বাবার ইলেকশন

0
921
সবার বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও বাবা জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বাবার মার্কা হচ্ছে ‘বাতাবি লেবু’। বাবা বলেন, “এটা খুবই উপকারী একটা ফল। প্রেশারের রোগীদের জন্য খুবই ইফেক্টিভ, জানিস তো?” “সে তো বুঝলাম বাবা। কিন্তু ছন্দ মেলাবো কি করে? মার্কার নাম দুই শব্দের হলে ছন্দ মেলানো কঠিন” বাবাকে এটা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত দেখা গেল না। বরং তিনি ভাবছেন নির্বাচনের দিন কোন রঙের পাঞ্জাবি পড়বেন। পরে একেবারে বাতাবী লেবুর মতন হাল্কা সবুজ রঙের একটা পাঞ্জাবি নিয়ে এসেছেন দেখলাম।
প্রচারণা নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হল খানিকটা। সিএনজি ভাড়া করে প্রচারণায় বের হলাম আমি আর আমার চাচাতো ভাই সাথে বাবা। আমার হাতে মাইক, আমি সবটুকু সুন্দরভাবে বললাম, শেষে এসে আটকে গেলাম। কি করে বলব বুঝতে পারছিলাম না। বাবাকে কিভাবে ভাই বলি! তাই আমি বললাম, “আমার আব্বুর সালাম নিন, বাতাবি লেবু মার্কায় ভোট দিন”। বাবা আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, “উনারা কি তোকে চিনে নাকি তোর বাবাকে চিনে? নাম বলা লাগবে না?” বাবার ধমক খেয়ে আমি একটু পরিবর্তন করলাম। “আফজাল আব্বুর সালাম নিন, বাতাবি লেবু মার্কায় ভোট দিন”। বাবা বিরক্ত হয়ে সিএনজি থামিয়ে আমাকে বের করে দিয়ে নিজেই নিজের প্রচারণা চালালেন।
পোস্টার বানানোর সময় আমার আর বাবার বেশ কয়েকবার ঝগড়া হয়ে গেল। বাবাকে বললাম প্রার্থীর ছবি বড় করে থাকতে হবে, তাহলে মানুষ চিনবে। কিন্তু তার কথা হচ্ছে যেহেতু প্রতীকে মানুষ ভোট দিবে, সেহেতু প্রতীক মুখ্য, প্রতীক বড় করে দিতে হবে। এই লজিক দাঁড় করিয়ে বাবার পোস্টারে বড় করে বাতাবী লেবুর ছবি দেয়া হল। আর বাবার ছবি ছোট করে একপাশে রাখা হল। বাবা সব কিছুতেই ক্রিয়েটিভিটি শো করতে পছন্দ করেন। তাই পোস্টারে বেশ কয়েকটি শব্দকে তিনি একটু ওলট-পালট করে ব্যবহার করলেন। তিনি “বাতাবি লেবু মার্কায় ভোট দিন” এর পরিবর্তে লিখলেন “বাতাবি লেবু মার্কায় সিল মারুন”। মাঝে তো একবার প্রস্তাব করেছিলেন সিনেমার ডায়লগের মত করে লিখবেন “আফজাল ভাইকে ভোট দিবি কিনা বল?” বাবার এসব উদ্ভট আইডিয়ায় সবার থেকে আলাদা দেখা যাচ্ছিলো তার নির্বাচনি পোস্টার। মনে হচ্ছিল এ জন্যই না তিনি নির্বাচিত হয়ে যান! নির্বাচনী খরচ যোগানোর জন্য বাবা অল্প কিছু পরিমাণ জমি বেচে দিলেন। নির্বাচনী খরচ সুবিশাল হয়, কিন্তু বাবা খরচ বাঁচাতে লাগলেন। পোস্টারিং করার সময় বাবাকে যখনি বলতাম, “বাবা অমুক জায়গায় পোস্টার লাগাবেন না?” বাবা বললেন, “ওখানে এমনিও ভোট পাবনা, বাদ দে” পরে দেখা গেল, আমাদের নিজ এলাকা বাদে আর কোথাও পোস্টার লাগানো হয়নি। প্রচারণা খুব একটা সুবিধের হয়নি। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা। প্রচারণা তো হল না ঠিকমত।” “আরে ধূর! এইযে এই এলাকার মানুষ অন্য এলাকায় যায়না? ঘুরতে, কাজ করতে। তারা গিয়ে বলবে না যে এখানে বাতাবি লেবুতে একজন প্রার্থী হয়েছে! প্রচারণা হয়ে যাবে” নির্বাচনের দিন ভোরে বাবা হালকা সবুজ কালারের পাঞ্জাবি পড়ে কেন্দ্রে গেলেন। ওখান থেকে এসে বাসায় পায়চারি করতে লাগলেন। আমি আর মা ভোট দিয়ে এলাম। বাবা ঘরের মধ্যে এইচএসসি ফলপ্রার্থীর মত দুঃশ্চিন্তা করতে লাগলেন। যে শিক্ষার্থী জানেই যে সে ফেল করবে সে কেন এ প্লাস প্রার্থীদের মত দুঃশ্চিন্তা করবে বুঝে আসে না। সন্ধ্যাবেলা নির্বাচনী ফল প্রকাশ করা হল। বাবা মোটে তিন ভোট পেয়েছেন। আমি আর মা দুইভোট দিয়েছি। বাবাকে বললাম, “আর একটা ভোট আপনার?” তিনি বললেন, “আরে নাহ! নিজের ফেসবুক পোস্টে কখনো নিজে লাইক দেয়? আত্মসম্মান আছে না আমার?” “তাহলে কে দিল এই তৃতীয় ভোট?” বাবার চোখ চকচক করে উঠল। তিনি বললেন, “তার মানে বুঝেছিস? অন্তত একজন হলেও বাইরের কেউ ভোট দিয়েছে!” কাজের মেয়ে আলেয়া এসে হাসিহাসি মুখ করে বলল, “চাচাজান আমি দিছি” বাবার চোখের চকচক মূহুর্তে মিলিয়ে গেল। ঘরজুড়ে নিরবতা বিরাজ করতে লাগলো। Asif Mahmud

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে