বৈধ সম্পর্কের জোর পর্ব-৭ এবং শেষ পর্ব

0
105

#বৈধ সম্পর্কের জোর
#জান্নাত
#শেষ_পর্ব_৭

আমার পিছু পিছু রাফিদ ও আসলেন, এসে আমাকে তার মুখো মুখি দাঁড় করিয়ে জানতে চাইলেন কি হয়েছে,,,
উনার এই প্রশ্নে যেন নিজেকে সামলাতে পারলাম না,ফুপিয়ে কেঁদে উঠললাম।
তিনি ব্যস্ত হয়ে কান্নার কারণ জানতে চাইলেন, আমি তবুও কিছু বলছি না কেঁদেই যাচ্ছি।

কিছু বলছি না দেখে উনিই নিজ থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন,তারপর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,তোমার কি রাতের জন্য মন খারাপ।
আমি পানি ভর্তি চোখে উনার দিকে তাকালাম।
আমার এমন নিরবতা আর তাকানো দেখে বুঝতে পারলেন যে কালকের জন্যই মন খারাপ।
তিনি একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জড়িয়ে ধরেই বললেন,তুমি হয়তো কাল রাতে আমার পুরো কথা শুনোনি।আমি কথা শেষে তাকিয়ে দেখেলাম তুমি ঘুমিয়ে গেছো।কত টুকু শুনেছো আমি জানি না,যদি পুরোটা শুনতে তাহলে হয়তো কালকে রাতের জন্য মন খারাপ করে থাকতে না।
আমি উনার কথা শুনে উনার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
উনি আমার দিকে তাকিয়ে আবারও বললেন,আমি কালকে যা বলছিলাম সে গুলো নিজেকে হালকা করতে বলেছিলাম।যেহেতু তুমি চাও আমি তোমাকে মন থেকে মেনে নেই আর আমি যেহেতু এখনও এশাকে পুরো পুরি ভুলতে পারি নি।তাই তোমার কাছে আরও সময় চেয়েছিলাম।আমিও চাই তোমাকে মেনে নিতে কিন্তু সেটা মন থেকে বাধ্য হয়ে না।আমি অবাক হয়ে শুনলাম,আর ভাবছি আমি কি ঠিক শুনছি।উনি কি আমাকে সত্যিই মেনে নিতে চান।তাহলে কালকে কেন এগুলো বললো।
আমি ছল ছল চোখে উনার দিকে তাকালাম।
উনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন তাই বললেন,আমি আগেই বলেছি নিজেকে হালকা করতে মনের কথা গুলো বলেছিলাম।কিন্তু তুমি তো পুরোটা না শুনেই ঘুমিয়ে পরেছো।আর আজ শুধু শুধু মন খারাপ করে ছিলে।নাকি তুমি চাও না আমি মনের কথা প্রকাশ করি।(মুচকি হেসে)

আমি চোখ মুছে বললাম, নাহ।আমি সত্যি খুশি হয়েছি যে আপনি নিজের মনের কথা নিজ থেকে আমায় বলেছেন।আমারই উচিৎ ছিল সবসময় জোর না করে মাঝে মাঝে আপনার মনের কথা শোনা।
উনি বললেন,আচ্ছা হয়েছে,হয়েছে এখন চলো খেয়ে ঘুমাবে।কালকে অনেক ধকল যাবে।

সুন্দর ভাবে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ইসলামিক শরীয়ত মোতাবেক সব নিয়ম মেনে ভাইয়ার বিয়ে সম্পন্ন হলো।আজকে সকালে শশুর শাশুড়ী এসেছেন।
আমরা পরশু সবাই চলে যাবো।
ভাবিকে এ বাড়িতে আনার পর অনেক মজা করলাম।একটু মন খারাপ হলো যদি আমার বিয়ে না হতো তাহলে ভাবির সাথে অনেক মজা করতে পারতাম।
ভাবি খুব ভালো মনের মানুষ।ভাইয়ার শশুর বাড়ির সকলেই বেশ ভদ্র বিনয়ী।

হাসি মজা আনন্দের মধ্যে দিয়ে আমার ও বাড়িতে যাওয়ার দিন এসে গেলো।আম্মু, আব্বু,ভাইয়া,ভাবিকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না।আজকে আমরা ও বাড়িতে যাবো আর ভাইয়াও ওর শশুর বাড়িতে যাবে।আম্মু বলেছিল আর কয়েকদিন আমাকে রেখে যেতে আমিও থাকতে চেয়েছিলাম।কিন্তু শাশুড়ী আম্মু বললেন অনেক দিন হয়েছে এ বাড়িতে আছে।কিছু দিন ও বাড়িতে (শশুর বাড়ি) থাকুক পরে আবার এসে থাকবে।
আম্মুও আর কিছু বলতে পারেন নি।
আসার সময় আম্মু আর আমি অনেক কেঁদেছিলাম।আব্বুরও চোখে পানি ছিল।আর ভাইয়া বারবার বলে দিয়েছে ও বাড়িতে কোনো সমস্যা হলে বা কেউ কিছু বললে সাথে সাথে ভাইয়াকে বলতে।ভাবি বলেছেন যেন তাড়াতাড়ি আবার বেড়াতে আসি।

গাড়িতে বসেও কাঁদছিলাম।আমার কান্না দেখে উনি বললেন,বিয়ের ছয় মাস পর এখন এমন ভাবে কাঁদছো যে মনে হচ্ছে আজকে তোমার বিয়ে হয়েছে আর পরিবার ছেড়ে চলে যাচ্ছো তাই কেঁদে কেঁদে পুকুর বানিয়ে ফেলছো।নাকি ভাবির কান্নার ছোঁয়া লেগেছে তাই কাঁদছো।

এমন ফাজলামো করে কথা বলাতে কিছু ক্ষনের জন্য কান্না বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। উনি যে আমার সাথে মজা করবেন আমি কল্পনাতেও ভাবতে পারি নি।কারন সবসময় উনি মুখ গম্ভীর করে রাখতেন।
তারপর আবারও কেঁদে দিলাম এই কান্না সুখ দুঃখ মিশ্রিত ছিল।

এ বাড়িতে আসার পর খুব ভালোভাবেই দিন কাটছিলো। বিশেষ করে উনি আমার সাথে ফ্রী হওয়াতে আরও ভালো দিন কাটছিল।

কিছু দিন পর,,,
বিকালে সবাই মিলে গল্প করছিলাম। সাথে হালকা নাস্তা।উনিও আজকে বাসায়।দুপুরের পর আর যাননি।হঠাৎ করে কলিং বেল বাজাতে সবাই সেদিকে তাকালাম। রাফিয়া উঠে দরজা খুলে দিল।ওপাশে এশার আব্বুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখ কালো করে ফেললো।তারপরও ভদ্রতার খাতিরে সালাম দিলো।শশুর জানতে চাইলেন কে এসেছে। এশার আব্বুকে দেখে উনিও মুখ গম্ভীর করে ফেললেন। আমি যেহেতু এশার আব্বুকে চিনি না।তাই শুধু বসে বসে দেখছিলাম।
এশার আব্বু বললেন,ভেতরে আসতে বলবেন না?(মুচকি হেসে)
আব্বু গম্ভীর ভাবেই রাফিয়াকে বললেন,এশার আব্বুকে ভেতরে আসতে দিতে।
রাফিয়া দরজা থেকে সরে দাঁড়াল।

এশার আব্বুকে দেখে সবার মুখই গম্ভীর হয়ে গেলো রাফিদেরও।
এশার আব্বু এসে সোজা শশুর আব্বুর পাশে বসলেন,ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করতে লাগলেন।আব্বুও উত্তর দিলেন তবে মুখে গম্ভীরতা বজায় রেখে।রাফিদ উঠে চলে যেতে চাইছিলেন,তখন তার হাত ধরে আবার বসিয়ে দিলাম,তারপর জানতে চাইলাম,ওনি কে?
রাফিদ বললো,এশার আব্বু। সাথে সাথে আমার মুখও গম্ভীর হয়ে গেলো।আর মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরাঘুরি করতে লাগলো।ওনার আসার কারন কি।

এশার আব্বু কথা বলার এক পর্যায়ে আব্বুর হাত ধরে বললেন,সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি খুবই দুঃখিত। আমি তো আপনাদের বলেছিলাম যে এশার বিয়ে ঠিক মৃত বোনের কাছে ওয়াদা দেওয়া।
আমি জানি আপনারা রাফিদকে বুঝিয়ে ছিলেন,কিন্তু ওরা বুঝেনি উল্টো পালাতে চেয়েছিলো।তাই আমি বাধ্য হয়ে আপনাদের অপমান করেছিলাম। যেন আপনারা রাফিদের অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিন।বিশ্বাস করেন যদি ওয়াদা না থাকতো তো রাফিদকে আমি মেনে নিতাম।কারন ও রিজেক্ট করার মতো পাত্র না।তবে রাজিবও অনেক ভালো ছেলে।
আমরা সবাই মনোযোগ দিয়ে ওনার কথা শুনছিলাম।
ওনি একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আবারও বললেন,হয়তো আপনাদের মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে যে আপনাদের অপমান না করে আমার মেয়েকেও বুঝাতে পারতাম। কিন্তু এতে আরও উল্টো হতো ছোট থেকে আহ্লাদ দিয়ে বড় করাতে জেদি হয়ে গেছে। যখন যা চায় তাই ওকে দিতে হবে।ওকে বোঝাতে গেলে সত্যি সত্যি ও পালিয়ে যেত।তাই আপনাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছি। আর তার জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত, ক্ষমাপ্রার্থী।
আব্বু হয়তো বুঝতে পেরেছে তার অবস্থা, তাই এশার আব্বুর হাত ধরে বললেন, এভাবে বলবেন না।আপনি যদি এই কথা গুলো সেদিনই বলতেন তাহলে আজ এরকম পরিস্থিতিতে পরতে হতো না।
এশার বাবা লজ্জিত মুখে বললেন, আমি তখন ভেবে কিছু করেন নি।আমার মাথায় শুধু ছিল যে ভাবেই হোক রাফিদের অন্য কোথাও বিয়ে দিতে হবে।তাই,,,,,,,
ওনাকে থামিয়ে দিয়ে আব্বু বললেন, আচ্ছা বাদ দিন নাস্তা করেন। (মুচকি হেসে)
এশার আব্বু এক গ্লাস পানি খেয়ে বললেন, সামনে শুক্রবার এশার বিয়ে, আপনারা অবশ্যই আসবেন।
আব্বু বললেন, চেষ্টা করবো।
এশার আব্বু বললেন, চেষ্টা না আাসতেই হবে।যদি আসেন তো বুঝবো আমাকে মন থেকে ক্ষমা করেছেন না হলে ভাববো আমার কৃতকর্ম ক্ষমার অযোগ্য।
আব্বু বললেন,আরে এভাবে বলছেন কেন।আমি সত্যিই ক্ষমা করে দিয়েছি।আমরা যাবো।
এশার আব্বু বললেন, আচ্ছা তাহলে আজ আসি।তারপর আবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, রাফিদের বউ।
আব্বু বললেন, হুম।
এশার আব্বু হেসে বললেন, বাহ্ বেশ মিষ্টি তো।তুমিও কিন্তু অবশ্যই আসবে। আর সবাইকে নিয়ে আসার দায়িত্ব কিন্তু তোমার।
আমি মুচকি হেসে বললাম, আচ্ছা
তিনি চলে গেলেন।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে রাফিদকে বললাম, আচ্ছা আপনার কি মন খারাপ এশার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তাই।
উনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, মন খারাপ হবে কেন।বরং আমি খুব খুশি ও নিজের জীবন গুছিয়ে নিচ্ছে।
আমি আরও কিছু বলতে যাবো,তার আগেই তিনি বললেন, পুরনো কথা বলে বা মনে করে বর্তমান নষ্ট করা উচিৎ নয়।
আমিও মুচকি হেসে বললাম, হুম।তারপর ঘুমিয়ে পরলাম ।

আজ এশার বিয়ে।অনেক সুন্দর ভাবে সব আয়োজন করেছেন। কোনো ত্রুটি রাখেন নি।
আমাদের দেখে এশার আব্বু আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পরলেন।

আমি গেলাম এশার কাছে।ও এমনিতেই দেখতে অনেক সুন্দরী। আজকে বিয়ের সাজে আরও সুন্দর লাগছে। আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখতে থাকলাম।তারপর গেলাম ওর সাথে কথা বলতে।
ওর সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম এই বিয়ে ও মন থেকেই করছে।আমাদের বিয়ের পর দুই তিন মাস মন খারাপ ছিল।তারপর রাজিবকে সব সত্য বলে দেয়। অবাক করার বিষয় রাজিব ওকে কিছু বলে নি উল্টো সাপোর্ট করেছে। বেশি বেশি কল দিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে। তার এক মাস পরেই দেশে চলে এসেছেন যেন এশা একা ফিল না করে।দেশে আসার পর অনেক জায়গায় ঘুরতে নিয়ে গেছে, বেশি বেশি সময় দিয়েছে তার ধারণা ওনি কম সময় দিতেন তাই এশা অন্য কারো প্রতি আকর্ষিত হয়েছে। তার তিন মাস পর এশা নিজেই বিয়ের কথা বলেছে।
ওর সাথে আরও কিছু ক্ষন কথা বলে চলে আসলাম আমার এক মাত্র জামাই এর কাছে। উনি যেহেতু জানতেন আমি এশার কাছে ছিলাম তাই এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না।
উনি গল্প করতে লাগলেন, আর আমি উনাকে দেখতে লাগলাম। উনার মুখে বিষাদের ছাপ ছিলো না বরং দেখে উনাকে হালকা লাগছিলো।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে ছয় বছর,,,,,,,,,,

আমি এখন এক মেয়ের মা।আমার মেয়ের নাম রাইমা।আমি একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করি,এটা আমার ছোট বেলার ইচ্ছে ছিল টিচার হওয়ার।উনারা কেউ বাঁধা দেন নি।
তবে এতদিনেও উনার মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শুনতে পারি নি। মাঝে মাঝেই উনি ঘুরতে নিয়ে যান,প্রতি দিন কিছু না কিছু কিনে আনেন খাওয়ার জন্য, বিশেষ করে আইসক্রিম। মাঝে মাঝে ফুল নিয়ে আসেন।নিজের হাতে সাজিয়ে দেন।উনি মুখে না বললেও উনার ভালোবাসা অনুভব করতে পারি। তবুও উনার মুখ থেকে শোনার প্রবল ইচ্ছা।

এর মধ্যে রাফিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। ওর একটা ছেলে হয়েছে দুই বছর বয়স। ভাইয়ার সারে চার বছরের একটা মেয়ে আর দেড় বছরের একটা ছেলে আছে। এশার একটা ছেলে আছে চার বছরের।

আজকে আবার একটা খুশির সংবাদ এসেছে। আমি আবারও মা হবো।উনি আসলে উনাকে বলাতে খুব খুশি হলেন।খুশিতে আমাকে উঁচু করে ঘুরতে লাগলেন।তারপর এ বাড়ি ও বাড়ির সবাইকে জানালেন।
খুশিতে আজ ও বাড়ির লোক আসবে। শাশুড়ী সব আয়োজন করেছেন। আমাকে কিছু করতে দিচ্ছেন না।আগের বারের মতো দেড় বছরের মতো আমাকে সব কাজ থেকে ছুটি দিয়েছেন।
আনন্দ হাসি খুশির মধ্যে দিন কেটে গেলো।রাতে উনি ফুল নিয়ে আসলেন তারপর আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বললেন তুমি তো বলবে না আমিই বলছি।আমি চেয়েছিলাম তুমি আগে বলো তোমার আশায় থাকলে বুড়ো হয়ে গেলেও ভালোবাসি কথাটা শুনা হবে না।অবশেষে আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি তোমাকে পাশে চাই।সারাজীবন এভাবে আমার পাশে থেকো। আমি সত্যিই খুব ভাগ্যবান তোমায় জীবন সঙ্গী হিসেবে পেয়ে।ভালোবাসি খুব বেশিই ভালোবাসি।

আমার চোখ থেকে আনন্দের অশ্রু পড়ছে।আমি উনার হাত থেকে ফুল নিয়ে আমিও বললাম আমিও আপনাকে খুব ভালোবাসি।সারাজীবন আপনার পাশে থাকতে চাই।ভালোবাসি।

মনে মনে ভাবলাম শাশুড়ী আম্মুর কথায় সত্যি হলো বৈধ সম্পর্কের জোরে উনি ঠিক আমাকে ভালোবেসে ফেললেন।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here