বসন্ত এসে গেছে পর্ব-২৪+২৫+২৬

0
78

গল্পঃবসন্ত এসে গেছে
লেখাঃনুশরাত জেরিন
২৪.২৫.২৬
পর্বঃ২৪

,

,
—এখানে দাঁড়িয়ে কি করছো অপরুপা?

নোমানের কথা শুনে সেদিকে তাকায় অপু।
আবার রায়হানের দিকে তাকায়।দেখে রায়হানও তাকিয়ে আছে নোমানের দিকে।

অপু সেকথার উত্তর দেয়না।
বলে,

—আপনি এখানে?

—তোমাকে নিতে এলাম।আজ অফিসের কাজ তারাতাড়ি শেষ হয়ে গেছে তাই ভাবলাম বাসায় যাওয়ার পথে তোমাকেও নিয়ে যাই।

–ওহ,আচ্ছা চলুন।আমিও বাসায়ই যাবো।

অপু এগিয়ে যায়।কিন্তু নোমান আসেনা।
অপু কিছুদুর পৌছে নোমানকে না দেখে পিছু ফিরে তাকায়। দেখে নোমান আগের জায়গায়ই দাড়িয়ে আছে।
প্যান্টের পকেটে দু হাত ঢুকিয়ে স্থীর ভাবে দাড়িয়ে আছে।তীক্ষ্ণ চোখে রায়হানের দিকে তাকিয়ে আছে।

অপু আবার ফিরে আসে।নোমানের একহাত ধরে ঝাকায়।

—কি হলো আসুন।

নোমান নড়ে না।
রায়হানের দিকে তাকিয়ে অপুকে উদ্দেশ্য করে বলে,

—ওনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেনা?

অপু শুকনো ঢোক গেলে।
রায়হান অপুকে কি নজরে দেখে সেটা জানলে নোমান যদি রেগে যায়?অপু আর নোমানের প্রায় ঠিক হওয়া সম্পর্ক আবার যদি এলোমেলো হয়ে যায়?
অপু সেকথা ভেবে ভয় পায়।
রায়হান নিজেই এগিয়ে আসে।হাত বাড়িয়ে দেয়।বলে,

—হাই,আমি রায়হান।
রুপার সিনিয়র।

একটু থেমে আবার বলে,

—সিনিয়র ভাই।

নোমান সেকথা শোনে কিনা ঠিক বোঝা যায়না।
ভ্রু কুঁচকে বলে,

—রুপা?রুপা কে?

—মানে অপরুপা।
আর আপনি?

নোমান এবার হাত মেলায়।বলে,

—নোমান খান,অপরুপার হাসবেন্ড।

অপু আবার নোমানকে তাড়া দেয়।বলে,

—কি হলো চলুন এবার।পরিচয় তো হলো।

—হু,চলো।

গাড়ির কাছে যেতে যেতে পেছনে বারবার তাকায় নোমান।
রায়হান তখনো আগের জায়গায় স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
বাইরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বুকের ভেতর তার তোলপাড় হয়।হ্রদয় ভাঙা প্রলংয়করী ঝর বয়ে চলে।

———

বাড়িতে ফিরে নোমান ব্যস্ত হয়ে যায় নিজের কাজে।
গোসল সেরে, ড্রেস বদলে,খাবার খেয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পরে সে।
অপুর বিরক্ত লাগে।

এতো বড় বাড়িতে,এতোগুলো মানুষের ভেতর তার খুব একা একা লাগে।
দুপুর থেকে বিকেল অব্দি এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে কাটায় অপু।
অবশেষে আর না পেরে নোমানের রুমে ঢুকে।
রুমে এসে দেখে নোমান এখনো ল্যাপটপ নিয়েই পরে আছে।
অপু নোমানের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য বারকয়েক সামনে দিয়ে হাটাহাটি করে।
গলা খুকখুক করে।
তবুও নোমানের সেদিকে কোন হুশ নেই।

অপু বেশ চটে যায়।
নোমানের সোফার পাশে ধপ করে বসে ল্যাপটপে উঁকিঝুকি দিতে লাগে।

নোমান সেদিকে আড়চোখে তাকায়।
বলে,

—কি সমস্যা?

অপু ধরা পরে যাওয়া বলদা হাসি হাসে।

—কি সমস্যা? ককক কিছুনা।

নোমান আবারও ল্যাপটপে মনোযোগ দেয়।
অপু কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে নোমানের সাথে কথা বলার আশায়।
নোমানকে আর কিছু না বলতে দেখে সোফা ছেড়ে উঠে দাড়ায়।

নোমান ল্যাপটপে চোখ রেখেই বলে,

—রায়হান নামক ছেলেটার থেকে দুরে থাকবা।

অপু চমকায়।
চোখ বড়বড় করে নোমানের দিকে তাকায়।
পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,

—আপনি যেরকম টা ভাবছেন আসলে কিন্তু তেমন কিছুইনা।

নোমান ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে রাখে।
সোফায় গা এলিয়ে এক পায়ের উপর পা তুলে বসে।
অপুর চোখে চোখ রেখে বলে,

—কেমন ভাবছি আমি?

অপু থতমত খায়।

—না মানে….

অপুর কথার মাঝেই নোমান বলে,

—ছেলেটা তোমাকে পছন্দ করে তাইতো?

অপু হ্যা সূচক মাথা ঝাকায়।

—কেমনে বুঝলাম জানো?

অপু আবারও মাথা ঝাকায় তবে এবার না সূচক।

নোমান হাসে।
মুচকি হাসি হাসে।
তবুও কি সুন্দর দেখায়!অপু মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে।

নোমান বলে,

—ছেলেটার চোখ দেখে বুঝলাম।

—চোখ দেখে?

—হুমমম।

অপু কৌতুহলী গলায় বলে,

—চোখ দেখে মনের কথা বোঝা যায় নাকি?

নোমান আবার হাসে।

—একটা গান আছে না?চোখ যে মনের কথা বলে।
শুনেছো?

—হু।

—আমি যখন তোমার হাসবেন্ড হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছিলাম তখন ছেলেটার মুখে কালো মেঘ নেমেছিলো।
চোখ ছলছল করছিলো।
তুমি দেখোনি?

—ওতো খেয়াল করিনি।

নোমান হাসি হাসি মুখটা গম্ভীর করে।
অপুর হাত ধরে টেনে পাশে বসায়,বলে,

—তুমিও কি ছেলেটাকে পছন্দ করো অপরুপা?
আমাকে নির্দিধায় বলতে পারো।

—না না সেরকম কিছুনা।
আমি ওনাকে কখনো ঐরকম নজরে দেখিইনি।

নোমান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
অপুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তবে মনের ভেতর একটু খুতখুত থেকে যায়।
কেমন সন্দেহ দানা বাধে।

——–

রাতের রান্না করার জন্য অপু কিচেনে যায়।
এসব সেফ দের হাতের তৈরি পাউরুটি জেলি খেতে খেতে অপুর মুখ পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
রুজি খালারা থাকতে তবু বাঙালি খাবার খেতে পারতো অপু কিন্তু এখানে সে উপায়ও নেই।
নোমান সারাবেলা এসব ঘাসফুস চিবায়।সাথে অপুকেও চিবাতে হয়।

সব কাজের লোকদের বের করে দিয়ে অপু চুলায় ভাত বসায়।
তরকারি কেটেকুটে রাখে।

পেছোন থেকে কেউ বলে ওঠে,

—ওমাআআআ,আপনে এইসব খাবার খান ম্যাডাম?

অপু চমকে পিছনে তাকায়।দেখে সকালে দেখে যাওয়া সেই মেয়েটি।যাকে সবার থেকে আলাদা লেগেছিলো তার।

অপু সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে কাজে মন দেয়।
বলে,

—না খাওয়ার কি আছে?

মেয়েটা খুশিতে লাফিয়ে ওঠে।
এ বাড়িতে প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত একটা টু শব্দ ও করা নিষেধ।আর মালিকদের সামনে কথা বলা দুর মাথা উচু করাও নিষেধ।
সেখানে অপু তার সাথে কথা বলায় মেয়েটা বেশ খুশি হয়।

বলে,

—এ বাড়িতে কেউ তো এসব খায়না, তাই কইলাম।

—ওহ তাই?কিন্তু আমি তো ঐসব ঘাসপাতা খেতে পারিনা।

মেয়েটা আরও খুশি হয়।
বলে,

—আপনেও ঐসব খাবাররে ঘাসপাতা কন?আমিও তো কই।

অপুও খুশি হয়।
কথা বলার মতো একজন সাথী তো পেলো এই ভেবে তার বেশ ভালো লাগে।কাজ করার ফাকে ফাঁকে দুজন টুকটাক কথা বলে।
মেয়েটা হাতে হাতে সাহায্য করে।

—আচ্ছা তোমার নামটা কি?

কথার মাঝেই পেছন থেকে ডাক শোনা যায়।
কেউ বলে,

—ফুলি……..

ফুলি তাড়াহুড়ো করে বলে,
—আমারে ডাকতাছে,আমি পরে কথা কমুনে আপনের লগে।

মেয়েটা সেদিকে দৌড়ায়।
অপু নিজের কাজে মন দেয়।

,

,
খাবার টেবিলে নোমানের সামনে নোমানের খাবার সাজিয়ে ভাত তরকারি নিয়ে অপু বসে।
নোমান সেদিকে আড়চোখে বারবার তাকায়।

অপু পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো খায়।

নোমান খাবার নাড়াচাড়া করে।
গলা উঁচিয়ে রুবেলকে ডাকে।
রুবেল হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসে।

নোমান বলে,

—এসব কে রান্না করেছে রুবেল?

রুবেল বলে,

—কেনো স্যার?এতোদিন যে রান্না করতো সেই রান্না করেছে।

—আজ একটুও ভালো হয়নি কেনো?কেমন বিদঘুটে গন্ধ বেরোচ্ছে।

রুবেল তীক্ষ্ণ চোখে প্লেটের খাবার দেখে।
নাকের কাছে এনে গন্ধ শোঁকে।
বলে,

—কোথায় গন্ধ স্যার?

নোমান অধৈর্য হয়।
অপুকে খেয়াল করে দেখে তার এদিকে কোন খেয়ালই নেই।নিজের মতোই খাচ্ছে সে।
কেনো খেয়াল নেই তার এদিকে?কেনো সে বললো না নোমানকে তার রান্না করা খাবার খেতে?
তার রান্না করা খাবার থেকে যে কি দারুণ সুগন্ধ বেরোচ্ছে তা কি অপু বোঝেনা?
ঐ রকম সুগন্ধ শুঁকে এইসব খাবার কি কারো গলা দিয়ে নামে?

নোমানের সব রাগ অপুর ওপর পরে।
কিন্তু প্রকাশ করতে না পেরে সব রাগ রুবেলের ওপর ঝারে।চিৎকার করে বলে,

—আমি বলেছি খাবার ভালো হয়নি মানে ভালো হয়নি।একবার বললে কানে যায়না?বুঝতে পারোনা আমার কথা?ইডিয়ট!সবগুলো ইডিয়ট পুষে রেখেছি আমি।
ভালো মতো রান্নাটা পর্যন্ত করতে পারেনা।

রুবেল হা হয়ে দাড়িয়ে থাকে।
হুট করে বিনা কারনে নোমানের রেগে যাওয়ার কারনটা তার মাথার উপর দিয়ে যায়।

নোমান সেদিকে তাকিয়ে আরও ধমকায়।

—কি হলো? হাবার মতো দাড়িয়ে আছো কেনো?এক্ষুনি এই সব খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দেবে।এক্ষুনি!

আর হ্যা নতুন সেফও আনবে।পুরোনো সেফকে বিদেয় করো।ঘার ধাক্কা দিয়ে বিদেয় করো।

কথাটা বলেই সিড়ি বেয়ে রুমে যায় নোমান।
অপু সেদিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসে।

,
গল্পঃবসন্ত এসে গেছে
লেখাঃনুশরাত জেরিন
পর্বঃ২৫

,
,
প্লেটে খাবার নিয়ে রুমে ফেরে অপু।
ধীরে ধীরে পা ফেলে খাটের কাছে আসে।
নোমান তখন বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে আছে।
অপু গলা খুকখুক করে।
এদিকওদিক হাত দিয়ে জিনিসপত্র সরায়।নোমানের শোনানোর জন্য শব্দ করে।
বলে,

—এই যে শুনছেন?এইযে?

নোমান তবু নড়েনা।অপু এবার নখ দিয়ে গায়ে খোঁচা দেয়।
আবার ডাকে,চেচিয়ে বলে,

—শুনতে পাচ্ছেন? এই যে?

নোমান ধড়ফড় করে উঠে বসে।
বুকে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ হাপায়।চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে।কি ঘটেছে বোঝার চেষ্টা করে।বুঝতে পেরে রাগী দৃষ্টি ফেলে অপুর উপর।
বলে,

–এভাবে আমায় ঘুম থেকে উঠালে কেনো?

অপু অপরাধীর ভঙ্গিতে তাকায়।
তার নিজেরও খারাপ লাগে।এভাবে ঘুম থেকে ডাকা ঠিক হয়নি,ব্যাপারটা বোধগম্য হয়।
কিন্তু অপু তো ভেবেছে নোমান রাগ করে ভান ধরে শুয়ে আছে।এতো তারাতাড়ি কেউ ঘুমাতে পারে সেটা অপু জানতো নাকি?

নোমান অপুর উত্তর না পেয়ে আবার বলে,

–কি হলো,উত্তর দাও।

—আপনি ঘুমাচ্ছিলেন?

নোমানের মেজাজ গরম হয়।কেউ কাঁচা ঘুম থেকে ডেকে যদি বলে আপনি কি ঘুমাচ্ছিলেন?তাহলে মেজাজ গরম হওয়াটাই স্বাভাবিক।
তবুও নিজেকে যথাসাধ্য কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে।
একটা রাগী দৃষ্টি নিয়ে অপুর দিকে তাকায়।
অপু সে দৃষ্টির মানে বোঝে।

—না মানে আসলে,আপনি না খেয়ে কেনো ঘুমাচ্ছিলেন?

—খাবার ভাল লাগেনি তাই খাইনি।কেনো তুমি তখন শোনোনি?

অপু বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে,
—সত্যি ভালো লাগেনি?

নোমান সেদিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়।ধরা পরার ভয়ে হুমকি ধামকি দেখায়।
জোর গলায় বলে,

—সত্যিই তো।মিথ্যা বলবো কেনো।

অপু চেয়ার ছেড়ে খাটে উঠে বসে।
শাসনের সুরে বলে,

—আমি কিছু জানিনা,আপনাকে খেয়ে দেয়ে তারপর ঘুমাতে হবে।নয়তো শরীর খারাপ করবে তো।
না খেলে আমি কিন্তু ঘুমাতে দেবোনা।চিমটি কেটে ঘুম ভাঙিয়ে দেবো।

—আমার খিদে নেই।

–তারমানে আপনি খাবেননা?

—উহু।

—সত্যিই না?

—না।

—আমি খাইয়ে দিলেও না?

নোমান না বলতে গিয়েও থেমে যায়।
এই মুহুর্তে কি শুনলো সেটা ঠিক মতো বোঝার চেষ্টা করে।
চোখ বড়বড় করে অপুর দিকে তাকায়।
অপু খাবারের প্লেট এনে সামনে ধরে।
নোমান খুশি হয়।মনের কুঠুরির গোপন ইচ্ছেগুলো না বলতেই কেউ বুঝে নিলে খুশি না হয়ে উপায় থাকেনা।
খুশি মনে সুবোধ বালকের মতো অপুর হাত থেকে খাবার মুখে নেয়।

খাইয়ে দেওয়ার মাঝে মাঝে অপুর হাতের সাথে নোমানের ঠোঁটের সংস্পর্শ লাগে।
অপু বারবার সেই স্পর্শে কেঁপে ওঠে।
নোমান প্রথমে বিষয়টা বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতে পারে।
পরবর্তীতে ইচ্ছে করেই অপুর হাতে মৃদু কামড় বসায়।

অপু লজ্জায় গুটিশুটি মেরে যায়।
অপুর লজ্জায় রাঙা রক্তিম মুখ দেখতে নোমানের দারুন লাগে।
রাতের মৃদু জোৎস্নার আলোয় ঘর আলোকিত হয়।
সে আলো তীর্যকভাবে অপুর চোখমুখে পরে।
মুখশ্রী জোৎস্নার আলোয় আরও মনোমুগ্ধকর লাগে।
নোমান একধ্যানে সে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে।
মৃদু বাতাসের ঝাপটায় মুখে চুল নেমে আসে।
একহাতে প্লেট, আরেক হাতে খাবার খাওয়ানোর দরুন চুল সরাতে পারেনা।
মাথা এদিকওদিক ঝাকায়।
নোমান একহাত এগিয়ে নিয়ে নরম ছোয়ায় চুল সরায়।
অপু নিজের কপালের মৃদু ছোয়ায় চমকে নোমানের মুখপানে তাকায়।
নোমান মিষ্টি হাসে।
চোখ নামিয়ে নেয়।
বাকা হেসে আবার তাকায়,অপু ততক্ষণে প্লেট হাতে নিয়ে রুম ছেড়ে পালায়।

—-

পরপর দুদিন ভার্সিটি যায়নি অপু।
বাড়িতে বসেই সময় কাটায় সে।
ফুলি নামক মেয়েটার সাথে অপুর ব্যাপক ভাব হয়েছে।মেয়েটা খুব চটপটে স্বভাবের। এই বাড়িতে কাজ করার কারনে কষ্ট করে চুপচাপ থাকতে হতো তাকে।
কিন্তু এখন অপুকে পেয়ে সে তার স্বভাবের পুরোটায় উন্মুক্ত করেছে।
দুজনে মিলে হাতে হাতে বাড়ির কাজ সামলায়।
লুডু খেলে।হৈ হুল্লোড় করে।
প্রানশূন্য চুপচাপ বাড়িটায় যেনো প্রাণ সন্ঞ্চার হয়।

—-

আজ সকালে উঠে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হয় অপু।
দু দুটো দিন সে ভার্সিটি যায়নি।
না যাওয়ার কারনটা রায়হান ভাই।
রায়হান ভাইকে এড়িয়ে চলার জন্যই ভার্সিটি অফ দিয়েছিলো অপু।
কিন্তু কতোদিন আর ঘরে বসে কাটানো যায়?রায়হান ভাইয়ের জন্য পড়াশোনা তো আর ছেড়ে দিতে পারেনা সে?

রাস্তায় কোথাও রায়হানের দেখা পাওয়া যায়না।অপু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
মানুষটার সামনে দাড়াতে ইচ্ছে করেনা অপুর।
কেনো যেনো নিজেকে দোষী দোষী মনে হয়।যদিও অপু রায়হান ভাইকে সেরকম কোন ধরনের ইঙ্গিত দেয়নি,স্বাভাবিক ভাবেই কথাবার্তা বলেছে।তারপরও রায়হান ভাই যে মন থেকে কষ্ট পেয়েছেন সে কারনটার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হয় অপুর।

ক্লাস শেষে এদিকওদিক দেখতে দেখতে গেট থেকে বের হতে যায় অপু।
কিন্তু সামনে রায়হান ভাইকে দেখে থমকে দাড়ায়।
আজ অপুর সাথে পিহু আছে।

পিহু পাশ থেকে বলে,

—কিরে অপু দাড়িয়ে পরলি কেনো?চল।

অপু আবার চলা শুরু করে।রায়হান ভাইকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে একটি ডাক শোনে।

—রুপা দাড়াও।

,

,
গল্পঃবসন্ত এসে গেছে
লেখাঃনুশরাত জেরিন
পর্বঃ২৬

,
,

অপু দাড়িয়ে পরে।
রায়হান পিছু এসে দাড়ায়।
বলে,

—আমায় ইগনোর কেনো করছো রুপা?

অপু কিছু বলতে চায়।আবার পিহুর দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে যায়।
যতো যাই হোক এসব বিষয়ে অন্য কাউকে কিছু জানাতে চাইছেনা অপু।
রায়হানও ব্যাপারটা বুঝতে পারে।
পিহুর দিকে তাকিয়ে মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলে,

—আমি কি অপরুপার সাথে আলাদা একটু কথা বলতে পারি পিহু।

পিহু দুজনের দিকে চোখ বুলিয়ে জোরে জোরে মাথা নাড়ায় আর বলে,

–হ্যা হ্যা অবশ্যই।
আচ্ছা তাহলে আমি ঐ দিকটায় দাড়াই।
অপু তুই কথা বলা শেষ করে আয়।

—তোকে আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা পিহু।
তুই বাসায় চলে যা।আমি একাই যেতে পারবো।

—সিউর?

—হুমমম।

–ওকে,তাহলে কাল দেখা হবে।
ভার্সিটি আসিস।

—আচ্ছা।

পিহু চলে যেতেই রায়হান গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে,

—আমাকে এড়িয়ে কেনো চলছো রুপা?

কথাটা শুনে অপু চমকে রায়হানের মুখপানে তাকায়।এর আগে কোনদিনও রায়হানের মুখে এতো গাম্ভীর্য দেখেনি সে।

রায়হানের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামায়।

অপুর কোন উত্তর না পেয়ে রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এতো জোরে নিশ্বাসের শব্দে মনে হয় তার হ্রদয়টা চুর্নবিচূর্ন হওয়ার শব্দ শোনা যায়।

–আজ হেটে হেটে বাসায় যাবে রুপা?

অপু ভড়কে যায়।হুট করে প্রসঙ্গ বদলানোয় কিছুটা অবাক হয়।
রায়হানের সাথে একসাথে বাসায় যেতে আপত্তি থাকলেও তা মুখ ফুটে বলতে পারেনা।নিজের মনকে প্রবোধ দেয়,
মনে হয় কি এমন হবে একটা দিন একসাথে বাসায় গেলে?কি এমন ক্ষতি হবে তাতে?

মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে।

রায়হান তা দেখে নিজের মনেই হাসে।
কিছুক্ষণ একসাথে হাটে।দুজনেই নিরব থাকে।
কথার ভান্ডার আজ অপুর শুন্য প্রায়।রায়হানের সাথে কিছুতেই ফ্রি হতে পারেনা সে।
হুট করে রায়হান বলে,

—আমরা কি বন্ধু হয়ে থাকতে পারিনা রুপা?

আচমকা কথা বলায় অপু চমকে সেদিকে তাকায়।
নিজেকেই নিজে ধমকায়।হুটহাট এভাবে চমকানো স্বভাবটা বড্ড বাজে লাগে তার কাছে।

অপু কিছুক্ষণ ভাবে।কি বলবে খোজার চেষ্টা করে।
তবে চেষ্টা সফল হওয়ার আগেই রায়হান আবার বলে,

—প্লিজ রুপা,এইটুকু তো চাইতেই পারি আমি বলো?
শুধু বন্ধু হয়ে আমার জিবনে থেকো তুমি।আমি আর কিচ্ছু চাইনা।
কিচ্ছুনা।
তোমার স্বামী সংসার নিয়ে তুমি খুব সুখে থাকো।আমি আর কখনোই এসব ভালবাসা-টাসার কথা বলবো না।
তবু রুপা প্লিজ!

অপু মনের দীধাদ্বন্দ ফেলে বলে,

—এভাবে বলবেন না প্লিজ। আমার খারাপ লাগে।
তাছাড়া এভাবে বলার কি আছে,আমরা তো বন্ধুই।

রায়হানের মুখ উজ্জ্বল হয়।খুশি ঠিকরে পরে চোখ মুখ বেয়ে।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।

—তবে আমাকে আর ইগনোর করবেনা তো রুপা?

অপু হেসে মাথা নাড়ায়।
কাউকে খুশি করতে পারার মধ্যেও যে হাজার গুন আনন্দ আছে তা সে উপলব্ধি করে।
তবে মনে মনে কোন ভয় বাসা বাধে।
নোমানের কথা মনে হয়।
নোমান কি এসব শুনলে মেনে নেবে?
তার রিয়াক্ট কেমন হবে?সে তো বলেছিলো রায়হানের থেকে দুরে থাকতে,তার কথা অমান্য করার অপরাধে কি তাঁদের সম্পর্কে আবার ফাটল ধরবে?
কিন্তু রায়হান?
সে তো অন্যায় কোন দাবী করেনি?
কি করবে অপু ভেবে পায়না।
মাথায় কাজ করেনা।

—-

রাতে নোমান খাবার না খেয়েই শুয়ে পরে।
অপু প্লেটে খাবার নিয়ে নোমানের কাছে আসে।
ভাবে আজও বুঝি নোমানকে তার খাইয়ে দিতে হবে।
হয়তো সেজন্যই নোমান না খেয়ে এসেছে।

,
,
চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here