বড় কুটুম

0
356

একান্নবর্তী পরিবারে নাকি মানুষ সুখ খুঁজে পায়না আজকাল। সবার চাই আলাদা আলাদা সংসার। আমার দাদার হালি দুয়েক ছেলেমেয়ে আর বড় একটা বাড়ি থাকার কারণে উনি একান্নবর্তী পরিবারের সুন্দর নিয়মটি বজায় রাখতে পেরেছিলেন। দাদার পরে সংসারের হাল ধরেন বড় চাচ্চু। তারপরে আমার আব্বু।

আমাদের বাড়ি এই ছিলো ওই ছিলো, কী ছিলো এসব বলে লাভ নেই। আমাদের বাড়িতে অতীতেও সুখ ছিলো। এখনো আছে ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের বাড়ির চারপাশে প্রচুর গাছ। সফেদা থেকে শুরু করে তেজপাতা এমনকি দারচিনি গাছ ও আছে। মধ্যবিত্তের অহংকার হিসেবে আমাদের বাড়িতে প্রচুর আমগাছ ছিলো। বাড়িতে দালানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেক গাছকেই বিদায় নিতে হয়েছে।

গোলাপজাম ও জামরুল গাছের পার্থক্য আমি জানি ছেলেবেলা থেকেই। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে গাছ
বাগান আর পরিবারের সবাইকে ঘিরে । ছোটবেলায় দেখতাম শীতকালে আমাদের বাড়িতে ছোট মিনি ট্রাক নিয়ে কয়েকজন লোক আসতো। উনাদের সাথে থাকতো মুড়ি, চালের গুড়া, আতপ চাল, পোলাউয়ের চাল। খিঁচুড়ি খাবার আলাদা চাল, কলাপাতা দিয়ে সতেজ রাখা কলসি ভর্তি দুধ। হাঁসের ডিম, জ্যান্ত হাঁস।

উনারা আসলে আমাদের বাড়িতে সাড়া পরে যেতো। পিঠা বানানোর। ভুনা গরুর মাংসের সাথে চিতই পিঠা খাওয়ার। ফুপু ফুপা, বোন দুলাভাই, ভাই ভাবিরা আসতেন। রাতে উনারা কোমড়ের খুঁট থেকে বের করতেন টাকা।

আব্বা টাকা গুনতেন আম্মার কাজ ছিলো লেখা। বড় আম্মা টাকা ভাগ করে করে আলাদা রাখতেন। রাতেই সবার টাকা দেয়া হয়ে যেতো। বর্গাদারেরা সিনেমা হলে গিয়ে রাতে সিনেমা দেখতেন। খুব ভোরে তারা রাতে বানানো পিঠা খেয়ে চলে যেতেন। শীতের দিন, পরীক্ষা শেষ। তাই আমাদের আরো কিছুদিন বাড়িতে থাকার অনুমতি মিলতো।

আমরা বড় হয়েছি বিশাল পাতিলে রান্না করা ভাত খেয়ে। এই অবস্থা ঢাকা শহরেও আমার বাবা বিদ্যমান রেখেছেন। আমাদের বাসায় রান্না হয়। পাঁচতালায় চাচাতো বোন বা পাশের ফ্লাটে ভাবিকে আজকে কী রান্না হবে, এই নিয়ে এখনো মাথা ঘামাতে হয়না।

আমাদের জমি ভাগ হয়েছে গত চার বছর আগে। মোটামুটি সম্পত্তি ভাগ করার পরে দেখা গেলো। আমাদের ভাগে যে টুকু জমি তা দিয়ে আমাদের বড়লোকি হালে না হলেও মোটামুটি চলে যাবে।

কিন্তু বিপাকে পড়লেন আব্বু । উনিতো ইচ্ছে করলেই হাঁড়ি ছোট করতে পারেননা। সংসারে লোক বাড়লেও আয় বাড়েনি মোটেই। তবুও শিব রাত্তির সলতের মতো ঐতিহ্য গুলো যে করেই হোক উনি ধরে রাখলেন।

এখনো পিঠা উৎসব হয় আমাদের বাড়িতে। শীতের রাতে সভা হয়। আলেমরা আসেন। ইসলামি আলোচনা করেন। সেই উপলক্ষে আমাদের এলাকায় ছোটখাটো মেলা হয়। মেইন শহরে বাড়ি হওয়া সত্বেও আব্বু যেনো কীভাবে এসব ম্যানেজ করে ফেলেন। আমরা বড়দের কাছ থেকে সালামি পাই। বড় বড় পাঁপর আর গরম জেলাপি খাওয়া চলে রাতভর। মাঝরাতে মোনাজাত শেষে তবারক বিলানো হয়। কেউ ঘুমে কাঁদা হয়ে গেলেও তাকে ডেকে তোলা হয় মোনাজাত ধরার জন্য সে ঘুমের মাঝেই হয়তো বলে বসে। ‘আচ্ছা তবারক কী দেয়া শেষ? ‘

এগুলোই আমার জীবন। আমার সম্পদ বলতে এগুলোই। এবারে বাড়িতে যাওয়ার পরে বর্গাদারেরা এলেন। এই প্রথম তারা বাসে এলেন। আমার পাঁচ ফুপু এক চাচা জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। তাদের নাকি এসব ঝামেলা ভালো লাগেনা। বংশ পরম্পরায় প্রতাপদীঘির পাড়ে যে একদাগে জমিগুলো তারা চাষ করতো সেগুলো এখন সুতার মিল হয়ে গেছে। আমার বড় চাচ্চু আর আব্বার জমির টাকা নিয়ে তারা এসেছে। সংগে প্লাস্টিকের বোতলে করে দুধ। একটা বাজারের ব্যাগে পলিথিনে পাঁচ সাত কেজি চাউলের গুড়া। বর্গাদার টাকা বের করতে গিয়ে চাদরের কোণায় চোখ মুছলো।

আব্বু ঠিক আগের মতো তাদের সমাদর করলেন।
আম্মা অনেক কিছু রান্না করলেন। উনারা খেয়েই
চলে গেলেন। আব্বু বললেন রাতটা থেকে যাও দুলাল!
দুলাল চাচা রাজি হলেন না। যাওয়ার সময় বলে গেলেন তোমরা দু’বোন আলাদা হয়োনা। আমরা তিন পুরুষ তোমাদের বর্গাদার। আমরা জান দিয়ে তোমাদের জমি আগলে রাখবো। আমার পরে আমার ছেলে রাখবে। তোমরা হচ্ছো আমাদের ‘মহাজন।’

এতো বছর পরে আজ বুঝতে পারলাম আমার দাদা কেনো তাদের ‘বড় কুটুম’ ডাকতেন। তারা এলে কেনো
আমাদের বাড়িতে উৎসব লেগে যেতো।

আমি চাঁদ জাগা রাতে একজন বড় মনের মানুষের হেঁটে চলে যাওয়া দেখলাম। জানিনা ভবিষ্যতে কী হবে। তবু পার্থনা এই মানুষগুলোর জন্য যারা নিজের জান দিয়ে আমাদের জমিতে ফসল ফলায়। তার ভাগ আমাদের ঘরে এনে দিয়ে যায়। আমাদের আর একটু সুখে থাকার ব্যবস্থা করে। বহু কিছু ভেবেই দাদা হয়তো তাদের নাম দিয়েছিলেন ‘বড় কুটুম। ‘

#আদৃতা মেহজাবিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here