ব্যস্ততা। ৩য়_অন্তিম_পর্ব।

0
1602

ব্যস্ততা। ৩য়_অন্তিম_পর্ব।

#লেখা_আরজুমান_তাশা।(আরু)

৩.

অভি যদি সেদিন ছাদে ইরার গায়ে হাত দিয়ে দেখতো তাহলে বুঝতে পারতো ইরার শরীরটা কতোটা উত্তাপে ছিলো। ইরা আজ তিনদিন ধরে বিছানা থেকে উঠতেই পারছেনা। জ্বরে সারা শরীর পুরে যাচ্ছে। অভির উপর রাগ অভিমান করে ডাক্তার অবধি দেখাচ্ছেনা। কিছুক্ষন থেমে থেমে অঝোর দ্বারাতে কান্না করছে। আর বিড়বিড় করে বলছে অভি, মুক্ত করে দিবো তোমাকে একে বারের জন্য। ইরার এমন অবস্থা দেখে তার মা বাবা অনেক ভয়ে আর টেনশনে আছে। এদিকে অভিকে অনেক গুলো কল দেওয়া হয়েছে কিন্তু অভি একটা কল অবধি ধরছেনা। সবাই টেনশনে পরে গিয়েছে। ইরা একটা খাবারের ধানা মুখে নিচ্ছেনা নিজেকে তিলতিল করে শেষ করে দিতে চাই সে। মৃত্যুর দিকে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে একটু একটু করে। অভি ছাড়া ইরার জীবনটা ইরার কাছে অচল মনে হচ্ছে।সেদিন অভিকে দেখে অনেক খুশি হয়েছিলো ইরা। যদি আরেকবার অভি জোড় করতো ইরা ঠিকই চলে যেতো অভির সাথে। কিন্তু,অভি তা না করে রাগ দেখিয়ে চলে গেলো।

অভি সেদিন সকালে ইরাকে নিয়ে যাবে বলছি ভাগ্যক্রমে সেদিন অভিকে অফিসের কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়।হাজার চেয়েও আর যেতে পারেনি। কিন্তু হাজার ব্যস্ততার মধ্যে বারবার ইরার কথা মনে পড়ছে। ভিতর টা অস্থিরতায় ভরে গেছে।

এই কয়েকদিনে সেই অভি আর অভি নেই। চোখের নিচে কালো দাগ, চুলগুলো উস্কোখুস্কো এলোমেলো হয়ে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে নিজের প্রতি কতটা অবহেলা করছে সে। কোথায় কি, কে কি বলছে তার দিকে অভির কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কাজ নিয়ে সিরিয়াস থাকা অভির এখন কাজের দিকে কোন মন নেই। আজকে সে যাবে ইরাকে নিয়ে আসছে, মন মরা হয়ে বসে অভি কথাটা চিন্তা করছে তার অফিসে, ঠিক তখনি শাওনের প্রবেশ।

-অভি?

সাড়াশব্দ নেই কোন অভির।

-অভিইইইই?

-হ্যা! আরেহ তুই কবে আসলি?

-এইতো একটু আগে।

-ওহ আই বস।

-তুর একি অবস্থা করে রেখেছিস বলতো? কি হাল করেছিস তুই নিজের!

-ঠিক আছি আমি। তা তুই হঠাৎ আমার অফিসে!?

-তুকে হাজার বার কল দিয়েছি ফোন ধরছিস না। ঠিক আছিস কিনা তা দেখার জন্য বাসায় গিয়েছিলাম বোয়া বললো তুই অফিসে তাই অফিসে চলে আসলাম।

-অহ হো সরি ফোন তো বাসায় রেখে এসেছি রে। ভুলে গেছি ফোনের কথা।

-অহ।

-বল কি হয়েছে?

-প্রীতি আমায় কল দিয়েছে। তোকে নাকি অনেক বার কল দিয়েছে পায়নি। আমার কাছে জানতে চাইলো তুই কই সেটা। তুর সাথে আমার কথা হলে আর্জেন্ট কল দিতে বলছে।

শাওনের কথা শুনে অভি টেনশনে পরে যায়। অভি শাওন কে বলে যাতে প্রীতি কে কল দেয়। আর শাওন তাই করে। প্রীতিকে কল দেয়।

-হ্যালো প্রীতি নাও অভির সাথে কথা বলো।
-হ্যালো ভাইয়া? কি হয়েছে আপনার কল ধরছিলেন না কেনো?

-আসলে প্রীতি ভুলে ফোনটা বাসায় রেখে এসেছি। বলো কি জেনো বলবে।

-ভাইয়া আপনি তাড়াতাড়ি আমাদের বাসায় চলে আসুন। আপুউউউউ (আর বলতে পারলোনা প্রীতি ডুগরে কেঁদে উঠে।)

-কি হয়েছে তোমার আপুর? (অনেকটা ঘাবড়ে যায় অভি।)

-ভাইয়া, আপু। (কেঁদেইই চলছে প্রীতি)

-প্রীতি কান্না থামিয়ে বলো ইরার কি হয়েছে?

-আপনি জলদি আমাদের বাসায় চলে আসুন।আপনি না আসলে আপুকে বাচানো যাবেনা।

এই বলে প্রীতি কল কেটে দেয়।

অভি এই মুহূর্তে কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা। টেনশনে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে অভির ইরার চিন্তায়।

শাওন চল জলদি আমার সাথে ইরাদের বাসায়।
-কি হয়েছে?
-এতো কিছু বলার সময় নেই এখন জলদি চল।

অভি কিভাবে ইরাদের বাসায় পৌছালো অভি হয়তো নিজেও জানেনা। বাসায় পৌছে দেখে ইরা অবচেতন অবস্থায় বিছানায় পরে আছে আর পাশে ইরার মা, বাবা কাঁদছে। আর পাশে দাঁড়িয়ে প্রীতি কান্না করছে। সবার কান্না দেখে অভির বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠে।

-ইরা,এই ইরা।

ইরাকে ডেকেই চলছে অভি৷ ইরার গায়ে স্পর্শ করতেই অভির হাতটা জেনো পুড়ে গেলো।

-ইরার এতো জ্বর আর আপনারা ওকে এভাবে ফেলে রেখেছেন?

-কি করবো মেয়েটা আমার বড্ড জেদি আর অভিমানী তোমার উপর অভিমান নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, ডাক্তার দেখাচ্ছেনা। বাসায় ও ডাক্তার কে আসতে দিচ্ছেনা

তুমি কিছু করো অভি। (মা)

-শাওন তুই গাড়িতে গিয়ে বস আমি ইরা কে নিয়ে আসছি। জলদি যা।

-আই তুই ইরাকে নিয়ে।

শাওন গাড়ি চালাচ্ছে আর অভি ইরাকে নিয়ে পিছনের সিটে বসে। ইরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শুধু একটা কথায় বলছে অভি। সরি ইরা, আমার জন্যই তোমার এই অবস্থা। ?ভির চোখ চলচল করছে আর বুকের বাম পাশে ব্যথা অনূভব করছে। বুকের সাথে শক্ত করে ইরাকে চেপে ধরে অভি। কষ্টে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে অভির। নিজেকে বড্ড অপরাধী লাগছে নিজেকে আজ নিজের কাছে। শান্ত হচ্ছেনা কোন ভাবেই অভির মনটা। চোখ বেয়ে আপনা আপনি জল গড়িয়ে পড়তে থাকে অভির। পারছেনা শুধু চিৎকার দিয়ে কান্না করতে। কি হাল করে ফেলেছে মেয়েটার । নিজের ব্যস্ততা আর অবহেলার ফল হিসেবে আজ সে নিজের ভালোবাসার মানুষ টা কে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলো। ইরার কিছু হয়ে গেলে অভি নিজেকে কোন দিন ও ক্ষমা করতে পারবেনা।

ইরাকে ICU তে ভর্তি করা হয় অবস্থা বেগতিক। স্যালাইন লাগানো,অক্সিজেন দেওয়া অবস্থায় ইরা।

আজ দুইদিন পর ইরা আস্তে আস্তে করে চোখ খুলে। চোখ খুলতে ওর খুব কস্ট হচ্ছে। শরীর অবশ প্রায় বলতে গেলে। বা হাতটা নাড়তে গিয়ে অনুভব করে কেউ তার হাতটা ধরে আছে। পাশ ফিরতেই দেখে অভি ইরার হাতটা ধরে ঘুমাচ্ছে। অভিকে দেখে ইরার চোখ ছলছল করছে। ইচ্ছে করছে অভির মাথায় হাত ভুলিয়ে দিতে। কিন্তু পারছেনা। ইরা একটু নড়ে উঠলে অভি জেগে উঠে।

-আস্তে, কিছু লাগবে।

-নাহ।

ইরার হাতটা শক্ত করে ধরে মাথা নিচু করে অভি

-I am sorry Ira।

-it’s okkkk। (শুকনো একটা হাসি দিয়ে)

-ইরা প্লিজ তুমি আমায় ক্ষমা করে দাও। আই প্রমিস তুমি যেভাবে চাইবে আমি সেভাবেই চলবো। আগের অভি হয়ে যাবো আর তোমার উপর রাগ দেখাবোনা। (প্রায় কান্না করে দিলো অভি)

-অভি প্লিজ কান্না করোনা। সহ্য হচ্ছেনা আমার তোমার কান্না।

-আগে বলো তুমি ফিরে যাবে আমার সাথে। এই কয়দিননে আমি বুঝে গেছি ইরা তোমাকে ছাড়া আমি কতোটা অচল। তোমাকে ছাড়া আমার নিঃশ্বাস নিতেও কস্ট হয়। আই লাভ ইউ ইরা। আই রেলি লাভ ইউ।

-তুমি ছাড়া আমিও অচল অভি। অভির মাঝেই ইরা। আই লাভ ইউ টু। এবার হাসো, না হলে যাবোনা তোমার বাসায় আমি।

-আমার একার না ইরা। আমাদের বাসা।

-হ্যা আমাদের বাসা।

এই বলে দুজন হেসে দেই।


আরো তিনদিন পর ইরাকে রিলিজ দিয়ে দেয়। ইরার মা বাবা নিয়ে যেতে চাইলে অভি বলে সে ইরার যতেষ্ট খেয়াল রাখবে। আর ইরাও তার মা বাবাকে না করে দেয়। ইরার মা বাবা খুশি হয় ওদের এক হতে দেখে আবার আর রিলেক্স হয় তারা।

ইরা ভিতরে ঢুকতে গেলে অভি ইরা কে থামিয়ে বলে…………..

-ইরা দাড়াও।

-কেনো!?

-চোখ বন্ধ করো আগে!

-কিন্তু কেনো?

হু।
………..
.

ইরাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে অভি ইরার চোখ গুলো হাত দিয়ে চেপে ধরে আস্তে আস্তে করে ভিতরে নিয়ে যায়।

-চোখ খুলবেনা কিন্তু।

-আচ্ছা বাবা, খুলবোনা।
…………..

কিছুক্ষন পর………….

-Wellcome To our home।

-ইরা চোখ খুলে অবাক পুরো ঘর সাজানো। শাওন প্রীতি আর বাদ বাকি সব কলেজ ফ্রেন্ড উপস্থিত।

সবাই এক সাথে বলে উঠে Happy Anniversary to you Guys .

ইরা অবাক হয়ে অভির দিকে তাকিয়ে থাকে।
অভি ইরার পিছনে গিয়ে ইরার দুই কাধে দুই হাত রেখে তার পর ইরার কাধে মাথা রেখে………..

-Happy Anniversary My dear .

-আমি সত্যি সারপ্রাইজ অভি। আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকী। সরি আমি সত্যিই ভুলে গেছি।

-থাকনা একবার না হয় আমিই মনে করিয়ে দিলাম প্রতিবারতো তুমিই মনে করিয়ে দাও।

-থ্যাংকস।
—–

সবাই খুব ধুমধাম করে পার্টি করে। রাতে খেয়ে সবাই চলে যায় আর সব কিছু ইরাই করলো। ও ভুলেই গিয়েছে ও হসপিটাল থেকে এসেছে। মনের ভিতর এক অজাননা আনন্দ বয়ে চলেছে ইরার। আসলে মানুষের মন সুস্থ থাকলে শরীর টাও সুস্থ থাকে।

সবাই চলে যাওয়ার পর ইরা আর অভি ছাদে গিয়ে দোলনায় বসে থাকে। অভির কাধে মাথা রেখে বসে আছে ইরা। আর হাত দুটো দিয়ে অভির হাত ধরে আছে।
-আই প্রমিস ইরা আজ থেকে প্রতিটা দিন আমাদের সুন্দর যাবে। অফিসের কাজ অফিসে, বাসায় নিয়ে আসবোনা।
-আই প্রমিস অভি আমিও তোমার সাথে অকারনে ঝগড়া করবোনা।

– হুম চলো অনেক্ষন হলো এবার ঘুমাতে চলো।

-আরেকটু থাকিনা অভি।

-হু একদমি না। তুমি এখন রেস্ট নিবা। আমি আর কিছু শুনবোনা।

-একটু বেশি না।

-শিসসসসসস। তোমাকে এভাবে হবেনা।
ইরাকে কোলে করে অভি রুমে নিয়ে চলে যায়। বিছানায় শুয়ে দিয়ে ইরার মাথায় বিলি কেটে দেই। ইরা অভির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কবে যে ঘুমিয়ে পরে ইরা নিজেই জানেনা। অভি ইরার ঘুমন্ত চেহারা টার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কপালে একটা চুমু একে দেয়।

সরি ইরা অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমায়। হাজার ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়েছি তোমায়। আজকে সব গ্লানি দূর তোমার। কাল থেকে তোমার আমার এক ভালোবাসার নতুন অধ্যায় শুরু হবে।মান অভিমান থাকবে কিন্তু কোন ঝগড়া অবহেলা দুরত্ব কখনো সৃষ্টি হবেনা। ভালোবাসি খুব পাগলি। ইরার ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে এসব বলতে থাকে অভি। কপালে আবার ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে খুব নিবিড় ভাবে ইরাকে জড়িয়ে ধরে অভিও ঘুমের দেশে তলিয়ে পড়ে।

[প্রিয় মানুষ টাকে একটু সময় দিন। এরা একটু আপনার থেকে সময় চাইলে ব্যস্ততা অজুহাত দেখাবেন না৷ ধন্যবাদ ]

#সমাপ্ত।

(ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমার চোখে দেখবেন। ধন্যবাদ)

“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন


একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে