনি কি এমনই? মানে,একটু দুরন্ত টাইপের?
– কখনো কখনো তাই মনে হয়। কিন্তু আমার ইচ্ছে আমি ভয়ংকর রকমের গম্ভীর মানুষ হব। কিন্তু পারি না। গম্ভীর মানুষদের আমার ভালো লাগে।
– কারণ?
উরবি চোখ উল্টিয়ে ভাবাতুর গলায় বলল
– কারণ, গম্ভীর মানুষেরা ব্যাক্তিত্ববান হয়।
তিয়াস একটু হেসে বলল,
– ব্যাক্তিত্ববান হওয়ার জন্য গম্ভীর হওয়া জরুরি নয়। আপনি দুরন্ত স্বভাবের হয়েও কিন্তু আপনার দুরন্তপনায় ব্যাক্তিত্বের ছাপ রাখতে পারেন।
– ‘তা ঠিক। আচ্ছা, আপনি তো আর-জে হতে পারতেন৷ আপনার ভয়েজ সাংঘাতিক সুন্দর।’
উরবি বরাবরই ঠোঁটকাটা স্বভাবের মেয়ে। তিয়াসের কণ্ঠের স্তবগান মোটেও বাড়াবাড়ি নয়। কিন্তু কথাটা বলার পরই তিয়াসের মুখভঙ্গি দেখে সে বুঝতে পারল,ছেলে জাতের অতো সহজে প্রশংসা করতে নেই। দুঃখের বিষয় হল, এদেশে ছেলেদের সঙ্গে একটু হেসে কথা বললেই তারা ধরে নেয় যে মেয়েটা তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে;আর মেয়েদেখার ব্যাপারে ছেলের কিঞ্চিৎ প্রশংসা মুখ ফসকে বেরোলেই ছেলেপক্ষ ধরে নেয় কাম ফিনিস!,মেয়ে রাজি!
নিজের প্রশংসা শুনে তিয়াস মুখে অদ্ভুত একটা ভঙ্গি ফুটিয়ে বলল,
– আমার ইচ্ছে ছিল,মায়ের ছিল না। ছেলে সারাদিন মাইক্রোফোন সামনে বকরবকর করে টাকা কামাবে এটা নাকি তিনি দেখতে পারতেন না।
– ভালো হইছে, আপনি তাহলে খেলাটা খেলবেন না? ভয় পাইছেন? গাছে উঠতে গিয়ে প্যান্ট ছিঁড়ে যাবে বলে? হাঃ হাঃ ভিতু।
একদফা হেসে নিল উরবি।
তিয়াসের মুখ থেকে আত্মশ্লাঘার দর্পটা একটু ম্লান হল। সে মিনমিন করে বলল,
– না,আপনি তো জানেন আমি শহরে বড় হয়েছি। গাছে তো উঠতে পারি না। নাহলে…
উরবি পাঁচ আঙুল তুলে হেয় করার ঢংয়ে বলল,
– হয়েছে, আপনি ঘড়িতে টাইম ধরেন। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে আম আপনার হাতে হাজির। কিন্তু…, কিন্তু শাড়ি পেঁচিয়ে গাছ থেকে পড়ে গেলে আপনার দোষ।
বলে উরবি পরনের শাড়িটা আরো টানটান করে কোমরে গুঁজে এক লাফে গাছে চড়ে গেল। কাঠবিড়ালির মতো দ্রুত বেয়ে বেয়ে উঠে টুক করে আমটা ছিঁড়ে নিয়ে নিচে নেমে এল যথাসময়ে। তার হাঁপ ধরে গেলেও নিজের মান রক্ষার্থে প্রাণপণে নিঃশ্বাস চেপে ধরে রাখল সে। তিয়াসের হাতটা তুলে নিয়ে সে আমরা চেপে দিয়ে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত বাতাস ছেড়ে দিয়ে বলল,
– কী বুঝলেন?
– বুঝেছি আপনি জংলীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নন।
অকারণে উরবির মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটল। ঘাড় কাত করে বাঁকা চোখে আঙুল তুলে বলল,
– তাহলে কি আপনার সঙ্গে আমার যায়? আমার চাই জংলী জামাই আপনি জংলী হতে পারবেন আমার জন্য? বনে গিয়ে বাস করব…
তিয়াস একটু উদাস ভঙ্গিতে বুকে হাত গুঁজে বলল,
– সুযোগ দিলে হওয়া যায়।
উরবি সামনে ঝুঁকে থাপ্পড় মারার ভঙ্গিতে বলল,
– একটা চটকানা মারব ধরে। আমার সঙ্গে থাকলে যে আপনাকে রাতদিন দৌড়ের ওপর রাখব সেটা আপনি বুঝতে পারছেন না?
তিয়াস আগের মতোই নির্ভার,
– সমস্যা নেই,বিয়ের একবছর পর থেকে যখন একের পর এক বাচ্চাকাচ্চা আসতে থাকবে তখন তাদের যন্ত্রণায় আপনাআপনি স্থির হয়ে যাবেন।
উরবি নাস্তানাবুদ। এই ছেলেকে যত সহজে পিষে দেওয়া যাবে ভাবা হয়েছে ততটা মসৃণ আর মোলায়েম লোকটা নয়। বরঞ্চ একটু ত্যাড়া টাইপের। কী করা, কী করা যায় ভাবতে ভাবতে উরবি নিজের ঘাড় চুলকাল অন্যমনস্ক হয়ে।
তিয়াস এবার একটু ধাক্কা মেরে হেসে বলল,
– আপনি বিয়ে করবেন না বললেই হতো। ঠিক আছে, চিন্তা নেই। বিয়ে করতে হবে না। এই বিষয় আর এগোবে না।
উরবি কিছুক্ষণ স্তম্ভিত-অধোমুখে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের উছলে পড়া উল্লাস চাপা দিয়ে বলল,
– থ্যাংক্স, কিন্তু আমি চাইলেই কি আমার মতো মেয়েকে আপনি বিয়ে করতেন?
তিয়াস পেঁচিয়ে হেসে বলল,
– কঠিন হয়ে যেতো। কিন্তু হয়তো মানিয়েও নিতে পারতাম, আমি জীবনে এই প্রথম এতো ফ্রিলি আর নিঃসংকোচে কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বললাম।…আসুন। আর আমবাগানে কাজ নেই।
তিয়াস হাঁটা ধরল। উরবিও পেছন পেছন মনের দোদুল্যমান মঞ্চে সুখের দুন্দুভি বাজাতে বাজাতে পুরো আম্রকানন মুখরিত করে তুলল।

উরবির এই সম্মন্ধটা টুটে গেল আপনিই। কেউ এটা নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করল না বরং দ্রুত নতুন পাত্র দেখার জন্য উঠে পড়ে লাগল। ইশতিয়াক সাহেত পারতপক্ষে মেয়েকে বাড়ির বাইরে যেতে দেন না। একবার গিয়েই একটা গন্ডগোল পাকিয়ে ফিরেছিল সে। কোন্ লোক যেন তাকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়েছিল এবং পাশের সঙ্গীর সঙ্গে তাকে নিয়ে বাজে আলাপচারিতা করেছিল। শুনেই উরবি জোয়ান ছেলেটাকে জনসম্মুখে ঠাস ঠাস করে দু’টো চড় কষে দিয়েছিল এবং হুমকি দিয়ে এসেছিল এরপর থেকে যে-ই তার নামে বদনাম রটাবে তার নামে নারী নির্যাতন মামলা করবে। ভিত্তিহীন কথাও নয় বটে। নারী নির্যাতনের মিথ্যে মামলায় নির্দোষ লোককে বছরের পর বছর চৌদ্দ শিকের ভেতর পঁচতে দেখেছে গ্রামের লোকজন। অকুস্থল থেকে উরবি ফিরতেই কয়েকজন কোরাস মন্তব্য করল, এই মেয়ের দ্বারা সব হতে পারে। সুতরাং সাবধান, খাল কেটে কুমির আনার দরকার নেই। বলা বাহুল্য, উরবিকে আড়ালে লোকেরা ভয় পেলেও তার নামে মিথ্যে চুগলি থেমে নেই একটি দিনের জন্যও। পরনিন্দা করে যে মজার পসরা জমা হয় সেটা কমবেশি কেউ ছাড় দিতো চায় না।
…………………………………

– ‘কাল আপনাদের এলাকায় নতুন কিছু হতে যাচ্ছে। লাশের মিছিল আর মাদবদ্রব্যের পাহাড় বেরিয়ে আসবে।’ উরবির থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে কংক্রিটের ঘাটে বসতে বসতে বলল আবিদ। ভর সন্ধ্যাবেলায় পুকুরঘাটে মুখহাত ধুতে এসেছিল সে। অকস্মাৎ ভূতগ্রস্তের মতো উরবিকে দেখে সে একটুখামি থমকে দাঁড়ালে উরবি মিনতির স্বরে বলেছিল, “আমার পাশে একটু বসবেন?” আবদারটা নিছক অমূলক আর ফেলনা হলেও আবিদ কেন জানি ফেলে দিতে না পেরে বসে পরিবেশ স্বভাবিক করতে উপরোক্ত কথাটি বলল। শুনে উরবি তড়িৎ-চমকে বলল,
– সেকি লাশ কেন?
– ‘হ্যাঁ, কথা ছিল যারা যারা বড় মাথাওয়ালা মানুষ তাদের সম্মান রক্ষার্থে আলাদা আলাদা ক্রসফায়ার করা হবে। ছিঁচকে গেঁজেলদের সঙ্গে তারা মরবে এটা কেমন দেখায় বলুন। কিন্তু গুপ্তচরের দ্বারা খবর পাওয়া গেছে যে কাল সবাই একত্র হয়ে সেই আস্তানায় মিটিং বসবে। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাবে র‌্যাব।
– ‘ওহহ আচ্ছা। আপনিও মানুষ মারবেন?’ উরবির কণ্ঠে উচাটন।
আবিদ বলল,
– খারাপ মানুষদের মারতে ক্ষতি কী? সুযোগ পেলে মারতাম। কিন্তু আমার অনুমতি নেই। জানেনই সব। তবে প্রয়োজনে দুয়েকটা কাত হলেও হতে পারে।
সন্ধ্যার আবছা মায়াবী আলোতে আচ্ছাদিত সমগ্র পুকুর পাড়। নির্মেঘ আকাশে চাঁদ নেই। সঙ্গীহীন সন্ধ্যাতারাটা অন্ধকার ঘরে এক টুকরো আলোর সলতের মতোন মিটমিট করে জ্বলছে৷ আর তারই পাশে নিজুত্ তারারা সন্ধ্যাতারাকে ঘিরে অনুসরণ করে ধিকিধিকি আলো বিকোচ্ছে। যেন আকাশটা পুরো একটু সমৃদ্ধ প্রাচীন গ্রাম আর অগণিত তারকারাজি প্রতিটি গ্রামবাসীর ঘরের প্রদীপ। আর সন্ধ্যাতারা? সে গ্রামের জমিদারের ঘরের অত্যুজ্জ্বল প্রদীপ। বাতাসে আবিদের গায়ের মিষ্টি গন্ধ এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল উরবির নাকে। উরবি বুকভরে নিঃশ্বাস নিয়ে অনেক্ষণ পর কি যেন ভেব বলল,
– ওহ আচ্ছা, ঠিক আছে। সাবধানে সব করবেন।
আবিদ মুখের ভিতর ‘হুম’ শব্দ করে বলবে বলবে করে কথাটা বলেই ফেলল,
– দুইদিন ধরে আপনার ভিতর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সম্মন্ধ ভেঙে গেছে বলে আফসেট?
অন্যদিন হলে উরবির ছ্যাঁৎ করে জ্বলে উঠতো। কিন্তু আজ সে নিরুত্তেজ হয়ে ভাবল, লোকটা তার মতিগতির পরিবর্তন লক্ষ্য করছে? এও সম্ভব? তবুও কেন বারবার তার অবচেতন মন আবিদের প্রতি অনুভূতিটা অস্বীকার করে যাচ্ছে? ঠুনকো অনুভূতিকে পায়ের তলায় পিষ্ট করে দেওয়ার বুলি কপচায় মন? মনটা তার এমন খাপছাড়া কেন? উরবি কথা বলতে পারল না। বদলে অলৌকিক ইন্দ্রজালে দূরত্ব কমিয়ে আবিদের গা ঘেঁষে বসল সে। আবিদ দূরে সরে বসতে গিয়েও পাথরের মূর্তির ন্যায় স্থবির হয়ে রইল সে। তার মনে পড়ে গেল সেই নিশুতির স্বপ্নের কথা। এই পুকুরঘাটেই তো এসেছিল আদিবা। অনেক কথাবার্তা হয়েছে তাদের। আদিবা কি আবারো এলো? সেদিনের এলোমেলো কথাগুলোর ইতি টেনে একটা সুরাহা করতে? মাথাটা কেমন ঝিম ধরে গেল আবিদের। চুলের ডগা হতে পায়ের পাতা পর্যন্ত অসাড় হয়ে এলো তার। শুধু বাঁ হাতটা সচল হয়ে উরবির ডান কাঁধে গিয়ে পৌঁছুল এবং ধীরে ধীরে নিজের বলিষ্ঠ বুকের ‘পরে ঠেকাল উরবির মাথাটা। জীবনে এই প্রথম উরবি আবিদকে জাপটে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল৷ উরবির চোখের জলের ভীষণ বর্ষণে যেন কর্ণফুলীর বাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে দিল গ্রামের পর গ্রাম —আবিদের বক্ষতট…! উরবি আছে বিষম ঘোরে। শক্ত মেয়েটা যেন ঘুরেধরা চৌকাঠের মতো ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ল আবিদের অপার্থিব স্পর্শে। এরপরও কি সে অস্বীকার করতে পারবে? আবিদই-বা নাহয় প্রয়াত স্ত্রীর স্বপ্নের কথা ভেবে এই আচরণ করেছে,কিন্তু উরবি? জানা নেই! জানা নেই! বলবে না উরবি। আবারো অস্বীকার করবে। কাঁদতে কাঁদতে উরবির হেঁচকি উঠে গেল। তাও বুদ্ধি হবার পর এই প্রথম! আবিদ ওর নরম চুলে পরম বাৎসল্যে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিশ্চল কণ্ঠে বলল,
– কেঁদো না আদিবা। তোমার কান্না সহ্য হয় না আমার। দেখো, আমার পাষাণ হৃদয়ও গলে যাচ্ছে বরফের মতোন। কেঁদো না…
আদিবার নাম শুনে উরবি সচকিত হয়ে সংবিৎশক্তি ফিরে পেল এবার। ওর চমকের দমকে আবিদ হালকা ধাক্কা খেল। পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে এক ধাক্কায় নিজের বুক থেকে দূরে ঠেলে দিল উরবিকে।
উরবি ক্ষীণ আর্তনাদে ঘাটলার সিঁড়ির ওপর আছড়ে পড়ল। সন্ধ্যার আঁধার গাঢ় হয়েছে তখন। উরবি সেভাবে কয়েক সেকেন্ড বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ে থেকে একসময় দ্রুতবেগে উঠে দাঁড়াল। এরপর আঁধার ফুঁড়ে একপলক আবিদের দিকে তাকিয়ে অশরীরীর মতোন হেঁটে প্রস্থান করল সেখান থেকে। ওর চলে যাওয়া দেখে আবিদ প্রকৃতিস্থ হয়ে ডাকল পেছন থেকে,
– উরবি, শুনে যাও।…উরবি।
উরবির কোনো ভাবান্তর হল না। শুনল বলেও মনে হলো না। তেমনি অপ্রকৃতস্থের মতোন ধীরলয়ে হেঁটে আমবাগানের গভীরে প্রবেশ করল৷ আবিদ সেখানে দুই করতলে মুখ ঢেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্তের মতো বসে রইল। মনে মনে সে পুনরায় আদিবার আগমন প্রার্থনা করতে লাগল। একটা সুরাহা তার চা-ই চা-ই।

চলবে….
আগামী কাল মিশন। সবাই প্রস্তুত হোন।