বিসর্জন চতুর্থ পর্ব

13
582

বিসর্জন চতুর্থ পর্ব

এর মধ্যেই হটাৎ একদিন আঙ্কেল ফোন দিয়ে বলল।আগামীকাল তোমার পরিবার নিয়ে আমাদের বাসায় আসো।

পরের দিন সকাল বেলা আমি,মা আর বাবা লিনাদের বাসায় যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম।তখন বাবা আমার হাতে একটা আংটি দিয়ে বলল এটা তোর কাছে রাখ।আমি আংটি টা হাতে নিয়ে বললাম বাবা এটা দিয়ে আমি কি করবো ?

– এটা আমি তোকে দেইনি তোর কাছে রাখতে বলছি।এটা আমার বৌমা’র জন্য।

যে বাবা কিনা তার ছেলেকে টাকা দিলে ওটার হিসাব রাখে আর আজ ওনার ছেলের বউয়ের জন্য আংটি নিয়ে যাচ্ছে।এটা ভাবতেই আমার কেমন যানি লাগছে।

যাই হোক অবশেষে আমরা লিনাদের বাসায় গেলাম।সেখানে গিয়ে দেখি বাসাটা হালকা সাজানো হয়েছে।লিনার বাবা আমাদের দেখতে পেয়েই এগিয়ে এসে বাসার ভেতরে নিয়ে গেলেন।

লিনার বাবার সাথে আমার বাবা- মা কথা বলতেছিল এর ফাঁকে আমি আঙ্কেল কে জিজ্ঞাসা করলাম,,,,

আঙ্কেল আমি কি লিনার সাথে একটু আলাদা ভাবে কথা বলতে পারি।

– হ্যাঁ বাবা তুমি গিয়ে কথা বলো,লিনা ওর ঘরেই আছে।আয়েশা তুই ওর সাথে গিয়ে লিনার ঘরটা ওকে দেখিয়ে দে।

এই বাড়ির কাজের মেয়েটা আমাকে লিনার ঘরে নিয়ে গেল।ঘরে গিয়ে দেখি কেউ নেই ঘরে।ঘরটা খুব সুন্দর করে গুছানো।ঘরের দেয়ালে দেয়ালে টানানো ছিল বিখ্যাত চিত্র শিল্পীর আঁকা কিছু ছবি।সেগুলি আমি ঘুরে ফির দেখতে ছিলাম এর মধ্যেই হটাৎ আমার চোখ চলে গেল বারান্দাটার দিকে।বারান্দায় গিয়ে দেখি এখানে বিভিন্ন রকমের ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে টবে।যেহেতু সময়টা ছিল বসন্ত কাল তাই সব গাছেই ফুল ফুটে আছে।

এত গুলি ফুলের মধ্যে আমার আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল বেলি ফুল।কারণ বেলি ফুল আমার খুব প্রিয় একটা ফুল।এত প্রিয় একটা ফুল হাতের কাছে পেয়েছি তাই ধরতে খুব ইচ্ছা হল।

যেই না আমি ফুল গুলি ধরতে যাবো ঠিক তখনেই কেউ একজন পেছন থেকে বলে উঠলো,,,

– সাবধান,,,ফুলে হাত দিবেন না।

কেন ?

– আমি আমার বাগানের ফুলে কাউকে হাত দিতে দেই না।

আর আপনি এখানে কি এসেছেন কেন ?

আপনার সাথেই কথা বলতে এসেছিলাম।আর এখানে আসার আগে আপনার বাবার থেকে পারমিশন নিয়েই এখানে এসেছি।

– আমি তো একটু পরেই ওখানে যেতাম।আপনি এখানে না আসলেও পারতেন।

আর এখন যেহেতু এসেই পরেছেন তাহলে বলেন কি বলতে চান।

আপনাকে কি আপনার বাবা কিছু বলেছে ?

– হম বলেছে।তবে আপনি কাজটা মোটেও ঠিক করেন নি।আপনার জন্য আমার আপু অনেক কষ্ট পেয়েছে।

একটা মেয়ের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিয়ে।এটা নিয়ে তারা অনেক স্বপ্ন দেখে।কোন মেয়ের যখন বিয়ে ঠিক হয়ে যায় তখন সেই মুহূর্ত থেকে মেয়েটার মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন চলে আসে।

আর বিয়ে ঠিক হওয়ার এক সপ্তাহ পরে যখন মেয়েকে বলা হয় ছেলে পক্ষ এই বিয়েটা ভেঙে দিছে।তখন মেয়েটার মনের অবস্থাটা কি হয় একবার দেখেছেন কি ?

আর বিয়েটা ভেঙে যাওয়ার পরক্ষণেই মেয়েটাকে যখন জানানো হয় তাকে নয় তার পরিবর্তে তারই ছোট বোনকে ছেলে পক্ষের পছন্দ হয়েছে তখন ঐ মেয়ের অবস্থাটা কি রকম হয় এটাও একবার ভেবে দেখবেন,,,,

আমি আপনার আপুর সাথে একবার কথা বলতে চাই।ওনার থেকে আমি এটার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিব।

– আপুকে আপনি কই পাবেন।আপু তো বাসায় নেই,,,,

দুইদিন আগে বাবা যখন আপুকে ডেকে নিয়ে কথা গুলি বলেছিল আমি তখন সেখানেই ছিলাম।আপু তখন হাঁসি মুখেই বলেছিল বাবা ওনার যখন লিনাকেই পছন্দ হয়েছে তাহলে লিনার বিয়েটাই আগে হোক।এতে আমার কোন আপত্তি নেই বাবা,,,,

তখন আপু হাঁসি মুখে কথা গুলি বললেও আপুর ভেতরে ছিল একটা চাপা কষ্ট।এটা বাবা বুঝতে না পারলেও আমি কিন্তু সেদিন ঠিকি বুঝেছি।

আর এর জন্যই আপু পরীক্ষার বাহানা দিয়ে আজকে সকালের ট্রেনেই ঢাকা চলে গেছে,,,,

আচ্ছা আপনাকে যদি একটা কথা জিগ্যেস করি তাহলে কি সত্যি করে উওর টা দিবেন ?

হ্যাঁ দিব,,,আপনি বলেন কি জানতে চান।

– আপুর সাথে আপনার বিয়ে ঠিক হল কিন্তু, আপুকে পছন্দ না করে আপনি আমাকে পছন্দ করলেন কেন ? আপু তো দেখতে আমার থেকে কম সুন্দর না।পড়াশোনার দিক থেকেও আপু আমার থেকে অনেক এগিয়ে তাহলে আপুকে আপনার পছন্দ হল না কেন ?

আমি আপনাকে বা আপনার আপু,দুজনের মধ্যে কাউকেই আগে কখনো দেখেনি।বলতে গেলে আপনার আপুকে না দেখেই এই বিয়েটাতে আমি রাজী হয়ে যায়।সেদিন যখন আপনার বাবা আমাকে ফোন দিয়ে বলল লিজা বাসায় এসেছে তুমি কালকে আমাদের বাসায় আসো।

তারপর আমি এখানে আসলাম।আর,যার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হল তাকে আমি আজ প্রথম বার দেখবো এমন একটা আগ্রহ নিয়েই আমি সেদিন আপনাদের বাসায় এসেছিলাম।

সেদিন যখন আপনাদের বাসার সামনে দাড়িয়ে দরকায় কলিং বেল দিয়েছিলাম তখন কিন্তু দরজা টা আপনিই খুলেছিলেন আর প্রথম আমি আপনাকেই দেখেছিলাম।তখন আমি আপনাকে দেখে মনে করেছিলাম আপনিই হয়তো লিজা যার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।

লিজা ভেবেই আপনাকে সেদিন আমার প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে যায়।আর এতটাই ভাল লেগেছিল আপনাকে যার জন্য পরে আর অন্য কাউকে লিজা বলে মানতে পারিনি।

এরপর এটা নিয়ে আমি অনেক বার ভেবেছি কিন্তু মনের সাথে যুদ্ধ করে আমি পেরে উঠিনি।মন যে শুধু আপাকেই চেয়েছিল।

– কিন্তু আপনাকে যে আমার একটুও ভালো লাগে না।

তাহলে কি এই বিয়েটা হবে না ?

– বিয়েটা হবে।কারন বিয়েটাতে যে আমার বাবার সম্মান জরিয়ে আছে।আমি চাইনা আমার বাবার অসম্মান হোক।

তবে এই বিয়েটাতে আমার কোনরকম মত নেই।শুধু বাবার কথা ভেবেই বিয়েটা করব,,,,

তাহলে তো আমি এই বিয়েটা করব না।

– কেন,,,,করবেন না কেন ?

যে বিয়েতে আপনার কোন মত নেই শুধু বাবার সম্মানের কথা ভেবে বিয়েটা করছেন।এই বিয়ে আমি করতে পারবো না।

– তাহলে কি আপনি আমার মত নিয়ে এই বিয়েটা করতে চান ?

“হম”

– তাহলে যে আমার একটা শর্ত আপনাকে মানতে হবে।

আপনার মত পাওয়ার জন্য আমি যে কোন শর্ত মানতেই রাজী।কি শর্ত মানতে হবে বলুন।

– আমার আপুর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমাদের বিয়েটা হবে না।

ওকে আপনার আপুর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনাকে বিয়ে করব না।

– আর আমি যে আপনাকে এই শর্ত দিয়েছি বাবা যেন কখনোই এই কথা জানতে না পারে।

এই আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি এই শর্তের বিষয়টা আমার আর আপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।এটা আমি আর কাউকেই বলব না।

সেদিন যখন লিনাকে আংটি পরানোর পরে আঙ্কেল বিয়ের তারিখ নিয়ে কথা তুলল।তখন আমি বললাম আঙ্কেল বিয়েটা আমি এখনেই করতে চাচ্ছি না।চাকরিটা আগে হোক আর এদিকে লিনাও অনার্স টা কমপ্লিট করুক।তাই আমি আপনার কাছে একটু সময় চাই।

তখন আঙ্কেল ওনার মেয়েকে জিগ্যেস করল লিনা তুমি কি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাও ?

– বাবা আপনার মতামতেই আমার আমার মতামত।আপনি যা ভালো মনে করবেন তাই হবে।

তারপর আঙ্কেল বললেন বিয়েটা তাহলে কিছুদিন পরেই হোক।এর মধ্যে তুমি নিজেকেও আরেকটু গুছিয়ে নাও।

আঙ্কেলের কথা শুনে আমার মা বাবাও আর আপত্তি করল না।সবাই এটাই মেনে নিল।

সেখান থেকে বাড়িতে আসার তিন দিন পরেই পিওন বাড়ি এসে একটা চিঠি দিয়ে গেল।চিঠি টা হাতে নিয়ে খুলে দেখি এটা আমার জয়েনিং লেটার।

তার মানে চাকরিটা আমার হয়ে গেছে।বাবা মা কে খবরটা জানালাম ওনারা খুব খুশি হয়েছেন।তবে বাবাকে দেখে মনে হল বাবা একটু বেশিই খুশি হয়েছেন।হয়তো এটা ভেবেই বাবা বেশি খুশি হয়েছেন যে আমাকে আর ওনার টাকা দিতে হবে না।

সাথে সাথে আঙ্কেলকেও খবরটা জানালাম ওনিও শুনে খুব খুশি হয়েছেন খবরটা শুনে।

আগামী মাসের এক তারিখে চাকরিতে জয়েন দিতে হবে।তাই,,,,

চলবে…..

লেখা || Tuhin Ahamed

Comments are closed.